প্রয়াত হলেন ব্রিজিত বারদো। সিনেমার নক্ষত্র: কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি সুরেন্দ্রবন্দিতা। সাহেবরা যা-ই বলুক, আমাদের কাছে তিনি পটের বি বি। বস্তুত, গত শতাব্দীর মধ্যভাগে তিনি সমুদ্র শাসন করতে পারতেন। একটা সময়ে তিনি যৌবনের আদি প্রতিমা ছিলেন। ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের তো বটেই, আটলান্টিকের এপারে এবং ওপারে তিনি এবং মেরিলিন মনরো হয়ে উঠেছিলেন ঊর্বশীর আধুনিক রূপ। ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ সুন্দরী রূপসী/হে নন্দনবাসিনী ঊর্বশী।’ এই দুজনেই যেভাবে সিনেমার আভিজাত্যকে ব্যবহার করেছেন এবং একইসঙ্গে শাণিত আততায়ীর মত জনতার বাসনাকে রক্তাক্ত করে দিয়েছেন তা অনবদ্য। আমাদের অনেক অনেক ত্রুটির মধ্যে একটি হল নিজেকেই ছলনা করা। ফলে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যতটা সত্যজিৎ রায় বা মিকেলাঞ্জেলো আন্তনিওনি বোঝেন, ততটাই মনরো বা বারদোকে না বোঝার ভান করেন। আমরা তারাদের জীবনে গোপনে উঁকি দিই, গসিপ কলাম পড়তে আমাদের আগ্রহের অন্ত নেই, কিন্তু আজ পর্যন্ত সিনেমার কন্দর্প ও অপ্সরাদের নিয়ে আমাদের নাক উঁচু ভঙ্গিটা থেকেই গেছে। কোনো ভারতীয় বুদ্ধিজীবী আজও হেলেনের তুলনারহিত পদযুগল নিয়ে চিন্তা করেন না। অথচ মার্লিন দিয়েত্রিশের উন্মুক্ত উরুদেশ কত না মনীষাদীপ্ত আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইউরোপ, আমেরিকায়। এমনকি ঔপন্যাসিক আঁদ্রে মালরো তো বলেছেনই যে দিয়েত্রিশ সামান্য অভিনেত্রী নন, তিনি কিংবদন্তি। আঁদ্রে বাজার মত চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক তাঁর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আবিষ্কার করেছেন জ্যামিতির সুষমা। শরীরের এই উন্মোচন কীভাবে ঈদিপাস এষণার সঙ্গে যুক্ত, তা নিয়ে লেখা হয়েছে দার্শনিক সন্দর্ভ। এমনকি ১৯৬৫ সালে নিউজউইক পত্রিকা যখন বিখ্যাত পরিচালক জোসেফ ভন স্টার্নবার্গের আত্মজীবনীর রিভিউ ছাপে, তাকে সবচেয়ে বেশি দাম দেয় দ্য ব্লু অ্যাঞ্জেল (১৯৩০)-এর স্রষ্টা হিসাবে। তাঁকে বর্ণনাই করে মার্লিন দিয়েত্রিশ ইমেজের রচয়িতা হিসাবে। এভাবেই মনোসমীক্ষকরা ব্যাখ্যা করেছেন বিখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী মে ওয়েস্টের আক্রমণাত্মক যৌন আবেদনকে।

আটলান্টিকের এপারে মনরো ও বারদোকে নিয়ে ফ্রান্সের নবতরঙ্গ, বিশেষত ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর উচ্ছ্বাস, তো ইতিহাসের অংশ। ১৯৬০ সালে ঔপন্যাসিক এবং নারীবাদের অন্যতম প্রবক্তা সিমোন দ্য বোভোয়া লিখলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ব্রিজিত বারদো অ্যান্ড দ্য লোলিটা সিনড্রোম সেই লেখায় তিনি দেখালেন, কোন সমাজ একইসঙ্গে বাসনা ও বিদ্রোহের স্মারক এই নতুন নারী বারদোকে নির্মাণ করে। তাঁর নগ্নতার প্রকৃত রহস্য দ্রৌপদীর শাড়ির মতই যুদ্ধোত্তর ফ্রান্সের খবরের কাগজের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে। বারদোই আধুনিক ইউরোপের সেই নক্ষত্র যিনি গার্হস্থ্যকে টেনে নিয়ে যান জনপরিসরে। আপাতভাবে যা মনরোর অন্তর্বাস বিষয়ে একটি দীর্ঘ প্রশস্তি, ‘নায়াগ্রা’-র সেই আলোচনায় ত্রুফোর মত মনস্বী পরিচালক আসলে বলতে চাইছিলেন, পরিচালককে ছাপিয়ে কীভাবে মনরো নিজেই হয়ে ওঠেন সময়ের ইশতেহার। ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে ব্রিজিতের ক্ষেত্রেও। যখন ১৯৫৬ সালে তাঁর ভুবনখ্যাত স্বামী রজার ভাদিম তৈরি করেন অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উওম্যান, তখনই ব্রিজিতের যৌন প্রতিমা যেমন উদ্ভাসিত হয়, তেমনই তিনি হয়ে ওঠেন পুরুষের পক্ষে কামাদ্রিশিখর এবং তা-ই বোভোয়াকে বলতে উৎসাহিত করে যে এই ধরনের নারী যৌনতাই ‘locomotive of women’s history’।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বোভোয়া বারদোকে ফ্রান্সের সবচেয়ে স্বাধীনচিত্ত নারী বলে ঘোষণা করেন। বারদো নানারকম পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু সব পুরস্কার ম্লান হয়ে গেছে জঁ লুক গোদার ল্যো মেপ্রি (১৯৬৩)-তে বারদোর ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিপ্রতিম নিতম্ব প্রদর্শন করায়। আমরা দেখলাম যৌনতা কত আক্রমণাত্মক, কতখানি গুপ্তঘাতকের মত হয়ে উঠতে পারে। যখন লুই মালের ভিভা মারিয়া (১৯৬৫) ছবিতে বারদো অভিনয় করলেন, তখন স্বয়ং ফরাসি রাষ্ট্রপতিকে বলতে হয়েছিল যে ফরাসি রফতানির মধ্যে একমাত্র বারদোই রেনো গাড়ির সঙ্গে তুলনীয়।

অথচ যিনি গাড়ির তুলনায় বেশি মুদ্রা যুদ্ধোত্তর ফ্রান্সকে এনে দিতে পারেন, তিনি প্রথম দশজন নক্ষত্রের মধ্যেই আসেননি। শুধু যৌন পুতুল হিসাবে বিবেচিত হয়েছেন। তাঁর বিপুল স্তনোচ্ছ্বাস এবং নিতম্বের বক্ররেখা আমাদের যত দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, আমরা তত খেয়াল করিনি যে তিনি আমাদের যৌন আতঙ্কের সান্ত্বনা। আসলে বারদোকে আমরা কখনোই বুঝতে পারিনি। নবতরঙ্গের সাহায্য সত্ত্বেও আমাদের উন্নাসিকতা থেকেই গেছে। তার কারণ নক্ষত্রের নির্মাণ করে কিন্তু পুরুষ। একজন পুরুষ অভিনেতা যদি নক্ষত্র হন, তবে তিনি স্বনির্ভর। নায়িকাকে নির্ভর করতে হয় সমাজ নির্দেশিত মানচিত্রের উপরে। একজন নায়িকার গঠন সম্পূর্ণই হয় না যদি তিনি তাঁর বেশভূষা, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর রুচি থেকে না বোঝাতে পারেন যে তিনি পুরুষের পৃথিবীতে কীভাবে ব্যবহারযোগ্য। পুরুষ মূলত দ্রষ্টা, একজন মহিলা মূলত দ্রষ্টব্য। বারদোর দুর্ভাগ্য এবং শোকান্তিকা এই যে তিনি দ্রষ্টব্য হিসাবেই বিবেচিত হলেন, তাঁকে তাঁর দ্রষ্টা চরিত্রে কেউ দেখতে পেল না। যেমন মনরোর লেখা কবিতা আমরা পড়ি না।

আরো পড়ুন আটপৌরে রুক্ষতা, সচেতন যৌনতা: সুপ্রিয়া চৌধুরী

সত্যি বলতে কী, নারী দেখে তাকে সমাজ কীভাবে দেখছে। কানন দেবী ও অড্রে হেপবার্ন, মনরো ও বারদো – সকলেই জানতেন যে তাঁদের টিআরপি দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের বিক্রয়মূল্যের উপরে। এই বিক্রয়মূল্য, লরা মালভের মত তাত্ত্বিকদের ভাষায় ‘to be-looked-at-ness’ (দৃষ্টি আকর্ষিত হওয়ার যোগ্যতা)। অর্থাৎ ‘শরীর, শরীর, তোমার মন নাই কুসুম?’ এই তবে মাংসের পুতুলনাচের ইতিকথা!

আমরা বারবার বলি ‘a woman is more mythic than man as both subject and object. She is naturally more of a star than a man.’ এই যে বারদোর স্টারডম, তাঁর পশুপ্রেম, তাঁর দাম্পত্য ও নৈরাজ্য, কামনাবিধুর নৈশ বিজ্ঞপ্তি – এই সমস্তকিছুই আসলে ব্রিজিতের প্রতিভাকে আড়াল করার একটি পুরুষতান্ত্রিক চক্রান্ত। বারদোকে দেখলে আমার অনেক সময়ে মনে হয়, উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে আমাদেরও যে নায়িকা – সুচিত্রা সেন – তাঁর মধ্যে বারদো লুকিয়ে আছেন। আমাদের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে শরীরী সন্ত্রাস তত জরুরি নয়, আর নগ্নতার সেই বেপরোয়া উচ্ছ্বাস বাদ দিলে দুজনেই চিরবালিকা এবং অভিভাবকের প্রত্যাশায় প্রেমার্ত। আপাতদৃষ্টিতে তাঁদের যতটা স্বাধীনতাপ্রিয় মনে হয়, বাস্তবে তাঁরা ততটাই পুরুষদের ছায়ায় কাটাতে চান। দুজনেই ততটা নতুন নারী নন, যতটা নতুন নারীত্বের জন্য পুরুষের আশ্রয়স্থল।

পুরুষের যৌনতা (১৯৪৮) এবং নারীর যৌনতা (১৯৫৩) সম্পর্কে কিনসে প্রতিবেদন প্রকাশের পরে পুরুষের যে যৌন আতঙ্ক, তার উপযুক্ত প্রতিষেধক ও ক্ষতিপূরণ ছিলেন বারদো। তিনি নিঃসন্দেহে কোনো কোনো সময়ে জাতিদম্ভে ভুগেছেন, তাঁর মুসলমানবিদ্বেষও সমালোচনার অতীত নয়। তবে বুঝতে হবে যে, তাঁর এই পথচ্যুতির কারণ সামাজিকভাবে তাঁর অপব্যবহার। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই সমাজতাত্ত্বিকরা বুঝতে পারবেন যে একজন বারদো বা মনরোকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু আপাতত আমাদের কাছে ওঁরা স্বপ্নের নারী হয়েই থেকে গেলেন। গোদারের ম্যাস্কুলা-ফেমিনা (১৯৬৬) ছবিতে বারদো যখন চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন আমরা বিদ্যুল্লতার মত এই নারীকে দেখে থমকে যাই। আর কাকে দেখে আমরা বলব – রেস্তোরাঁয় দেখা হল তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল, স্বপ্নে বহুক্ষণ…

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

  1. একজন উচ্চশ্রেণীর মহিলার জাতিবিদ্বেষকে এইভাবে ব্যাখ্যা করলে তো খুবই বিপদ! ফরাসী ছবি ও তার সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক আবহ নিয়ে আদিখ্যেতাটা একটু বেশি মাত্রায় হয়ে গেল না কি?! এই লেখাটাও পাশাপাশি থাক।
    https://www.theguardian.com/news/ng-interactive/2026/jan/04/sex-object-animal-rights-activist-racist-paradox-brigitte-bardot?CMP=share_btn_url

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.