বি বি গাঙ্গুলি মোড়ে কমিউনিস্টদের বিখ্যাত শহীদ বেদী ছাড়িয়ে একটু এগোলেই ছানাপট্টির প্রায় গা ঘেঁষে একটা তিনতলা বাড়ি চোখে পড়বে। ১১০ নম্বর, কলেজ স্ট্রিট। বাড়িটার গায়ে এখন নীল রঙের পোঁচ পড়েছে৷ ঘিঞ্জি রাস্তা আর ততোধিক ঘিঞ্জি ফুটপাথের ভিড় ঠেলে সেই বাড়ির সামনে দাঁড়ালে অবশ্য বোঝার উপায় নেই যে, এই বাড়িতেই একসময় নিয়মিত আড্ডা জমাতেন একজন চিরপ্রণম্য শিক্ষক আর তাঁর তুখোড় মেধাবী ছাত্ররা। ১৯১১ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত এই বাড়ির তিনতলায় ছিল ‘ডাক্তারবাবুর মেস’। ডাক্তারবাবু মানে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যাঁর আজ জন্মদিন। প্রফুল্লচন্দ্র নিজে সেখানে থাকতেন না বটে, কিন্তু প্রেসিডেন্সি কলেজে ক্লাস শেষ হলে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে তাঁর ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসে দাঁড়াত এই মেসবাড়ির দরজায়। এখানে থাকতেন পরবর্তীকালের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, রসায়নের প্রখ্যাত অধ্যাপক নীলরতন ধর, তাঁর ছোট ভাই জীবনরতন ধর, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ও তাঁর ছোট ভাই ভূপেন্দ্র ঘোষ, সতীশচন্দ্র সেন, ক্ষিতীশচন্দ্র সেন-সহ জনা পনেরো তরুণ। সকলেই প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র বা ছাত্রস্থানীয়। মেঘনাদবাবু নিজে তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্কে অনার্স পড়ছেন। জ্ঞানচন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্রনাথ এবং নীলরতন তাঁর সতীর্থ।

মেঘনাদ সাহা কী করে এই ডাক্তারবাবুর মেসের আবাসিক হলেন, সে-ও এক গল্প। যে কাহিনীর পরতে পরতে মিশে রয়েছে বাঙালি সমাজের চাপা বর্ণবাদের আখ্যান। ১৯১১ সালে ইন্টারমিডিয়েটে থার্ড হয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসে মেঘনাদ প্রথমে থাকতে শুরু করেন ইডেন হিন্দু হস্টেলে। কিন্তু ‘ছোট জাত’ হওয়ায় সেখানে তাঁকে নানাবিধ হেনস্থা সহ্য করতে হত। একসঙ্গে খেতে চাইতেন না বাকিরা, বারান্দার এক কোণে বসে খেতে হত ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুদিন পরে তাই তিনি উঠে এলেন ১১০ নম্বর মেসবাড়িতে। এখানে আর কোনও সমস্যা রইল না, সকলেই হাতে হাতে কাজকর্ম করতেন — রান্না করা, বাজার করা, বাটনা বাটা — সবই নিজেদের দায়িত্বে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রতিদিন বিকেলে প্রফুল্লচন্দ্র তো আসতেন বটেই, সঙ্গে আসতেন বঙ্গবাসী কলেজের প্রিন্সিপাল গিরিশচন্দ্র বসু, সুরেন্দ্রনাথের সহকর্মী সত্যানন্দ বসু, জবাকুসুম তৈল প্রতিষ্ঠানের উপেন্দ্রনাথ সেন-সহ এক ঝাঁক দিকপাল। ছাত্রসম মেঘনাদ সাহাদের সঙ্গে নিয়ে তাঁরা চলে যেতেন ময়দানে, লর্ড রবার্টের মূর্তির (১৯৬৯ সালে অপসারিত) নিচে। সেখানে প্রায় ঘন্টা দুয়েক ধরে চলত নির্ভেজাল আড্ডা — মহাযুদ্ধ থেকে রাজনীতি, সংস্কৃতি থেকে ফুটবল — সবকিছু নিয়েই প্রাণ খোলা তর্কবিতর্ক, হাসিঠাট্টা। গড়ের মাঠের এই আড্ডার খবর রাখতেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও। তিনিই নাকি এই আড্ডার নাম দিয়েছিলেন ‘ময়দান ক্লাব’। বলা বাহুল্য, আড্ডার মধ্যমণি ছিলে স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র।

কলকাতা গবেষক সুনীল মুন্সী লিখেছেন, ময়দানে প্রফুল্লচন্দ্রকে ঘিরে সকলে বসতেন। একমাত্র সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছাড়া। তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে একটানা কথা বলে যেতেন। প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর নাম রাখলেন ‘স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল’। যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় অত্যন্ত উৎসাহী ছিলেন দেবপ্রসাদ। তাঁর নাম হল ‘ট্যাকটিশিয়ান’। জ্ঞান মুখোপাধ্যায়, জ্ঞান ঘোষ আর জ্ঞান রায়কে ডাকতেন ‘জ্ঞানত্রয়’ বলে। জ্ঞান রায় আচার্যের সব বক্তৃতা টুকে রাখতেন বলে তাঁর নাম হল ‘গণেশ’।

জমজমাট এই মেসবাড়িতে আর একজনও ছিলেন নিয়মিত অতিথি। বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বাঘাযতীন। ততদিনে তিনি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। বিদেশ থেকে অস্ত্র এনে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছেন। তার ফাঁকেই মাঝেমধ্যে হাজির হতেন বন্ধু মেঘনাদ সাহার মেসে। সময় পেলে মেঘনাদের ভাই কানাইলালকে ইংরেজিও পড়াতেন। কানাইলাল পরে লিখেছেন বাঘাযতীনের পড়ানো চার্লস ল্যাম্ব ও মেরি ল্যাম্বের টেলস ফ্রম শেকসপীয়র-এর স্মৃতি তিনি কখনও ভুলতে পারবেন না।

একদিন খবর এল মেস থেকে বেরিয়ে যতীন্দ্রনাথ আহিরিটোলায় এক পুলিশ অফিসারকে গুলি করে পালিয়েছেন। ১১০ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে তুমুল উত্তেজনা! মেস থেকে বেরনোর সময় যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল জ্ঞানচন্দ্রের নাম লেখা একখানা বই। যদি কোনও কারণে পুলিশ বাঘাযতীনকে ধরতে পারে, তাহলে তো মহা বিপদ! মেসবাড়ির বাসিন্দারাও রক্ষা পাবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি।

এই ডাক্তারবাবুর মেসে বসেই যতীন্দ্রনাথ ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বড়সড় সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা কষেছিলেন। ঠিক হয়েছিল সুন্দরবনের হাতিয়া দ্বীপে, কলকাতায় ও বালেশ্বরে জার্মান অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হবে। হাতিয়ার আসবে জাহাজে করে। বাঘাযতীনের উপর দায়িত্ব পড়ল মাদ্রাজ রেলপথের সেতু ধ্বংস করার, যাতে ভিন প্রদেশ থেকে বাংলায় ব্রিটিশ সেনা আসতে না পারে। মেসবাড়ি থেকে সেই উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছিলেন যতীন্দ্রনাথ। তাঁর পিছু নিয়েছিল পুলিশ।

সে যাত্রায় অবশ্য যতীন্দ্রনাথের নাগাল পায়নি ব্রিটিশ পুলিশ। তবে এই মেসবাড়িতে আর কখনও আসা হয়নি তাঁর। এর কিছুদিন পরেই বুড়িবালামের তীরে কান্তিপদ নামে পার্বত্য অঞ্চলে নিজের রক্ত দিয়ে তিনি লিখবেন নতুন ইতিহাস। সেটা ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস।

ওই বছরেই মেঘনাদ সাহা এম এস সি পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হলেন, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তারপর আরও কিছুদিন ওই মেসবাড়িতেই ছিলেন সকলে। তখনও মেঘনাদ সাহা চাকরি পাননি, একটা সাইকেলে করে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে চরকি পাক খেয়ে তিনটি টিউশন করতেন। চাকরি পেলেন পরের বছর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত গণিতের অধ্যাপনা। মেসের বাকি আবাসিকরাও আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়লেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। সিট তো আর ফাঁকা থাকে না, নতুন আবাসিকেরা আসতে শুরু করলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রও তাঁর নানা রকম কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ডাক্তারবাবুর মেসের সোনার দিনগুলি শেষ হয়ে গেল।

মধ্য কলকাতার এই অঞ্চলের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাসের মণিমাণিক্য। ডাক্তারবাবুর মেসবাড়ি থেকে একটু এগোলেই সেই আমলের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজ, যেখানে থাকতেন জীবনানন্দ দাশ, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যোমকেশ-অজিতের হ্যারিসন রোডের সেই মেসবাড়ির একতলায় এখন ভাতের হোটেল। আরেকটু এগোলে সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশদের স্মৃতি জড়ানো স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল। তার লাগোয়া একটি বাড়িতে জন্ম নিয়েছিল বিপিএসএফ — বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশন। খানিক দূরে শিবরাম চক্রবর্তীর মেস। মির্জাপুর স্ট্রিটে স্বাধীনতা সংগ্রাম, বামপন্থী গণআন্দোলন, কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষচন্দ্র বসু, কল্লোল যুগের স্মৃতি মাখা ফেভারিট কেবিন। তার থেকে দু পা গেলেই শরবতের দোকান প্যারামাউন্ট, অনেকে বলেন যাদের বিখ্যাত ডাব শরবতের রেসিপি নাকি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের তৈরি। এই রকম আরও অসংখ্য ঠিকানার খোঁজ মেলে মধ্য কলকাতার ওই এলাকায়, যেগুলি কেবল বাংলা নয়, গোটা উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের ল্যান্ডমার্ক। অন্ধকারের গল্পও আছে বৈকি! ডাক্তারবাবুর মেসের প্রায় উল্টো দিকেই গোপাল পাঁঠার দোকান। সেই ছেচল্লিশের দাঙ্গাবাজ গোপাল পাঁঠা, যে এখন হয়ে উঠেছে বঙ্গীয় হিন্দুত্ববাদীদের নয়া আইকন।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও বেঙ্গল কেমিক্যালস – ছবি Wikipedia থেকে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.