গত ২৭ মে (শনিবার) খড়্গপুর আইআইটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়জান আহমেদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তাঁর দেহের দ্বিতীয়বার অটোপ্সির নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। তাঁর আংশিকভাবে পচন ধরে যাওয়া দেহ গত বছর অক্টোবরে হোস্টেলের ঘর থেকে উদ্ধার হয়েছিল। ফয়জানকে সমাধিস্থ করা হয় ডিব্রুগড়ে। সেখান থেকে তাঁর দেহ আদালতের নির্দেশে উত্তোলন করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় এবং দ্বিতীয় অটোপ্সি সম্পন্ন হয় কলকাতা মেডিকাল কলেজে।

দ্বিতীয়বার অটোপ্সির সুপারিশ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির অবসরপ্রাপ্ত ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডাঃ অজয় কুমার গুপ্ত। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে ফয়জানের মৃত্যু সংক্রান্ত কেস ডায়রি, ময়না তদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেন্সিক রিপোর্ট পরীক্ষা করতে বলেছিলেন বিচারপতি রাজশেখর মান্থা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একাধিক লক্ষণ দেখে ফয়জানের মত একজন উজ্জ্বল ছাত্রের মৃত্যুর বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছে। ইনিউজরুম এই মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে গিয়ে ময়না তদন্তের রিপোর্ট আর পুলিস রিপোর্টের মধ্যে বেশকিছু বড়সড় অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে। বিচারপতি মান্থার এজলাসে শুনানির সময়ে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ ডাঃ গুপ্ত ময়না তদন্তের রিপোর্টের পরস্পরবিরোধী দিকগুলো চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ফয়জানের বাবা-মায়ের কৌঁসুলিরা কেস ডায়রির গণ্ডগোলগুলো তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই মামলার খুঁটিনাটি আলোচনা করার আগে আমাদের জেনে নেওয়া দরকার, কে ছিল ফয়জান?

 

এরিয়াল রোবোটিক্স রিসার্চ ও রোবোসকার দলের সদস্য

ফয়জান সম্পর্কে তাঁর বন্ধুরা বলেন, “সে ছিল আইআইটিয়ানদের সকলের চেয়ে এককাঠি উপরে।” জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই ফয়জান রাজ্য স্তরের অঙ্ক ও রসায়ন অলিম্পিয়াডে তিনটে সোনার পদক জিতেছিলেন – দুবার অঙ্কে আর একবার রসায়নে।

মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হিসাবে খড়্গপুর আইআইটিতে ভর্তি হওয়ার পর ফয়জান ভারত সরকারের অর্থে পুষ্ট বেশকিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী রোবোটিক প্রকল্পে নির্বাচিত হন। সেই রিসার্চ গ্রুপের পৃষ্ঠপোষক ছিল এসআরআইসি (স্পনসর্ড রিসার্চ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনসালটেন্সি), সেন্টার ফর এক্সেলেন্স ইন রোবোটিক্সের অংশ হিসাবে। তাছাড়া ওই ২৩ বছর বয়সী ছাত্র খড়্গপুর রোবোসকার স্টুডেন্টস গ্রুপেরও (কেআরএসএসজি) সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি অনলাইন অঙ্ক ক্লাস করাতেন, SuperProf.com-এর মত সাইটে তাঁর প্রোফাইল ছিল।

এই মামলার ট্রায়াল এখনো শুরু না হলেও তিনটে গুরুত্বপূর্ণ নথি আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে – ময়না তদন্তের রিপোর্ট, পুলিস রিপোর্ট ও ফরেন্সিক রিপোর্ট।

 

ময়না তদন্তের রিপোর্ট

এই তিন পাতার রিপোর্ট (যার প্রতিলিপি ইনিউজরুমের কাছে রয়েছে) ফয়জানের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। শুধুমাত্র বলেছে যে তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিন্তু ফরেন্সিক রিপোর্ট এর সঙ্গে একমত নয়। ডাঃ গুপ্তার দাবি হল, ময়না তদন্তের যে ভিডিও তিনি পেয়েছেন সেখানে মাথার খুলির RI প্যারিয়েটো-টেম্পোরাল এলাকায় এক জায়গায় রক্ত জমে আছে বলে দেখা গেছে। অটোপ্সি রিপোর্টও ফয়জানের বাঁ হাতে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ তাঁর রিপোর্টে সেগুলোকে মৃত্যুর কারণ বলে গণ্য করতে অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন যে সেগুলো ‘fabricated cut marks’ হতে পারে। প্রথম অটোপ্সি রিপোর্ট মৃতের শরীরে কোনো বিষ বা অ্যালকোহলের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করেনি।

 

ডাঃ গুপ্তের প্রাথমিক ফরেন্সিক রিপোর্ট

তাঁর ন পাতার রিপোর্টের (যার প্রতিলিপি ইনিউজরুমের কাছে রয়েছে) একটা অনুচ্ছেদে ডাঃ গুপ্ত লিখেছেন “I would like to submit that after comparison of the pertinent findings in the documents i.e. (i) Post-Mortem Report (ii) the Post-Mortem video by me, my preliminary opinion is that the findings in these two documents are not adequate to draw a final conclusion as to actual cause and manner of death of Faizan Ahmed, Muslim Male, aged 23 years. I am enclosing herein pertinent findings regarding injuries seen on dissection of the dead body i.e. over vault of head, front of left side of chest close to left axilla of Faizan Ahmed, aged 23 years, in videoclips on the Post-Mortem Examination of Faizan Ahmed, aged 23 years which clearly and definitely reveal that there is no mention about these injuries in the Post-Mortem Report No. 1289 of 2022 of Faizan Ahmed, aged 23 years. (sic)”

 

পুলিসের আত্মহত্যার তত্ত্বে গলদ

পুলিস ফয়জানের মৃত্যু হওয়ার দীর্ঘ চার মাস পরে কয়েকশো পাতার তিনটে রিপোর্ট ফাইল করেছে। কিন্তু তাতেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি।

রিপোর্টে মৃত্যুর যেসব কারণ বলা হয়েছে তার অন্যতম হল বেটাক্যাপ (Betacap) নামে একটা অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ড্রাগ। ছটা ট্যাবলেটওলা একটা র‍্যাপার ফয়জানের হোস্টেলের ঘরে পাওয়া গেছে, যা থেকে মনে হয় যে চারটে ট্যাবলেট খাওয়া হয়েছিল। একটা রিপোর্টে আবার বলা হয়েছে মৃত্যু ঘটেছে শিরা কাটার ফলে অত্যধিক রক্তপাতের কারণে। কিন্তু ফয়জানের বাবা-মায়ের উকিল রণজিৎ চ্যাটার্জি উল্লেখ করেছেন যে কেস ডায়েরি অনুযায়ী, শিরা কাটার জন্য যে ব্লেড ব্যবহার করা হয়েছিল তা পাওয়া গেছে বাগান থেকে, যে ঘরে ফয়জানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল, সেখান থেকে নয়।

 

ফয়জানের বাবা-মায়ের কৌঁসুলিদের সওয়াল

১৯ মে কলকাতা হাইকোর্টে প্রধান বিচারপতি মান্থার এজলাসে ফয়জানের বাবা-মায়ের উকিলরা পুলিসি তদন্তে বেশকিছু বড় ফাঁক রয়েছে বলেও দাবি করেন। তার মধ্যে ফয়জানের ঘরে ছটা বেটাক্যাপ ২০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট থাকার কথাও ছিল, যা থেকে পুলিস বলতে চেয়েছে ফয়জান হয়ত চারটে ট্যাবলেট খেয়েছিলেন। রণজিৎ আদালতে বলেন “ওই ট্যাবলেট ১০০০ মিলিগ্রাম খেলে তবেই তা একজন মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু ৮০ (৪x২০) মিলিগ্রাম কারোর মৃত্যুর কারণ হতে পারে না।”

এই সিনিয়র আইনজীবী আদালতকে এ কথাও জানান যে, হোস্টেলের যে ঘরে ফয়জানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল সেই ঘরের দরজায় অন্য এক ব্লাড গ্রুপের রক্তের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। রণজিৎ বলেন “বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি বলছে ফয়জানের ব্লাড গ্রুপ O+। কিন্তু AB+ গ্রুপের আরেকরকম রক্তও ওই ঘরে পাওয়া গেছে।” বিচারপতি মান্থাও এতে অবাক হয়ে যান এবং বলেন “তার মানে ওই ঘরে আরেকজন উপস্থিত ছিল!”

আরো পড়ুন কেন লাশকাটা ঘর বেছে নেয় পিএইচডি স্কলার?

ফয়জানের বাবা-মায়ের কৌঁসুলি আরও একটা দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যাকে তদন্তের সময়ে পুলিস বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তা হলে মৃতের ঘরে সোডিয়াম নাইট্রেট পাউডারের উপস্থিতি। এই হলদে পাউডার মাংস সংরক্ষণ কাজে এবং মৃতদেহ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। একথা উল্লেখ করে রণজিৎ আদালতকে বলেন “মৃত্যু হওয়ার তিনদিন পরেও রহস্যজনকভাবে কোনো দুর্গন্ধ পাওয়া যায়নি।”

ফয়জানের বাবা-মায়ের আরেক উকিল অনিরুদ্ধ মিত্র ইনিউজরুমকে বললেন “এই কেসটা আমাদের জন্যেও একটা চ্যালেঞ্জ। আমরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। আশা করি দ্বিতীয় অটোপ্সির ফলাফল প্রমাণ করবে যে আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি।”

ইনিউজরুম ওয়েবসাইটের অনুমতিক্রমে ইংরেজি প্রতিবেদনের এই ভাষান্তর প্রকাশিত হল। তথ্য প্রতিবেদকের।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.