“It’s not just to the people of Chile, it’s to the people of the world. This election was muy muy importante, it meant everything to all of us,” আবেগ ভরা কন্ঠে বলে চলেছেন পিঙ্ক ফ্লয়েডের রজার ওয়াটার্স। নিজের বলা কথাগুলো “…you won! Boric won!” যেন তাঁর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে যাঁরা বিশ্ব বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে পরাজয়ই স্বাভাবিক, জয়ের বার্তা আসে কদাচিৎ। আমাদের এই সময় বিপ্লবী সময় নয়, অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির সময় নয়, প্রতিক্রিয়ার সব বাধা চূর্ণবিচূর্ণ করার সময় নয়। আমাদের এই সময় বিশ্ব জুড়ে একের পর এক অতি-দক্ষিণপন্থার বিজয়ের মাঝখানে নিজেদের ছোট ছোট জয়গুলো গুনে নেওয়ার সময়। সেই প্রেক্ষিতে চিলের বিজয় ঠিক কতটা অস্বাভাবিক, কতটা রূপকথার মত, তা বলাই বাহুল্য।

শুরু থেকে শুরু করা যাক। ষাটের দশকের চিলেতে সোশ্যালিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা হিসেবে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তিনি হলেন সালভাদোর আয়ান্দে। আয়ান্দের আমলে বাম রাজনীতির আপ্তবাক্য ছিল ‘ঐক্য’। এই ঐক্যের ধারণার ভিত্তিতেই সোশ্যালিস্ট-কমিউনিস্ট বাম জোট দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়ান্দের এমনই ক্ষমতা ছিল, যে তিনি ওই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বিরোধী কমিউনিস্ট ও খ্রিস্টান সোশ্যালিস্টদের এক ছাতার নিচে টেনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বাম ঐক্যের ফলেই ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আয়ান্দে জয়লাভ করেন। চিলেতে বামপন্থী ‘পপুলার ইউনিটি’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু অভূতপূর্ব পদক্ষেপ ও বৈপ্লবিক নীতি নিলেও এই সরকার কিন্তু বেশিদিন চলতে সক্ষম হয়নি। কিউবার পর লাতিন আমেরিকায় দ্বিতীয় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে মেনে নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই রাজি ছিল না। CIA-এর সহায়তায় একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ই সেপ্টেম্বর সালভাদোর আয়ান্দের সরকারকে ফেলে দেওয়া হয়। গণতন্ত্রের স্ব-নির্বাচিত রক্ষাকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিলের গণতন্ত্রকে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য চরম শাস্তি দেয়। চিলেতে প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কিন সমর্থিত জেনারেল পিনোচের সামরিক শাসন। জেনারেল অগাস্তো পিনোচের সামরিক শাসনে বামপন্থীদের চূড়ান্ত অত্যাচারের ও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তার দখল নেয় জেনারেলের ডেথ স্কোয়াড। স্তব্ধ করে দেওয়া হয় ভিক্টর হারার কন্ঠ। চিলে পরিণত হয় শিকাগো বয়েজদের নব্য উদারনৈতিক পরীক্ষানিরীক্ষার গিনিপিগে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৯০-এর দশকে দীর্ঘ দুই দশকের অতি-দক্ষিণ সামরিক শাসনের দুঃস্বপ্নের শেষে চিলেতে যখন আবার সংসদীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন ধীরে ধীরে দেশ আবার ছন্দে ফিরবে। তা হয়নি। পিনোচে সরে গেলেও পিনোচের রেখে যাওয়া রাষ্ট্র থেকে গেছিল। শাসন কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখনো ছিল পিনোচিস্তারা। সবথেকে বড় কথা, দেশের সংবিধানও ছিল পিনোচের আমলে প্রণীত। এই সংবিধানের গায়ে লেগেছিল আয়ান্দের ও চিলের গণতন্ত্রের রক্ত। তাই সংসদীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঠিক পরেও চিলের জনগণের কখনো মনে হয়নি বিশাল কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। মধ্যবাম সোশ্যালিস্ট পার্টি, যারা আয়ান্দের আদর্শের ও র‍্যাডিকালিজমের অনেকটাই ডাস্টবিনে ফেলে ভোটে লড়তে এসেছিল, তারা প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে জয়ী হলেও পিনোচের কাঠামোকে আমূল পাল্টাতে আগ্রহী ছিল না। যে রাজনৈতিক দল এই পরিস্থিতিতে বদলের প্রক্রিয়া শুরু করে, তা হল চিলের কমিউনিস্ট পার্টি। নব্বইয়ের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থা ছিল শোচনীয়। কিন্তু তাঁদের নেতৃত্বের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য হল ১৯৮০ সালের পিনোচে সংবিধানকে কবরে পাঠানো। এই লক্ষ্যে তাঁরা দেশের সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম শক্তিকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যান। এই পর্যায়ে পার্লামেন্টে অস্তিত্ব না থাকলেও চিলের খনি শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্র আন্দোলন, সর্বত্র কমিউনিস্টরা তাঁদের উপস্থিতি জানান দিতে থাকে। স্বাধীন বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাঁদের প্রশংসনীয়ভাবে কোনো বড়দাসুলভ আচরণ ছিল না, বরং বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে গড়ে ওঠা এই গোষ্ঠীগুলোর আলাদা অস্তিত্ব বজায় রাখার ইচ্ছাকে তাঁরা সম্মান করতেন।

অপর দিকে খনি আন্দোলন থেকে পেনশনের বেসরকারীকরণ, গণ-পরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধি থেকে পানীয় জলের বেসরকারীকরণ, যে একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম শক্তির জন্ম দিয়েছে, আদিবাসী অধিকার থেকে নারী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে সব সংগঠন উঠে এসেছে — তারাও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একত্রে কাজ করতে আগ্রহী ছিল। প্রথমে সোশ্যালিস্ট পার্টির সার্বিক নেতৃত্বেই কমিউনিস্ট পার্টিসহ এই দলগুলো সংগঠিত হয়েছিল। তাঁরা জানতেন তাঁদের যে মূল লক্ষ্য, তা সোশ্যালিস্ট সরকারের অধীনে কখনোই পূরণ হবে না। কিন্তু মধ্যবাম সরকারে অংশগ্রহণ ও তার মধ্যে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নীতির আংশিক বাস্তবায়ন জনতার সামনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা যে বৃদ্ধি করবে, এ সম্পর্কেও তাঁদের কোনো সংশয় ছিল না। রাস্তা-পার্লামেন্ট-রাস্তা — এই ফরমুলাতে চিলের বাম রাজনীতির রথের চাকা গড়িয়েছে। ২০০৬, ২০১১-১৩ সালের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সুযোগ কাছে এসেও দূরে থেকে গেছে, কিন্তু আশাভঙ্গের দুঃখ ভুলে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে গণআন্দোলনে ঝাঁপ দিয়েছেন বামপন্থীরা।

যে ঐতিহাসিক সুযোগের সন্ধান তাঁরা করছিলেন, তা অবশেষে এল ২০১৯ সালে। মেট্রো ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা অচিরেই রূপান্তরিত হল সামগ্রিক নব্য-উদারনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সংগ্রামে। এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অনেক দেশেই হয়ে থাকে। মার্কিন দেশে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট বা ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এই একইরকম স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল। কিন্তু এই দুটোর কোনোটাই কোনো স্থায়ী রূপ লাভ করতে সক্ষম হয়নি, কারণ এর পিছনে কোনো সংগঠন ছিল না। সৌভাগ্যের বিষয়, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এই গণবিক্ষোভকে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালনা করা সক্ষম হয়েছিল চিলেতে। লক্ষ্য হল সংবিধানের পরিবর্তন। প্রবল গণআন্দোলনের চাপে ক্ষমতাসীন দক্ষিণপন্থী ‘চিলে ভামোস’ জোটের রাষ্ট্রপতি পিনেরার সরকার বাধ্য হল আন্দোলনকারীদের দাবী মেনে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান বিষয়ে মতামত নিতে। ২০২০ সালের গণভোটে প্রায় ৭৮% ভোটার মত দিলেন সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে।

এরপর কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল দ্বিমুখী। নবগঠিত সংবিধান সভায় বাম সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণপন্থীরা যাতে এক তৃতীয়াংশ আসনও না পায় তা সুনিশ্চিত করা, কারণ তাহলেই তাদের কাছে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা চলে আসবে। এই সময়েই সোশ্যালিস্ট পার্টির ‘নিউ মেজরিটি’ জোট এবং ন্যাশনাল রিনিউয়াল পার্টির ‘চিলে ভামোস’-এর বাইরেও কমিউনিস্ট পার্টি গত দু দশক যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, সেইসব ক্ষুদ্র র‍্যাডিকাল বামপন্থী দলের ঐক্য ও তৃতীয় একটি বিকল্প ‘ব্রড ফ্রন্ট’ নামক জোটের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের অগ্নিপরীক্ষা ছিল গত ১৫ ও ১৬-ই মের সংবিধান সভার নির্বাচন। ফলাফল প্রকাশিত হতেই দেখা যায় এই পরীক্ষায় তাঁরা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কমিউনিস্টরা ব্রড ফ্রন্টের সঙ্গে মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘অ্যাপ্রুভ ডিগনিটি’ জোট। এই জোট সংবিধান সভায় পেয়েছে প্রায় ১৮% ভোট এবং ২৮ জন প্রতিনিধি। এ ছাড়া আরো ছোট ছোট বাম দলের প্রাপ্ত আসন নিয়ে তাঁরা খুব সহজেই দক্ষিণপন্থী তো বটেই, এমনকি মধ্যবামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টিকেও বাদ দিয়ে অতি সহজে অর্জন করলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা। দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টিসহ বামপন্থী দলগুলো যে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিল, তা পূরণ হল। অবশেষে পিনোচে আমলের সংবিধানকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে তাঁরা নয়া ইতিহাস ও সংবিধান রচনা করতে প্রস্তুত হলেন।

সংবিধান সভায় ঐতিহাসিক জয়ের পর দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের শেষ বাধা ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আপাতভাবে মনে হয়েছিল সংবিধান পাল্টানোর এত কঠিন পরীক্ষায় যে বামপন্থীরা এত সহজে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে এই পরীক্ষায় পাশ করা খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু পরীক্ষায় আসা বেকায়দার প্রশ্নের মত চিলের রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভাব হয় এক নতুন দক্ষিণপন্থী তারকার, হোসে আন্তোনিও কাস্ত।

তাঁর সম্পর্কে আলোচনার আগে, কাস্তের পরিবার সম্পর্কে কিছু আলোচনা দরকার। কাস্তের পরিবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি থেকে চিলেতে এসে আশ্রয় নেয়। তাঁর বাবা নাৎসি পার্টির সদস্য ও জার্মান বাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন। বিদেশে আশ্রয় নিয়েও তাঁরা তাঁদের দক্ষিণপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ করেননি। পিনোচে আমলে কাস্তের পরিবার ছিল শাসকগোষ্ঠীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং পিনোচের শাসনের উৎসাহী সমর্থক। কাস্তের সঙ্গে চিলের অন্য দক্ষিণপন্থীদের মূল তফাৎ এই, যে কাস্ত তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্বন্ধে অত্যন্ত সৎ। তিনি পিনোচে শাসনের প্রতি তাঁর সমর্থন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও গোপন করেননি। “পিনোচে বেঁচে থাকলে আমাকে ভোট দিতেন”, এই কথা গর্ব করেই তাঁকে অনেক সময় বলতে শোনা গেছে। চিলের এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যত এগিয়ে আসতে থাকে, এহেন কাস্তের সমর্থনের পারদও যেন মন্ত্রবলে চড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, ২১ নম্ভেম্বরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে প্রায় ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন কাস্ত। এখন প্রশ্ন হল, যেখানে ছুপা পিনোচিস্তা প্রেসিডেন্ট পিনেরাকেই চিলের জনগণ ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করছে, সেখানে কাস্ত কী করে এত ভোট পেলেন? উত্তর বহুবিধ।

চিলের বামপন্থীরা প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে ভেবেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির ড্যানিয়েল হাউয়েকে। রিকোলেতা শহরের মেয়র হাউয়ের দলমত নির্বিশেষে সুদক্ষ প্রশাসক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি আছে, রাজনীতিতেও তিনি পুরনো মুখ। কিন্তু ‘অ্যাপ্রুভ ডিগনিটি’ জোটের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর জন্য অনুষ্ঠিত আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে তাঁকে হারিয়ে জয়লাভ করলেন সোশ্যাল কনভার্জেন্স পার্টির গ্যাব্রিয়েল বোরিচ। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন ২০১১-১৩ সালের ছাত্র আন্দোলনের সূত্রে। তিনি এরপর সরাসরি জাতীয় আইনসভায় ডেপুটি পদে নির্বাচিত হন। তিনি তরুণ, অনভিজ্ঞ এবং কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও নেই। এছাড়া রাজনীতিতেও তাঁর পশ্চাদপসরণের প্রবণতা আছে। জোটের অন্য শরিকরা না চাইলেও বামপন্থী ভোটাররা বোরিচ ও হাউয়ের মধ্যে সম্ভবত হাউয়ের দিকেই ঝুঁকে ছিলেন। তাঁরা অনেকেই প্রথম রাউন্ডে বোরিচকে ভোট দেননি। অন্যদিকে কাস্ত ২০১৯ থেকে বিপুল গণআন্দোলনের ঢেউয়ে জর্জরিত চিলের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে যে আশঙ্কা দানা বেঁধেছিল, তাকে পুঁজি করতে সক্ষম হন। বোরিচ চেষ্টা করছিলেন তাঁর র‍্যাডিক্যাল প্রস্তাবগুলি প্রত্যাহার বা তার ধার কমিয়ে র‍্যাডিক্যাল বাম ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে ভদ্র সভ্য মডারেট বাম হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার। তাঁর এই পদক্ষেপ ২০১৯ সালের গণআন্দোলনের সঙ্গে জড়িত অনেক বামপন্থীকেই হতাশ করে। অন্যদিকে কাস্ত ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে একজন খাঁটি অপরাধবোধহীন পিনোচিস্তা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বীরদর্পে চিলেকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশন থেকে সরিয়ে নেবেন, দেদার কারাগার বানাবেন ও তাতে সব “ক্রিমিন্যাল আর ড্রাগ নেওয়া বামপন্থী”-দের পুরবেন, পিনোচের শাসনের সঙ্গে যুক্ত যারা জেলে আছে তাঁদের মুক্ত করবেন, গর্ভপাত ও সমকামী বিবাহ নিষিদ্ধ করবেন, নারী ও লিঙ্গসাম্য মন্ত্রকের বিলোপ ঘটাবেন ইত্যাদি ঘোষণা করতে থাকেন। দক্ষিণপন্থী ভোটার ও গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ব্যাপক মতাদর্শগত উদ্দীপনা দেখা দেয়। বোরিচকে নিয়ে হতাশা ও কাস্তকে নিয়ে এই উদ্দীপনাই প্রথম রাউন্ডে তাঁর সাফল্যের কারণ। কিন্তু বামেরা তাঁদের গয়ংগচ্ছ ভাব ত্যাগ করে দ্বিতীয় রাউন্ডে যে কোনো ভাবে কাস্তকে হারানোর জন্য ঝাঁপান। অনেক মধ্যবাম ভোটার, যাঁরা বোরিচকে বেশি চরমপন্থী এবং অনেক চরমপন্থী বাম ভোটার, যাঁরা বোরিচকে বেশি মধ্যপন্থী মনে করে প্রথম রাউন্ডে ভোট দেননি, তাঁরা কাস্তকে ঠেকাতে দ্বিতীয় রাউন্ডে ঢেলে ভোট দেন। এর পরিণতিতেই গ্যাব্রিয়েল বোরিচ ১৯ ডিসেম্বর দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটে প্রায় ৫৫% ভোট লাভ করলেন। বাম ঐক্য একদা আয়ান্দেকে চিলের মসনদে বসিয়েছিল। একই পথে এল ঐতিহাসিক জয়।

গ্যাব্রিয়েল বোরিচের বিজয়ে আন্দিজে নব্য বাম দলগুলোর যে বিজয় বলিভিয়াতে ২০২০ সালে MAS-এর ক্ষমতায় ফিরে আসা দিয়ে শুরু হয়েছিল, পেরুতে কাস্তিলোর বিজয় ঘুরে চিলেতে এসে তা সম্পূর্ণ হল। আয়ান্দের পর আবার কোনো র‍্যাডিকাল বাম প্রেসিডেন্ট পেল চিলে। কিন্তু বোরিচের কাজ এখানেই শেষ নয়। ব্রাজিলে বলসোনারোর হাত ধরে যে অতি-দক্ষিণপন্থার রোগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল লাতিন আমেরিকায়, তা ক্যান্সারের মতো সমগ্র লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। আগে শুধু বামপন্থী দলগুলোই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক রাখতেন সাও পাওলো ফোরামের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে মাদ্রিদ চার্টার ও তাতে লাতিন আমেরিকার একাধিক দক্ষিণপন্থী দলের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার শিক্ষা দক্ষিণপন্থী দলগুলোও শিখছে।

অবশ্য এর আগেই বলিভিয়ায় সফল অভ্যুত্থান ও ভেনেজুয়েলায় অভ্যুত্থানের ব্যর্থ প্রচেষ্টার প্রসঙ্গে লাতিন আমেরিকার দক্ষিণপন্থী দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আগেও দেখা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতেও চিলেকে এখনো সংগ্রাম করতে হবে। বোরিচকে বুঝে নিতে হবে, সবার মন পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কাস্তের থেকেও তাঁর একটা জিনিস শেখার আছে — কী করে নিজের আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে নিজের রাজনৈতিক প্রকল্পকে আপোষহীনভাবে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করতে হয়। এই একই জিনিস বোরিচকে করতে হবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। নয়ত নতুন এক যুগের সূচনা তিনি করতে পারবেন না।

তাঁর সুহৃদ ও ছাত্র আন্দোলনের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেত্রী ক্যামিলা ভালেহো একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দক্ষিণপন্থীদের পরাজিত করতে হলে, তাঁদেরই মত শ্রেণি সচেতন হতে হবে, রাষ্ট্রের মূলগত শ্রেণি চরিত্রের কথা ভুলে গেলেও চলবে না। বোরিচ নিজেও নিশ্চয়ই তা জানেন, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সে কথা তাঁর মনে থাকে কিনা সেটাই এখন দেখার। কিন্তু সফল হোন বা ব্যর্থ হোন, বোরিচের বিজয়ে, একদা আয়ান্দের বিজয়ের পর যে স্লোগানে চিলে মুখরিত হয়েছিল, তা আবার ধ্বনিত হচ্ছে আন্দিজে – “¡El pueblo unido, jamás será vencido!” (ঐক্যবদ্ধ মানুষ কখনো হারবে না)। রজার ওয়াটার্স এমনি এমনি বলেননি, এই বিজয় শুধু চিলের নয়, সারা বিশ্বের। পুঁজির বাহুবলীদের মখমলের দস্তানার নীচ থেকে বাঘনখ বেরিয়ে আসছে আমাদের এই যে অন্ধকার যুগে। চিলে এই সার সত্য আবার শিখিয়ে দিয়ে গেল, যে ঐক্যবদ্ধ জনগণ অপরাজেয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.