একানব্বই বছর বয়সে গত ৩০ অগাস্ট মিখাইল গর্বাচভ মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যু আবার নতুন করে আমাদের কাটা ঘায়ের জ্বালা মনে করিয়ে দিয়ে গেল। গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধারার বামেদের উল্লাসও দেখলাম। “মরেচে ব্যাটা মরেচে!” যেন তার কোনোদিন না মরারই কথা ছিল। কালের নিয়মে সবারই মৃত্যু হবে, কিন্তু তাতে উল্লসিত হয়ে আসল প্রশ্নগুলো ধামাচাপা দিলে নিজেদের ব্যর্থতারই সোচ্চার ঘোষণা করা হয় না কি? গর্বাচভকে খানিকটা গাল দিয়ে নিজেকে খুব একটা বিপ্লবী বা কমিউনিস্ট দেখানো সোজা বটে, কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রথম অভিযানের পরাজয় আমাদের সামনে যে জ্বলন্ত প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছিল আজ থেকে তিন দশক আগে, তার কোনো উত্তর খুঁজে বার করতে পেরেছি কি আমরা? মনে তো হয় না।

গর্বাচভের মৃত্যুতে এই সমবেত উল্লাসধ্বনি সেই ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখার প্রয়াস নয় তো? কেউ অবশ্য বলতে পারেন, এসব নিয়ে এখনই মাথা ঘামিয়ে সমাধান বার করতে হবে সেই মাথার দিব্যি কে দিয়েছে হে? ওসব চলতে দেখা যাবে। এই ধরনের একটা বক্তব্য কমিউনিস্ট আন্দোলনে বেশ শক্তিশালী। আজকের কাজ নিয়ে মাথা ঘামাও, মুহূর্তকে দ্যাখো! মুহূর্তকে অতীত এবং ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয়ে পরিণত করা যে আমাদের মাথাটা আবার হেঁট করে নিজ চরণতলের মাটিটুকুই দেখতে শেখায়, তা আমরা সম্ভবত ভুলে যেতে বসেছি। চার পায়ে চলা বাদ দিয়ে দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে মানুষ যে মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিল, তার প্রধান কারণ ছিল ঐ একদা হেঁটমুণ্ড পরিত্যাগ করে মানুষের মাথা তুলে দাঁড়ানো। তার দিগন্তরেখা পালটে গিয়েছিল। বাস্তববাদী রাজনীতির অনুশীলন আমাদের আবার মনুষ্যেতর মননে নিয়ে যাচ্ছে। বামপন্থী আন্দোলনে এই রাজনীতির সমর্থকরা এটা বোঝেন না, বা বুঝতে চান না। যে একটা বিকল্প সমাজব্যবস্থা হিসাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের প্রক্রিয়া নিয়ে যত প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঠেছে তার সন্তোষজনক উত্তর যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ ব্যাপক অংশের জনগণ তথা শ্রমিকশ্রেণি কমিউনিস্টদের পক্ষে দ্বিতীয়বার সমবেত হবেন না। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্য নিয়ে আমাদের গভীর চর্চা করা প্রয়োজন এবং অতীতের ভুলত্রুটিগুলিকে স্পষ্টাস্পষ্টি বর্জন করা প্রয়োজন। এটা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার কাজ নয়। এটা এখনকারই কাজ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু দশকের পর দশক ধরে বিষয়গুলো পড়ে থাকে কেন? বিষয়গুলোকে ফেলে রাখা হয় কেন? কারণ সমাজতন্ত্র নিয়ে আলোচনা একদিকে যেমন দুরূহ অন্যদিকে তেমনই স্পর্শকাতর। কমিউনিস্ট বলে পরিচিত দলগুলির মধ্যে এ বিষয়ে মতান্তরও বেশ তীব্র। এই মতান্তর শুধুমাত্র দলগুলির পারস্পরিক বিতর্ক, এমনটা ভেবে নেওয়াও ভুল। দুটি দলের মধ্যে বিতর্কের বিন্দুগুলি একই দলের বিভিন্ন নেতা, কর্মীদের মধ্যেও আছে। সুতরাং এসবের মধ্যে ঢুকে কেউই আর চলতি সংগঠনের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের সামনে ফেলতে চায় না। তাতে করে যদি প্রশ্নগুলো পড়ে থাকে তাহলে থাকগে। চিন্তাভাবনা এমনই। এতে যে দলগুলির রাজনীতিই বড় বেশি ঘোলাটে হয়ে যায় সে খেয়াল তথাকথিত বাস্তববাদী নেতাদের থাকে না।

উদাহরণস্বরূপ দেখুন, গর্বাচভ লোকটিকে প্রায় সব কমিউনিস্টই ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু গর্বাচভ তো আকাশ থেকে পড়েননি। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সোভিয়েত নীতিরই ফসল। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্য চালাতে গিয়ে শ্রমিকশ্রেণির যে পরাজয় ঘটে গিয়েছিল, তার ফলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মুখোশের আড়ালে একচেটিয়া আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গড়ে উঠেছিল। গর্বাচভ সেই প্রক্রিয়ারই সন্তান। অথচ মূলধারার বামেরা চিরকালই প্রক্রিয়াটিকে সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা বলে চিহ্নিত করে এসেছেন এবং তার কদাকার সন্তানটি যখন ভূমিষ্ঠ হল তৎক্ষণাৎ সেই সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করলেন। ক্রুশ্চেভের সময় থেকে (স্তালিনের সময়কাল নিয়ে আলোচনায় বিরত থাকছি, কারণ সেই আলোচনা অনেক বেশি জটিল) যে বুর্জোয়া সংস্কারের গতি ঝোড়ো হাওয়ায় পরিণত হয়েছিল, তারই চরম এবং অনিবার্য পরিণতি হল গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকা। পৃথিবীতে এমন কোন মহাজ্ঞানী আছেন যিনি এই সরল সত্যের বিরোধিতা করতে পারেন?

পেরেস্ত্রৈকার মূল কথাটা কী ছিল? মূলগতভাবে পেরেস্ত্রৈকা ছিল একগুচ্ছ অর্থনৈতিক (এবং রাজনৈতিক) সংস্কার, যা স্থবিরতায় আক্রান্ত সোভিয়েত অর্থনীতিকে মুনাফা বা লাভের ধারণার ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করতে চেয়েছিল। এখন কথা হল মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রয়াস কি গর্বাচভ প্রথম করেছিলেন? না। ক্রুশ্চেভের সময় থেকেই এই দিশায় সোভিয়েত অর্থনীতি বদলাতে বদলাতে গেছে। স্তালিনের সময়ে অন্য অনেক পরিবর্তন সত্ত্বেও অর্থনীতির মুনাফাকেন্দ্রিকতার ব্যাপারে প্রথাগত মার্কসবাদী তত্ত্বে হাত দেওয়া হয়নি। কিন্তু ক্রুশ্চেভের সময় থেকেই সে সম্পর্কে মার্কসবাদী ধারণাকে বিসর্জন দিয়ে একেবারে বুর্জোয়া ধারণা গ্রহণ করা হয়, যার চরম রূপ আমরা দেখতে পাব গর্বাচভ আনীত পেরেস্ত্রৈকার ধারণাগুলির মধ্যে। স্তালিনের বহুচর্চিত গ্রন্থ ইউএসএসআর সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমস্যাবলী-তে তিনি লেখেন

যদি একথা সত্য হয় তালে এটা বোঝা অসম্ভব হবে কেন আমাদের হালকা শিল্পগুলি যা সর্বাপেক্ষা লাভজনক তার চরম বিকাশ হল না, এবং কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয় ভারী শিল্পতে, যেগুলি অধিকাংশ সময়ে কম লাভজনক, এবং কখনও কখনও সম্পূর্ণভাবে অলাভজনক।

যদি এটা সত্য হয় তালে এটা বোঝাও অসম্ভব হয়ে যাবে যে, কেন আমাদের একগুচ্ছ ভারী শিল্প কারখানা যা এখনও অলাভজনক এবং যেখানে শ্রমিকের শ্রম ‘ঠিকঠাক মুনাফা’ আনতে পারে না, সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, এবং কেন নতুন নতুন হালকা শিল্প কারখানা যেগুলি নিশ্চিতভাবে লাভজনক এবং যেখানে শ্রমিকের শ্রম ‘বড় আকারে মুনাফা’ নিয়ে আসতে পারে, সেগুলি খোলা হয় নি।

যদি এটা সত্য হয়, তালে এটা বোঝা অসম্ভব হবে যে, কেন কারখানাগুলি কম লাভজনক কিন্তু আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্যে খুবই জরুরী সেগুলি থেকে শ্রমিকদের উচ্চ মুনাফাযুক্ত কারখানাগুলি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি…

যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। প্রণিধানযোগ্য। সোভিয়েত অর্থনীতির একটা অংশ “পরিকল্পনামাফিক লোকসান”-এ চালানো হচ্ছিল জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক স্বার্থকে মাথায় রেখে। জারের কুশাসনে বেহাল অর্থনীতি যে সঙ্কটে পড়েছিল তা বিপ্লবী ঝঞ্ঝায় পরিবর্তিত হওয়ার পর দীর্ঘ চার বছরের গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী কাটিয়ে আবার অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন জনতাকে অন্তত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ দিতে হলে অন্য উপায় ছিল না। তার উপর ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা। বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এইভাবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পদক্ষেপ নেয় না। তার পদক্ষেপের ভিত্তিই হল মুনাফার সম্ভাবনা সম্পর্কে তার নিজস্ব ধারণা, অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিটকে লাভজনক করতে হবে এবং প্রতি মুহূর্তে লাভজনক থাকতে হবে। তাতে করে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সম্পূর্ণ বোঝা শ্রমিকশ্রেণি, মেহনতি মানুষ এবং সাধারণ জনতার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।

১৯৬২ সালে ক্রুশ্চেভের জমানায় ঠিক এই বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী যুক্তিই দেওয়া হয় সোভিয়েত তাত্ত্বিকদের পক্ষ থেকে। তৎকালীন নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এল গতোভস্কি কমুনিস্ত পত্রিকায় লেখেন

প্রথমত, স্তালিন উচ্চ লাভজনকতার তত্ত্বকে লাভের ধারণা থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। সুতরাং, “উচ্চ লাভজনকতা” কথাটা তার অন্তর্বস্তুর সঙ্গেই মিলল না। লাভজনকতা সংক্রান্ত পরিষ্কার সুসংজ্ঞায়িত ধারণাকে প্রতিস্থাপিত করা হল সম্পূর্ণভাবে ধোঁয়াশাপূর্ণ, সংজ্ঞায়িত করা যায় না এমন এবং শূন্যগর্ভ ধারণা, যার সঙ্গে লাভ বা মুনাফার কোনো সম্পর্কই নেই, এমন ধারণার দ্বারা।

দ্বিতীয়ত, এখানে একটি সংস্থা এবং মুনাফার যে সম্পর্ক বিবৃত হচ্ছে তা ভ্রান্ত। একইভাবে, লাভজনকতা সুস্থির এবং লাগাতার একই রকম হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়। তা সব সময়েই অস্থির এবং পরিবর্তনশীল হবে।

তৃতীয়ত, যে ভারসাম্য স্তালিন নির্ণয় করেছিলেন তার ‘উচ্চ লাভজনকতা’-র সাথে তা একটি নির্দিষ্ট সংস্থার নিজস্ব লাভজনকতার সাথে সংঘাতে চলে যাচ্ছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

লাভজনকতার সাথে পরিকল্পনার এই বিচ্ছিন্নতা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার মৌলিক কর্তব্যের বিরোধী। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম মৌলিক কর্তব্যই হল এক একটি সংস্থার লাভের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সঞ্চয়ন গড়ে তোলা।

(কমুনিস্ত/ ১৯৬২/ ১৮ নং)

সুতরাং মুনাফাকেন্দ্রিকতা সম্পর্কে সামগ্রিক ধ্যানধারণা ক্রুশ্চেভের সময় থেকেই পালটে গিয়ে পুরোপুরি বুর্জোয়া পথে চলে যায়, গর্বাচভ খুব নতুন কিছু করেননি। তারপর শুরু হয় টেনে হিঁচড়ে হুড়মুড় করে প্রত্যেকটি শিল্প ইউনিটে মুনাফা বাড়াবার প্রতিযোগিতা। ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হল ‘বলশেভিকা মায়াক’ পরীক্ষা নিরীক্ষা। এর মূল কথা হল প্রত্যেকটি ইউনিটে ম্যানেজমেন্টকে সেই সংস্থার লাভের ভিত্তিতে বোনাস দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল লাভের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় তহবিলে না দিয়ে সংস্থার হাতেই রেখে দেওয়ার মত ব্যাপার স্যাপার। ওই অংশ একেবারেই ম্যানেজমেন্টের মালিকানায় থাকত এবং তাদের জন্যই খরচ করা হত। ১৯৬০ সালে এই ভাগাভাগি ছিল ৬৪% রাষ্ট্রীয় তহবিলের জন্য, ৩৬% ম্যানেজমেন্টের জন্য। ১৯৬৯ সালে ম্যানেজমেন্টের ভাগ আরও বাড়ল – ৬১% বরাদ্দ হল রাষ্ট্রীয় তহবিলে আর ৩৯% থাকল ম্যানেজমেন্টের হাতে।

বলশেভিকা-মায়াক পদ্ধতি অতি দ্রুত ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল। ফলে নির্বিচারে প্রত্যেকটি সংস্থায় লাভের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়। ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে ক্রুশ্চেভের অপসারণ এবং ব্রেজনেভের আগমনে এই প্রক্রিয়ায় কিন্তু কোনো ছেদ পড়ল না। বরং দ্রুততর হল। সোভিয়েত অর্থনীতি বিষয়ক ১৯৬৫ সালের একটি পত্রিকা জানাচ্ছে, বলশেভিকা-মায়াক পদ্ধতি চালু হবার ফলে সে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে পুঁজির পরিমাণ একই থাকলেও মুনাফা দ্বিগুণ হয়ে যায়। (Finansy SSSR/ No. 12/ 1965) অন্য একটি পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেনিনগ্রাদের একটি সংস্থা ১৯৬৪ সালের ২০০ রুবল লাভ করলেও ১৯৬৫ সালে লাভ করেছিল ৭২,৯০০ রুবল (Vestnik Statistiki/ No.11/ 1965)।

উদাহরণ, ঘটনা এবং পরিসংখ্যান না বাড়িয়ে বলা যাক, মোটের উপর ওই প্রক্রিয় তিন দশক ধরে রাশিয়ায় ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। একেকটি সংস্থায় নিজস্ব মুনাফা এবং তার এক বড় অংশ দিয়ে ম্যানেজমেন্ট ও আমলাতন্ত্রের ফুলে ফেঁপে ওঠার এই খেলা ১৯২০-র দশকের দ্বিতীয়ার্ধে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর এবং শ্রম দিন কমানোর যে মরিয়া প্রচেষ্টা আমরা দেখেছিলাম তার একেবারে বিপরীত ছিল। বর্ষীয়ান আমেরিকান কমিউনিস্ট উইলিয়াম জে ফস্টার তাঁর ১৯৩২ সালে প্রকাশিত এক বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছিলেন “সোভিয়েত সমাজতন্ত্রে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতি যতটা অনুমোদন করতে পারে ততটা উঁচুতে, আর পুঁজিবাদী দুনিয়া দিচ্ছে শ্রমিকরা যতটা নিচু মেনে নিতে পারে ততটাই নিচুতে।” (William Z Foster/ Toward Soviet America) মোটের উপর এই ছিল পরিস্থিতি। বিপ্লবের পর লাফিয়ে লাফিয়ে মজুরি বাড়ে এবং ১৯১৭ সালে শ্রমিকরা যা মজুরি পেতেন তা ১৯২০-র দশকের শেষে দ্বিগুণ হয়ে যায়। গড় শ্রম ঘন্টা ছিল দৈনিক ৭.২ ঘন্টা এবং সপ্তাহ পাঁচদিনের। সেইসময় আমেরিকাতে গড় শ্রম ঘন্টা ছিল দৈনিক ৮ ঘন্টা এবং সপ্তাহ ছদিনের।

সোভিয়েত অর্থনীতিতে যতদিন উৎপাদন শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে মজুরি বাড়ানোর এবং শ্রম দিন বা শ্রম ঘন্টা কমানোর প্রক্রিয়া জারি ছিল, ততদিন উৎপাদন শক্তি বৃদ্ধির ফলে বর্ধিত মূল্য শ্রমজীবী মানুষের হাতেই গেছে। ফলে চাহিদা বেড়েছে এবং তার টানে আবার উৎপাদন শক্তি বেড়েছে। বর্ধিত উৎপাদন শক্তি আবার চাহিদা বাড়িয়েছে এবং বর্ধিত চাহিদা আবার উৎপাদন শক্তি বাড়িয়েছে। শ্রম সময় কমার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। এসবের প্রত্যক্ষ টানে আবার শিল্প উৎপাদন বেড়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি সর্বদাই আভ্যন্তরীণ শক্তিতে গতিময় থেকেছে। কিন্তু অন্যান্য নানা কারণে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির নির্ধারক পরাজয় এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মুখোশে একচেটিয়া আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী শক্তিগুলির প্রতিবিপ্লব বিজয়ী হওয়ার মধ্যে দিয়ে যখন মুনাফা এবং মুনাফার সম্ভাবনার ধারণার পরিবর্তন ঘটানো হল, তখন শিল্পসংস্থাগুলোর লাভ যত বাড়তে লাগল, তত বাড়তে থাকল শোষণের মাত্রা। অর্থাৎ উৎপাদিত মূল্যের মধ্যে মজুরি ও উদ্বৃত্ত মূল্যের (surplus value) অনুপাত ক্রমে ক্রমে উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুকূলেই ঢলে পড়তে লাগল, ফলে সমাজে অসাম্য বাড়তে থাকল। উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা পিছিয়ে পড়তে লাগল। একসময় তৈরি হল সংকট। সংকট কাটাতে গিয়ে পুঁজির সপক্ষে আরও বড় সংস্কার হতে লাগল, ফলে তা ডেকে আনল আরও বড় অসাম্য এবং আরও বড় সংকট। অর্থাৎ আগে অর্থনীতির যে ইতিবাচক টান ছিল তা এই দুষ্টচক্রে পড়ে নেতিবাচক টানে পর্যবসিত হল এবং একসময়ে হল বিস্ফোরণ। ঘটনাচক্রে যার সময়ে এই বিস্ফোরণ ঘটল তার নাম গর্বাচভ।

আরো পড়ুন রুশ বিপ্লবের একালের তাৎপর্য

গর্বাচভ অতিরিক্ত যা করেছিলেন তা হল পূর্ব ইউরোপের উপর থেকে সোভিয়েতের সামরিক নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি শিথিল করা। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছিলেন। গর্বাচভের আগে অন্য কেউ এমনটা করেননি। তাঁরা যা করেছেন সবই সামরিক আধিপত্য বজায় রেখে। কিন্তু এই আধিপত্যের ফাঁস আলগা করা ছাড়া গর্বাচভের উপায় ছিল না। আসলে সোভিয়েত রাশিয়ায় পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার অবধারিত ফলাফল ছিল সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের উত্থান। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মতই সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল তার সামরিক শক্তি। কিন্তু অর্থনীতি নিজেই যখন বিপুল পরিমাণ সামরিক বাজেট বহন করতে পারে না, তখন কোথাও না কোথাও সেই বিন্দু আসবেই, যখন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামরিক ক্ষমতা কমানো ছাড়া অন্য পথ থাকবে না। ঘটনাচক্রে যার সময়ে এই মাহেন্দ্রক্ষণটি উপস্থিত হয়েছিল তারই নাম গর্বাচভ। আর ভেতর থেকে ফাঁপা একটা ব্যবস্থা যখন জনগণের ক্রোধের সামনে সামরিক শক্তির জোরে টিঁকে থাকে, তখন সেই শক্তি কমানোর অবধারিত ফলাফল হুড়মুড় করে সেই ব্যবস্থার পতন। পূর্ব ইউরোপে এই পতন শুরু হয়েছিল, গর্বাচভ আমলে সোভিয়েতের পতনের মধ্যে দিয়ে ইতিহাস তার কাজ শেষ করে।

গর্বাচভ নিন্দা তো অনেক হল, ইতিহাসের এই গতিকে আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম কি?

তথ্য ও পরিসংখ্যান নিম্নোক্ত দুটি প্রকাশনা থেকে নেওয়া

১) The Restoration of Capitalism in the Soviet Union/ Willi Dickhut/ Verlag Neuer Weg, Germany

২) Commemorating the 100th Anniversary of the Great October Socialist Revolution/ Revolutionary Organization of Labor, USA

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.