কংগ্রেসের বহু প্রতীক্ষিত ভারত জোড়ো যাত্রা কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয়েছে এক সপ্তাহের কিছু বেশিদিন হল। এটা বহুযুগ পরে সম্ভবত পার্টির সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জনসংযোগ কর্মসূচি। কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত ৩৫০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা দিয়ে ১৫০ দিনের বেশি এই কর্মসূচি চলার কথা। একেই তো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে। এই যাত্রার প্রভাব পরিমাপ করার পক্ষে এক সপ্তাহ যথেষ্ট নয় একথা যেমন সত্যি, তেমন একথাও ঠিক যে ভারতীয় রাজনীতিতে সাতদিন লম্বা সময়।

ভারত জোড়ো যাত্রার লক্ষ্য

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দিল্লির আধিপত্যবাদী শাসনের ফলে জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক সন্দর্ভ থেকে বিরোধী স্বর কার্যত নির্বাসিত হয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলো সঠিকভাবেই অনুযোগ করে থাকে, যে তাদের বার্তা এবং কর্মসূচি দেশের নাগরিকদের কাছে পৌঁছয় না। তাই এই যাত্রার অন্যতম লক্ষ্য হল সংবাদমাধ্যমের তোয়াক্কা না করে নিজেদের বার্তা নিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে চলে যাওয়া। কংগ্রেস অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলে যাচ্ছে যে ভারত জোড়ো যাত্রা নির্বাচনের দিকে নজর রেখে সংগঠিত হচ্ছে না। বরং এর উদ্দেশ্য ঘৃণা ও অন্ধভক্তির আবহে দ্বিধাবিভক্ত দেশটার উপর স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেওয়া। আরেকটা উদ্দেশ্য, নাগরিকদের কথা শোনা এবং যে ইস্যুগুলো তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে সেগুলো জানা। তবে সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই তৃণমূল স্তরের কর্মীদের এবং পার্টি সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করা। পার্টি সযত্নে বোঝাতে চাইছে যে এই যাত্রা অকংগ্রেসী রাজনৈতিক দল এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সমর্থন পাওয়ার জন্য এক সমন্বয়মূলক উদ্যোগ। মূল ‘যাত্রী’ দলের সদস্যরা যে কংগ্রেসের পতাকা বহন করছেন না এবং যোগেন্দ্র যাদবও এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করছেন – সেটাই পরিষ্কার ইঙ্গিত। আরও প্রতীকী হল কন্যাকুমারী থেকে যাত্রা শুরু করার সময়ে ডিএমকের এম কে স্ট্যালিনের রাহুল গান্ধীর হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া। দৃশ্য হিসাবে ওই মুহূর্তটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্রতিক্রিয়া

যাত্রা শুরুর আগের কয়েকদিন তেমন উৎসাহিত হওয়ার মত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু তামিলনাড়ু থেকে কেরালায় পৌঁছতে পৌঁছতে ভারত জোড়ো যাত্রা কিছুটা গতি পেয়েছে। এখন হাজার হাজার মানুষের যাত্রায় পা মেলানো এবং রাস্তার ধারে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে দেখার দৃশ্য অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। আয়োজকরা নিশ্চয়ই এতে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে বেশি উচ্ছ্বসিত না হওয়াই ভাল এই কারণে, যে কেরালা আর তামিলনাড়ু এমন দুটো রাজ্য, যেখানে রাহুলের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এমনিতেই নরেন্দ্র মোদীর চেয়ে অনেকখানি বেশি। ফলে এরকম প্রতিক্রিয়া অনেকটা প্রত্যাশিতই ছিল।

যা বেশি গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ করা দরকার, তা হল অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া। ডিএমকে তো প্রথম দিনেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। কেরালার ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টে কংগ্রেসের শরিকরাও তাই। গত দুমাসের বেশিরভাগ সময়টা বিজেপি কাটিয়েছে ভারত জোড়ো যাত্রাকে ফালতু, ব্যর্থ পরীক্ষার তকমা দিয়ে। কিন্তু যাত্রা শুরু হওয়ার পর তারা দাঁত নখ বার করে এগিয়ে এসেছে। প্রত্যেকটা পদক্ষেপের নিন্দা করেছে। রাহুলের টি-শার্ট থেকে শুরু করে যাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের থাকার ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুতেই খুঁত খুঁজে পেয়েছে। সংবাদমাধ্যম যথারীতি বিজেপির নিন্দাগুলোকে বহুগুণ বাড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। শোনা যায় গোয়ার যে কংগ্রেস বিধায়করা ঈশ্বরের অনুমতি পেয়েছেন বলে দাবি করে বিজেপিতে যোগ দিলেন, তাঁরাও নাকি মে মাস থেকেই এই পদক্ষেপ নিতে তৈরি ছিলেন। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব এতদিনে কাজটি সারলেন ভারত জোড়ো যাত্রা থেকে নজর ঘোরাতেই।

অরবিন্দ কেজরিওয়াল, যিনি নিজেকে মোদীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে খাড়া করতে চান, কংগ্রেসের যাত্রার সময়েই হিসার থেকে ‘মেক ইন্ডিয়া নাম্বার ওয়ান এগেইন’ যাত্রা শুরু করার কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সে যাত্রা সেদিনই বানচাল হয়ে যায়। তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, জনতা দল ইউনাইটেড এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির মত দলগুলো এখন পর্যন্ত মোটামুটিভাবে এই যাত্রা সম্পর্কে চুপ।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার মত প্রতিক্রিয়া এসেছে বাম দলগুলোর কাছ থেকে। নির্দিষ্ট করে বললে সিপিএমের কেরালা ইউনিটের কাছ থেকে। যেদিন যাত্রা কেরালায় প্রবেশ করল, সেদিন পার্টির নিজস্ব টুইটার হ্যান্ডেল থেকে ভারত জোড়ো যাত্রার রুটের সমালোচনা করে একটা টুইট করা হয়। তাদের আপত্তির কারণ হল রাহুল কেরালায় ১৮ দিন কাটাবেন আর উত্তরপ্রদেশে মাত্র দুদিন। এই তথ্য তুলে ধরে সিপিএম যাত্রার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু তারা লক্ষই করেনি যে রাহুল কর্ণাটকে কাটাবেন ১৯ দিন এবং মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের মত রাজ্যেও – যেখানে হয় বিজেপি ক্ষমতায় অথবা তারা প্রধান বিরোধী দল – অনেকখানি সময় কাটাবেন। আসলে ভারত জোড়ো যাত্রার বিরুদ্ধে এই যুক্তিটা প্রশান্ত কিশোরের যুক্তি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে কথাটা বলেছিলেন। সিপিএম এবং আরও অনেকে সেখান থেকেই যুক্তিটা ধার করেছে। যুক্তি যা-ই হোক, এই যাত্রায় সিপিএমের প্রতিক্রিয়া দুর্ভাগ্যজনক এবং এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার পরিচায়ক। তবে কংগ্রেসের পক্ষে ভাল হবে যদি তারা সিপিএমের কেরালা ইউনিট আর গোটা পার্টিটাকে একই নিক্তিতে না মাপে।

সমালোচনা

যে কোনো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং প্রয়োগ নিয়েই সমালোচনার অবকাশ থাকে। যাত্রার সামগ্রিক দেখাশোনার দায়িত্বে একটা কেন্দ্রীয় কমিটি থাকলেও রাজ্য স্তরে দেখাশোনার দায়িত্ব রয়েছে রাজ্য শাখাগুলোর হাতে। এরকম ব্যবস্থা করা হলে প্রায়শই ব্যবস্থাপনা যাচাই করে নেওয়ার অভাব দেখা যায়। ইতিমধ্যেই বেশকিছু বিতর্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যা সেই অভাবের প্রমাণ।

কিন্তু ভারত জোড়ো যাত্রার যে দিকটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা হল যাত্রাপথ। ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল যাত্রাপথের বাইরে রয়ে গেছে। পূর্ব উপকূল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, গুজরাট, বাংলা এবং বিহার এই যাত্রার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে এই ত্রুটিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কীভাবে?

যাত্রা
ভারত জোড়ো যাত্রার যাত্রাপথ। ছবি টুইটার থেকে

প্রথমত, ভারত জোড়ো যাত্রাকে যদি ভারতের প্রত্যেকটা কোণ ছুঁয়ে যেতে হয় তাহলে তা অনন্ত যাত্রায় পরিণত হবে। যাত্রা শেষ করতে যা সময় লাগবে তাতে দুটো নির্বাচন পেরিয়ে যাবে। তবে পার্টি ইতিমধ্যেই সামনের বছর পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত একটা যাত্রার প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। যেসব রাজ্য এবারের যাত্রার বাইরে রয়ে গেল, সেখানে রাজ্য স্তরে যাত্রার আয়োজনও করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হলেও স্থানীয় সমর্থন ও সংগঠনকে ব্যবহার করে ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করা এবং সদর্থক দৃশ্যের জন্ম দেওয়াও অন্যতম লক্ষ্য। ফলে সেইসব রাজ্যই এই যাত্রার লক্ষ্য যেখানে পার্টির সংগঠন সবচেয়ে শক্তিশালী। তারাই পারবে এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ভারত জোড়ো যাত্রার গতি বজায় রাখতে। সত্যি কথা বলতে, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা বা বাংলার রাজ্য শাখাগুলোর পক্ষে একটা গোটা দিনও এই যাত্রায় উৎসাহ ধরে রাখা কঠিন। হয়ত আগামী বছর যাত্রা হলে তারা সামান্য বেশি প্রস্তুত থাকবে।

তবে আমার বিশ্বাস এই যাত্রার অন্তত ৪-৫ দিনের জন্য নির্বাচনের মুখে থাকা গুজরাট পরিক্রমা করা উচিত ছিল। বিশেষ করা সেখানকার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল, যা একসময় কংগ্রেসের ঘাঁটি ছিল এবং খাম (KHAM) ফর্মুলার অংশ ছিল। যদিও ওই অঞ্চল এখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গড়, ভারত জোড়ো যাত্রার মত জনসংযোগ কর্মসূচির অভিঘাত শহরাঞ্চলের চেয়ে ওইসব জায়গায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ওখানকার মানুষের মধ্যে শহুরে নৈরাশ্যবাদ তুলনামূলকভাবে কম।

এই যাত্রা যেসব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তা মোটের উপর সদর্থক। কিন্তু মনে রাখতে হবে যেসব অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যাত্রা পৌঁছেছে সেগুলো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং রেষারেষিমুক্ত এলাকা। আসল চ্যালেঞ্জ আসবে যখন যাত্রীরা তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু বলয়ে প্রবেশ করবেন।

ভারত জোড়ো যাত্রা যেমন ভারতের পুনরুত্থানের উদ্দেশ্যে, তেমনই নেতা হিসাবে রাহুলের পুনরুজ্জীবন ও নতুন চেহারায় উপস্থাপনার উদ্দেশ্যেও। এই যাত্রায় বরাবরের জন্য প্রমাণ করে দেওয়ার চেষ্টা হবে যে তিনি একজন অনিচ্ছুক রাজনীতিবিদ, যিনি এই ভূমিকায় বেমানান। এই যাত্রার প্রথম অংশে যেসব ছবি উঠে এসেছে তা আশাব্যঞ্জক। রাহুলকে দেখে একেবারেই মনে হচ্ছে না তিনি এমন কেউ যাঁর নাগাল পাওয়া যায় না। বরং সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর অনাড়ম্বর মেলামেশার মুহূর্তগুলো ঠিক উল্টো ছবিটাই তুলে ধরে। রাহুলকে এমন এক মনোযোগী, খাঁটি মানুষ বলে মনে হচ্ছে, যিনি আর পাঁচজনের মতই অচেনা মানুষের সাথে মেলামেশা করার সময়ে সামান্য সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রাখেন। প্রশ্ন হল, তাঁর পরামর্শদাতা এবং পার্টি রাহুলের এই ভাবমূর্তিকে কীভাবে ব্যবহার করার কথা ভাবছেন?

আরো পড়ুন রাহুল গান্ধীর স্মরণীয় বক্তৃতায় উঠে এসেছে গোটা দেশের স্বার্থ

কোনো জোরালো বয়ান কি গড়ে তোলা হচ্ছে যা ভারত জোড়ো যাত্রা শেষ হওয়ার আগেই তুলে ধরা হবে? এটা প্রয়োজন কারণ জাতীয় নির্বাচন জিততে হলে একটা বড়সড় সারা দেশের মানুষকে প্রভাবিত করার মত বয়ান দরকার। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিজেপি জিতেছিল মোদীর “৫৬ ইঞ্চি ছাতি”, অর্থাৎ আলফা মেল বয়ানের উপর ভর দিয়ে। “সত্যিকারের ৫৬ ইঞ্চি ছাতি, যার অধিকারী একজন হৃদয়বান মানুষ” – কংগ্রেস এইভাবেও রাহুলকে তুলে ধরতে পারে। যদি তা করা যায় তাহলে ভারত জোড়ো যাত্রা রাহুলের, কংগ্রেসের এবং ভারতের পুনরুজ্জীবন যাত্রা হয়ে উঠতে পারে।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.