সংসদের এবারের বাজেট অধিবেশন সরগরম হয়ে রইল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বক্তৃতা নিয়ে। গত ২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ভাষণের জবাবে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি ৪২ মিনিটের একটি বক্তব্য রাখেন, আর তা থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে এমন বহু বিষয় উঠে এসেছে, দেশ-দুনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাশিতভাবেই সরকারপক্ষ পাল্টা সমালোচনা করেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। যদিও, তিনি নিজে রাহুলের বক্তব্যের কতটুকু সদুত্তর দিতে পেরেছেন তা বিবেচনাসাপেক্ষ।

লোকসভায় রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্য এবং তার বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে বলে নেওয়া দরকার, কেরালার ওয়ানাড় থেকে নির্বাচিত এই সাংসদ লোকসভায় যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তা শুধুমাত্র জাতীয় কংগ্রেসের দলীয় বক্তব্য নয়; বরং এই প্রশ্নগুলি বিভিন্ন সময়ে ভারতবর্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিগুলি, তাৎপর্যপূর্ণভাবে বামপন্থীদের বক্তব্যের মধ্যেও উঠে এসেছে। তাই দলীয় স্বার্থের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে, এই প্রশ্নগুলির সাথে জড়িয়ে আছে গোটা দেশের সাধারণ জনগণের স্বার্থ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মূলত তিনটি বিষয়কে রাহুল তুলে ধরেন। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “সমালোচনার সুরে নয়, এই বক্তব্য তিনি রাখছেন অস্বস্তিতে।” রাষ্ট্রপতির ভাষণকে তিনি “দূরদৃষ্টিহীন” বলে উল্লেখ করেন। করোনাজীর্ণ দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, টালমাটাল অর্থব্যবস্থা, বিদেশনীতির ব্যর্থতাসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনোটাই রাষ্ট্রপতির ভাষণের স্থান পায়নি; আসলে তা কতকগুলি “আমলাতান্ত্রিক কলমের আঁচড়” বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা রাহুলের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন “বর্তমানে আসলে দুটি ভারতবর্ষ তৈরি হয়েছে। একটি ভারতবর্ষ ধনকুবেরদের। যারা সংখ্যায় অল্প, হাতেগোনা। যাদের কাজ খোঁজার দরকার হয় না। আর অপর প্রান্তে আরেকটি ভারতবর্ষ, যা দরিদ্র, প্রান্তিক, মেহনতী মানুষের।” রাহুলের বক্তব্যে উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পক্ষেত্রে (MSME) সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ঘটনা, যার জন্য নোটবন্দি ও ভুল জিএসটি নীতির মতো একাধিক পদক্ষেপ দায়ী বলে তিনি মনে করেন।

যদিও ১৯৯১ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রাক্কালেই দেশের বামপন্থী শক্তিগুলি এই ভবিষ্যৎ চিত্র সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন, কিন্তু তা শোনা হয়নি। তথাপি নেহরুভিয়ান রাষ্ট্রদর্শনের হাত ধরে বেড়ে ওঠা কল্যাণকর রাষ্ট্রের যেটুকু ধারণা ভারতবর্ষের বুকে উদারীকরণের পরেও অবশিষ্ট ছিল, তারও সলিল সমাধি রচনা করতে এই সরকার তৎপর। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে এখন বামপন্থীদের এই আশঙ্কাই পরিস্ফুট হচ্ছে। অর্থনীতির উদারীকরণের মাধ্যমে যে হারে পুঁজির একচেটিয়াকরণ শুরু হয়েছিল, মোদি জমানায় তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অনেক বিতর্ক থাকলেও, বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদরা মোটামুটি একমত যে ভারত রাষ্ট্র কখনোই কোনো একটি বিশেষ শ্রেণির দ্বারা শাসিত নয়, বরং তা শাসিত হয় একটি ‘শ্রেণিজোট’ দ্বারা। উল্লেখযোগ্যভাবে, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধন মনে করেন, এই শ্রেণিজোটের অন্তর্ভুক্ত মূলত তিনটি শ্রেণী — বৃহৎ পুঁজিপতি, ধনী কৃষক এবং আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠী। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই তিনটি শ্রেণির মধ্যেকার সম্পর্ক স্বার্থকেন্দ্রিক ও দ্বন্দ্বে পূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে, খুব সরলভাবে বললে, রাষ্ট্রের কাজ হল এই শ্রেণিজোটের মধ্যে সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে সম্পদের বন্টন ঘটিয়ে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা এবং কালক্রমে এই একে টিকিয়ে রাখা, যাতে সর্বহারা শ্রেণি কখনোই রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করতে না পারে।

মোদি জমানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, রাষ্ট্র এখন এই শক্তিজোটের মধ্যেকার পুরনো সমীকরণ খানিকটা পাল্টে দিতে চাইছে। শ্রেণিজোটের নতুন সমীকরণে দ্রুত গুরুত্ব হারাচ্ছে ধনী কৃষকরা, ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বৃহৎ পুঁজির মালিক এবং আমলাতন্ত্রের একটা অংশ। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে বাতিল হওয়া কৃষি আইনগুলো প্রণয়নে। পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার এভাবেই আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।

যদিও ভারতবর্ষের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো আদৌ ‘আপেক্ষিকভাবে স্বতন্ত্র’ কি না তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; তবু এখন প্রশ্ন হল, এই নতুন সমীকরণকে রাষ্ট্র কীভাবে কার্যকর করবে? এই পরিবর্তন কার্যকর করতে গেলে তার কাঠামোগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই রাষ্ট্রের কেন্দ্রকে আরও বেশি সংগঠিত, আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। প্রান্ত, অর্থাৎ রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা এবং তাদের অটোনমিকে যতটা সম্ভব সীমিত রাখতে হবে। কেন্দ্রের ক্ষমতাকে লাগামছাড়া হতে না দেওয়ার জন্য যেসব নিয়ামক সংস্থা রয়েছে, তাদের বকলমে নিজেদের অধীনে রাখতে হবে।

রাহুলের বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে এই উদ্বেগ উঠে এসেছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে মনে করিয়ে দিয়েছেন “ভারতবর্ষের পরিচয় হল, তা একটি রাজ্যসমুহের সমবায় বা Union of States, যার মুল আদর্শ হল পার্টনারশিপ। কেন্দ্রীয় সরকার যদি এই পার্টনারশিপকে ধ্বংস করে নিজের বিচারধারাই চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে তার প্রভাব হবে মারাত্মক।” এমনিতেই ভারতবর্ষের বুকে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বেশ দ্বন্দ্বপূর্ণ। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের আর্থিক দিকটির বেশিরভাগটাই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে। যে কারণে, রাজ্যের সাথে তার টানাপোড়েন অব্যাহত থাকে। সেইসঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে প্রজাতন্ত্র দিবসে কয়েকটি রাজ্যের ট্যাবলো বাতিলের বিষয়টা। এভাবেই মুলত একটি ‘কেন্দ্রাভিমুখী শাসনকাঠামো’ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ‘শাহেনশাহ’ বলে কটাক্ষ করেছেন। যদিও বিজেপি যে এসব যুক্তির ধার ধারে না, তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি কটাক্ষের সুরে বলেছেন “জাতীয় কংগ্রেসের নাম পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কংগ্রেস করলে এই সমস্যার সমাধান হবে।”

তৃতীয় যে বিষয়টি নিয়ে রাহুল সরব হয়েছেন তা হল একপ্রকার ‘কূটনৈতিক ব্যর্থতা’। তিনি অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকারের সবথেকে বড় ভুল হল চীন এবং পাকিস্তান, যা কিনা আগে দুটি আলাদা ফ্রন্ট ছিল, তাদের ক্রমশ কাছাকাছি নিয়ে এসে একটি বৃহৎ ফ্রন্টে পরিণত করা। এ প্রসঙ্গে তিনি ডোকলাম এবং লাদাখে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। রাহুল তাঁর বক্তব্যের শেষ দিকে অভিযোগ করেন, আমাদের দেশ এখন এক ভয়ঙ্কর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই ঝুঁকি যেমন সীমান্তের ওপার থেকে শানিত হচ্ছে, তেমনি দেশের ভিতরেও মোদী সরকারের বর্তমান নীতির ফলে বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাগরিক অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।

যদিও রাহুলের এই বক্তব্যের পর আরএসএস এবং ভারতীয় জনতা পার্টি চুপ করে বসে থাকেনি। নানাভাবে তারা এই বক্তব্যের স্পিরিটকে নষ্ট করতে চেয়েছে, কারণ একটি কথারও কোনো জবাব তাদের কাছে ছিল না। বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অমিত মালব্য তাঁর জ্ঞানের দারিদ্র্য থেকে জানিয়েছেন, রাহুলের যুক্তরাষ্ট্র সংক্রান্ত বক্তব্য নাকি সংবিধানবিরোধী। যদিও ভারত যে আসলে একটি “Union of States”, তা সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে দেওয়া আছে। ওই অনুচ্ছেদ বলছে “India, that is Bharat, shall be a Union of States”। এই গোটা বাক্যে ‘shall be’ কথাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যার সহজ মানে করলে দাঁড়ায়, যতদিন পর্যন্ত ভারতের অস্তিত্ব থাকবে, ঠিক ততদিন পর্যন্ত তার পরিচয়, সে কতগুলি ‘রাজ্যের সমবায়’ বা ‘Union of States’।

রাহুলের দল জাতীয় কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন কখনো যে ইউনিয়ন অফ স্টেটসের গরিমা নষ্ট করেনি, একথা বলা মানে মূর্খের স্বর্গে বেঁচে থাকা। তৎসত্ত্বেও বর্তমানে যে আক্রমণ দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বিভিন্ন নিয়ামক সংস্থাগুলির উপর নামিয়ে আনা হচ্ছে, তাকে প্রতিরোধ করতে না পারলে আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো অচিরেই ফ্যাসিবাদী হয়ে দাঁড়াবে, যার ফল, বলাই বাহুল্য, ধ্বংসাত্মক। অতীতে যখন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল, রাষ্ট্রকাঠামো হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য, তখন যেমন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, ঠিক সেরকমভাবেই এখনো এই চলমান আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই আমাদের নাগরিক কর্তব্য।

 মতামত ব্যক্তিগত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.