আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী গোটা বিশ্বে, বিশেষত এই উপমহাদেশে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক চর্চার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধ সেই সম্পর্কিত একটা সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। বলে রাখা দরকার, বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা যা এই আলোচনায় উল্লেখ করা হয়নি তা গুরুত্বহীন নয়, বরং অনেক বৃহৎ পরিসরে তা আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যেকোন নিবন্ধেরই একটা সীমাবদ্ধ পরিসর থাকে, এক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা হয় নি।

ইসলামের পুনরুজ্জীবন

সপ্তম শতাব্দীতে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়, ইউরোপ তখন মধ্যযুগের অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। পরের কয়েক শতককে বিবেচনায় রাখলে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের নিরীখে ইসলামি দুনিয়া মধ্যযুগের ইউরোপের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামিয় নিও-প্লেটোইজম ছিল ইউরোপীয় নবজাগরণের পূর্বসুরী। কিন্তু ইতিহাস দেখল যে, ইউরোপেই প্রথম পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটল। তা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না খ্রিস্টধর্মের আদেশে বা উদারতায় ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছিল। ভিন্নমতাবলম্বীদের পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, বিজ্ঞানকে অবরুদ্ধ করার প্রবল চেষ্টা হয়েছিল ‘পবিত্র’ ইনকুইজিশনের আসরে। তবু নবজাগরণ ও পুঁজিবাদী বিপ্লবের আলোকে ইউরোপ উদ্ভাসিত হয়েছিল, সামন্ততন্ত্র আর ধর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, স্বাধিকারের নবদিগন্তে পদার্পণ করেছিল। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিশর আক্রমণের সময়টাকেই ইসলামি দুনিয়ার উপর ইউরোপের আগ্রাসনের সূচনা ধরা যেতে পারে। ইউরোপে উদ্ভব হলেও পুঁজিবাদ তার বিকাশের স্বাভাবিক নিয়মেই পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীকেই তার শোষণের ক্ষেত্রে পরিণত করল। ধর্মের বিস্তারের জন্য নয়, শোষণের ক্ষেত্র বিস্তারের জন্যই ইউরোপ ইসলামি দুনিয়াকে তার ঔপনিবেশিক শোষণের অধীনে নিয়ে এল। ব্রিটিশরা দখল নেয় ভারতসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, রুশরা দখল করে মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়াকে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। যে গুটি কয়েক মুসলিম দেশ কোনোক্রমে টিকে রইল, তারাও পশ্চিমী প্রভাবমুক্ত থাকতে পারল না। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা উপনিবেশগুলিতে বিদ্যমান সামন্ত সম্পর্কের উচ্ছেদ করে না, তার উপরই পুঁজিবাদী শোষণ চাপিয়ে দেয়। ফলে একটা আধা-ঔপনিবেশিক, আধা-সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর উপর পূর্বতন ইসলামি দুনিয়ায় ইসলাম টিকে রইল এক অপরিবর্তনীয় উপরিকাঠামো হিসেবে। কোন ধর্ম ভালো, কোন ধর্ম মন্দ এই বিতর্ক অনৈতিহাসিক। একজন ইসলামিক মার্টিন লুথারের কষ্টকল্পনা কেবল অনৈতিহাসিক বললেই যথেষ্ট নয়, ইতিহাসের ধারায় অবান্তরও বটে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পশ্চিমী আধিপত্যের প্রতিক্রিয়ায় ইসলামি ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনকে হাতিয়ার করার প্রবণতা থেকেই ইসলামিস্ট রাজনীতি সূচনা। বলে রাখা প্রয়োজন, এই নিবন্ধে ধর্মের পুনরুজ্জীবনে ইসলাম নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ হয়েছে এমন কোন বিশ্বাস থেকে নয় যে অন্য ধর্মগুলি থেকে ইসলাম মূলগতভাবে ভিন্ন; বরং তার বিপরীত। পুনরুজ্জীবনের প্রাথমিক ধারণাটি ছিল আত্মরক্ষামূলক, যখন মুসলিম সমাজ রাষ্ট্রের সমর্থন পাবে না তখন মুসলিম সমাজ কীভাবে তার নিজস্বতা রক্ষা করবে। ১৮৬৭ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দ মাদ্রাসা ও দেওবন্দিরা জন্মলগ্ন থেকেই এই কাজে নিয়োজিত হয়েছিল। পুনরুজ্জীবনের আরেকটা ধারা হল গঠনমূলক। পশ্চিমী রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমস্ত ধারণার বিপরীতে কোরান ও শরিয়তের উপর ভিত্তি করে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের ইসলামিকরণ করা, সেই উদ্দেশ্য ইসলামি আদর্শ ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা। ভারতীয় উপমহাদেশের মৌলানা মৌদুদি (জামাত-এ-ইসলামি) এবং মিশরের হাসান-আল-বান্না (মুসলিম ব্রাদারহুড) এই নতুন ইসলামপন্থার স্রষ্টা। এই পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা মুসলিম সমাজের অগ্রগতির জন্য ইসলামভিত্তিক প্রচেষ্টা, যা কিছু ক্ষেত্রে পশ্চিমী আধুনিক জ্ঞানের দ্বারাই উজ্জীবিত। কিন্তু নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইসলামিক পুনরুজ্জীবনের দুটি ধারাই যথেষ্ট সাফল্য লাভ করলেও সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ব্যাপক দরিদ্র মুসলিম কৃষক সাধারণের মধ্যে জমি বন্টন করা বা পিতৃতান্ত্রিকতার কবল থেকে নারীসমাজের মুক্তি দেবার মৌলিক প্রয়োজনীয় কর্তব্য সাধনে ব্যর্থ। বরং শেষ বিচারে আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক, পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নমূলক শ্রেণী কাঠামোকে রক্ষা করাই এর কাজ হয়ে দাঁড়ায়। স্বীয় সমাজে শোষণের সেই কাঠামোকে রক্ষা করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সাথে লড়াইয়ের পরিবর্তে পুনরুজ্জীবনবাদ শেষপর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের দোসরে পরিণত হয়। গত অর্ধশতাব্দীর আফগানিস্তানের ইতিহাস সে কথাই প্রমাণ করে।

আফগানিস্তান ও সাওর বিপ্লব

আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানটাই মধ্য এশিয়ার রাজনীতির জন্য চিরকাল গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে জারশাসিত বিশাল রুশ সাম্রাজ্য, অন্যদিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতীয় উপমহাদেশের মাঝে আফগানিস্তান একটি ইসলামিক দেশ হিসাবে টিকে ছিল। যদিও দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের (১৮৭৮-৮০) পর থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত আফগানিস্তানের বিদেশনীতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ১৯১৯ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের পর কাবুলের বিদেশনীতির উপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ উঠে যায়। ১৯১৯ সালের ১৯শে আগস্ট রাওয়ালপিণ্ডি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার দিনটিই আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে উদযাপন করা হলেও আজকের আফগানিস্তান সমস্যার কিছু আগাছা তখনই অঙ্কুরিত হয়েছিল। চুক্তিতে ডুরাণ্ড লাইনকে সীমান্তের স্বীকৃতি দেবার ফলে আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাংশে পাখতুন অঞ্চলের একটা বড় অংশ স্থায়ীভাবে আফগানিস্তানের বাইরে চলে যায়। প্রথম যিনি পশ্চিমী ধাঁচে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি হলেন আফগানিস্তানের তৎকালীন রাজা আমানুল্লা খান। আমানুল্লা ছিলেন তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক পাশার আদর্শে উজ্জীবিত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধি। সেই সময় আফগানিস্তানের সংবিধানের ৬৮ নং ধারায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, নারীশিক্ষার জন্য প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, অনেকগুলি কো-এডুকেশন স্কুল খোলা হয় এবং মহিলাদের পর্দা বাধ্যতামূলক নয় বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে ইউরোপের মতো শিল্পবিপ্লব না হবার কারণে শক্তিশালী জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল না। অন্যদিকে রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের পর থেকে কোনো দেশের জাতীয় বুর্জোয়ারা সামন্ততন্ত্রকে সরাসরি আঘাত করতেও চাইত না। তাই সামন্ততন্ত্র রইল, কিন্তু তার উপরিকাঠামোকে ভাঙার চেষ্টা হল। ফল হল পাখতুন উপজাতি ও মোল্লাতন্ত্রকে ব্যবহার করে সাক্কাওয়িস্ট অভ্যুত্থান (১৯২৮-২৯)। রাজতন্ত্র টিকে গেল, কিন্তু আধুনিকীকরণের গতি রুদ্ধ হল।

গত শতাব্দীর ষাটের দশক ছিল সারা পৃথিবীতে ছাত্র আন্দোলন আর গণ আন্দোলনের উর্বর সময়। আফগানিস্তানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯৬৫ সালে আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি, পিডিপিএ (পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান), গড়ে উঠল। সারা পৃথিবীর ছাত্র আন্দোলন আফগানিস্তানের যুবকদের এক নতুন পৃথিবীর জন্য উদ্বেল করে তুলেছিল।

(মার্কিন আফগান ইতিহাসবিদ লুইস ডুপ্রে লিখেছেন, “বার্কলেতে পুলিশী অত্যাচারের খবর, বা কলম্বিয়ার সংঘর্ষ, বা প্যারিসে ছাত্র-শ্রমিকদের ব্যারিকেডের খবর কয়েক ঘন্টার মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যেত। আফগানিস্তানের সব শহরে ও অনেক গ্রামে রেডিওতে সেই খবর ছাত্ররা শুনত। আফগানিস্তানের ছাত্র আন্দোলন সারা পৃথিবীর ছাত্র আন্দোলনের সম্প্রসারণের ফল।”) ইতিমধ্যে ১৯৭৩ সালে আফগান রাজতন্ত্রের বিলোপ ঘটে এবং দাউদ খান আফগান প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। দাউদ খানের শাসনকাল কমিউনিস্টরা তাদের প্রভাব ক্রমশ বাড়াতে থাকে। ১৯৭৮ সালের ১৮ই এপ্রিল শ্রমিক নেতা মীর আকবর খাইবার খুন হন। জনগণের সন্দেহ ছিল দাউদ খান প্রশাসন এই খুনের পিছনে আছে। সেদিন কাবুলের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হয়। আতঙ্কিত দাউদ খান প্রশাসন পিডিপিএ নেতাদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। ফল হল উল্টো। ২৮শে এপ্রিল সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করল (সাওর বিপ্লব)।

প্রতিবিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত

কিন্তু এত দ্রুত একটা বিপ্লব ঘটে যাবে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় তারা এসে যাবে, তা পিডিপিএ নেতৃত্বের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তাঁরা পেলেন, সেটা পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম। দেড় কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র কুড়ি লক্ষ মানুষ শহরবাসী। অবশিষ্ট এক কোটি তিরিশ লাখ গ্রামীণ জনগণের মধ্য ১৫ লক্ষ মানুষ তখনও প্রাক-সামন্ততান্ত্রিক যাযাবর জীবন যাপন করে। জনসংখ্যার ৯৫% নিরক্ষর। মোট জমির ৮৮% অনাবাদী। আবাদযোগ্য জমির ৪৫%-এর মাত্র ৫% জমির মালিকের হাতে। গ্রামের দরিদ্র কৃষক সকলেই মহাজনী ঋণের নাগপাশে বাঁধা। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানের কোনো গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। দেশে মোট শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের কম। জিডিপির মাত্র ১৭% আসত শিল্প থেকে। পিডিপিএ-কে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই হল।

(১) তারা সমস্ত শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করল, শিল্পে লক্ষণীয় অগ্রগতি ঘটাতে সক্ষম হল। ১৯৭৮ সালে জাতীয় আয়ের ৩% আসত খনিজ শিল্প থেকে, ১৯৮৮ সালে সেটা বেড়ে হল ১০%। প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই একশোর বেশি নতুন শিল্প কারখানা হল।

(২) কৃষিজমির ঊর্ধ্ব সীমা, অর্থাৎ সিলিং, বেঁধে দেওয়া হল। উদ্বৃত্ত জমি গরীব কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা হল। প্রথম বছরেই আট লক্ষ একর জমি ১,৩২,০০০ হাজার পরিবারের মধ্য বন্টন হল। যৌথ চাষ শুরু হল।

(৩) গরীব কৃষককে মহাজনদের ঋণ থেকে মুক্তি দেওয়া হল। কয়েক পুরুষ যে ঋণের বোঝা গরীব জনগণের কাঁধে চেপেছিল, তা তারা পরিশোধ করবে না, সরকার ঘোষণা করল।

(৪) নারীশিক্ষা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হল। পণপ্রথা নিষিদ্ধ হল। সেচ ও পানীয় জলের দায়িত্ব হল রাষ্ট্রের। হাসপাতালে বেড বাড়ল ৮৪%, ডাক্তার বাড়ল ৪৫%।

এইসব কর্মকান্ডের সাফল্য একসাথে অনেকগুলো প্রতিবিপ্লবী শ্রেণির জন্ম দেয়। যারা জমি হারাল, আধিপত্য হারাল, তারা স্বভাবতই এই নতুন ব্যবস্থার বিরোধী হয়ে উঠল। আফগানিস্তানে কমিউনিস্টদের এইসব কার্যকলাপ বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কেন্দ্র আমেরিকার মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল। অনেক বলেন এবং বিশ্বাস করেন, আফগানিস্তানে আমেরিকার কার্যকলাপ সোভিয়েত রাশিয়ার আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়া মাত্র। কিন্তু ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু পাঠক দেখবেন, সাওর বিপ্লবের বর্ষপূর্তির আগেই ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে সিআইএ আমেরিকার রাষ্ট্রপতির কাছে আফগানিস্তান নিয়ে রিপোর্ট পাঠায়, এবং ঐ বছর ৩রা মে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার তাঁর তহবিল থেকে ৫,০০,০০০ ডলার সিআইএ-র হাতে তুলে দেন আফগানিস্তানে প্রতিবিপ্লব সংগঠিত করার জন্য (সূত্র: What we won — Bruce Riedel)। হ্যাঁ, ইতিহাস এ কথাও বলে, যে সোভিয়েত রাশিয়াও আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করে, কিন্তু কোনোভাবেই সেটা ১৯৭৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বরের আগে নয়। আমেরিকা এই দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামি দুনিয়ার হিতার্থে কী কী করেছিল তা প্রায় সকলেরই জানা, তবু কিছুটা উল্লেখ না করলে এই নিবন্ধ অসম্পূর্ণ থাকবে।

আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্ট উচ্ছেদ করার জন্য সিআইএ-র এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’। এটা ছিল আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থার দ্বারা পরিচালিত সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়সাপেক্ষ অভিযান। এক দশকের বেশি সময় জুড়ে আমেরিকা প্রতি বছর গড়ে ষাট কোটি ডলার খরচ করেছে এই ‘ডলার জেহাদ’ পরিচালনা করতে। ডলারের এমন জাদু, যে প্যালেস্টাইনের মুক্তির জন্য জেহাদি ফিলিস্তিনি আবদুল্লা ইউসুফ আজম (ওসামা বিন লাদেনের গুরু) সেই ’৭৯ সালেই সৌদি আরব ছেড়ে পাক আতিথেয়তায় ইসলামাবাদ হয়ে পেশোয়ারে ঘাঁটি গাড়লেন। পাকিস্তানের দেওবন্দি মাদ্রাসাগুলোই ছিল আফগানিস্তানের ছাত্রদের ইসলামিক শিক্ষাকেন্দ্র। সত্তরের দশকে এসে সৌদি আর্থিক অনুদানের সঙ্গে সঙ্গে সৌদি ওয়াহাবি মতবাদের প্রভাব এই মাদ্রাসাগুলিকে গ্রাস করল। এই মাদ্রাসাগুলোই ব্যবহৃত হতে থাকল সন্ত্রাসবাদের গর্ভগৃহ হিসাবে। আফগান সমাজের জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে আফগান কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী জেহাদি সংগঠনগুলোও অনেকগুলি উপধারায় বিভক্ত ছিল। সিআইএ-র আর্থিক মদতে এবং পাক আইএসআইয়ের নেতৃত্বে আফগান মুজাহিদিনদের সাতটা ভিন্নমুখী ধারাকে এক ছত্রছায়ায় আনা হল। তাদের এই ধর্মযুদ্ধে অংশ নেবার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশের যুবক মিলিয়ে জেহাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রায় কুড়ি হাজার যোদ্ধার এক বাহিনী গঠিত হল। এই বাহিনীই ১৯৮৮ সালে ওসামা বিন লাদেনের আল কায়দায় পরিণত হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তানে পিডিপিএ সরকারের সাহায্যকারী হিসাবে যে বাহিনী পাঠিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে। সোভিয়েতের পতনের পর ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে, কিন্তু ১৯৯২ সালে আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকারের পতন নিশ্চিত করা পর্যন্ত আমেরিকা এই তথাকথিত ধর্মযুদ্ধের শরিক থেকে গেল।

তালিবান

নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর আফগান মুজাহিদিনদের ঐক্য অনাবশ্যক হয়ে পড়ে, ক্ষমতার জন্য শুরু হয় পারস্পরিক লড়াই। ’৯২ থেকে ’৯৬ এই গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। উদ্দেশ্যসিদ্ধির পর আমেরিকাও আপাতভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকে।

দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহারের পাশে মোল্লা ওমর নামের একজন প্রাক্তন মুজাহিদিন একটা নিজস্ব মাদ্রাসা চালাত। পাখতুন উপজাতি অধ্যুষিত এইসব পশ্চাদপদ এলাকায় প্রশাসনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অবাধে আফিম (পোস্ত) চাষ আর আফিমের চোরাচালান ছিল এইসব এলাকার অর্থনীতির মেরুদন্ড। পৃথিবীর মোট আফিমের ৯৩% আফগানিস্তানে উৎপন্ন হয়, আর ও দেশের মোট জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে এই অবৈধ উৎপাদন থেকে। চোরাচালান, লুঠ, খুন, অপহরণ অশিক্ষিত গ্রামীণ উপজাতিগুলোর জীবনের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে ছিল। ১৯৯৪ সালের শুরুর দিকে কান্দাহার থেকে পাকিস্তান সীমান্তে যাবার রাস্তায় দুজন ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়। কুয়েত্তা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি স্থানীয় একজন মোল্লার দ্বারস্থ হয়। সেই মোল্লা হল মোল্লা ওমর। তার মাদ্রাসার ছাত্ররা (তালিবান) অপহরণকারীদের দমন করে। কুয়েত্তা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীকেই পথ নিরাপত্তার জন্য আর্থিক সাহায্য করতে থাকল। ক্রমে স্থানীয় ভূস্বামী, জমির মালিক, মহাজন, ব্যবসায়ী সবাই এই জেহাদি ইসলাম ও পাখতুনওয়ালি সংস্কৃতির (আত্মমর্যাদা, সাহস, বদলা, আতিথেয়তা) মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা নতুন তালিবান গোষ্ঠীকে তাদের সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সমস্তরকম সমর্থন দিল। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রায় বিনা বাধায় এই গোষ্ঠী দক্ষিণ আফগানিস্তানের বারোটা প্রদেশ দখল করে ফেলল। পাকিস্তান সরকার ও ইসলামিক আন্তর্জাতিক সংগঠন আল কায়দার পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর তালিবান কাবুলের দখল নিল।

তালিবান ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ

তালিবানি শাসন মানে ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধকার। আফগানিস্তানের সমাজব্যবস্থায় মধ্যযুগীয় সামন্ত সম্পর্কের বিরুদ্ধে যে কোনো প্রতিস্পর্ধাকে সে ধর্মীয় অনুশাসনের কঠোরতায় দমন করে। লিবারাল বুদ্ধিজীবীরা আশা করে থাকেন, পুঁজিবাদ সারা পৃথিবীতে নিজেকে বিকাশিত করার সাথে সাথে গণতন্ত্র, স্বাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার আলো ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যেটুকু ইতিহাস আমরা বিবৃত করলাম, তাতে আধুনিক পুঁজিবাদ তা করল না। বিপরীতক্রমে সমাজের পশ্চাদপদ শ্রেণিসম্পর্কের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পূর্ণ মদত দিল। এর কারণ, আধুনিক পুঁজিবাদ তার কেন্দ্রকে সুরক্ষিত রেখে পরিধির দিকে তার শোষণের বিস্তার ঘটায়। কিন্তু শোষণের জন্য সেইসব পশ্চাদপদ দেশের পশ্চাদপদ সমাজ সম্পর্ককে ভাঙতে চায় না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সামাজিক পশ্চাদপরতা পুঁজিবাদী শোষণের সহায়ক হয়ে ওঠে। তাই তালিবান শাসনের সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কোনো সংঘাত ততদিন পর্যন্ত ছিল না, যতদিন সাম্রাজ্যবাদের ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন আল কায়দা তাকেই ছোবল মারল। সেই ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সাম্রাজ্যবাদ তার হিংস্র রূপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা দেশের আপামর জনসাধারণের উপর। ফরাসি বিপ্লবের সময় যে বুর্জোয়া শ্রেণি মানবসভ্যতার সামনে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে এসেছিল, আফগানিস্তানের বুকে দু দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি তাকেই পদদলিত করেছে। কিন্তু আফগান সমাজে বিদ্যমান শোষণসম্পর্ককে ভাঙার কোনো পথে আধুনিক বুর্জোয়ারা যেতে পারে না। তাই তালিবানরা বলত “আমেরিকার ঘড়ি আছে, কিন্তু আমাদের জন্য আছে সময়”। আজ যখন আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে শূন্য হাতে ফিরে গেল, তখন আরো একবার প্রমাণিত হচ্ছে, আজকের বুর্জোয়া শ্রেণি সামন্ততন্ত্রের নিগড় থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ব্যর্থ।

শেষ কথা

যাঁরা বলেন আমেরিকার পশ্চাদপসরণের অর্থ আফগানিস্তানের জনগণের স্বাধীনতা লাভ, তাঁরা ঠিক বলেন। যাঁরা বলেন তালিবানদের ক্ষমতা দখলের অর্থ আফগানিস্তানের জনগণের উপর মধ্যযুগের অন্ধকার নেমে আসা, তাঁরাও ঠিক বলেন। কিন্তু আমাদের দেশের শাসক শ্রেণির অনুগামী সংবাদমাধ্যম দুটো সত্যকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চাইছে। আসলে হিন্দুত্ববাদী শাসকরা আমাদের দেশের জনগণকে দুটো শিবিরে বিভাজিত করতে চায় — হয় আপনি ইসলামিস্ট, অথবা আপনি ইসলামোফোবিক। কিন্তু নিবন্ধকারের বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদী আস্ফালন বা মধ্যযুগীয় বর্বরতা — কোনোটাই শেষ কথা বলবে না। না ভারতে, না আফগানিস্তানে। শেষ কথা বলবে পৃথিবীর মেহনতী জনগণ।

Leave a Reply