২০০ আসন জিতে ‘সোনার বাংলা’ তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি খুব খারাপ ফলও করেনি। সাতাত্তর আসনে জয়, অধিকাংশ আসনে দ্বিতীয়। বাম-কংগ্রেসকে মুছে দিয়ে বিরোধী রাজনীতির প্রায় সবটুকু পরিসর দখল। সর্বোপরি, নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দেওয়া। কিন্তু কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের আগে কার্যত ‘উধাও’ বঙ্গ বিজেপি।

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে শোনা যাচ্ছে বিজেপি প্রার্থীদের হাহাকার। প্রচারে বেরোতেই পারছেন না অনেকে। কারণ, কর্মী নেই। এজেন্সিকে পয়সা দিয়ে পোস্টার, ব্যানার লাগানো হচ্ছে বটে, কিন্তু বাড়ি বাড়ি যাওয়ার লোক জুটছে না। দক্ষিণ কলকাতার এক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, ৫০০ টাকা দিয়ে দিন প্রতি ‘কর্মী’ ভাড়া করতে হচ্ছে। একটি ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থীর স্ত্রী আবার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর হয়ে প্রচার করছেন। কার্যত দেখাই যাচ্ছে না হেভিওয়েট বিজেপি নেতাদের। পুরভোটের আগে শেষ রবিবার খানিকটা মাঠে নেমেছেন দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারীরা। কোনও মেয়র-মুখের বালাই নেই। সর্বোপরি, কলকাতা পুরসভার সব আসনে লড়তেও পারছে না বিজেপি। দুটি ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিজেপি সূত্রের খবর, পৌরসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। একটি কলকাতা পুরসভার জন্য। তার মাথায় বসানো হয়েছিল দীনেশ ত্রিবেদীকে। সদস্য হিসাবে ছিলেন রুদ্রনীল ঘোষ, প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের মতো নেতারা। আর একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছি হাওড়ার পৌরসভা নির্বাচনের কথা ভেবে। কলকাতা পুরসভার কমিটি এখনো পর্যন্ত মাত্র একটি বৈঠক করেছে। ওই কমিটির সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ নেই প্রার্থী এবং মুখ্য নির্বাচনী এজেন্টদের। আর হাওড়া পুরসভার অবস্থা আরও সরেস। কমিটিতে শুভেন্দু অধিকারীর লোকজনের প্রাধান্যের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন হাওড়ার পুরনো আরএসএসপন্থী নেতাদের একাংশ। তাঁদের তড়িঘড়ি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

রবিবার রাজ্য বিজেপির সদর দফতর মুরলীধর সেন লেনের মুখের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, এক প্রভাবশালী নেতা দফতরে ঢুকছেন। একদা রাজ্যের প্রথম সারির ওই নেতা রাজ্য বিজেপির অন্দরে দিলীপ ঘোষের উত্থানের পর অনেকটাই কোণঠাসা। শুনশান পার্টি অফিসে বসে তিনি কলকাতা পুরসভায় বিজেপির সম্ভাবনাময় আসনগুলির হিসাব দিলেন। কুল্লে চারটি আসনে বিজেপি জয় প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করছে। বড়বাজারের তিনটি আসনে এগিয়ে রয়েছে গেরুয়া শিবির। রাজ্যে বিজেপির প্রভাব বলতে যখন কিছুই ছিল না, তখন থেকেই অধিকাংশ পুরভোটে ওই তিনটি আসনে বিজেপি জিতে আসছে। চতুর্থ আসনটি শিয়ালদার কাছে, যেখানে প্রার্থী হয়েছেন সজল ঘোষ। বস্তুত, তৃণমূলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের মধ্যে এই ওয়ার্ডটির লড়াই সম্ভবত সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক।

সজল ঘোষের বাবা প্রদীপ ঘোষ এককালের দাপুটে কংগ্রেস নেতা, দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর। সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারের পুজোর কর্ণধার। তাঁর ছেলে সজল এলাকায় ডাকাবুকো ছাত্র পরিষদ নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সিটি কলেজ নিয়ন্ত্রণ করতেন একদা। এরপর বাবার সঙ্গেই যোগ দেন বিজেপিতে। সম্প্রতি তাঁকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সেই ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। শুভেন্দু অধিকারীর মতো সজলও দ্রুত আয়ত্ত করে নিয়েছেন বিজেপির শব্দসম্ভার। এই বছর সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বিবিধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

এর বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি অবাঙালি প্রধান ওয়ার্ডে লড়াইয়ে আছে বিজেপি। ভবানীপুরের একটি ওয়ার্ড যেমন। তৃণমূলের এক দাপুটে নেতা নির্দল হয়ে লড়ছেন সেখানে। ভোট কাটাকুটিতে জেতার আশা করছে বিজেপি। ২০১৫ সালে ওই ওয়ার্ডে বিজেপি জয়ী হয়েছিল। সেই জয়ী প্রার্থীই অবশ্য এবার জোড়া ফুলের হয়ে লড়ছেন।

কিন্তু কেন এমন অবস্থা? মাত্র সাত মাসে বঙ্গ বিজেপির এমন বেহাল দশা কেন হল?

আরএসএস এবং বিজেপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে চুম্বকে কয়েকটি বিষয় উঠে আসছে।

প্রথমত, কলকাতা তৃণমূলের দুর্গ। এখানে খুব ভাল ফলের আশা গেরুয়া শিবিরের কেউই করছেন না। দিল্লির নেতারাও কলকাতার পৌর নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী নন। পরিকাঠামোগত যে সাহায্য আসার কথা, তাতেও ভাঁটা পড়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপির তেমন কোনো সংগঠন ছিল না। কিন্তু এই ‘পরিকাঠামোগত সাহায্য’ বিজেপিকে প্রধান বিরোধী করে তুলেছিল। এবার সেইসবের বালাই নেই। প্রার্থীদের কার্যত নিজেদের জোরে লড়তে হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বঙ্গ বিজেপি একটি ‘মন্থন প্রক্রিয়ার’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলায় আগামীর রণনীতি কী হবে তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। আরএসএস নেতৃত্ব নব্য বিজেপিদের নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক খোলনলচে বদলে ফেলেছে আরএসএস। এই বদলের বিষয়ে বিজেপির অধিকাংশ রাজ্য নেতা ওয়াকিবহাল নন। কার্যত স্বাধীনভাবে বাংলায় নিজেদের সামাজিক ভিত্তিকে আরো দৃঢ় করতে চাইছে সংঘ। ফলে বিজেপি খানিকটা দিশাহারা।

তৃতীয়ত, বিধানসভা নির্বাচনের পরে রাজ্য বিজেপির ফাটল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বহুচর্চিত। বস্তুত, এই মুহূর্তে বিজেপি তিনটি সমান্তরাল ও পরস্পরবিরোধী কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হচ্ছে। দিল্লির সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অনুগামীরাই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয়। দলীয় সমীকরণে খানিকটা কোণঠাসা দিলীপ ঘোষ। তাঁর সঙ্গে থাকা আদি বিজেপির কর্মীরাও অনেকে নিষ্ক্রিয়। তৃতীয় অংশটি নতুন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের অনুগামী। সুকান্তবাবুর বয়স কম, উচ্চশিক্ষিত, উদ্যমী। কিন্তু ঘটনা হল, উত্তরবঙ্গের এই সাংসদের নাম বিজেপির অনেক কর্মীই জানেন না।

চতুর্থত, মুরলীধর সেন লেনের অন্দরে চূড়ান্ত অবিশ্বাসের আবহ তৈরি হয়েছে। একটি ঘটনার কথা বললে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। গত দোসরা ডিসেম্বর দলের দফতরে দুই শীর্ষ নেতার কথোপকথনে উত্তরবঙ্গের এক বিধায়কের প্রসঙ্গ ওঠে। দুজনের কেউই নিশ্চিত ছিলেন না ওই বিধায়কের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কী। এইরকম ঘটনা এখন এতই স্বাভাবিক এবং প্রাত্যহিকতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে সাংবাদিকদের সামনেও নেতাদের একাংশ নিজেদের সংশয় প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না। এরমধ্যেই উত্তর ২৪ পরগনার এক বাহুবলী সাংসদকে নিয়েও জল্পনা চলছে। শোনা যাচ্ছে, তিনিও নাকি কেন্দ্রীয় বিজেপির তৃণমূলের প্রতি ‘নরম নীতি’তে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। গত মাসখানেক কার্যত নিষ্ক্রিয় তিনি। কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে নিজের নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

কলকাতা পুরসভায় ১১ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে তৃণমূল। কিছু কসমেটিক উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাগরিকদের ক্ষোভও বিপুল। জল জমা থেকে শুরু করে বস্তির অনুন্নয়ন — সমস্যা তো কম নেই। কিন্তু নিজেদের সাংসারিক অশান্তিতে জেরবার বিজেপি কার্যত দর্শকের ভূমিকায়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.