কনট প্লেসের হ্যামিলটন হাউসের কাছে ফুটপাথে বই বিক্রি করেন যে ভদ্রলোক, ওঁকে আমি বহু বছর ধরে চিনি। আমি ডাকি ‘জৈন সাব’ বলে। ওঁর বইয়ের সংগ্রহ বেশ ভাল আর দামের ব্যাপারে ভাল ছাড়-টাড়ও দেন। সেদিন আমাকে একটি বই দিতে চাইছিলেন খুব শস্তায়। বললেন “এই বইটার ভাল চাহিদা আছে।”

আমার হাতে একখানা কপি দিতে দেখলাম বইটি হল Why I Assassinated Gandhi? (কেন আমি গান্ধীকে হত্যা করেছি?), নাথুরাম গডসের লেখা। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দিল্লিতে এক আততায়ীর বুলেটে প্রাণত্যাগ করার ১৩ বছর পরে আমার জন্ম। তবু আমি ওই তেজস্বী মানুষটির সাথে জোরালো বন্ধন অনুভব করেই বেড়ে উঠেছি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমি বেড়ে ওঠার দিনগুলো দেশের রাজধানীর এমন এক এলাকায় কাটিয়েছি, যার প্রত্যেকটি ইঞ্চিতে মহাত্মা গান্ধীর পদচিহ্ন রয়েছে। গোল মার্কেটের কাছে মন্দির মার্গে (আগে নাম ছিল রিডিং রোড) রাইসিনা বেঙ্গলি স্কুলে আমি পড়তাম। ওখানে আমার ডানদিকে গান্ধী, বাঁদিকে গান্ধী, সামনে গান্ধী, এমনকি স্কুলের পিছন দিকেও গান্ধী। ওই জায়গাটিতে গান্ধীকে বাদ দিয়ে বাঁচা অসম্ভব।

আমার স্কুলের বিশাল সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় বাঁদিকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে দেখা যায় বাল্মীকি মন্দির। সেখানে গান্ধী ছিলেন এপ্রিল ১, ১৯৪৬ থেকে জুন ১০, ১৯৪৭। এর আশপাশের এলাকায় থাকতে “হরিজন”-রা। গান্ধী ইচ্ছা করেই ওখানে থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ওখানকার শিশুদের নিয়মিত পড়াতেনও।

গান্ধী এত নিষ্ঠাবান শিক্ষক ছিলেন যে তাঁর অস্থায়ী স্কুলের ছাত্রসংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল। পাহাড়গঞ্জ আর আরউইন রোডের মত দূর দূর থেকেও ছেলেমেয়েরা ওঁর সকালের ক্লাস করতে আসত। বেলা গড়ালে গান্ধী ওই একই জায়গায় লর্ড মাউন্টব্যাটেন, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গফফুর খান এবং অন্যান্য শীর্ষনেতাদের সাথে দেখা করতেন।

স্কুলজীবনে আমরা প্রায়ই বাল্মীকি মন্দিরের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতাম। কখনো বা অকারণেই ভিতরে ঢুকে পড়তাম। তখনো আমাদের ইতিহাসের সচেতন ছাত্র হওয়ার বয়স হয়নি। কিন্তু আমরা জানতাম যে একজন মহান মানুষ এই অখ্যাত মন্দিরের চারপাশে তাঁর চিহ্ন রেখে গেছেন।

এই গল্পের অন্য একটি দিকও আছে। ওই মন্দির মার্গেই আমি একবার একজন মানুষকে হাঁটতে দেখেছিলাম। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের সেই লোকটির চেহারায় তেমন কোনো বিশেষত্ব ছিল না। কিন্তু একজন সিনিয়র ছাত্র আমাদের বলে দিয়েছিল মানুষটি কে। গোপাল গডসে, নাথুরামের ছোট ভাই। ইনিও গান্ধীহত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী; বহু বছর জেলে কাটিয়েছেন।

সেইসময় উনি সম্ভবত হিন্দু মহাসভাতে থাকতেন। জায়গাটা আমাদের স্কুলের ডানদিকে ৫০০ গজ দূরে। আমার এখনো মনে আছে, লোকটির পরিচয় জানা মাত্রই আমি রাস্তার অন্য প্রান্তে সরে গিয়েছিলাম। এখনো ঠিক বলতে পারব না কেন ওরকম করেছিলাম।

হিন্দু মহাসভার পাশেই হারকোর্ট বাটলার স্কুল। তারপরেই বিশালকায় লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, যাকে সবাই বিড়লা মন্দির বলে। সেখানেও গান্ধীর ছোঁয়া আছে। উনি ১৯৩৯ সালে ওই মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করতে রাজি হন একটি শর্তে — সমস্ত বর্ণের মানুষকেই মন্দিরে ঢুকতে দিতে হবে।

স্কুলে পড়ার সময়ে সেই মন্দিরেও আমরা প্রায়ই যেতাম। প্রার্থনা করতে নয়, লুকোচুরি খেলতে। ওই মন্দিরের বিরাট বাগানের কৃত্রিম গুহাগুলো লুকোচুরি খেলার পক্ষে আদর্শ।

মন্দির মার্গে যেন স্কুল আর মন্দিরের মেলা। ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা আর তামিল মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের স্কুল। মা কালীর মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির, লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির, বাল্মীকির মন্দির ইত্যাদি। এককথায় ভারততীর্থ। এই অট্টালিকাগুলোর পিছনেই সেন্ট্রাল রিজ রিজার্ভ ফরেস্ট।

১৯৬০, ৭০-এর দশকে রিজে ঢোকা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আমরা প্রায়ই করোলবাগ যেতে হলে ওই রিজের মধ্যে দিয়ে যেতাম। এক মাস্টারমশাই আমাদের বলেছিলেন যে ইতালিয়ান বেরেত্তা M1934 সেমি-অটোম্যাটিক পিস্তল দিয়ে জাতির জনককে হত্যা করা হয়েছিল, সেটি আমাদের স্কুলের পিছনের জনবসতিহীন রিজ ফরেস্টেই পরখ করে নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু আসল ষড়যন্ত্র ওখানে বসে হয়নি। আমাদের স্কুলের সামনের রাস্তা সোজা কনট প্লেসে গিয়ে পৌঁছেছে, দূরত্ব দু কিলোমিটারেরও কম। ওই পথের শেষেই হল আইকনিক র‍্যাডিসন ব্লু মেরিনা হোটেল, যার তখন নাম ছিল মেরিনা হোটেল। এই হোটেলেই ১৯৪৮ সালের ২০শে জানুয়ারি নাথুরাম গডসে আর নারায়ণ আপ্তে ১০ দিন পরে যে ভয়ানক ঘটনাটি ঘটানো হবে, তার নিপুণ ছকটি কষেছিলেন।

Gandhi’s Delhi (গান্ধীর দিল্লি) নামক অসামান্য বইটির লেখক বিবেক শুক্লার কথা অনুযায়ী, বাপু কখনো কনট প্লেসে যাননি। কিন্তু তিনি যখন ভারত ছাড়ো আন্দোলন ঘোষণা করলেন, তখন আন্দোলনকারীরা বহু ব্রিটিশ মালিকানাধীন দোকানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

যাঁরা দিল্লির বাসিন্দা এবং এখনো ঘৃণায় পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ড করা সোশাল মিডিয়া মেসেজে নয়, ইতিহাসে বিশ্বাস করেন; তাঁদের জন্য শুক্লার বইটি অবশ্যপাঠ্য।

আমাকে সেদিন যখন জৈন সাব গডসের লেখা বইটি কিনব কিনা জিজ্ঞেস করলেন, আমি গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়েছিলাম। একটিও কথা না বলে বইটি ফিরিয়ে দিয়ে মেরি হিগিন্স ক্লার্কের লেখা একটি রুদ্ধশ্বাস উপন্যাস কিনেছিলাম। উনি আমার প্রিয় আমেরিকান থ্রিলার লেখকদের অন্যতম। তারপর যা কেনাকাটা হল, তাতে সন্তুষ্ট হয়ে হেঁটে পার্লামেন্ট স্ট্রিটে আমার অফিসে ফিরে গিয়েছিলাম।

মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে প্রকাশিত এই লেখাটি লেখকের অনুমতিক্রমে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে পুনঃপ্রকাশ করা হল।

Leave a Reply