এক সিপিআই কর্মী, ছেলেটিকে চিনি, এক জায়গায় মন্তব্য করেছে যে আনিসকে তারা তাদের হাওড়ার পার্টি অফিসে থাকার কথা বলেছিল। আনিস শোনেনি, শুনলে হয়ত এই বিপদটা হত না।

যদি ধরে নেওয়া যায় কথাটা সত‍্যি, তারপরেও যে প্রশ্নটা আসে তা হল কেন শোনেনি আনিস? তার কি মৃত‍্যুভয় ছিল না? যদি না থাকে, তবে এক বছর আগে অমন কাতরভাবে নিজের আর পরিবারের জন্য প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিল কেন? পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছে অথচ তথাকথিত প্রগতিশীল সংগঠন আশ্রয় দিতে চাইলে নিচ্ছে না। আনিস কি তবে দ্বিচারী ছিল?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দ্বিচারী তো বটেই।

একটি ছেলে সিপিআইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখছে, সিপিএমের ব্রিগেডে যাচ্ছে, কলকাতার স্বাধীন কলরবপন্থী সংগঠনগুলোর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আলিয়ার ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে, আইএসএফের সাথে সম্পর্কে যাচ্ছে, এলাকায় জনস্বাস্থ‍্য আন্দোলনে উদ্যোগ নিচ্ছে, ‘নো ভোট টু’-র মিছিলে গিয়ে জোর গলায় বলছে বিজেপি-তৃণমূল-মোর্চা কাউকেই চাই না, চাই বিপ্লবী ঐক‍্য। এতগুলো এজেন্সি নিচ্ছে একটা আঠাশ বছরের ছেলে। কীভাবে সম্ভব যদি ছেলেটি দ্বিচারী না হয়?প্রতিটা অবস্থানেই তো রয়েছে স্ববিরোধিতা।

কই আমাদের তো স্ববিরোধিতা নেই!

আমরা তো পলিটিকালি কারেক্ট থাকার জন্য প্রাণপাত করে ফেলতে পারি। নিজের থেকেও প্রাণপ্রিয় পার্টিকে চোখের মণি করে তোলার জন্য হাঁটতে পারি যোজন মাইল, সংগঠন অন্যায় করছে জেনেও ধামাচাপা দিতে পারি সমস্ত রাগ আর ক্ষোভ, নিজেকে সঠিক আর পার্টিনিষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনে বিরুদ্ধাচরণ করতে পারি মানুষের, গড়ে তুলতে পারি গ্রুপ-সেমিগ্রুপ-সিকি গ্রুপ নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য, কই আনিস কি এগুলো করতে পারত না? একটা কোনো সংগঠনে তো যোগ দিতে পারতিস ভাই আনিস আমার। তাহলে তোর মৃত‍্যুর পর সবাই মিলে পথে নামার দায় থেকে তো অন্তত বেঁচে যেতাম। যেভাবে খুব সহজেই অনাক্রান্ত হতে পারি অন্য সংগঠন বা সেই সংগঠনের সাথে যুক্ত মানুষরা আক্রান্ত হলে, চুপ থাকতে পারি, প্রতিবাদ করতে পারি বেছে বেছে। রাজনৈতিকভাবে স্ববিরোধী না হয়ে এই সুযোগটা কি আমাদের একান্তই দিতে পারত না আনিস?

বোধহয় পারত না।

কারণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের সাহচর্যে কাটালেও নির্দিষ্ট কোনো দলীয় অবস্থান ওর ছিল না। জীবিত আনিস কোনো দলবৃত্তে পড়েনি। কিন্তু কী পরিহাস! মৃত আনিস সেই ঘূর্ণিপাকেই পড়ে গেল।

যে উলুবেড়িয়া হাসপাতালে আনিসের শরীরটা আনা হয়েছিল, সেই উলুবেড়িয়া স্টেশন থেকে নেমে দুশো মিটার একদিন হেঁটে দেখবেন কখনো। ওই অপ্রশস্ত এলাকাটুকুর মধ্যেই শ খানেক নার্সিংহোম আর প্রাইভেট হাসপাতাল। অথচ ব্লকের প্রাথমিক স্বাস্থ‍্যকেন্দ্রগুলোতে যান, অক্সিজেন সিলিন্ডারটুকু পর্যন্ত নেই। জনস্বাস্থ‍্যের নামে কর্পোরেটের এই ব্যবসাকে ধাক্কা দিতে চেয়েছিল আনিস। সেজন্যই মানুষকে সংগঠিত করা, রক্তদান শিবির ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। শাসক দলের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, আন্দোলন হলে আন্দোলনের জল কোনদিকে গড়াবে।

আন্দোলনের প্রতি সৎ ছিল আনিস। তাই যেখানে মনে করত নতুন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানেই ছুটে যেত। বারবার বিফলমনোরথ হয়েও ছেলেটা থেমে যায়নি, আবার ছুটেছে। ভুলে গেছে যে ও সংখ্যালঘু পরিবার থেকে উঠে আসা। ভুলে গেছে উত্তরপ্রদেশ, বাংলা সবজায়গাতেই সংখ্যালঘুর জীবনের দাম কম। ভুলে গেছে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো একক লড়াই আসলে দাঁড়ায় না, বরুণ বিশ্বাস হতে হয়।

যদি আমাদের এই মৃত‍্যু থেকে কিছু শেখার থাকে, তা বোধহয় এটাই, যে কেন আনিসদের একা চলতে হয়, কেন স্ববিরোধী হতে হয় নিজের প্রাণের আগুনটুকু বাঁচিয়ে রাখবে বলে। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে আজ কি আমরা দেখতে পাই না এমনই লক্ষ লক্ষ আনিস? কোনো দলীয় বৃত্তের মধ্যে না দাঁড়িয়ে যারা হেঁটে চলেছে নিজের অধিকারে, গণতন্ত্রের দাবিতে? সেই এগিয়ে থাকা আনিসদের থেকে অনেক পিছনে পড়ে আছে দলগুলো; যাদের পতাকায় লেখা স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব-সমাজতন্ত্র ইত‍্যাদি।

আনিস গণতন্ত্রের মুখ।

বিশ্বাস করি, আনিসের মৃত‍্যু বৃথা যাবে না। আজ না হোক কাল, খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে একদিন উঠে দাঁড়াবেই হাজার হাজার আনিস।

কারণ আনিসরা রাস্তা খুঁজছে। বিভ্রান্তি আর দিশাহীনতার জমিতে দাঁড়িয়ে খুঁজছে নতুন পথ। কারণ সমস্ত চলতি পথ বাতিল হয়ে গেছে। এই লক্ষ লক্ষ আনিস পথের খোঁজে বেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো দলীয় পতাকায় সমাবেশিত হবে না। এই ‘একক’ আনিসরাই গড়ে তুলবে নতুন দল। সেটাই এখন দেখার।

মতামত ব্যক্তিগত

আরও পড়ুন

আনিস খান হত্যা: যেটুকু জানি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.