এ কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে মহামান্য কর্ণাটক হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলা — ‘শ্রীমতি রেশম অ্যান্ড অ্যানাদার ভার্সেস স্টেট অফ কর্ণাটক অ্যান্ড আদার্স’, ভারতীয় বিচারব্যবস্থার আরেকটি পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। অদূর অতীতে আমরা দেখেছি যে, বিশ্বাসের ভিত্তিতে কীভাবে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে বাবরি মসজিদ এবং রাম জন্মভূমি সংক্রান্ত বিবাদের নিষ্পত্তি হয়েছিল। আমরা এ-ও দেখেছি, যে বিগত কয়েক বছরে, একের পর এক মামলায়, ‘রাইট টু প্রাইভেসি’, ‘ডিক্রিমিনালাইজেশন অফ কনসেনসুয়াল হোমোসেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’, ‘রাইট অফ পার্সোনাল লিবার্টি’ ইত্যাদি নানা বিতর্কিত বা বহুচর্চিত বিষয়ে, একের পর এক ঐতিহাসিক রায় দান করেছেন মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। একথা অনস্বীকার্য যে, আলোচ্য বিষয় যতই বিতর্কিত হোক না কেন, সেটা যদি সংবিধানের প্রশ্ন হয়, তাহলে তার নিষ্পত্তি করেছে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। তাৎক্ষণিক তিন তালাক থেকে শুরু করে, শবরিমালা মন্দিরে প্রবেশের অধিকার — উদাহরণ অসংখ্য। একের পর এক এই ধরনের মামলার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেখানে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট, কখনো সুও মোটো, কখনো কোনো আবেদনের ভিত্তিতে আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের সীমানা নির্ধারণ করেছে। অ্যাকাডেমিয়ার বন্ধুরা কখনো এই প্রবণতাকে ‘জুডিসিয়াল অ্যাক্টিভিজম’ বলছেন, আবার কখনো বলছেন ‘প্রগতিশীল’। সবটাই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। বক্তব্য এইটুকুই যে, বিগত কিছু বছর ধরে, ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ক্রমাগত এমন অনেক রায় দিয়ে চলেছে যেগুলো সমস্ত ভারতীয়দের সাংবিধানিক অধিকারের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত, এবং সেসব নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বহুবিধ বিতর্কের পরেও, সেই সমস্ত বিতর্ককে উপেক্ষা করেই নিজের কাজ করে চলেছে বিচারব্যবস্থা। এই ‘শ্রীমতি রেশম অ্যান্ড অ্যানাদার ভার্সেস স্টেট অফ কর্ণাটক অ্যান্ড আদার্স’ মামলা সম্ভবত এগোতে চলেছে সেই একই পথে।

মামলার কথা শুরু করার আগে যদি আমরা ঘটনাপ্রবাহ একটু স্মরণ করে নিই, তাহলে আলোচনার সুবিধা হয়। গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে, কিছুটা যেন হঠাৎ করেই, কর্ণাটকের উদুপিতে একটি সরকারি কলেজে কিছু মুসলিম ছাত্রীকে হিজাব পরা অবস্থায় কলেজে ঢোকার সময় বাধা দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, হিজাব একটি ধর্মীয় পোশাক, যার কোনো প্রয়োজন শিক্ষা ক্ষেত্রে থাকতে পারে না, এবং কলেজে আসতে গেলে কর্তৃপক্ষের ঠিক করে দেওয়া পোশাক পরেই আসতে হবে। সেই নিয়ে প্রথম অভিযোগ ওঠে এ বছরের প্রথম দিন। প্রথমে সেরকম হৈ চৈ না হলেও, আস্তে আস্তে এই খবর এবং এই সংক্রান্ত বিতর্কে সমর্থন ও বিরোধিতায় মুখর হয়ে ওঠে কর্ণাটকের রাজনীতি। অল্পদিনেই একই ঘটনা ঘটে আশপাশের আরও কয়েকটি কলেজে এবং দেখা যায়, হিজাবই যেন শিক্ষাক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রথা পালনের একমাত্র উদাহরণ হিসাবে ক্রমাগত গণ্য হয়ে চলেছে। কিন্তু মুসলিম ছাত্রীরা অনেকে যেমন হিজাব পরে, মুসলিম ছাত্রদের অনেকে হয়ত ফেজ টুপি পরে। হিন্দু ছাত্রদের আবার আছে, পৈতে বা তিলক। এই সমস্ত ধর্মপালনের চিহ্ন চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল কর্তৃপক্ষের। তাদের এক এবং একমাত্র সমস্যা, কোনো অজ্ঞাত কারণে, হিজাব। অতএব মুসলিম ছাত্রীরা কিছুটা জেদের বসেই হিজাব পরে কলেজে যাওয়া বন্ধ করছিলেন না। একই সঙ্গে বাড়ছিল হিজাব পরা ছাত্রীদের ঘিরে ধরে, হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা ছাত্রদের হুমকি, চিৎকার, স্লোগান এবং হয়রানি। এর সাথে যুক্ত হয় দলিত ছাত্রদের নীল টুপি পরে কলেজে যাওয়া। মিছিল, পাল্টা মিছিল, মিটিং, পাল্টা মিটিং, প্রতিবাদ, অবরোধ ইত্যাদি বাড়তে দেখে ওইসব কলেজের কর্তৃপক্ষ কলেজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে সরকারি নির্দেশিকায় হিজাব পরে কলেজে আসা নিষিদ্ধ করা হয়। সংবাদমাধ্যমে এর নামকরণ হয় ‘হিজাব ব্যান’। এই আপাতদৃষ্টিতে সংবিধান বহির্ভূত ব্যানের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়, তাকেই এখন বলা হচ্ছে ‘হিজাব প্রোটেস্ট’। এই আন্দোলনের পুরোভাগে অবশ্যই রয়েছেন ছাত্রীরা, এবং তাঁরা বলছেন “হিজাব আমার পছন্দ”, বা “হিজাব ইস মাই চয়েস”। এই বক্তব্যের সমস্যা আমরা জানি। হিজাব কেন, সামাজিক কোনো রকম বিধিনিষেধই কারোর পছন্দ বা চয়েস হতে পারে না। কিন্তু, এই আলোচনায় সেটা প্রাসঙ্গিক নয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এর মাঝে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায় একটি ভিডিও, যেখানে একজন হিজাব পরা ছাত্রীকে ঘিরে ধরে স্লোগান দিচ্ছে একদল গেরুয়া পোশাক পরা ছাত্র। আর সেই ছাত্রী, মুসকান খান, তার প্রতিবাদে পাল্টা “আল্লাহু আকবর” বলছেন। অনেকটা যেন ওই গানটার মতন “উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায়/বন্দিনী এক বাঘিনী চিতা/চিড়িয়াখানায় অসহায় তবু/উঠে দাঁড়ানোয় অপরাজিতা”। এই ভিডিওর সূত্রেই সারা ভারতের সংবাদমাধ্যমে একেবারে সামনের সারিতে চলে আসে ‘হিজাব প্রোটেস্ট’। কলেজে ঢুকতে বাধাপ্রাপ্ত কিছু ছাত্রী মহামান্য কর্ণাটক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আমাদের সংবিধানের ২২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কোর্টের কাছে তাঁরা তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার, ‘রাইট টু এডুকেশন’ এবং ‘রাইট টু প্রফেস, প্রোপাগেট, এন্ড প্র্যাকটিস রিলিজিয়ন’ কে সুনিশ্চিত করার আবেদন করেন। সেই মামলা প্রথমে সিঙ্গল বেঞ্চে বিচার্য হলেও, মহামান্য আদালত সিদ্ধান্ত নেয় উচ্চতর বেঞ্চ, বা তিনজন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হবে। সেখান থেকে শুরু হয় এই ‘শ্রীমতি রেশম অ্যান্ড অ্যানাদার ভার্সেস স্টেট অফ কর্ণাটক এন্ড আদার্স’। এই মামলায় বিচার্য বিষয় আদতে একটিই। তা হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ধর্মাবলম্বী ছাত্রীরা তাদের পছন্দের পোশাক, যা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ — হিজাব — পরে আসতে পারবে কিনা।

শুরুর আগেও তো কিছু কথা থেকে যায়। যেমন আমরা যারা স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছি, বিশেষ কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনো, খেলাধুলো, রাজনীতি, গানবাজনা ইত্যাদি সমস্ত কিছু করার সুযোগ পেয়েছি, তাদের পক্ষে খুব কঠিন নয় এটা জানা বা বোঝা যে, এর বাইরেও একটা বিরাট সমাজ রয়েছে যেখানে ছাত্রীদের স্কুল বা কলেজে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ধর্মের বিভেদ ভুলে, এক বিরাট ভারতবর্ষ, এই একটি বিশেষ ক্ষেত্রে এক হয়ে যায়। যেখানে ওই অনুমতিটুকু মেলে, সেখানেও চলে আসে পোশাকের বিধিনিষেধ। অবশ্য হিজাব মুসলিম মহিলাদের সামাজিক বিধিনিষেধের একটি অংশ হওয়ার সাথে সাথে, ইসলাম ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়। ২০১৬ সালেই মহামান্য কেরালা হাইকোর্ট হিজাবকে এই স্বীকৃতি দিয়েছিল কোরান এবং হাদিশের নানাবিধ বিশ্লেষণের পর। কিন্তু তা ছাড়াও, মেয়েদের ক্ষেত্রে পোষাকের বিধিনিষেধ দুনিয়ার কোথাও নতুন ব্যাপার নয়। কোথাও ঘোমটা, কোথাও বোরখা, আবার কোথাও লং ট্রাউজার ও লং স্লিভস। শুধু স্বাধীনতার আস্বাদ পেতে, এই সমস্ত নিষেধ মেনে নিয়েই বহু ছাত্রী স্কুল কলেজে পড়তে আসে আমাদের দেশে। আজ থেকে একশো বছর আগে সমাজের তথাকথিত শালীনতা মেনে নিয়ে, অবরোধ উপেক্ষা করে, গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই ধরনের ছাত্রীদের সাহস জুগিয়ে, হাতে বই তুলে দিয়ে, স্কুলে নাম লিখিয়ে, বিজ্ঞান পড়তে শিখিয়ে, এইভাবেই লড়াই করেছিলেন একজন বেগম রোকেয়া, বা একজন সাবিত্রীবাই ফুলে। একশো বছর পরেও সামাজিক বিধিনিষেধ বা অবরোধ কিছুমাত্র না কমলেও, শুধু একটি ধর্মাবলম্বী ছাত্রীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় পোশাককে নিষিদ্ধ করার অর্থ, সরাসরি তাদের সংবিধান স্বীকৃত শিক্ষার অধিকারকে আক্রমণ করা।

শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের সর্বত্রই নিজ ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে, একটি সাংবিধানিক অধিকার হিসাবেই। আমাদের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে এই অধিকার স্বীকৃত। এর সাথে অবশ্যই রয়েছে কিছু বিশেষ বিধিনিষেধ, যেমন স্বাস্থ্য বা নৈতিকতার প্রশ্নে, বা কোনো বিশেষ প্রয়োজনে, এই অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে সরকার। যেমন ‘চার্চ অফ গড ইন ইন্ডিয়া ভার্সেস কে কে আর ম্যাজেস্টিক কলোনি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ মামলায় শব্দদূষণের কারণে চার্চের অবাধ ধর্মাচরণের অধিকারে হস্তক্ষেপকে সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েছিলেন মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু এরকম বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ভারতবর্ষের কোনো নাগরিকের ধর্মপালন এবং প্রচারে রাষ্ট্র কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আমাদের দেশের সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার সূত্রানুযায়ী এ দেশে সকল ধর্মালম্বী মানুষের নিজ ধর্ম পালনের সমান অধিকার রয়েছে। শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যেমন কোনো পরিস্থিতিতেই পারে না তার পাগড়ি পরার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে, ঠিক তেমনটাই হওয়ার কথা হিজাব, ফেজ টুপি ইত্যাদি ইসলামিক আচারের ক্ষেত্রেও, সেগুলো উক্ত ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হোক বা না হোক।

এমতাবস্থায় আমাদের আলোচ্য এই ‘শ্রীমতি রেশম অ্যান্ড অ্যানাদার ভার্সেস স্টেট অফ কর্ণাটক অ্যান্ড আদার্স’ মামলায় মহামান্য কর্ণাটক হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের সামনে শুনানির প্রথম দিনে, অর্থাৎ গত ১০ ফেব্রুয়ারি, মহামান্য আদালত অন্তর্বর্তীকালীন রায় হিসাবে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে এবং সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে অবিলম্বে কলেজে ফিরতে দেওয়ার জন্য সরকার ও অন্যান্য সমস্ত আগ্রহী ব্যক্তি এবং সংস্থাকে অনুরোধ করে। এর সঙ্গে মহামান্য আদালত এই শুনানি চলাকালীন সমস্ত ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদেরই গেরুয়া বস্ত্র, স্কার্ফ, হিজাব, ধর্মীয় পতাকা ইত্যাদি কোনোকিছু পরে ক্লাসরুমে না ঢোকার নির্দেশও দেয়। একই সাথে ওই একই রায়ে, মহামান্য আদালত এটাও স্পষ্ট করে দেয় যে, এই রায় শুধু মাত্র সেই কলেজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেখানে কলেজ কর্তৃপক্ষের তৈরি ড্রেসকোড বা ইউনিফর্ম রয়েছে।

এই মামলার শুনানি এখনো চলছে এবং সম্ভবত এই মামলার ইতি এখানে টানা যাবে না। আমার ধারণা, এই মামলা পৌঁছবে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে, যেখানে ভারতবর্ষের সমস্ত নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের সাংবিধানিক অধিকার বিচার করবেন মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত। এখানে বলা প্রয়োজন, ড্রেসকোড বা ইউনিফর্মের নিয়ম আছে এমন সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে বহিরঙ্গে অন্যান্য ধর্মীয় পোশাক পরে ক্লাসরুমের মধ্যে ঢোকার সেভাবে প্রয়োজন আমি দেখি না। উপরন্তু যে ছাত্রছাত্রী ওই কলেজে পড়ছেন, তিনি কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়েই এই নিয়ম মেনে নিয়েছন এমনটা ধরে নেওয়াই যায়। সে অর্থে, সাধারণ দৃষ্টিতে, এই অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এতে প্রশ্ন ওঠা থামছে না।

আদালতের রায় সাধারণভাবে, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে, কে ভুল আর কে ঠিক, তা নির্ধারণ করার জন্য হয়। অর্থাৎ কোনো ভুল কাজের বিরুদ্ধে, এবং সেটার সংশোধনের পক্ষে রায় দেওয়াই আদালতের লক্ষ্য হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় আদতে একটিই হলেও আবেদনকারী ছাত্রীদের অভিযোগ ছিল দুটি। এক, হিজাব মুসলিম ধর্মাবলম্বী মহিলাদের জন্য একটি অপরিহার্য ধর্মীয় পোশাক এবং যেহেতু ধর্মপালনের অধিকার প্রতিটি মানুষের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, তাই সেই পোশাক পরে কলেজে যাওয়া যাবে না, এমন কোনো নিয়ম তৈরি হলে সেটা সংবিধান বিরোধী। দুই, এই পোশাক পরে কলেজে যাওয়া ছাত্রীদের হেনস্থা করছে হিন্দু ধর্মের কিছু ছাত্র, যাদের ওই পোশাক বা কলেজের নিয়ম তৈরির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। এই দুটি অভিযোগের বিচার করতে বসে অন্তর্বর্তীকালীন রায় হিসেবে উপরোক্ত যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে যুক্তির থেকেও সকল বিবদমান পক্ষকে সন্তুষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। কারণ কোর্টের কাছে হিজাবের ব্যান চেয়ে কোনো মামলা বা আবেদন তো করাই হয়নি। তাই হঠাৎ হিজাব পরার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ কীভাবে বিচার্য হল, তা নিয়েই বিতর্ক আরম্ভ হয়েছে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। যেমন কেশবানন্দ ভারতীর বিখ্যাত মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিলেন, আমাদের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মর্যাদাপূর্বক স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার। অর্থাৎ অন্যের সমস্যার কারণ না হয়ে, নিজের ইচ্ছায়, স্বাধীনভাবে, যেমন খুশি জীবনযাপনের অধিকার আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল ওই মামলায়। এর সাথে যুক্ত করা যায় ২০১৭ সালের বিখ্যাত ‘জাস্টিস কে এস পুত্তস্বামী ভার্সেস (রিটায়ার্ড) অ্যান্ড অ্যানাদার ভার্সেস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড আদার্স’ বা ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ মামলা। ওই মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা, পারিবারিক জীবন, বিবাহ, রাজনীতি, যৌন জীবন, ধর্ম, বিশ্বাস, ইত্যাদি সবই আমাদের সংবিধান স্বীকৃত গোপনীয়তার অধিকারের অংশ। অর্থাৎ যা কিছু আমাদের ব্যক্তিগত, তাতে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ আমাদের দেশের সংবিধানে নেই। স্বাভাবিকভাবেই, এই প্রেক্ষিতে হিজাব ব্যান শুধু ধর্মপালনের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ নয়, রাইট টু প্রাইভেসি, বা মুসলিম মহিলা/ছাত্রীদের পছন্দমত পোশাক পরবার ব্যক্তিগত অধিকারের উপরেও হস্তক্ষেপ।

বিতর্কের আরেকটা কারণ হল, এই ছাত্রীদের বিভিন্ন কলেজে কিছু হিন্দু ছাত্র যেভাবে হুমকি দিয়েছে বা বিরক্ত করেছে, তার কোনো বিচার এখনো হয়নি বা সেই সংক্রান্ত কোনো নির্দেশ দেননি মহামান্য আদালত। অর্থাৎ বিপন্নের সুরক্ষার দায়িত্ব সম্পর্কে কিছুটা যেন উদাসীন রয়ে গেছে আদালত। অথচ এই জাতীয় ভিডিওতে ছেয়ে গেছে ইন্টারনেট।

আমরা আশা করতে পারি, মহামান্য কর্ণাটক হাইকোর্টে শুনানির শেষে আবেদনকারী ছাত্রীদের সাংবিধানিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং কঠোরভাবে নিন্দিত হবেন সেই ছাত্ররা, যারা এই ছাত্রীদের শুধুমাত্র পোশাকের জন্য ঘেরাও, বক্রোক্তি এবং বিরক্ত করেছেন কলেজে কলেজে, রাস্তাঘাটে বা অন্যত্র। আমরা এ-ও আশা করতে পারি, পরবর্তীকালে এই মামলা মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছলে এই ছাত্রীদের অধিকারের স্বীকৃতি বহাল থাকবে। আমাদের যেন, আবার সেই একই কথা না বলতে হয়:

উপনিষদ সংস্কৃতি, কোরান হল মুসলমান,

সংস্কৃতির ধারকরা সব শান্তি মিছিলে হাঁটতে যান।

ঘোমটা তুমি সংস্কৃতি, বোরখা তুমি মুসলমান,

সংস্কৃতির ধারকরা সব গম্ভীর মুখে হাঁটতে যান।”

মতামত ব্যক্তিগত

সম্পাদকমণ্ডলীর সংযোজন: শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। কর্ণাটকের বিভিন্ন স্কুলে কলেজে ছাত্রীদের রাস্তার মধ্যেই হিজাব/বোরখা খুলে ঢুকতে বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ কেউ এই পদ্ধতির প্রতিবাদে ভিতরে না ঢুকে ফিরে যাচ্ছেন, কোনো কোনো ছাত্রী পরীক্ষা বয়কট করেছেন বলেও খবর।

আরও পড়ুন

হিজাব না হলেও হিজাবির পক্ষ নিতেই হবে আমাদের

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.