সরকারের বা রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, বাজার হবে খোলা, বাঁধনহীন, অনিয়ন্ত্রিত। যার পকেটে যত জোর, বাজারে তো তার দাপট তত বেশি। ফলে খোলা বাজার মানেই পুঁজিপতির অনিয়ন্ত্রিত দাপট। খোলা বাজারে যা যা বিকিকিনি হবে সেসবের দাম তাই ঠিক হবে তাদের খেয়ালে, তাদেরই স্বার্থে। পেট্রল ডিজেলই হোক কিংবা বাস-অটোর ভাড়া – দাম বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারে সরকার আর কোনো ভূমিকা পালন করবে না। বাজারেই ঠিক হবে দাম। বলাই বাহুল্য, বাজারে যার দাপট বেশি তারই শ্রেণিস্বার্থে ঠিক হবে দাম। পুঁজিপতির ধান্দা একটাই – মুনাফা। আরও বেশি মুনাফা। মুনাফা বাড়িয়ে নেওয়ার জন্যে দাম বাড়ানো হচ্ছে সমস্ত পণ্যের। সবকিছুর দাম বেড়ে চলেছে, শুধু শ্রমের দাম কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ মজুরি কমে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে খোলা বাজার অর্থনীতি চালু হয় তিরিশ-বত্রিশ বছর আগে। তখন থেকেই সর্বত্র স্থায়ী শ্রমিকের বদলে ঠিকা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর রমরমা। সময়ের সাথে সাথে, এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোতেও ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ বাড়তে থাকে। এই তিরিশ-বত্রিশ বছরে অনেকবার সরকার পাল্টালেও এই নীতি পাল্টায়নি। আর মোদি সরকার তো এই নীতি প্রয়োগে অতীতের যে কোনো সরকারের থেকে বেশি আগ্রাসী। শ্রম আইন পাল্টে শ্রম কোড এনে স্থায়ী চাকরি ব্যাপারটাই তুলে দিতে চাইছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই সময়কালে পুঁজিপতিরা যতদূর সম্ভব মুনাফা করার তাগিদে সরাসরি লুঠের রাস্তা নিয়েছে। সাধারণভাবে শ্রমিকশ্রেণির উপর শোষণের মাত্রা যেমন বেড়েছে, তেমনই ঠিকা শ্রমিকদের ঠেলতে ঠেলতে খাদের কিনারায় দাঁড় করানো হয়েছে। এমনিতেই স্থায়ী শ্রমিকদের চেয়ে ঠিকা শ্রমিকরা অনেক বেশি অরক্ষিত। পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইএসআই ইত্যাদি সামাজিক সুরক্ষা থেকে ঠিকা শ্রমিকরা (সাধারণভাবে) বঞ্চিত। কাজ করতে হয় একজন স্থায়ী শ্রমিকের প্রায় অর্ধেকের অর্ধেক মজুরিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটুকুও অনিয়মিত। যখন তখন ছাঁটাইয়ের ভয় তো আছেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এঁরা কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারের যৌথ শোষণের শিকার।

এই পরিস্থিতিতে আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে, আলাদা আলাদা সংস্থায়, আলাদা আলাদা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়াই করছেন। এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলকাতা কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পরিচালিত সাম্প্রতিক আন্দোলন সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলা দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে নয়।

 

কেন আন্দোলন? কীসের আন্দোলন?

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫টি হোস্টেলে রান্নাবান্না ও সাফাইয়ের কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী শ্রমিক‌। স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা হাতে গোনা। অস্থায়ী ঠিকা কর্মীর সংখ্যা দেড়শোর বেশি – ১০৩ জন রাঁধুনি, ২৯ জন হেল্পার এবং ২১ জন সাফাইকর্মী। কেউ কাজ করছেন আট বছর, কেউ ১০ বছর। কিন্তু তাঁদের স্থায়ী করার বালাই নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এঁদের দায়িত্ব নিতে চায় না। এদিকে ঠিকাদার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দেয় না, বছরের পর বছর মাইনে বাড়ায় না, ৬০০০-৭৫০০ টাকাতেই সংসার চালাতে হয়।

লকডাউনের ২১ মাস সেই মাইনেও মেলেনি। এ বছর জানুয়ারিতে হোস্টেলে পুরোদমে কাজ শুরু হওয়ার পর জানাজানি হয়, ওই ২১ মাসের মধ্যে সাত মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক কোটি টাকার বেশি অর্থ বরাদ্দ করেছে। ঠিকাদারের অ্যাকাউন্টে সে টাকা জমা পড়লেও সে শ্রমিকদের মাইনে দেয়নি। এই ঠিকাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চুক্তিবদ্ধ ২০১৮ সাল থেকে। প্রত্যেক শ্রমিকের প্রভিডেন্ট ফান্ডে যে টাকা জমা দেওয়ার কথা, সেটাও প্রায় পুরোটাই সে আত্মসাৎ করেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতদিন মুখ বুজে মেনে নিয়ে থাকলেও, এরপর কয়েকজন শ্রমিক মুখ খুলতে শুরু করেন। সেই অপরাধে তিনজন শ্রমিককে ছাঁটাই করে ঠিকাদার। এটা জানুয়ারি মাসের শেষ দিক। ফেব্রুয়ারি পড়ল, কাজ করেও জানুয়ারির মাইনে পেলেন না শ্রমিকরা। ঠিকাদারের জুলুমবাজি মাত্রা ছাড়াল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিতে নারাজ। অবস্থা এমন যে এই ঠিকা শ্রমিকরা নিজেদের দাবিদাওয়া জানাতে গেলে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যদিও CONTRACT LABOR (REGULATION AND ABOLITION) ACT, 1970-র ২১(৪) ধারায় এ কথা স্পষ্ট উল্লিখিত যে ঠিকা শ্রমিকদের ‘প্রাথমিক নিয়োগকর্তা’ (ঠিকাদার) প্রাপ্য মজুরি না দিলে ‘মূল নিয়োগকর্তা’ (যে সংস্থায় তারা কর্মরত সেই সংস্থার কর্তৃপক্ষ) তা দিতে বাধ্য থাকবেন। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের দায় এড়ানোর আইনি অবকাশ নেই। কিন্তু আইনকানুন থোড়াই কেয়ার।

এই পরিস্থিতিতে সিআইটিইউ-র কলকাতা জেলা নেতৃত্ব হস্তক্ষেপ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়, ঠিকা শ্রমিকদের আইনানুগ প্রভিডেন্ট ফান্ডের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কথা জানিয়ে শ্রম দপ্তর এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড দপ্তরেও চিঠি দেওয়া হয়। ফলে প্রভিডেন্ট ফান্ড দপ্তর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে শোকজ করে। ঠিকা শ্রমিকদের সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দীর্ঘকালীন ঔদাসীন্য কাটে, শুরু হয় ঠিকাদারকে ডাকাডাকি।

হোস্টেলগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঠিকা শ্রমিকরা এরপর সংগঠিত হতে শুরু করেন। বিচ্ছিন্নভাবে তিনজন প্রতিবাদ করে ছাঁটাই হওয়ায় শ্রমিকরা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সিআইটিইউ অনুমোদিত কলকাতা কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতৃত্ব তাঁদের সংগঠিত করে। এক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী কর্মচারীদের বামপন্থী সংগঠনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব ঠিকা শ্রমিকদের সংগঠিত হতে উৎসাহ দেন।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

ইতিমধ্যে ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে এবং আরও এক মাসের মাইনে বকেয়া হয়েছে। ৮ মার্চ প্রথমবার হোস্টেলগুলোতে কর্মরত ঠিকা শ্রমিকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের ভিতরে গেটের কাছে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। জীবনে কখনো যাঁরা স্লোগান দেননি, সেই শ্রমিকরাও স্লোগানে গলা মেলান। কলকাতা কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের নেতৃত্বে সংগঠিত এই বিক্ষোভ জমায়েত থেকে ঠিকা শ্রমিকদের আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত অংশের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী, আধিকারিকদের মধ্যে। আন্দোলন ও ইউনিয়ন মজবুত হতে থাকে। ২৩ তারিখ সিআইটিইউ কলকাতা জেলা দপ্তরে শতাধিক শ্রমিক জড়ো হয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে ইউনিয়নের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট তৈরি করেন। নিজেদের মধ্যে থেকে কমিটির সদস্যদের নির্বাচিত করেন এবং আন্দোলন এই ইউনিট কমিটির নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেন।

 

আন্দোলনের অগ্রগতি

উল্লেখ্য, এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই প্রবাসী। কারোর বাড়ি বাঁকুড়া, কারোর মেদিনীপুর। এঁরা হোস্টেলেই থাকেন, নিজেদের দুবেলা খাওয়াদাওয়ার জন্য মেস খরচ দিতে হয়। মাইনে না পেলে তা দেবেন কী করে? জানুয়ারি থেকে মার্চ অব্দি হোস্টেলের আবাসিক ছাত্ররা এঁদের মেসের খরচ চালিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের পক্ষেও আর টানা অসম্ভব। এমতাবস্থায় এই শ্রমিকদের এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে হোস্টেলে আর খাবার না মেলার কথা।

১ এপ্রিল সকালবেলা রান্না করলেন শ্রমিকরা, নিজেরা খালি পেটে থেকে ছাত্রদের খেতে দিলেন। তারপর ভুখা পেটেই পনেরোটা হোস্টেল থেকে সকলে এসে জড়ো হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙ্গা ভবনের সামনে। ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা দেখা করলেন রেজিস্ট্রারের সাথে, নীচে শ্রমিকদের জমায়েত হল। ওই দিনের লড়াইতে দুটো ফল হল। এক, হোস্টেলগুলোতে শ্রমিকদের দুবেলা খাওয়া নিশ্চিত করা গেল। দুই, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দ্রুত তিন মাসের বকেয়া বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মিললেই তো হল না, ২ তারিখ থেকে প্রায় রোজ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পদাধিকারীদের (রেজিস্ট্রার, বোর্ড অব রেসিডেন্টের সম্পাদক, ইন্টারনাল অডিটর, প্রো ভিসি-অ্যাকাডেমিক ও ফিনান্স) ডেপুটেশন দেওয়া হয়, চাপ তৈরি করা হয়।

আন্দোলনের প্রাথমিক সাফল্য আসে ১৬ মার্চ, যখন জানুয়ারি মাসের বকেয়া মাইনে শ্রমিকরা হাতে পান। দু মাসের মাইনে তখনো বকেয়া, লকডাউনের ২১ মাস তো আছেই। সাথে পিএফ, ইএসআই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, আর ছাঁটাই তিন শ্রমিককে পুনর্নিয়োগ করার লড়াই‌।

মাসের পর মাস মাইনে বাকি, হাতে একটা পয়সা নেই, ধার করে সংসার চলছে। আন্দোলনে সামিল হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার জন্য বাসের ভাড়াটুকুই বা দেবেন কী করে? দিনের পর দিন আলিপুর থেকে বা হাজরা রোড থেকে পায়ে হেঁটে কলেজ স্ট্রিটে এসেছেন শ্রমিকরা। কিন্তু অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ দিনের পর দিন মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে, ঠিকাদারকে আড়াল করেছে।

এপ্রিলও ফুরিয়ে গেল, মাইনে মিলল না। ফের তিন মাসের বেতন বকেয়া। ধর্মঘট ছাড়া যে রাস্তা নেই, বেশ বুঝতে পারছিলেন আন্দোলনকারীরা। পেটের খিদে চেপেও সেই অস্ত্র প্রয়োগ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখছিলেন সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে। কর্তৃপক্ষ কিন্তু শ্রমিকদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিঁটেফোঁটা মানবিকতাও দেখাননি।

১০ মে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ তিন মাসের বকেয়া মাইনে মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও শ্রমিকদের হাত খালিই থেকে যায়, তাঁরা অবস্থানে বসে পড়েন। কথা ছিল দাবিপূরণ না হওয়া পর্যন্ত উঠবেন না। কিন্তু শেষ অব্দি কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রেখে অবস্থান তুলে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ১৭ মে ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে ইউনিয়ন নেতৃত্বকে আলোচনায় অংশ নিতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। এমনকি রেজিস্ট্রারের অফিসেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মিছিল করে দ্বারভাঙ্গা ভবনের দোতলায় উঠে আসতে চান তাঁরা। গেট বন্ধ করে আটকানো হলে শুরু হয় ঘেরাও। শ্রমিকদের মেজাজ দেখে ঠিকাদার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষও ভয় পায়। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হন রেজিস্ট্রারসহ অন্য আধিকারিকরা। দাবি মেটাতে আরও এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেন।

পরের সপ্তাহের সোমবারই ফের হানা দেন শ্রমিকরা। এবার পাকাপাকি কথা ছাড়া ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন নেই – এই মেজাজে শুরু হয় অবস্থান। সেটা ২৩ তারিখ। কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনায় ঠিক হয়, কর্তৃপক্ষ একদিনের মধ্যে ঠিকাদারকে অগ্রীম দু মাসের টাকা দেবে এবং ২৫ তারিখ সকালের মধ্যে শ্রমিকদের হাতে ঠিকাদার টাকা তুলে দেবে।

আবার প্রতারণা। মাইনে না পেয়ে ২৫ তারিখ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে উপাচার্য ও সহউপাচার্যের গাড়ি ঘেরাও করে বসে পড়েন শ্রমিকরা। ইউনিয়ন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, মাইনে ছাড়া শুকনো প্রতিশ্রুতিতে আর মাটি ছাড়া হবে না।

 

২৫ ও ২৬ তারিখের লড়াই

বারবার কথার খেলাপ করেছে কর্তৃপক্ষ, তাই এবার হেস্তনেস্ত করে তবেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার মানসিকতা নিয়ে এসেছিলেন শ্রমিকরা। জঙ্গী মেজাজ আন্দাজ করতে পেরে খোদ উপাচার্য শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলতে চান। প্রায় আড়াই মাসের আন্দোলনে উপাচার্যের এই প্রথম হস্তক্ষেপ। এর আগে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, ইউনিয়ন তাঁর কাছে চিঠি দিতে গেলেও উপাচার্যের দপ্তর সে চিঠি গ্রহণ করেনি। কিন্তু সে কথাও স্রেফ কথার কথা। শ্রমিকদের আবার পরের সোমবার অব্দি অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি। ইউনিয়ন নেতৃত্ব তা মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করেন, অবস্থান চলতে থাকে। শ্রমিকরা ঠিক উপাচার্য, সহউপাচার্যের গাড়ি ক্যাম্পাস থেকে বেরোতে দেওয়া হবে না।

সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ অভাবিত ঘটনা ঘটল। তিন মাস আগেও যে ঠিকা শ্রমিকদের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকতেই দেওয়া হত না, তাদের আন্দোলনের ভয়ে ঘুরপথে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্থান করতে হল উপাচার্য, সহউপাচার্যকে। ওঁরা দুজন চলে গেলেও, শ্রমিকরা অনড় থাকেন। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। ২৫ মে রাতে একজনও হোস্টেলে ফিরে রান্না করলেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের লনেই রাত জাগলেন অবস্থানে। নেতৃত্ব বললেন, ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধায় পড়ার দায় পুরোপুরি কর্তৃপক্ষের। ধর্মঘট করা ছাড়া শ্রমিকদের আর উপায় ছিল না।

২৬ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর শুরু হয় দফায় দফায় মিছিল, সভা। জমায়েত বাড়তে থাকে। আগের দিন যে ঠিকা শ্রমিকরা ছিলেন না, তাঁরাও সামিল হন। সিআইটিইউ কলকাতা জেলার নেতৃত্বও আসেন। কলকাতা কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী স্থায়ী কর্মচারী সংগঠনের নেতৃত্ব তো শুরু থেকে এই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। ২৬ তারিখ বিভিন্ন হোস্টেলের আবাসিক ছাত্রছাত্রীরাও দলে দলে এসে দাঁড়ান হোস্টেলের রাঁধুনি, হেল্পার, সাফাইকর্মীদের আন্দোলনের পাশে। তাঁরাও কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত বকেয়া বেতন মিটিয়ে দেবার দাবি জানান, যাতে হোস্টেলগুলোতে স্বাভাবিক পরিষেবা চালু করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ নত হতে বাধ্য হয়। উপাচার্য সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়েই আসেননি, সহউপাচার্য হস্তক্ষেপ করেন। ঠিকাদারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়, শ্রমিক প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয় আলোচনায় বসার জন্য। সেখান থেকেই পুরনো অবস্থানে ফিরে গিয়ে কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে শ্রমিকদের দুমাসের মাইনের টাকা অগ্রীম দেওয়ার কথা জানান। পরদিনই শ্রমিকদের হাতে দুমাসের মাইনে তুলে দিতে নির্দেশ দেন। সাথে লকডাউনের সময়কার যে কমাসের টাকা কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে দিয়েছে তা ১৫ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের হাতে তুলে দিতে বলেন। লিখিত প্রতিশ্রুতি হাতে নিয়ে বিকেলবেলা শ্রমিকরা মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে হোস্টেলগুলোতে ফিরে যান, ছাত্রছাত্রীদের জন্য রান্না করেন রাতে।

২৭শে মে ঠিকাদারের কাছ থেকে দুমাসের মাইনে আদায় হয়।

 

দাবি উত্থাপন থেকে দাবি আদায়: এই আন্দোলনের তাৎপর্য

৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে জমায়েত থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল, তার অনেকটা আদায় করা গেল লাগাতার আন্দোলনের ফলে মে মাসের শেষে। সব দাবি আদায় হয়নি, আন্দোলন আংশিক সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু এর তাৎপর্য অনেকখানি।

এই সাফল্য আরও একবার প্রমাণ করল, লড়াই করে দাবি আদায় করা যায়। যদি সে দাবি ন্যায্য হয়, যদি ধৈর্য ধরে আন্দোলন পরিচালনা করা যায়, যদি সাহস থাকে এবং যদি সংগঠিত হওয়া যায়। নিশ্চিতভাবে এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজে অন্য ঠিকা সংস্থার অধীনে কর্মরত শ্রমিকদেরও উৎসাহিত করবে। তাঁরাও ইউনিয়নের পতাকার নীচে সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকারের লড়াই লড়তে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের ঠিকা শ্রমিকদেরও এই আন্দোলন উৎসাহিত করছে।

আন্দোলন কিন্তু থামেনি। বাকি দাবিগুলো পূরণ করার লক্ষ্যে আন্দোলন চলছে।

মতামত ব্যক্তিগত, তথ্য লেখকের

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.