বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী রাজধানী দিল্লির রামলীলা ময়দান। রাবণ বধ পালা থেকে রাজনৈতিক সভা; আন্না হাজারের ঐতিহাসিক দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদ সভা থেকে কৃষকদের জমায়েত – অনেককিছুই দেখেছে এই ময়দান। গত রবিবার সেই মাঠ আবারও ভরে উঠেছিল আম আদমি পার্টির হলুদ, কংগ্রেসের তেরঙা, বামপন্থীদের লাল এবং ইন্ডিয়া জোটের অন্যান্য দলগুলির বিভিন্ন রঙের পতাকায়। বিরোধীপক্ষের তাবড় নেতারা তাদের বক্তব্য রাখলেন মাঠভর্তি মানুষের মাঝে। তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম – বিরোধী নেতাদের গ্রেফতার করে বা ব্যাঙ্কের লেনদেন বন্ধ করিয়ে ঠিক নির্বাচনের মুখে তাদের শক্তিহীন করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার।
আপের ডাকা এই ইন্ডিয়া জোটের ‘লোকতন্ত্ৰ বচাও’ জমায়েত হয়েছিলই ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ও দিল্লির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কেন্দ্রীয় সংস্থা দ্বারা গ্রেফতারের বিরোধিতায়। তৃণমূল কংগ্রেস ও ডিএমকে ছাড়া প্রায় সবকটি দলেরই সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে দেখা গেছে মঞ্চে। রাখা ছিল দুটি খালি আসনও – হেমন্ত আর অরবিন্দের নামে। অনেক বক্তা বলেন, ওই দুজন অংশগ্রহণ না করতে পারলেও সবার মনেপ্রাণে বিরাজমান।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
জ্বালাময়ী ভাষণ দেন হেমন্তের স্ত্রী কল্পনা সোরেন। ঘোষণা করেন ‘ঝাড়খন্ড ঝুকেগা নহি ঔর ইন্ডিয়া রুকেগা নহি’। অরবিন্দের লিখিত ভাষণ পড়ে শোনান স্ত্রী সুনীতা। বিরোধী জোটের মঞ্চ থেকে বলেন ‘অরবিন্দ কেজরিওয়াল সিংহ; তাঁকে বেশিদিন জেলে রাখা যাবে না।’
আবার তৃণমূল নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দলের রাজ্যসভার আরেক সদস্য সাগরিকা ঘোষ ঘোষণা করেন যে তাঁরা ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গেই আছেন এবং থাকবেন। মঞ্চে তখন গান্ধী পরিবারের তিন সদস্যই উপস্থিত – সোনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা। উপস্থিত কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেও।
একই দিনে কৃষ্ণনগরের নির্বাচনী সভায় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, বিরোধী জোটের ইন্ডিয়া নাম তাঁরই দেওয়া। কিন্তু রাজ্যে কংগ্রেস বা সিপিএমের সঙ্গে নেই তাঁর দল। তিনি বলেন যে এই জোট তারই তৈরি করা, নামটা তাঁরই দেওয়া, ‘ভোটের পরও আমিই দেখে নেব।’ যোগ করেন যে রাজ্যে কংগ্রেস বা সিপিএমকে ভোট দেওয়া মানে বিজেপিকে ভোট দেওয়া! পরদিন, অর্থাৎ সোমবার, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী খোঁচা দিলেন মমতাকে। প্রশ্ন তুললেন যে এই ইন্ডিয়া জোট কেন ভাঙলেন মমতা? অরবিন্দ, হেমন্তরা ভাঙেননি বলেই তাঁদের জেলে যেতে হয়েছে, বহরমপুরে বলেন এই প্রবীণ কংগ্রেস নেতা। তারপর তাঁর অভিযোগ, মমতার উপর নাকি এই কারণেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির কোনো প্রভাব পড়েনি।
আবার সেই সোমবারই আবগারি মামলায় অরবিন্দের ইডি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়। দিল্লির বিশেষ আদালতের বিচারক তাঁকে আরও ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আরো পড়ুন আপনি বাঁচলে বাপের নাম: তৃণমূলের ব্রিগেডের নির্যাস
সেদিন স্বামীর মামলার শুনানিতে আদালতে হাজির ছিলেন সুনীতাও। মুখ্যমন্ত্রীকে দিল্লির তিহার জেলে এবার দিন কাটাতে হবে, যেখানে আগে থেকেই আছেন তাঁর অন্য সহকর্মীরা। দিল্লিতে কিন্তু এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবাদ, বিক্ষোভ দেখা গেল না। দিল্লির গরমে হয়ত কাহিল আপ সমেত অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি, অথবা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। বা হয়ত ধরেই নিয়েছে যে রাস্তায় নেমে লাভ হবে না, তাদের সর্বোচ্চ নেতা ছাড়াও সত্যেন্দ্র জৈন, সঞ্জয় সিং এবং মণীশ সিসোদিয়াও নির্বাচনের সময়টা তিহার জেলের ভিতরেই কাটাবেন।
আবার রবিবার রামলীলা ময়দানের সমাবেশে শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা উদ্ধব গণতন্ত্র বাঁচানোর তাগিদে জোট সরকারকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানালেন; ওদিকে মহারাষ্ট্রে কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আসন ভাগাভাগি নিয়ে এখনো কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর দলের মন কষাকষি চলছে। মহারাষ্ট্রের আরেক বড় নেতা, এনসিপির শরদ পাওয়ারও রবিবার ছিলেন মঞ্চে। কিন্তু রাজ্যে তাঁদের মহারাষ্ট্র বিকাশ আঘাড়ি জোটের অংশীদারদের আসন সমঝোতা কিছুতেই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।
এই বিশাল সমাবেশের বিশেষ প্রভাব পাঞ্জাবেও দেখা গেল না। দিল্লিতে কংগ্রেস ও আপের আসন রফা হলেও, প্রতিবেশী রাজ্যে তা সম্ভব হয়নি। রামলীলা ময়দানে অবশ্য বক্তব্য রাখেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান। তবে আসন রফার কোনো কথা কোনো পক্ষই তুলল না।
এ তো গেল আঞ্চলিক রাজনীতির আশা-আকাঙ্ক্ষা। নির্বাচনের ফলাফলের উপর এর কতটা প্রভাব পড়বে তাও দেখার বিষয়। রবিবার ‘লোকতন্ত্ৰ বচাও’ মঞ্চে যেসব বিরোধী দলের নেতৃত্বকে দেখা গেছে তার মধ্যে ছিল আপ, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম, সিপিআই (এমএল) লিবারেশন, ফরওয়ার্ড ব্লক, ডিএমকে, আইইউএমএল, ন্যাশনাল কনফারেন্স, পিডিপি, জেএমএম, এনসিপি, ভিসিকে, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, শিবসেনা (ইউবিটি) প্রভৃতি। এই দলগুলি ২০১৯ লোকসভায় জিতেছিল সর্বসাকুল্যে ১১৩ আসন। ওদিকে বিজেপি একাই জিতেছিল ২৮৮। অথাৎ বিরোধী দলগুলি ৪ জুন নির্বাচন ফল ঘোষণা হবার পর ‘খেলা হবে’ বলে আসরে তবেই নামতে পারে যদি তারা আগেরবারের চেয়ে দেড়শোর বেশি আসন পায়। সেক্ষেত্রে প্রধান ভরসা কংগ্রেস। কারণ আঞ্চলিক দলগুলির সর্বাধিক আসন সংখ্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের রাজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
অন্যদিকে বিজেপিকে খোয়াতে হবে প্রায় ৬৫টি আসন। এখানে সেই খেলা হতে হবে মধ্য ভারতে, পশ্চিমে এবং কিছুটা কর্ণাটকে। তা কতটা সম্ভব? অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম ফের বিজেপির হাত ধরেছে, বিহারে তেমন জেডিইউ। আপাতত ওড়িশায় সম্মুখসমরে বিজেপি ও বিজেডি, কিন্তু লোকসভায় কি বিরোধীপক্ষের পাশে ভবিষ্যতে দাঁড়াবেন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক?
পূর্ব উপকূলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দক্ষিণ ঘুরে কর্ণাটক পর্যন্ত আসন সংখ্যা ১৭৫। এখানে কিন্তু বিজেপি নিজের জোরে বিশেষ লাভ নাও পেতে পারে। ওড়িশা ও অন্ধ্রের কথা আগেই বলা হল। কর্ণাটক বিধানসভায় কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রভাব লোকসভায় কতটা পড়ে তাও লক্ষণীয়। তামিলনাড়ু, কেরালাতেও শোনা যাচ্ছে বিজেপি নাকি একটি-দুটি আসন পেতে পারে। তামিলনাড়ুতে বিজেপি আন্নামালাই কুপ্পুসামির উপর ভরসা করে আছে। এই প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এখন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। পশ্চিমবঙ্গে যেমন শুভেন্দু অধিকারী, তেমনি তামিলনাড়ুতে আন্নামালাই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় নয়নমণি।
এমতাবস্থায় বিভিন্ন রাজ্যে ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে এত আসনে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বহু ভোট ভাগাভাগি করবে। তার ফল কী হবে সেটাও দেখার বিষয়। আজকের বিজেপির শক্তি ও কৌশলের মোকাবিলা করতে গিয়ে ইন্ডিয়া জোটের নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতা হ্রাসের চেষ্টাকে বিফল করতে পারে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








