বাঁশদ্রোণী এলাকায় সিপিএমের নির্বাচনী সভা সবেমাত্র শেষ হয়েছে। যাদবপুর লোকসভার বাম প্রার্থী সৃজন ভট্টাচার্যের বক্তৃতা দৃশ্যতই উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলেন চায়ের দোকানে জড়ো হওয়া মানুষজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের এক স্থানীয় নেতাও। বক্তৃতা শেষ হতেই তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘ছেলেটি বলে ভাল। ভদ্র ছেলে। না জিতলেও খারাপ ভোট পাবে না।’ তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই এক বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘আগেরবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলাম৷ এবার সৃজনকেই দেব। তোমাদের হারাতে পারলে ও-ই পারবে।’

শুধু বাঁশদ্রোণী, বাঘাযতীন, গড়িয়া বা নাকতলা নয়। যাদবপুর লোকসভার দুটি বিধানসভায় (টালিগঞ্জ ও যাদবপুর) তৃণমূলের সায়নী ঘোষকে কড়া টক্কর দিচ্ছেন সৃজন। তাঁর সভায় উপচে পড়ছে ভিড়। বসে যাওয়া বহু বাম কর্মী নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন। বেশকিছু এলাকায় তরুণ বামপন্থী প্রার্থীকে কেন্দ্র করে কার্যত আবেগের বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছে। যাদবপুর, বাঘাযতীন, গড়িয়া, টালিগঞ্জের বিস্তীর্ণ কলোনি এলাকা একসময় লাল দুর্গ হিসাবে পরিচিত ছিল। উদ্বাস্তু আন্দোলন, ইউসিআরসির হাত ধরে গড়ে ওঠা বাম সংগঠন সম্প্রতি একের পর এক নির্বাচনী বিপর্যয়ে বেশ খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছিল। ঝকঝকে যুবক সৃজন সেই হতাশার আবহ এক ঝটকায় অনেকখানি কাটিয়ে দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তো বটেই, মধ্যবয়সী বা প্রৌঢ় বামপন্থী কর্মীরাও পা মেলাচ্ছেন মিছিলে। তৃণমূলের জোড়াফুলের সঙ্গে কড়া টক্কর দিচ্ছে কাস্তে হাতুড়ি। এর ফলে একেবারে পিছনে চলে গিয়েছে বিজেপি। পতাকা, পোস্টারের দৌড়েই হোক বা জনসমাবেশের মেজাজে ও বহরে, কেন্দ্রের শাসক দল পরিষ্কার তিন নম্বরে। গোটা রাজ্যের মত যাদবপুরেও ‘বামের ভোট রামে’ চলে গিয়েছিল ২০১৯ এবং ২০২১ সালে। এবার কিন্তু ছবিটা একদম উল্টো। অন্তত খালি চোখে দেখে মনে হচ্ছে, রামের ভোটের অনেকখানি বামে ফিরবে তো বটেই, তৃণমূলের শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটারের একাংশও সৃজনে মুগ্ধ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদকের গুণ হল, তিনি কখনোই মেজাজ হারান না। অন্যের কথা শোনেন। সিপিএম নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে যে ঔদ্ধত্যের অভিযোগ ওঠে, সৃজন সম্পর্কে তেমন অভিযোগ তাঁর অতি বড় শত্রুও করবে না। পাশের বাড়ির ছেলের ভাবমূর্তি নিঃসন্দেহে তাঁর জোরের জায়গা। যাদবপুর, টালিগঞ্জের চেনা মাঠে জমিয়ে ব্যাট করছেন তিনি। কথাবার্তায় চুঁইয়ে পড়ছে আত্মবিশ্বাস। তাঁকে ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে সংগঠনের ভিতরে ও বাইরে, তার উপর ভিত্তি করেই সৃজন বলছেন, ‘যাদবপুর, টালিগঞ্জের লাল মাটি আরও গাঢ় লাল হবে।’ সিপিএমের মরা বাজারেও এই দাবি খুব অবাস্তব শোনাচ্ছে না। যাদবপুর বিধানসভায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয় হয়েছিলেন সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী। পেয়েছিলেন ২৭.৭৫% ভোট। নির্বাচনের ঠিক আগে সিপিএম ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েই বিধানসভার টিকিট পাওয়া রিঙ্কু নস্কর পেয়েছিলেন ২৪.৬৭% ভোট। সৃজনের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সিপিএমের সংগঠন এবং ঝিমিয়ে পড়া বিজেপি – এই ত্রিবেণীসঙ্গম সম্ভব হলে যাদবপুরে পিছিয়েও পড়তে পারে তৃণমূল। একই কথা বলা যায় টালিগঞ্জ বিধানসভার ক্ষেত্রে। গত বিধানসভায় বিজেপি পেয়েছিল ২৬% ভোট। সিপিএম ২০.৫%। এবার টালিগঞ্জেও বিজেপির প্রচার স্তিমিত। ফলে তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে উঠে এসেছে লাল পতাকাই।

কিন্তু যাদবপুর লোকসভা মানে তো কেবল দুটি বিধানসভা নয়। বারুইপুর পূর্ব, বারুইপুর পশ্চিম, সোনারপুর উত্তর এবং দক্ষিণ অনেকখানি ভরসা জোগাচ্ছে সায়নীকে। পঞ্চায়েতে কিছুটা খারাপ ফল হলেও এই চারটি বিধানসভায় তৃণমূল কার্যত অপ্রতিরোধ্য। ওই বিধানসভাগুলিতে বামপন্থীদের ভোট গত বিধানসভায় ঘোরাফেরা করেছে ৯-১৩ শতাংশের মধ্যে। যাদবপুর ও টালিগঞ্জের তুলনায় এই চারটি বিধানসভায় বিজেপির অবস্থানও তুলনামূলকভাবে ভাল। যদিও সৃজন এই অঞ্চলগুলিতেও চুটিয়ে প্রচার করেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে একদম গ্রামীণ এলাকাতেও যথেষ্ট আবেগ চোখে পড়েছে। কিন্তু তা কি সাংগঠনিক খামতি ঢাকার জন্য যথেষ্ট? মনে হয় না। এই চারটি বিধানসভায় সংখ্যালঘু ভোটও যথেষ্ট। ফলে বিজেপিও তাদের চিরাচরিত বিভাজনের তাস ব্যবহার করতে দ্বিধা করছে না। কয়েক বছর আগে সায়নী একটি অনলাইন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেটিকে হাতিয়ার করে প্রচার করছেন বিজেপি কর্মীরা।

আরো পড়ুন মোদী-রাহুল নয়, এখানে লড়াই পওয়ার বনাম পওয়ার

তবে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক বিধানসভা নিঃসন্দেহে ভাঙড়। নির্বাচনের ঠিক আগেও সেখানে আইএসএফ ও তৃণমূলের সংঘর্ষ চলছে। গত কয়েক বছরে বারবার রাজনৈতিক হিংসার কারণে সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছে ভাঙড়। কখনো নকশালপন্থী সিপিআইএমএল রেড স্টারের নেতৃত্বে জমি আন্দোলন, কখনও আইএসএফের উত্থানকে কেন্দ্র করে রক্ত ঝরেছে। বিধানসভা নির্বাচনে নওশাদ সিদ্দিকি জয়ী হন সিপিএমের সমর্থনে। তারপর আরও তীব্র হয় সংঘাত। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে আইএসএফ বনাম তৃণমূলের সংঘর্ষ চরম আকার নিয়েছিল। এবারে সিপিএমের সঙ্গে জোট হয়নি আইএসএফের। ভাঙড়ের তৃণমূলবিরোধী ভোট কি আদৌ সৃজন পাবেন? নাকি নওশাদ সেই ভোট নিয়ে যেতে পারবেন আইএসএফ প্রার্থীর বাক্সে? এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করছে অনেককিছু। ভাঙড়ে প্রচারে গিয়ে সেলিম, সৃজনরা আইএসএফের ঘাড়ে জোট ভাঙার দায় চাপিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের আক্রমণের ভাষা ছিল সংযত। সম্ভবত ভবিষ্যতের বিবিধ সম্ভাবনার কথা ভেবেই। তৃণমূলের হাতে আক্রান্ত আইএসএফ সমর্থকদের বাড়িতে গিয়েছেন সৃজন, পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু নওশাদের ব্যক্তিগত আবেদন ভাঙড়ে প্রবল। ভাইজানের আহ্বান উপেক্ষা করে সৃজনকে কি ভোট দেবেন ভাঙড়ের আইএসএফ সমর্থকরা? সৃজনের চেষ্টার অন্ত নেই, কিন্তু সংশয় থাকছেই।

যাদবপুর বরাবর নতুন তারকার জন্ম দেয়, আবার ইন্দ্রপতন ঘটাতেও তার জুড়ি নেই। ১৯৮৪ সালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মত হেভিওয়েটকে হারিয়ে রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে উল্কাসদৃশ উত্থান ঘটেছিল এক নক্ষত্রের – মমতা ব্যানার্জি। আবার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা মমতাকেই হারতে হয়েছিল এই যাদবপুরে, সিপিএমের মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে। ২০০৯ সালে কবীর সুমন হারিয়ে দেন সুজন চক্রবর্তীকে। তারপর দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তাঁর। ২০১৪ সালে সুগত বসু, ২০১৯ সালে মিমি চক্রবর্তীকে এই আসন থেকে জেতায় তৃণমূল। তাঁদের কাউকেই দ্বিতীয়বারের জন্য টিকিট দিতে পারেননি মমতা। এবারে প্রার্থী সায়নী। তিনিও সৃজনের মতই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। সৃজনের মত তিনিও গত বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে পরাজিত হয়েছেন। বিজেপি প্রার্থী অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়ও গত বিধানসভায় হেরে যাওয়া প্রার্থী।

তিন ‘হেরো’ প্রার্থীর টক্করে কে জিতবেন যাদবপুরে? উত্তর পাওয়া যাবে ৪ জুন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.