জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে সেটা বুঝতে বুঝতে সন্ধে ছটা, সোয়া ছটা বেজে গিয়েছিল। তখন তো মিডিয়ার এত প্রতাপ ছিল না, ডিজিটাল তরঙ্গ বয়ে যেত না। খবর সাবানের ফেনার মত ছিল না। সন্ধেবেলা জিনিসটার সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া বুঝিনি, কিন্তু আমার মনে আছে যে প্রথমে আমরা খানিকটা উল্লসিত হয়েছিলাম। তার কারণ আমরা তখন বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং বামপন্থী রাজনীতি পশ্চিমবাংলায় ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে ছিল ১৯৭২ সালের পর থেকে। আমরা চুয়াত্তর সালের রেল ধর্মঘটের সময় থেকেই বুঝতে শুরু করি যে ইন্দিরা গান্ধী, বা শাসক দল কংগ্রেস, প্যাঁচে পড়েছে। তারপর জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে একটা আন্দোলন যে চলছে সেটা টের পাচ্ছিলাম, কিন্তু পশ্চিমবাংলায় তেমন কিছু ঘটছিল না। পশ্চিমবাংলা তখনও রাজনীতির দিক থেকে, যাকে বলে, খুব “হ্যাপেনিং” জায়গা নয়। তার একটা কারণ আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা। জরুরি অবস্থার সময় তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত কদর্য ছিল, এখনও তাই বলে আমার মনে হয়। যা-ই হোক, কলকাতা, এবং সে অর্থে পশ্চিমবঙ্গও, তখন “নন-হ্যাপেনিং সিটি”। কিন্তু এই ঘটনা শুনেই বুঝলাম যে কিছু একটা হচ্ছে।

এই কিছু একটা হওয়ার পরেই যা শুরু হল তাতে এক দিক থেকে আমরা বেশ মজা পাচ্ছিলাম। কেন না খবরের কাগজগুলো শুনলাম সেন্সর করা হচ্ছে। সত্যিই যে হচ্ছে তার প্রমাণও পেলাম শিগগির। যিনি সেন্সর করছিলেন, এখনকার পঞ্চায়েত মন্ত্রী এবং তখনকার তথ্যমন্ত্রী, তিনি যাঁকে দায়িত্বটা দিয়েছিলেন, সেই অফিসার ঘটনাচক্রে আমার আত্মীয়। সেই সূত্রে আমি সব মজার মজার ঘটনা শুনতাম। যেমন জীবনানন্দ দাশের ‘রাত্রি’ কবিতাটার প্রথম স্তবক নাকি চলবে না। কারণ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বে “হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল” — এটা অবাস্তব। হাইড্র্যান্ট খুলে কাউকে জল খেতে হয় না। এইসব লাইন উন্নয়নবিরোধী, অতএব চলবে না। এরকম না চলার গল্প অনেক চালু হল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এমার্জেন্সি কী জিনিস, সেই বোধটা শুরুতে আমাদের ছিল না। কেন না পশ্চিমবাংলায় বামপন্থীরা তার আগেই চূড়ান্ত আঘাত পেয়েছে। সিপিএম তো বটেই, ১৯৭২ সালে রিগড নির্বাচন যার বিরাট দৃষ্টান্ত। এমনই নির্বাচন হল যে এগারোটার সময় জ্যোতি বসু প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করলেন। নকশালপন্থীদের উপরেও একই সময়কালে চরম আঘাত নেমে এসেছে। ফলে মোটামুটি ৭৩-৭৪ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে একটা অদ্ভুত, অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছিল। কোনও কোনও জায়গায় কেউ কেউ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বা অন্য জায়গায় কিছু করছিলেন। কিন্তু সেইভাবে অনুভবযোগ্য কিছু হচ্ছিল না। জরুরি অবস্থা ঘোষণা হওয়ার দু-তিন দিন পরে একটা ঘটনায় আমি সম্যক উপলব্ধি করলাম এমার্জেন্সি মানে আসলে কী।

তখন আমি লেখাপড়া করতাম। মানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হলেও ওটা পড়তে আমার ভাল লাগত না, তাই বাইরের বইপত্র পড়তাম। পড়ার জন্যে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যেতাম। ওটা পড়ার পক্ষে খুব ভাল জায়গা, কারণ বিশেষ কেউ যায় না। আশপাশে যেহেতু খাবার দোকান-টোকান কিছুই নেই, তাই একবার গেলে চট করে বেরিয়ে আসাও যায় না। ফলে গিয়ে আট-দশটা বইয়ের রিকুইজিশন দিয়ে দু-তিনটে পেলে বড় ঘরে বসে পড়া যেত। ওরকম একদিন পড়তে যাচ্ছি, ঢুকতে গিয়ে যে বিরাট সিঁড়ি দিয়ে উঠতে, সেখানে হঠাৎ আমাকে বলা হল “দাঁড়িয়ে যান, দাঁড়িয়ে যান।” কেন? ওখানে মহাত্মা গান্ধীর সেই বিখ্যাত উক্তিটা বিরাট আকারে টাঙানো ছিল, “I do not want my house to be walled in on all sides and my windows to be stuffed. I want the culture of all lands to be blown about my house as freely as possible. But I refuse to be blown off my feet by any”। একটা বাঁশের ভারা খাটিয়ে সেটা প্রায় আট-দশজন লোক মিলে নামাচ্ছে। ওই উদ্ভট দৃশ্য দেখে যে দু-একজন স্টাফ ওখানে ছিলেন তাঁদের আমি জিজ্ঞেস করলাম “এটা নামাচ্ছেন কেন?” কাণ্ড দেখে ওঁরাও হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই উত্তর দিলেন “গান্ধীজির ওই কোটেশন ওখানে রাখা যাবে না। ডিরেক্টর বলেছেন।” আমি বললাম “এতক্ষণ ধরে আমাকে আটকে রেখেছেন, আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব?” ওঁরা বললেন “আরে কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের ব্যাপার।” আসলে প্রায় দু মানুষ উঁচু লেখাটাকে সাবধানে নামিয়ে চোখের আড়ালে কোথাও রেখে দিতে হবে। কারণ গান্ধীজি এই যে সব জানলা খুলে দিতে বলছেন, এটা ঠিক নয়। এটা যদি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ঢোকার মুখে পাঠকরা ওসব পড়ে, তাহলে দেশের গণতন্ত্রের বা শাসনতন্ত্রের সমূহ ক্ষতি হবে।

শাসকদের এরকম অসামান্য বোকামির অজস্র ছবি তখন রোজ তৈরি হত। রবীন্দ্রনাথের কিছু গান যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। “বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান, তুমি কি এমনি শক্তিমান?” বিপজ্জনক বলে শাসকের মনে হয়েছিল।

সবচেয়ে হাস্যকর লেগেছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের। তাঁরা পরে অনেক বড় বড় কথা বলেছেন, কিন্তু তখন সবাই নির্বিকার ঢোঁড়াসাপ প্রায় হয়ে ছিলেন বড় বড় কাগজের পাতায়। সেই তুলনায় জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলনগুলো, অন্তত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, পশ্চিমবাংলার বাইরে অনেক বড় ছিল। পশ্চিমবাংলার কিছু কিছু ছোট পত্রিকাতেও লেখালিখি হত, কিন্তু সে-ও খুব সভয়ে। চায়ের দোকানে লোকে এক কাপ চা ভাগাভাগি করতে হলে অল্পবয়সীরা বলত “একটা চা আর একটা সিদ্ধার্থ।” কেন না আমাদের এখানে বামপন্থার রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল এবং তখন কংগ্রেস পার্টির ভূমিকার কথা আজ না বলাই ভাল। কারণ এখন তো বলা হচ্ছে তখনকার লোকেরা সবাই মহান, সবাই দূরদ্রষ্টা। সেই দূরদ্রষ্টারা অনেকেই আজ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, ফলে তাঁদের নিয়ে কথা বলে আর কী লাভ?

জরুরি অবস্থার মধ্যেই, ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঋত্বিক ঘটক মারা গেলেন রাত্তির এগারোটার সময়। পরের দিনের কাগজগুলোতে খবরটা নিতান্ত অকিঞ্চিৎকরভাবে বেরোল। আমরা গেলাম পিজি হাসপাতালে। গিয়ে দেখি কেউ কোত্থাও নেই। তার কারণ সকলেই ভয় পাচ্ছে। একে ঋত্বিক ঘটক বিস্ফোরক, তারপর ওখানে গিয়ে পুলিসের চোখে পড়ে গেলে বিপদ হবে। সে-ও এক অদ্ভুত দৃশ্য। তখন পরপর দুটো গেট ছিল — ম্যাকেঞ্জি বিল্ডিংয়ের গেট আর এমার্জেন্সি গেট। এমার্জেন্সি গেটের নীচে বিজন ভট্টাচার্য মাটিতে বসে পড়ে কাঁদছেন। সেখানে ভিড় কম। সত্যজিৎ রায় ততক্ষণে এসে পড়েছেন এবং ম্যাকেঞ্জি গেটের একটু দূরে আকাশবাণীতে কিছু একটা বলছেন, তাই ওদিকে ভিড়। তাছাড়া খুবই সামান্য লোক উপস্থিত। মাঝখানে একবার খানিকটা ভিড় জমল, আমরা ভাবলাম ঋত্বিকের জন্য। কিন্তু অচিরেই ভুল ভেঙে গেল। সিকিম সরকারের একজন আধিকারিক মারা গিয়েছিলেন, তাঁকে বড় বড় ফুলের তোড়া নিয়ে সরকারি লোকজন শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। ঋত্বিকের পায়ে রীতিমত মাছি বসছিল মর্গে, নিজের চোখে দেখা। বেলা বারোটা-সাড়ে বারোটা অব্দি কোন রাজনৈতিক দলের নেতাই আসেননি। বিকেলে সিনেমা বা থিয়েটার হলগুলো খোলাই ছিল। এমার্জেন্সি এভাবেই কাটছিল।

এই বেলা আমি আমার নিজের ব্যর্থতাও স্বীকার করে নিই। যখন নির্বাচনের কথা শুনলাম, সমস্ত পার্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জানলাম, তখন পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক কর্মী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের নীরবতায় এতই হতাশ ছিলাম যে ভেবেছিলাম এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ইন্দিরা গান্ধীকে কার্যত বাই দেওয়া হল। প্রমাণিত হতে দেওয়া হল যে তিনি গণতান্ত্রিক শাসক, নির্বাচন-টির্বাচন করান। এবং এই নির্বাচনে বিরোধীরা বিশ্রীভাবে হারবে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলাম নির্বাচনের দিন। সকালবেলা রাসবিহারীর মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রথম বুঝলাম যে একেবারে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ থেকে আচমকা দৈত্য বেরিয়ে আসার মত প্রচুর লোক রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। এরা কোথায় ছিল কে জানে! পিঁপড়ের ঢিবি থেকে যেমন অনেকসময় দলে দলে পিঁপড়ে বেরিয়ে আসে, সেইরকম। মনে আছে ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একটা হলুদ পাঞ্জাবি পরে, রাসবিহারীর মোড়ে অমৃতায়ন রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে লোক দেখছিলেন। তিনি আমাকে বললেন “দ্যাখ, কত লোকে ভোট দেয় বল তো?” এত লোক কাকে ভোট দিচ্ছে কিছুতেই বোঝা যাচ্ছিল না, কারণ কেউ কাউকে কিছু বলছিল না। কিন্তু পরে আমরা বুঝলাম একটা জনবিস্ফোরণ ঘটেছে। সেই প্রথম উত্তর ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস একটাও আসন পেল না, যা পেল সব দাক্ষিণাত্য থেকে। ইন্দিরা স্বয়ং এলাহাবাদে পরাজিত। সে এক অভাবনীয় ঘটনা!

এখন জরুরি অবস্থার বিষয়ে অনেকেই অনেক রকম লেখেন। কিন্তু আমরা তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে বাইরে দেখেছি, ছাত্ররা কিছু অরাজনৈতিক ফোরামে কাজ করার চেষ্টা করত। সেই ফোরামগুলোই কিছুটা সক্রিয় ছিল। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বিকল্পগুলো একেবারেই নীরবে ভবিতব্য মেনে নিয়েছিল। আমার এখন মনে হয় ভাগ্যিস জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন হয়েছিল! তাই পাশা উল্টে গেল এবং তার ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পেলেন।

জরুরি অবস্থা নিয়ে আলোচনায় বামপন্থীদের মধ্যে কে অত্যাচারিত হয়েছিল আর কে হয়নি, তা নিয়ে একটা বিভাজন দেখা যায় এবং দু পক্ষ থেকেই বাড়াবাড়ি করা হয়। আসলে আমাদের দেশে মার্কসবাদীদের সবচেয়ে বড় শত্রু মার্কসবাদীরাই। বাহাত্তর সালের পর থেকে, সাতাত্তর না হলেও, ছিয়াত্তর সাল পর্যন্ত সিপিএমের উপর কীরকম অত্যাচার হয়েছে আমরা চোখে দেখেছি।

বাহাত্তরের ১১ই মার্চের পরে ১৫ই মার্চ অব্দি তেমন কিছু বোঝা যায়নি। যখন নির্বাচনের ফল বেরোল এবং মাত্র ডজনখানেক আসন জিতল সিপিএম, জ্যোতি বসু ৩৮,০০০ ভোটে সিপিআই (তখন ইন্দিরার সঙ্গী দল) প্রার্থী শিবপদ ভট্টাচার্যের কাছে হারলেন, সেটা ছিল একটা রসিকতা। ফলটা বোধহয় শিবপদবাবু নিজেও মেনে নিতে পারেননি, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও সম্ভবত লজ্জা পেয়েছিলেন। তাই এ নিয়ে সিপিআইও খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেনি। কিন্তু তারপর থেকে দেখা গেল, সিপিএম কর্মী খুন যত না হচ্ছে, তার থেকেও বেশি হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায় সিপিএম কর্মী উচ্ছেদ। নিজের চোখে দেখেছি বিজয়গড়, শ্রী কলোনি, নাকতলা, দমদমের মত সিপিএমের বড় বড় ঘাঁটিগুলোতে খুব শান্তভাবে বলে দেওয়া হত “বাড়িতে থাকলে সুবিধা হবে না, বাড়ি ছাড়ো।” আশ্চর্যভাবে কলকাতায় তখন কিছু অঞ্চলকে ‘সেফ জোন’ বলে মনে করা হত। অর্থাৎ সেই পাড়াগুলোতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেনি। সেগুলো মূলত কংগ্রেস প্রভাবিত এলাকা। এই উচ্ছিন্ন সিপিএম কর্মীরা সেইসব এলাকায় গিয়ে থাকতে শুরু করলেন। যেমন খুব বেশি করে এঁরা থাকতেন কালীঘাট এবং চেতলা অঞ্চলে। আরেকটা বড় অংশ ছিলেন পার্ক সার্কাসে। কারণ ওটা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জায়গা হওয়ায় শাসক দল খুব বেশি মারামারি করার ঝুঁকি নেবে না।

এই সময়কার একটা খুব বড় অভিজ্ঞতা নিয়ে কেউ লেখেনি। এই পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা অনেকে শনিবার এবং রবিবার মিলিত হতেন এসপ্লানেডে। ট্রাম ডিপোয় যেখানে লাইন দিয়ে ট্রাম ঢোকে, সেখানে তখন একটা বিরাট পেচ্ছাপখানা ছিল, যেটা এখন আর নেই। তার সামনের জায়গাটা হয়ে উঠেছিল উচ্ছেদ হওয়া সিপিএম কর্মীদের মিলনস্থল। আমারই এক বন্ধু, তার প্রেমিকার সাথে দেখা করত ওইখানে। প্রেমিকা সপ্তাহে ওই একটি দিন, হয়ত দাদা বা বাবার সঙ্গে আসত। অভিভাবকটি অন্য কোথাও যেতেন, এরা কথাবার্তা বলত; জামাকাপড়, বই দেওয়া নেওয়া হত। কারোর ক্ষেত্রে দেখতাম বাবা, মা দেখা করতে এসেছেন। বন্দীশিবিরে বা জেলে যেমন সপ্তাহান্তিক মিলন হয়, তেমন দৃশ্যের জন্ম হত। এসপ্লানেডকে মনে করা হত নিরাপদ জায়গা। এই উপলক্ষে শনি, রবিবার ওই জায়গাটায় রীতিমত বাজার বসে যেত। ফুচকাওলা, আলুকাবলিওলা এসে দাঁড়াত; আমরা খাওয়াদাওয়া করতাম। আমাদের বন্ধুবান্ধবরাও ছিল সেইসব লোকেদের মধ্যে। দমদমের ছেলে, হয়ত এখন বেহালায় থাকে। তার দমদমের পাড়ার ছেলেরা দেখা করতে এল। সবাই সবাইকে চিনে নিচ্ছে, এরকম একটা জায়গা ছিল ওটা।

তাছাড়া সিপিএমের লোকেরা যে ব্যাপকভাবে চাকরি থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, কাজ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, এগুলো নির্মম বাস্তব। এগুলো যদি আজ হয়নি বলা হয়, সেটা এক ধরনের প্রতিশোধ কামনা।

আবার নকশালদের উপরেও যে বিপুল অত্যাচার হয়েছে, তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সিদ্ধার্থশঙ্কর যে আজ অব্দি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কোন শ্রদ্ধা পাচ্ছেন না, মমতা ব্যানার্জিও যে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র কসবার কাছে একটা পার্কের নাম সিদ্ধার্থ রায়ের নামে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারছেন না, তার কারণ হল সিদ্ধার্থশঙ্কর নিঃসীম ঘৃণার পাত্র। পুলিস হেফাজতে খুন করা, নকশালপন্থী কর্মীদের চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া — এগুলো নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে, কিন্তু ঘটনাগুলো তো সত্যি। সুতরাং পরবর্তীকালে “আমরাই শুধু আক্রান্ত হয়েছি, আর কেউ আক্রান্ত হয়নি”, এ কথা বলার মধ্যে অগৌরব আছে। আসলে তখন সবরকম বামপন্থী আক্রান্ত হয়েছে।

আমার মনে হয় বামপন্থীদের একটা বড় অভিশাপ হল, সাতাত্তর সালে প্রফুল্ল সেনের একটা ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে তারা এককভাবে নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতায় চলে আসতে পারল এবং ৩৪ বছর থাকল। যদি তারা দশ বছর থাকত, তাহলে কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ থাকত। এখন তারা যে একেবারে জেলিফিশের মত থলথলে হয়ে গেছে, এটা বোধহয় হত না। নকশালপন্থীদেরও প্রায় একই অবস্থা। তাঁরা যে এখন জনপ্রিয় খবরের কাগজে সিপিএমের দুর্বলতা নিয়ে প্রবন্ধ লিখছেন, নিজেদের কাগজে না লিখে, সে-ও ওই দুর্বলতা থেকেই এসেছে। মনে হয় তাঁরা ভাবছেন, এইবার একটা বোঝাপড়া করা যাবে। আমরা দীর্ঘদিন সংখ্যালঘু ছিলাম, এখন পরিস্থিতি বদলেছে, দেখা যাক সিপিএম কোথায় পার পায়।

অথচ আমার মনে হয় এখনকার জরুরি অবস্থা আরও মারাত্মক। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার একটা পরিপ্রেক্ষিত ছিল এবং রেল ধর্মঘটের পরে সকলেই বুঝতে পারছিলেন যে ইন্দিরা গান্ধী চূড়ান্ত আঘাত হানতে চলেছেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পক্ষপাতী। সে অর্থে যখন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় বেরোল, উনি পরাস্ত হলেন, তখনই আশঙ্কা করা হয়েছিল যে উনি সোভিয়েতপন্থীদের সাহায্য পাওয়ার সুবাদে ওরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি করবেন। কিন্তু তুলনামূলকভাবে ওঁর বিষনজর যতটা অবামপন্থীদের দিকে ছিল, ততটা বামপন্থীদের দিকে ছিল না। যেমন পশ্চিমবাংলায় বামপন্থীদের উপর নির্যাতন কিন্তু জরুরি অবস্থার সূত্রে ততটা হয়নি। তার আগেই যারা গ্রেপ্তার বা অত্যাচারিত হওয়ার হয়েছিল।

তার উপর জরুরি অবস্থার সময় এ রাজ্যে সাংবাদিক গ্রেপ্তার বলতে বরুণ সেনগুপ্ত, গৌরকিশোর ঘোষ আর জ্যোতির্ময় দত্ত। সেটা যতটা সিদ্ধার্থশঙ্করের ব্যক্তিগত আক্রোশে ঘটেছিল, ততটা জরুরি অবস্থার কারণে ঘটেনি বলেই অনেকের ধারণা। বিশেষত বরুণ সেনগুপ্তের গ্রেপ্তারিতে ব্যক্তিগত আক্রোশই বেশি ছিল বলে মনে করা হয়। জেলে এঁরা খুব সংকটেও ছিলেন না, যেমনটা ভারভারা রাওদের ক্ষেত্রে হয়েছে। সেই অর্থে সেইসময় চলাচলের বাধা ছিল না এবং কথাবার্তা বলা যেত। এখন তো ইউএপিএ-র মত ভয়ঙ্কর আইন রয়েছে। ইন্দিরার জরুরি অবস্থার সময় কারোর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা যেত না। যে আইনগুলো প্রয়োগ করা হত সেগুলো ইউএপিএ-র তুলনায় নিরীহ। শাসক দলের আজকের মত এরকম সর্বগ্রাসী আধিপত্যও তখন ছিল না। শুধু বিজেপি নয়, অন্য শাসক দলগুলোর কথাও বলছি।

এখন তো এলাকায় থাকতে হলে সমস্ত বিষয়ে একমত হতে হবে। এখন এমনকি খবরের কাগজেরও দ্বিমত হবার সুযোগ নেই। খবরের কাগজ এবং মিডিয়া দেখে বুঝি, আজকের চেয়ে বেশি আক্রান্ত ভারতবর্ষের সংবাদমাধ্যম আর কখনও হয়নি। জরুরি অবস্থার সময়েও কিছু কিছু কথা বকলমে বলে দেওয়া যেত। আর আজ টিভি দেখা বা খবরের কাগজ পড়ার কোনও মানেই হয় না। কারণ যারা বিজ্ঞাপন দেয়, তারাই খবরের কাগজ করে। বিজ্ঞাপন সরকার সবচেয়ে বেশি দেয়, সুতরাং যে যার বিজ্ঞাপন পায় সে তার মর্জি মাফিক খবর তৈরি করে। সংবাদমাধ্যমগুলো পার্টি ফোরাম হয়ে গেছে।

আমরা দণ্ডিত হয়ে জীবনের শোভা দেখে যাই, মহাপুরুষের উক্তি চারিদিকে কোলাহল করে। এই এক করোনাই শাসকদের উতরে দিল, জনসাধারণ তো বাধ্যতামূলকভাবে নির্বাক।

জরুরি অবস্থা – ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের সংবিধান, সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ও সংসদ : ছবি উইকিপিডিয়া থেকে।

2 মন্তব্য

  1. অনবদ্য। নানা গালগপ্পো বেছে সত্য সামনে আসার সময় এসেছে। একটাই কথা, জ্যোতির্ময় দত্ত ও তাঁর কলকাতা পত্রিকাকে কী প্রশাসনিক রোষ সহ্য করতে হয়েছিল তা তাঁর কাছে বিশদে শুনেছি এবং এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আকাশবানীতে রেকর্ডও করিয়ে রাখতে পেরেছি। তার মধ্যে আছে একটি ঘটনার বর্ণনা যাতে জানা যায় এক অতি সমাদৃত বাঙালি নব্য ধারার গদ্যকার তাঁকে ধরিয়ে দিয়ে সরকারি পুরস্কারের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন এক সাহিত্যরসিক অবাঙালি পুলিশ অফিসারের কাছে। তিনি উক্ত সাহিত্যিককে বাড়ি থেকে দূর করে দেন। ইন্টারভিউটি আজও প্রচারিত হয়নি।

Leave a Reply