অনিমেষ দাস

তিনটে কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সংগঠিত এই কৃষক আন্দোলন একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। ভারতের সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ যে ঠিক কতখানি শক্তি ধরে, তার প্রমাণ এই আন্দোলন। আপাতভাবে ফ্যাসিবাদীদের যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন, যদি ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তাহলে তারা পরাজিত হতে বাধ্য — এটা সহজ সত্য। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে অনেকসময় আমরা ভুলে যাই। এই ধরনের সাফল্যগুলো আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় যে, জনগণের শক্তি অপ্রতিরোধ্য। জনগণই ইতিহাস রচনা করেন। কোনও ফ্যাসিবাদী, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দীর্ঘদিন মানুষের উপর স্টিমরোলার চালানোর ক্ষমতা নেই।

কৃষক আন্দোলনের প্রথম থেকেই আমি আন্দোলনকারীদের পাশে থেকেছি। একজন চিকিৎসক হিসাবে যেমন, তেমনই আমি যে সংগঠনের সদস্য, সেই ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়নস (IFTU)-এরসংগঠক হিসাবেও আমি আন্দোলনের ময়দানে ছিলাম। আমরা হেলথ ক্যাম্প করেছি, চলমান গণআন্দোলন নিয়ে আমাদের বক্তব্য প্রচার করেছি। সব মিলিয়ে বলতে পারি, এ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা! আমাদের দেশের মানুষের শক্তি, জেদ, দৃঢ়প্রত্যয়ের সাক্ষী থাকতে পারলাম, এ এক বিরাট প্রাপ্তি। একইসঙ্গে, বিপ্লবী ধারার রাজনীতি যাঁরা করেন,বামপন্থী বা কমিউনিস্ট রাজনীতি যাঁরা করেন, তাঁদের কাছে এই আন্দোলন অনেক বড় শিক্ষা দিয়ে গেল। আন্দোলন শেখাল, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিভাজনের জায়গাগুলো সরিয়ে একজোট হতে পারলে নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের দেশে বহুদিন ধরে নব্য উদারবাদীএজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এটা কেবল বিজেপির দায় নয়, তথাকথিত বিজেপিবিরোধী, কিন্তু আদতে শাসকশ্রেণির দলগুলোও একই পথের পথিক। নরেন্দ্র মোদী সরকার সেই প্রক্রিয়ায় গতি এনেছে। আমরা এই সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলেই মনে করি। এহেন ফ্যাসিবাদী সরকার এই প্রথম এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হল। এর আগে গত সাত বছরে এমন পরিস্থিতির সামনে তাদের পড়তে হয়নি। আমরা দেখলাম, শেষ অবধি তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল।

চলমান কৃষক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় জোরের জায়গাটা হল এর ঐক্যবদ্ধতা। দেশের ৫০০ কৃষক সংগঠন এক মঞ্চে এসেছে। তাদের অসংখ্য মতপার্থক্য, কোনও কোনও জায়গায় সংঘাতও রয়েছে। কিন্তু সবরকম রাজনৈতিক ভিন্নতা পাশে সরিয়ে রেখেই গড়ে উঠেছে এই আন্দোলনের জোট। পঞ্চায়েত, জেলা, রাজ্য স্তর পেরিয়ে জাতীয় স্তরে প্রসারিত হয়েছে ঐক্য। এই যে ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচি চিহ্নিত করা, তার ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলা —এগুলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ার অমোঘ হাতিয়ার। এই শিক্ষা যদি গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে সাফল্য আসবে না।

বিশেষত পাঞ্জাবের কথা বলব। তৃণমূল স্তরে এক আশ্চর্য ঐক্য গড়ে উঠেছে। আন্দোলনটা গোটা পাঞ্জাবের আন্দোলন হয়ে উঠেছে। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, একটা সামাজিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য রাজ্যেও আন্দোলন বিরাট চেহারা নিয়েছে, কিন্তু পাঞ্জাবের দিকে বিশেষভাবে তাকানো দরকার।

পাঞ্জাবে বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজন ছিল, এখনোআছে। একদিকে আছেন জাঠ শিখরা। পাঞ্জাবের জমির অধিকাংশ তাঁদের হাতে। অন্যদিকে দলিত শিখরা। এর আগে পাঞ্জাবে দলিত শিখ আন্দোলন হয়েছে। বিরাট বিরাট জমায়েত, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সবই হয়েছে। শহীদও হয়েছেন দলিতরা। কিন্তু এই এত বড় মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে কৃষি আইন বাতিলের প্রশ্নে তাঁরা একজোট হলেন। জাঠ শিখ এবং দলিত শিখরা সিঙ্ঘু, টিকরি সীমান্তে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করছেন, থাকছেন, শীতের রাতে কাঁপতে কাঁপতে একসঙ্গে শপথ নিচ্ছেন হার না মানা যুদ্ধের। এসবইপ্রমাণ করে, গণআন্দোলনের ময়দানেই বিভাজন ঘুচে যায়। আর অন্য কোনো উপায় নেই। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কথা তো আপনারা জানেন। দাঙ্গায় যুযুধান হিন্দু, মুসলিম মিলে গিয়েছেন আন্দোলনের ময়দানে। কী করে সম্ভব হল? এটা হতে পারল, কারণ, তাঁরা ন্যূনতম সাধারণ কর্মসূচি চিনতে ভুল করেননি।

এই আন্দোলন গোটা করোনাকাল জুড়ে চলছে।এটাও একটা অসাধারণ বিষয়। কোভিডকে শাসক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। মোদী বলেছিলেন, ক্রাইসিসকে অপরচুনিটিতে বদলে দেবেন। অর্থাৎ সঙ্কটকে সুযোগে পরিণত করবেন। আসলে ওটা কর্পোরেটের জন্য এক বিশেষ বার্তা ছিল। তার উপর ছিল নানা রকমের লকডাউন। মানুষবাইরে বেরোতে ভয় পেত। এইসব পেরিয়ে আন্দোলন চলেছে। করোনা নিয়ে যথাসম্ভব সতর্কতা মেনেই মানুষ মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন।

পাঞ্জাবের ৪০টা সংগঠন একযোগে আন্দোলন করছে। একেকটা সংগঠন একেক রাজনৈতিক মত ও পথের। কিন্তু সেসব বাধা হয়নি। ২০১৯ থেকে শুরু হয় আন্দোলন। প্রথমে নটা সংগঠন একজোট হয়, তারপর আরো কিছু কৃষক সংগঠন আসে। ক্রমশ ঘরে ঘরে তৈরি হল আন্দোলনের সৈনিক। গণজাগরণ ঘটে গেল গোটা পাঞ্জাবে। সকলে ২০২১ সালের লড়াইটা দেখছেন, আসলে কিন্তু সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে।

খাপ পঞ্চায়েতও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। আসলে খাপ হল উত্তর ভারতের বাস্তবতা। কে কেমন করে তাকে ব্যবহার করবে, তার উপর অনেককিছু নির্ভর করে। যদিও পাঞ্জাবে খাপের তেমন ভূমিকা নেই, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশে আছে।আসলে কখনো কখনো শাসক খাপকে ব্যবহার করে। অধিকাংশ সময়েই তাই হয়। আবার কখনো কখনোবিরোধীরাও ব্যবহার করতে পারে। এবার যেমন ঠিক তাই হল। আমার মনে হয়, কথাবার্তা চালিয়ে যেতে হবে। দরজা বন্ধ করে দিলে চলবে না। নমনীয় হলে বহু সম্ভাবনার দরজা খুলে ফেলা সম্ভব।

আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা কিন্তু বিরাট। বিশেষ করে পাঞ্জাবে বামেদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রাকেশ টিকায়েত বড় নেতা, কিন্তু তিনি পরে এসেছেন। বামেরা বরং শুরু থেকেই আছেন। পাঞ্জাবে তো বামশক্তিরই মূল ভূমিকা। আন্দোলনের ভরকেন্দ্র কিন্তু পাঞ্জাবই। সেখানকার বড় বড় ইউনিয়নগুলো বাম প্রভাবিত। বিপ্লবী ধারাগুলোও শক্তিশালী। অন্যদিকে রাকেশ টিকায়েত পরে এলেও প্রচার পেয়েছেন। তাতে সংবাদমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। তবে আন্দোলনের মূল শক্তি টিকায়েত — এটা একদম ভুল ধারণা। সাহারানপুরে সোশালিস্টরাও আছেন। তাঁদের ভাল প্রভাব। আর আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ যে পাঞ্জাবের কোর বামপন্থীরা, সে কথা আগেই বলেছি। বিশেষ করে বিপ্লবী ধারার বামপন্থীরা খুবই সক্রিয়।

আসলে পাঞ্জাবে তিনটে শক্তির সমাহার হয়েছে।নানা ধারার বামপন্থী, সমাজবাদী আর শাসকশ্রেণির নানা দলের প্রভাব। গাজিপুরের পর কিন্তু টিকায়েত এলেন। সিঙ্ঘুবর্ডার বা টিকরি বর্ডারে প্রথম থেকেই আছেন বামেরা। গাজিপুর তো প্রথমে অবরুদ্ধ ছিল না। ছাব্বিশে জানুয়ারির পর অবরোধ শুরু হল। আসলে মিডিয়া একরকম করে দেখায়। যদিও এখন এই আলোচনার প্রয়োজন নেই। আর টিকায়েতরা তো উত্তর ভারতের কৃষকদের বড় অংশের নেতা বটেই। তাঁদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

এই আন্দোলনের ফসল কে ঘরে তুলবে তা নিয়ে গবেষণা চলছে, চলুক। বিরোধীরা তাদের মত করে নানা অঙ্ক কষছে। সে তো কষবেই। কিন্তু বাংলায় মমতা ব্যানার্জির দলের জয় না এলে কি আন্দোলন থামত? এই আন্দোলন মমতাকে সাহায্য করেছে হয়ত, কিন্তু তাতে কী যায় আসে? মমতা বা রাহুল গান্ধীর সাফল্য চেয়ে কি আন্দোলন হয়েছে? এটা ছিল ভারতের শাসক শ্রেণির, কর্পোরেট জগতের এজেন্ডা। ওরা সেটা চাপিয়ে দিচ্ছিল। সেটাকে তো আটকানো গেল। এভাবেই আমি দেখি। কর্পোরেটের পথে মনমোহন সিং, পি চিদাম্বরম আগেইগেছেন। নরেন্দ্র মোদী ওঁদের পথেই আরও এগিয়েছেন। তাহলে? একথা ঠিক যে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের জন্যই হয়ত দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। কিন্তু সে তো শাসকের নিজের হিসাব। আন্দোলন তার তোয়াক্কা করে না। বিজেপি উত্তরপ্রদেশে জিতলেও কি সব অর্থহীন হয়ে যাবে? আদৌ সম্ভব? কৃষকরা তো তাঁদের বাঁচার জন্য করলেন এই লড়াই। সেই যুদ্ধে জয় এল। রাহুল গান্ধী কি কংগ্রেসের কর্পোরেটবান্ধব নীতি থেকে সরবেন? মনে হয় না। তখন প্রয়োজনে আরও লড়াই হবে। তাই এই আন্দোলনকে ভোটের পাটিগণিত দিয়ে বিচার করা যায় না।

আগেও বললাম, আবারও বলি। একমাত্র গণআন্দোলনই বিভাজন মুছতে পারে। “ভাই ভাই” বলে লাভ হয় না। শ্রেণির লড়াই, বাঁচার লড়াই হল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার হাতিয়ার। কৃষক আন্দোলন এই শিক্ষাই দিল।

অনুলিখন: অর্ক

নিবন্ধকার পেশায় চিকিৎসক। IFTU-এর সংগঠক। চলতি কৃষক আন্দোলনের শুরু থেকেই দিল্লি সীমান্তে কর্মরত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.