বন সংরক্ষণ বিধি ২০২২ নিয়ে লিখছেন সুশান্ত ঝা। আজ তৃতীয় তথা শেষ পর্ব।

নতুন বিধির মাধ্যমে বনবহির্ভূত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য বনভূমি বরাদ্দ করার সময় গ্রামসভার অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বা আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের অধিকার সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গ্রামসভা বন অধিকার আইন ২০০৬-এর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পেসা আইন ১৯৯৬ বিশেষত তফসিলভুক্ত এলাকায় গ্রামসভাকে ক্ষমতা দিয়েছে। সেই ক্ষমতা কেড়ে নিলে বন অধিকার আইন ২০০৬ অর্থহীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ আদিবাসী এবং অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের বনভূমিতে প্রকৃতপক্ষে কোনো অধিকার থাকবে না এবং কেন্দ্রীয় সরকার ফের বনভূমির উপর সীমাহীন এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাবে। কর্পোরেটদের জন্য হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি বরাদ্দ করবে এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী ও বনবাসীরা নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন অথবা উচ্ছেদ হবেন। এই বিধির সুযোগ নিয়ে কর্পোরেট তথা বহুজাতিক সংস্থাগুলো জঙ্গল কেটে মাটির নিচের খনিজ পদার্থ ও বিভিন্ন বনজ সম্পদ লুঠ করবে। এই কর্পোরেটবান্ধব নীতি প্রায় ৪০ কোটি আদিবাসী এবং অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীর জীবন ও জীবিকা ধ্বংস করবে।

প্রচুর পরিমাণ জঙ্গল ধ্বংস হওয়ার ফলে আমাদের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হবে। এই কারণেই আদিবাসী ও পরম্পরাগত বনবাসীদের বন অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কাজ করা অনেক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন, গণতান্ত্রিক সংগঠন, এমনকি অনেক বিরোধী দলও এই বন সংরক্ষণ বিধির বিরোধিতা করছে।

বন সংরক্ষণ বিধি ২০২২-এ অবশ্য লেখা আছে, রাজ্য সরকার বনবহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য বন কেটে জমি তৈরি করার অনুমতি দেওয়ার সময়ে বন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের উপর তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব মূল্যায়ন করবে। কিন্তু আদিবাসী ও অন্যান্য বনবাসীদের উপর যে প্রভাব পড়বে সে সম্পর্কে কী করা হবে তা নিয়ে কোনো কথা এই বিধি বলছে না। কোথাও তাদের মত প্রকাশের অধিকারের কথাও নেই। বিধি বলছে, যে বনবহির্ভূত কাজের জন্য বনভূমি হস্তান্তর অনুমোদনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বনের জন্য ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজনের অর্থ কেন্দ্রের কোষাগারে যাবে। কিন্তু ওই অংশে বসবাসকারী আদিবাসী ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বনবাসীদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নেবে কেন্দ্রীয় সরকার – এমন কথা বলা নেই। এসব ক্ষেত্রে যদি তারা বাস্তুচ্যুত হয় বা তাদের বনভিত্তিক জীবিকা হারিয়ে যায়, তবে তারা কোনো ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন পাবে না। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বিধির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের প্রায় ৪০ কোটি আদিবাসী ও পরম্পরাগত বনবাসী, যারা দেশের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ২৮%, তাদের অধিকার ও জীবিকা কেড়ে নিতে চায় এবং তাদের উচ্ছেদ করে বনভূমি দেশি ও বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে চায়।

এই বিজ্ঞপ্তির ৮ নং ধারা স্পষ্ট বলছে, পাঁচ হেক্টরের বেশি যে কোনো বনভূমি অন্য কোনো বনবহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করার জন্য ভারত সরকারকে আর বন ও পরিবেশ বিভাগ দ্বারা গঠিত বন উপদেষ্টা কমিটির কাছে যেতে হবে না। আরও বলছে, প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের উচিত তাদের নিজস্ব পাঁচ সদস্যের প্রকল্প স্ক্রিনিং কমিটি তৈরি করা এবং তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো। এই নিয়ম লাগু হলে বিস্তীর্ণ বনভূমি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহৃত হবে এবং ব্যাপক অরণ্য ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হবে। অবশ্যই তার আর্থিক ক্ষতিপূরণ কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যদি সেই টাকা দিয়ে নতুন করে বনসৃজন করে তাহলেও কি পুরনো অরণ্য ধ্বংসের প্রকৃত ক্ষতিপূরণ হবে? না, তা হবে না প্রধানত দুটো কারণে। প্রথমত, এক একটা জঙ্গল, তার সমস্ত গাছপালা, লতাগুল্ম, পশুপাখি, জীববৈচিত্র্য, ঝর্না, জলধারা তথা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সমেত তৈরি হতে যুগ যুগ এমনকি শতাব্দী কেটে যায়। দ্বিতীয়ত, নতুন বনসৃজন করার সময়ে সরকারের লক্ষ্য থাকে বাণিজ্যিক লাভের দিকে, সত্যিকারের জঙ্গল সৃষ্টি করার দিকে নয়। কাজেই সরকার যেসব গাছ লাগায় তা বনবাসী মানুষের কাজে লাগে না, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়। বনবাসীদের কাজে লাগে শাল, মহুয়া, আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ। কিন্তু সরকার লাগায় ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি জাতীয় গাছ, যা ঘন আবরণ তৈরি করে না, কোন কোনটার তলায় গুল্ম পর্যন্ত জন্মায় না। সরকারি ভাষ্যে ঘন আবরণ তৈরি হওয়া জঙ্গল হল উগ্রপন্থীদের বিচরণ ক্ষেত্র।

কাজেই খাতায় কলমে জঙ্গলের ক্ষতি পূরণ করতে নতুন জঙ্গল গড়ে ওঠে, হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশ জরিপে তার পুষ্টিও হয়। কিন্তু প্রকৃত ঘন জঙ্গল গড়ে ওঠে না। ফলে এই তথাকথিত বনসৃজনে জঙ্গলের অধিবাসীদের কোনো উপকার হয় না। শুধু তা-ই নয়, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিও পূরণ হয় না। ঘন জঙ্গল বন্যা, খরার বিরুদ্ধে এক প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। এই নির্বিচার ধ্বংসের ফলে সেই রক্ষাকবচ দুর্বল হয়, মানুষের জীবনে মারাত্মক দুর্বিপাক নেমে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

যদিও বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮০-র সংশোধনী হিসাবে এই বিধি আনা হয়েছে, এর আসল লক্ষ্য বন অধিকার আইন ২০০৬। সরকার বিদ্যমান বন অধিকার আইনকে দুর্বল করে কর্পোরেটদের প্রশ্রয় দিতে চায়, কিন্তু ২০০৬ সালের আইন সংশোধন করতে সাহস পাচ্ছে না। মনে করছে তাতে বড় আন্দোলন সৃষ্টি হতে পারে এবং তাদের রাজনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। আবার যেহেতু বন ও পরিবেশ মন্ত্রক এবং আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক – দুটো দপ্তরই এই আইনের সাথে জড়িত এবং কোনো কোনো সময় পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেয়, তাই সরকার তাদের প্রচেষ্টার সমন্বয় ঘটানোর জন্য আরও বেশি সময় চায়। তাছাড়া বন অধিকার আইন সংশোধনের জন্য খোলাখুলিভাবে বিল আনলে সরকারের কর্পোরেটপন্থী অবস্থান জনগণের সামনে উন্মোচিত হবে এবং আদিবাসীবিরোধী হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার বিপদ থাকবে। এমতাবস্থায় সরকার পিছনের দরজা দিয়ে বন সংরক্ষণ বিধি সংশোধন করে বন অধিকার আইনকে দুর্বল ও অকেজো করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আরো পড়ুন প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব

১৯৮০ সালের বন সংরক্ষণ আইন প্রণীত হওয়ার পরেও অরণ্য রক্ষা ও বিকাশের জন্য সেই আইনকে ব্যবহার না করে কীভাবে বনের জমি বনবহির্ভূত কাজের জন্য হস্তান্তর করা যায় সেদিকেই সরকার নজর দিয়ে এসেছে। উন্নয়নের নামে সরকার প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ একর বনভূমি বড় ব্যবসায়ী ও কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার হাতিয়ার হিসাবে ওই আইনকে ব্যবহার করেছে। ২০০৬ সালের পর বনভূমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও বহু বছর ধরে বড় আকারে অরণ্য ধ্বংস চলেছে। বন অধিকার আইন ২০০৬-এর বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২,৫৩,১৭৯ হেক্টর বনভূমি বনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য হস্তান্তরিত হয়েছিল এবং ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজনের নামে বরাদ্দ হয়েছিল আরও ৪৭,৫০০ হেক্টর বনভূমি। বন সংরক্ষণ বিধির সর্বশেষ সংশোধনী উন্নয়নের নামে হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

১০.৫ কোটি আদিবাসীসহ প্রায় ৪০ কোটি মানুষ আমাদের বনাঞ্চলে বাস করেন। আদিবাসী রাষ্ট্রপতির সান্ত্বনা পুরস্কারের আড়ালে বিজেপি-আরএসএস নেতৃত্বাধীন মোদী সরকারের এই কাজ জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। সর্বশক্তি দিয়ে এই জনবিরোধী তথা আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীবিরোধী বিধিকে প্রতিহত করা সমস্ত দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক মানুষের আশু কর্তব্য।

লেখক কৃষক সংগঠন এআইকেএমএসের সর্বভারতীয় সহ সভাপতি ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.