কর্ণাটকের নির্বাচন পর্ব শেষ হল। এই লেখার সময়ে কংগ্রেস ১৩৫ আসনে জয়ী ঘোষিত, আরও একটা আসনে এগিয়ে। বিজেপি ৬৫ আসন জিতে অনেক পিছনে শেষ করেছে, জনতা দল সেকুলার (জেডিএস) জিতেছে ১৯ আসনে।
আসলে এই ফল নিয়ে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না। কংগ্রেস কত বড় ব্যবধানে জিতবে সেটাই ছিল প্রশ্ন। অ্যাক্সিস-মাই ইন্ডিয়া আর সি-ভোটারের মত দু-একটা বুথফেরত সমীক্ষা শেষপর্যন্ত যে সংখ্যাগুলো পাওয়া গেল তার কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছিল। সমস্ত ফলাফল এসে যাওয়ার পর অঞ্চলভিত্তিক ফলগুলো দেখে গভীর বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু কংগ্রেস কী করে এই ফল করল সে সম্পর্কে আপাতত আমরা কয়েকটা ইঙ্গিত পেয়েছি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রথমত, কংগ্রেস সমস্ত সম্প্রদায় এবং গোষ্ঠীর মধ্যেই আগের চেয়ে ভাল ফল করেছে। সংখ্যালঘুরা বিপুলভাবে কংগ্রেসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৮৮% মানুষ কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। ব্যাপারটা অনেকটা ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে যা হয়েছিল তার মত। সেবার ৯০% সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কর্ণাটক রাজ্যে এবার কংগ্রেস তফসিলি জাতির ভোটারদের ৬০ শতাংশের ভোটও পেয়েছে। কুরুবা এবং তফসিলি উপজাতিদের মধ্যেও কংগ্রেসই অন্যদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। তার উপর ভোক্কালিগা আর লিঙ্গায়েতদের মধ্যে কংগ্রেস আগের চেয়ে ভাল ফল করেছে। একমাত্র ৬১ বছরের বেশি বয়সী ভোটার ছাড়া আর সব বয়সের ভোটারদের মধ্যেই কংগ্রেস সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। মহিলাদের মধ্যেও কংগ্রেসই এগিয়ে।
স্থানীয় ইস্যু, স্থানীয় নেতৃত্বের উপর জোর দিয়ে কংগ্রেসের প্রচারাভিযান প্রায় নিখুঁত ছিল। কর্ণাটকের প্রচারের মডেল অন্য রাজ্যগুলোতেও অনুসরণ করার মত। এ সম্পর্কে পরে আরও বলছি। আপাতত বিজেপি এরপর কী করতে পারে সে প্রশ্নে আসা যাক।
তারা স্বীকার করুক আর না-ই করুক, বিজেপি এই নির্বাচনটাকে নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে গণভোট করে তুলেছিল। বলা যায় এটা খুব বড় বাজির জুয়া ছিল, যা দুর্দান্তভাবে বিজেপি হেরেছে। এমন নয় যে প্রধানমন্ত্রী খুব অনিচ্ছার সঙ্গে এরকম একটা প্রচারে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে যা যা করা সম্ভব সবই করেছিলেন। বজরংবলী আর বজরং দলের তফাত ঘেঁটে দিতে চেষ্টা করেছেন, কর্ণাটক ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাবে – এরকম একটা আজগুবি ভয়ও তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন। যতরকম নোংরা কৌশল জানা আছে তার কোনোটাই প্রয়োগ করতে বাকি রাখেননি, তারপরেও ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে ব্র্যান্ড মোদী ধাক্কা খেয়েছে। রীতিমত বড়সড় ধাক্কা।
শেষ ফলাফল যা হয়েছে তাতে কর্ণাটকে আর অপারেশন কমল করার উপায় নেই। অন্তত অদূর ভবিষ্যতে তো নয়ই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পর্যুদস্ত বিজেপি হল বিপজ্জনক বিজেপি। ওরা নতুন সরকারকে অস্থির করতে সবরকম চেষ্টা করবে। যেমন উপকূলবর্তী কর্ণাটকের মত স্পর্শকাতর এলাকায় অশান্তি বাধাতে চাইবে।
তবে আপাতত যে জিনিসটা নিয়ে সকলের উৎকণ্ঠা তা হল পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন। দুজন জোরালো এবং যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড এই ব্যাপারটা কীভাবে সামলান তা দেখার মত ব্যাপার। তবে অতীতের দৃষ্টান্ত থেকে মনে হয় দুজনেরই পছন্দসই ফর্মুলা তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগবে এবং শেষপর্যন্ত সেই ফর্মুলা অনুযায়ী ডি কে শিবকুমার লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত সংগঠনের দায়িত্ব সামলাবেন, তারপর রাজ্য সরকারে যোগদান করবেন। তবে এটা নেহাতই আমার অনুমান।
এবার আসা যাক জাতীয় রাজনীতিতে এই ফলাফলের প্রভাবের আলোচনায়।
এর আগের লেখাতেই লিখেছিলাম, কর্ণাটকের নির্বাচন অন্য রাজ্যের এবং জাতীয় স্তরের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। সমালোচক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একথা পড়ামাত্রই বলে উঠবেন, ভারতের মানুষ বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচনে আলাদা আলাদা চিন্তাভাবনা নিয়ে ভোট দেন। এই বিশ্লেষকরা নিজেদেরই বোঝানোর জন্য উঠেপড়ে লাগেন যে মানুষ চান “দিল্লিতে মোদী আর রাজ্যে অন্যরা”। এর সমর্থনে অতীতের কিছু দৃষ্টান্তও তাঁরা তুলে ধরেন। কিন্তু সত্যিই কি এই তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য? যদি ভোটাররা রাজ্যের ভোটে কর্মসংস্থানের অভাব, মহিলাদের নিরাপত্তা, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধির মত ইস্যুর কথা ভেবে ভোট দেন তাহলে জাতীয় স্তরের ভোটে হঠাৎ এইসব ইস্যু ভুলে যাবেন কেন? কেন্দ্রীয় সরকার কি এই বিষয়গুলোর জন্যেও দায়ী নয়? যদি এই দুটো প্রশ্নের উত্তরই “হ্যাঁ” হয়, তাহলে বিরোধীদের কাজ এই ইস্যুগুলোকে একেবারে নিচের স্তরেও তুলে ধরা। এমনিতে ভারতের প্রত্যেকটা রাজ্যেরই কিছু নিজস্ব ইস্যু আছে, যার কয়েকটা আবার সর্বত্র প্রযোজ্য। তবে অনেক ইস্যুই একটা রাজ্য বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কংগ্রেসের কর্ণাটক নির্বাচনের প্রচার দেখিয়ে দিয়েছে যে সেই ইস্যুগুলোকে তুলে ধরতে পারলে অতি বিরাট জনসংযোগ ও প্রচারযন্ত্রও ভেঙে পড়তে পারে।
সমালোচকরা ভারত জোড়ো যাত্রাকে কোনো নম্বরই দিচ্ছিলেন না। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে পরিষ্কার যে এই যাত্রা কর্ণাটকে দারুণ কাজ দিয়েছে। যে কুড়িটা বিধানসভা এলাকার মধ্যে দিয়ে রাহুল গান্ধী গিয়েছিলেন তার মধ্যে কংগ্রেস জিতেছে ১৫ আসন, জেডিএস তিনটে আর বিজেপি মাত্র দুটো।
While this is the direct impact of the #BharatJodoYatra in Karnataka, the intangible impact was uniting the party, reviving the cadre and shaping the narrative for the Karnataka elections. It was during the Bharat Jodo Yatra, from the many conversations @RahulGandhi had with the… pic.twitter.com/r1JOWMoei3
— Jairam Ramesh (@Jairam_Ramesh) May 13, 2023
ওই যাত্রার ফলে তৃণমূল স্তরের সংগঠন পুনরুজ্জীবিত হয় এবং কর্ণাটকের নেতৃবৃন্দ তার উপর ভিত্তি করেই পার্টিতে নতুন গতি আনেন। কংগ্রেসকে এই তৃণমূল স্তরের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার কাজটা চালিয়ে যেতে হবে।
আরো পড়ুন মোদী নয় তো কে? উত্তর রাহুল গান্ধী
এছাড়াও কংগ্রেসকে এমন একটা পার্টি হয়ে উঠতে হবে, মানুষ আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্যে সবার আগে যার দিকে তাকায়। কর্ণাটকের ক্ষেত্রে সেটা করতে পারা গেছে। তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশার মত রাজ্যগুলোতেও এটা করার সুযোগ রয়েছে। কংগ্রেস বরাবরই ছিল একটা ছাতা বা মঞ্চের মত, যেখানে বহুরকমের আদর্শ জায়গা পেয়েছে। এখনো সামান্য এদিক ওদিক করলেই কংগ্রেসকে আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলোর জোট হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব।
একটা জিনিস সকলের বুঝে নেওয়ার দরকার। কংগ্রেসকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় না রেখে কেন্দ্রে কোনো অবিজেপি সরকার তৈরি করা সম্ভব নয়। কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল সেই জায়গাটার প্রতি কংগ্রেসের দাবিকে অনেক জোরদার করে দিল। এর ফলে কংগ্রেসের নিজের মধ্যেও রাজস্থান, আসামের মত রাজ্যে সংগঠনকে মেরামত করার তাগিদ তৈরি হওয়া উচিত।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








