সারা দেশে এখন ভুয়ো খবরের ছড়াছড়ি। মানুষ যত আধুনিক হচ্ছে, যত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে সে তত বেশি ভুয়ো খবরে বিশ্বাস করছে। গত দশ বছরে ভুয়ো খবরের রমরমা বেড়েছে। সোশাল মিডিয়া, মূলত ফেসবুক এবং হোয়াটস্যাপ, হয়ে উঠেছে ভুয়ো খবর ছড়ানোর মাধ্যম। একটা সময়ে আমরা জানতাম যে ধর্ম হচ্ছে আফিম। এখন দেখা যাচ্ছে স্মার্ট ফোন হচ্ছে আফিম, যা দিয়ে আজকের সময়ের সব বয়সী মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা যাচ্ছে। ফেসবুক বা এক্সের মত সোশাল মিডিয়ায় তাও বোঝা যায় কে বা কারা ভুয়ো খবরের উৎস। হোয়াটস্যাপে সে উপায়ও নেই।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ভুয়ো খবর রুখতে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি চিঠি লিখেছেন। সাইবার অপরাধের মোকাবিলা এবং সোশাল মিডিয়ায় প্ররোচনামূলক ও ভুয়ো খবর ছড়ানোর প্রবণতা কী করে আটকানো যায়, তা নিয়েই তাঁর এই চিঠি। সেখানে তিনি লিখেছেন ‘সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ঘটনায় সোশাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর খবর এবং জাল ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে সমাজের একাংশে আগ্রাসী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, দেশে সাইবার অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে, ডিজিটাল গ্রেফতারির ভয় দেখানোর মত ঘটনা সামনে আসছে, তাতে বিশ্বাস করে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বহু মানুষ। সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো খবর, তথ্য এবং ভিডিও সমাজের কাঠামোকে দুর্বল করছে। ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত আসছে প্রতিদিন। এমনকি মহিলা, শিশু, বয়স্ক এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই প্রবণতা রুখতে কড়া আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। এই চিঠির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে ভুয়ো খবর এবং সাইবার প্রতারণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে মহিলা, শিশু, প্রবীণ এবং দুর্বল আর্থসামাজিক অবস্থানের নাগরিকদের। এঁদের পক্ষে এই সব প্রযুক্তিগত অপরাধ প্রতিহত করা বা প্রতিকারের পথ খোঁজা কার্যত অসম্ভব।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখন সমস্যা হল, এই ধরনের ভুয়ো খবর বা সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়ানো কি কোনো রাজ্য সরকার বন্ধ করতে পারে? যেসব অসাধু ব্যক্তি এসব কাজ করছে, তাদের কি রাজ্য পুলিস গ্রেফতার করতে পারে? করলে তার পরিণতি কী হতে পারে? আইনত পারে। কিন্তু মূলত যাঁরা এই বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন তাঁরা তো কেন্দ্রের শাসক দলের কুখ্যাত আইটি সেলের কর্মী। তারা উদ্যোগ নিলেই এ জিনিস অনেকখানি কমিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু তা করার জন্য যে সদিচ্ছা প্রয়োজন, তা কি শাহ কিংবা অমিত মালব্যদের আছে? মনে পড়ে যাচ্ছে দুটো ঘটনার কথা, যা আইটি সেলের প্রচার এবং প্রভাবের বিস্তার প্রমাণ করে।

প্রথমত, একবার শাহ নিজেই বলেছিলেন, তাঁদের আইটি সেলের এত প্রভাব যে তাঁরা যে কোনো খবরকে দু ঘন্টার মধ্যে ভাইরাল করে দিতে পারেন। সেই সময়েই হঠাৎ শোনা যায়, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব নাকি তাঁরা বাবা মুলায়ম সিং যাদবকে ভরা জনসভায় চড় মেরেছেন। মুহূর্তে সেই খবর পুরো উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা গিয়েছিল, খবরটা সম্পূর্ণ মিথ্যে।

দ্বিতীয় ঘটনা অপারেশন সিঁদুরের সময়কার। ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের মধ্যে যখন বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রী ঘোষণা করেন যে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তখন কীভাবে আইটি সেলের কর্মীরা তাঁকে এবং তাঁর কন্যাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে, তা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যাননি। বিক্রম বাধ্য হন তাঁর এক্স হ্যান্ডেল লক করে দিতে। পরবর্তীকালে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, কারা বিক্রম ও তাঁর পরিবারকে সোশাল মিডিয়ায় কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেছিল সে ব্যাপারে তার কাছে নাকি কোনো তথ্যই নেই।

এই আইটি সেল এখন বোতল থেকে বের হওয়া এক দৈত্য, যাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বিজেপির আর নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী চিঠি দিলেও যে এ বিষয়ে কিছু করা সম্ভব নয়, তা বিজেপি নিজেও বুঝতে পারছে। অথচ তাদেরও হাত-পা বাঁধা। ওদিকে কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকার এ বিষয়ে একটা আইন করতে চলেছে। ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা বিভিন্ন রাজ্যের ভুয়ো খবর সংক্রান্ত যে আইন আছে, তার তুলনায় সেই আইন আরও বেশি কঠোর। এমনিতে এই আইনের উদ্দেশ্য দেখতে শুনতে ভালই। অপতথ্য বা ভুয়ো খবর প্রচার করে কেউ যাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে না পারে, সেইজন্যই এই আইন আনা হচ্ছে বলে খবর। কিন্তু বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষজন বলছেন, এই আইনের মাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠ দমন করাই লক্ষ্য। মজার কথা, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য যে ইশতেহার কংগ্রেস প্রকাশ করেছিল, তাতে অবাধ বাকস্বাধীনতা রক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল।

আরো পড়ুন আর জি কর: ভুয়ো খবর ছড়ানোয় সংবাদমাধ্যম, প্রশাসনও দায়ী

কর্ণাটকের প্রস্তাবিত আইনে সমস্যা কোথায় তা বুঝতে আইনজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কংগ্রেস যখনই ক্ষমতায় থেকেছে, এমন অনেক কাজ করেছে যা ভবিষ্যতে তাদেরই ক্ষতি করেছে। আধার থেকে শুরু করে ইউএপিএ – সবই তার উদাহরণ। কর্ণাটকের মিসইনফর্মেশন অ্যান্ড ফেক নিউজ প্রোহিবিশন বিল, ২০২৫ দেখেও সেরকমই মনে হচ্ছে। ২০২৩ সালে ‘স্ট্যাটাস অফ পুলিসিং ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এক বেসরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে দেশের দুই তৃতীয়াংশ মানুষের আশঙ্কা – সোশাল মিডিয়ায় করা যে কোনো মন্তব্যের জন্য তাঁদের পুলিসি হেনস্থার শিকার হতে হবে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এই আশঙ্কা বেশি। কংগ্রেসের উচিত ছিল এ নিয়ে বেশি কথা বলা। তার পরিবর্তে তারা এমন এক বিল আনছে যাতে তারা আদপে কী চায় – সেটাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এ বিষয়ে অতীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে একখানা মামলা হয়েছিল। তখন সর্বোচ্চ আদালত বলেছিল যে আইনে অপরাধের সংজ্ঞা যত অস্পষ্ট থাকে, নাগরিক অধিকার হরণে সেই আইন তত বেশি ব্যবহৃত হয়। কোনটা সচেতন মিথ্যাচার, কোনটা সৎ ভ্রান্তি, কোনটা ইচ্ছাকৃত ভুয়ো খবর ছড়ানো, কোনটি অসতর্কতামূলক আচরণ – তা এই আইন দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। নারীবিদ্বেষী মন্তব্য এবং সনাতন প্রতীকের প্রতি অসম্মানজনক বক্তব্যকেও কর্ণাটকের প্রস্তাবিত আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। কোন বক্তব্যের ভিত্তিতে কে অসম্মানিত বোধ করলে অপরাধ হবে, তাও স্পষ্ট করে বলা নেই। অর্থাৎ এই বিল আইন হয়ে দাঁড়ালে শাসকই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন – এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কর্ণাটক সরকারের এই বিল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে যদি অন্য রাজ্যগুলো এবং কেন্দ্রীয় সরকার নতুন কোনো বিল আনে, তাহলে তা যে কর্ণাটক কংগ্রেসের আনা বিলের চেয়েও বেশি কঠোর হবে তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমবঙ্গেও এই ধরনের আইন করা হলে যে সমূহ বিপদ, তা বলাই বাহুল্য। অল্টনিউজের মত যেসব সংস্থা ভুয়ো খবর বা অপতথ্য রোখার কাজ করে চলেছে, এই ধরনের আইন যে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে না – তা কে বলতে পারে? সরকারের তরফ থেকে ভুয়ো খবর সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার বদলে এই ধরনের আইন প্রণয়ন যে ক্ষতিই করবে তাতে সন্দেহ নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য হয়ত সৎ, কিন্তু বিজেপি যদি এই অজুহাতে কোনো দমনমূলক আইন আনে, তখন কি তৃণমূল কংগ্রেসের তার বিরোধিতা করার মুখ থাকবে? কংগ্রেসই বা কর্ণাটকের অমন আইন করার পর কী করে তখন প্রতিবাদ করবে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.