কিবরিয়া আনসারি

‘আমাদের মারধোর করে রাস্তার কুকুরের মত দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, আধার আর ভোটার কার্ড দেখানোর পরেও। আমাদের টাকাপয়সা, ফোন – সবকিছু কেড়ে নিয়ে এমনভাবে অন্য দেশে ঠেলে দিল, যেন আমরা অপরাধী,’ বললেন নাজিমুদ্দীন মন্ডল। তিনি মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা একজন রাজমিস্তিরি। আরও ছজন বাঙালি শ্রমিকের সঙ্গে তাঁকেও এই দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। তাঁদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইনিউজরুম দীর্ঘদিন ধরেই লিখে আসছে যে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী মুসলমান প্রবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে দেগে দেওয়ার বিপদ রয়েছে। সেই সম্ভাবনা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। নিরপরাধ শ্রমজীবীদের আটক করা হচ্ছে, মারধোর করা হচ্ছে এবং সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

এমাসে পশ্চিমবঙ্গবাসী যে সাতজন প্রবাসী শ্রমিককে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, নাজিমুদ্দীন তাঁদেরই একজন। অথচ তাঁরা প্রত্যেকে ভারতীয় নাগরিক এবং তাঁদের বৈধ পরিচয়পত্র রয়েছে। এই ভয়ানক ঘটনায় স্থানীয় স্তরে আক্রোশ তৈরি হয়েছে, রাজ্যস্তরে রাজনৈতিক নিন্দা হয়েছে এবং ভারতে প্রবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করা হয়, বিশেষত যে বাংলাভাষী শ্রমিকরা বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে কাজ করেন তাঁদের সঙ্গে, তা ফাঁস হয়ে গেছে।

মহারাষ্ট্রে আটক করে কোচবিহার থেকে নির্বাসন

নাজিমুদ্দীন মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া ব্লকের টারিটিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মুম্বইতে আরও তিনজনের সঙ্গে রাজমিস্তিরি হিসাবে কাজ করছিলেন। সেই তিনজন হলেন হোসেনপুরের (ভগবানগোলা) মেহবুব শেখ, কাজিশাহার (বেলডাঙা) মীনারুল শেখ এবং কুলুট গ্রামের (মন্তেশ্বর, পূর্ব বর্ধমান) মোস্তাফা কামাল। গত ১০ জুন চারজনকেই মুম্বই পুলিস বাংলাদেশি সন্দেহে তুলে নিয়ে যায়।

তারপর যা ঘটে তা যেমন অদ্ভুত তেমন ভয়াবহ। ওঁদের পরিচিতি যাচাই করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার বদলে মহারাষ্ট্র পুলিস এই চারজনকে শিলিগুড়িতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। তারপর যথাযথ যাচাই বা আদালত নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়াই বিএসএফ তাঁদের কোচবিহারের মেখলিগঞ্জের কাছে জিরো পয়েন্টে নিয়ে যায় এবং বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয় দুজন সত্যিকারের বাংলাদেশির সঙ্গে।

বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নাজিমুদ্দীন একখানা ভিডিও বার্তা রেকর্ড করেন এবং ছড়িয়ে দেন, যা শেষমেশ তাঁর গ্রামের লোকেদের কাছে পৌঁছে দেয়। তাঁরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

স্থানীয় হইচইয়ের ফলে উদ্ধার

হরিহরপাড়ার বাসিন্দা শামীম রহমান বললেন, ভিডিওটা তাঁর চোখে পড়ে এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে জেলা পরিষদ সদস্য জিল্লার রহমান আর স্থানীয় বিধায়ক নিয়ামত শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরাই নাজিমুদ্দীনদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

ব্যাপারটা দ্রুত ওয়েস্ট বেঙ্গল মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলামের কাছে পৌঁছয়। তিনি বিএসএফ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্থানীয় পুলিস এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাজিমুদ্দীনদের ফিরিয়ে আনেন। ওঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আধার, ভোটার পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র দেখানো হয়।

ইতিমধ্যে ওঁদের পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নাজিমুদ্দীনের বউ পিংকি বিবি কাঁদতে কাঁদতে বললেন ‘ও নিরাপদে আছে জেনেই আমি খুশি হয়েছিলাম। যারা যারা ওকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’

‘ওরা সবকিছু নিয়ে নিয়েছিল, এমনকি আমার বউয়ের ফোনও’

একইরকম অভিজ্ঞতা ২১ বছর বয়সী ফজর মন্ডল আর তাঁর স্ত্রী তসলিমা মন্ডলের। ওঁরা উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বাগদার হরিহরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই দম্পতিও মহারাষ্ট্রে কাজ করছিলেন। পুলিস তাঁদের ১০ জুন রাত দুটোর সময়ে নয়ানগর থেকে তুলে নিয়ে যায়।

ফজরের বাবা তাহাজুল মন্ডল বললেন ‘ওরা আমাকে ফোন করে কাগজপত্র দেখতে চাইল। আমি হোয়াটস্যাপে সব পাঠালাম – আধার, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, স্কুল সার্টিফিকেট। ওরা ছেড়ে দেবে কথা দিল। তারপর ওর ফোন বন্ধ হয়ে গেল, আর যোগাযোগ করতে পারছিলাম না।’

১৪ জুন তাহাজুল একজনের থেকে একটা হোয়াটস্যাপ কল পান। যিনি কল করেছিলেন তিনি বলেন যে তিনি বাংলাদেশের দিনাজপুরের একজন বিজিবি অফিসার। ওই কলে ফজরের সঙ্গে কথা হয়, তাঁরা পরিবার জানতে পারে তাঁরা যা ভয় পাচ্ছিলেন ঠিক তাই ঘটেছে। অর্থাৎ মহারাষ্ট্র পুলিস তাঁদের কাগজপত্র আর ফোন কেড়ে নিয়ে ফজর আর তসলিমাকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাহাজুল রিপোর্টারদের বলেন ‘জানি না কী করে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে আনব। ও ভারতের নাগরিক। ওর একটাই দোষ – ও বাংলায় কথা বলে।’

ওই পরিবারের মরিয়া আবেদনে শেষপর্যন্ত কাজ হয়। কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চাপে বিএসএফ আর বিজিবি ফ্ল্যাগ মিটিং করে এবং ওই দম্পতিকে ফিরিয়ে আনা হয় উত্তর দিনাজপুরের বিন্দোলের কয়লাডাঙি সীমান্ত দিয়ে। তাঁদের রায়গঞ্জ থানার হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁরা পরিবারের কাছে ফিরে আসেন।

‘বাংলায় কথা বলার জন্যে চূড়ান্ত অবিচারের শিকার’

এই ঘটনার সর্বাত্মক নিন্দা হয়েছে। তৃণমূল সাংসদ সামিরুল এই নির্বাসনকে বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিকদের চাঁদমারি করে তাঁদের প্রতি ‘অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক’ আচরণ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তাঁর এক্স সোশাল মিডিয়ার পোস্টে সামিরুল অনেকগুলো প্রশ্ন তোলেন

বিএসএফ বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে, পুলিস নির্বাসিতদের ফিরিয়ে আনে

মুর্শিদাবাদ পুলিস সূত্রের খবর, উপর মহল থেকে হস্তক্ষেপের পর বিএসএফ বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং মুম্বই থেকে নির্বাসিত শ্রমিকদের ভারতে ফিরিয়ে এনে কোচবিহার জেলার পুলিসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুর্শিদাবাদ পুলিসের একটা দল তাঁদের বাড়ি ফিরিয়ে আনে।

বিধায়ক নিয়ামত বললেন ‘নাজিমুদ্দীন ভারতের বৈধ নাগরিক। তাঁর কাছে বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আরও কয়েকজনের সঙ্গে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।’

বাংলাভাষী বলেই আক্রমণের লক্ষ্য?

মানবাধিকার কর্মী এবং প্রবাসী শ্রমিকদের গোষ্ঠীগুলোর সতর্কবাণী – এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাঁদের মতে, বৈধ নাগরিকদের শুনানি, যাচাই, এমনকি সাধারণ প্রশাসনিক অনুসন্ধান ছাড়াই নির্বাসন গুরুতর চিন্তার ব্যাপার। এটা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটি নয়, জাতিগত এবং ভাষাগত চিহ্নিতকরণের ভিত্তিতে বৈষম্যের নিদর্শন।

আরো পড়ুন ভদ্দরলোকি ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে পারবে না

এই ধরনের ঘটনা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার কর্মী বললেন ‘এগুলো স্রেফ ভুল নয়। এগুলো গরিব মানুষের বিরুদ্ধে হিংসা। জীবিকা অর্জন করতে যেসব মানুষ বাড়ি থেকে দূরে যান এবং নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার সাহস করেন, এটা তাঁদের বিরুদ্ধে একেবারে রাষ্ট্রীয় হিংসা।’

নির্বাসিত সাতজন শ্রমিকই নিজের নিজের গ্রামে ফিরে এসেছেন, কিন্তু আতঙ্কটা রয়েই গেছে। নাজিমুদ্দীন বললেন ‘আমরা অপরাধী নই। কিন্তু আমাদের সাথে এমন ব্যবহার করল, যেন আমরা বুঝি যে আমরা এই দেশের কেউ নই।’

ইনিউজরুম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে ভাষান্তরিত। নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক, মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.