ওড়িশার জগৎসিংপুর জেলার ধিনকিয়া অঞ্চলে জিন্দাল গোষ্ঠীর ইস্পাত প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন গ্রামবাসী সাধারণ মানুষ। নবীন পট্টনায়কের সরকার বিশাল পুলিশবাহিনী পাঠিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী গ্রামবাসীদের উপর নামিয়ে এনেছে নৃশংস সন্ত্রাস।

গোড়া থেকে শুরু করা যাক। এই গল্পের শুরু বহুবছর আগে। ওড়িশার ধিনকিয়া জেলা সরকার ও বড় কর্পোরেটদের নেকনজরে ছিল। এখানে বারবার বড় শিল্প করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কয়লা, বক্সাইট উত্তোলন থেকে ইস্পাত প্রকল্প, রেলপথ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। ২০০৫ সাল থেকেই বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার পর অবশেষে ২০১৩ সালে ওড়িশা সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাতশিল্পের মহীরুহ পসকোর হাতে ২৭০০ একর জমি তুলে দেয় ইস্পাত প্রকল্পের জন্য। এই ২৭০০ একর জমি এককথায় বলপূর্বক অধিগ্রহণ করে সরকার। আর তার বিরুদ্ধেই গ্রামবাসীরা শুরু করেন জোরদার আন্দোলন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আন্দোলন যত তীব্র হয়েছে, ততই আন্দোলনকারীদের মিথ্যা মামলায় জেলে বন্দী করা, মিছিল মিটিং সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা, যখন তখন যে কোনো লোককে তুলে নিয়ে যাওয়া বেড়েছে। খবরে প্রকাশ, প্রায় চারশোর বেশি আন্দোলনকারীর নামে বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে, তবুও টলানো যায়নি গ্রামবাসীদের। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আইনি লড়াই পেরিয়ে, বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, এমনকি দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর পর অবশেষে ২০১৬ সালে পিছু হটতে বাধ্য হয় সরকার, পিছু হটে পসকো, আন্দোলন জয়যুক্ত হয়।

কিন্তু সেই জয়ের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী পায়নি। অধিকৃত জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি গ্রামবাসীদের। ২০১৭ সালে জিন্দাল উৎকল স্টিল কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের দেওয়া একটি প্রস্তাবে রাজি হয়ে ওড়িশা সরকার ওই পসকো প্রকল্পের এলাকাতেই জিন্দাল গোষ্ঠীকে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প, ইস্পাত প্রকল্প, সিমেন্ট কারখানা, জেটি প্রকল্প ইত্যাদি বানানোর ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। আবার নতুন করে শুরু হয় আন্দোলন। স্লোগান ওঠে “জিন্দাল গো ব্যাক”, “ নবীন পট্টনায়ক হায় হায়”।

২০২০ সালের আগস্ট মাসে নবীন সরকার নতুন করে ঘোষণা করে যে ওই ২৭০০ একর জমির সাথে আরও ২২০ একর জমি যুক্ত করে মোট ২৯২০ একর জমিতে পূর্বে উল্লিখিত জিন্দাল গোষ্ঠীর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করা হবে। প্রকল্পে বলা হয় এক ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হবে, সঙ্গে সঙ্গে এক ১০ এমটিপিএর সিমেন্ট গ্রাইন্ডিং ও মিক্সিং ইউনিট তৈরি করা হবে। ২০১৭ সাল থেকে গ্রামবাসীরা যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন, নতুন করে এই প্রকল্প ঘোষণার হওয়ার পর তা তীব্র হতে শুরু করল। জগৎসিংপুর জেলার ধিনকিয়া, গোবিন্দপুর, নুয়াগাঁও, বায়ানালা, কুন্ডা, পোলাঙ্গা, জটাধর সহ বিভিন্ন গ্রাম এই প্রকল্প অঞ্চলের অন্তর্গত। আর এই এলাকার মানুষ নিজেদের জমি দিতে নারাজ।

ওড়িশা সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ বিভাগের মন্ত্রী এবং ধিনকিয়ার বিধায়ক রঘুনারায়ণ দাস, জেলা কালেক্টর পারুল পাটওয়ারি সহ অন্যান্য সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্যোগে প্রকল্প এলাকার মানুষের সাথে এক সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় জিন্দাল গোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের উপস্থিতি মেনে নেননি গ্রামবাসীরা।

ধিনকিয়া অঞ্চল পান চাষের জন্য বিখ্যাত। বেশিরভাগ গ্রামবাসীই পান চাষের উপর নির্ভরশীল। অঞ্চলের বেশিরভাগ জমিই অরণ্যের আওতায় পড়ে। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে অরণ্য অধিকার আইন (Forest Rights Act, 2016)-এর অন্তর্গত রাইট টু রেকর্ডস (RoR) অনুযায়ী এই অরণ্য অঞ্চলের জমির যাবতীয় তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি।

শুধু ধিনকিয়াই নয়, একইসঙ্গে কোরাপুট জেলায় হিন্দালকো গোষ্ঠীকে, কলিঙ্গনগরে টাটা গোষ্ঠীকে, নিয়মগিরিতে বেদান্ত গোষ্ঠীকে বক্সাইট উত্তোলনের ছাড়পত্র দেয় নবীন সরকার। সবকটা প্রোজেক্টের বিরুদ্ধেই শুরু হয় জোরদার আন্দোলন। এই সমস্ত জায়গাতেও দেখা যায় সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর পুলিশি অত্যাচার, আন্দোলনকারীদের মিথ্যে মামলায় বন্দী করে রাখার মত ঘটনা।

তথ্য অনুযায়ী পসকোর জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করার সময় এই অঞ্চলের প্রায় ১.৭৯ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। এই বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ সরকারের নির্দেশে চালিয়েছিল কাঠ মাফিয়ারা। নতুন করে আবার এই প্রকল্প হলে কাটা যাবে কয়েক লক্ষ গাছ, ধ্বংস হবে বাস্তুতন্ত্র।

পান চাষী সহ অন্যান্য চাষের সাথে যুক্ত গ্রামবাসীদের পুনর্বাসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কোম্পানির পক্ষ থেকে। পান চাষীদের এককালীন ৪৪,০০০ টাকা, জমির একর প্রতি ১৭.৫ লক্ষ টাকা অবধি ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। চিংড়ি চাষীদের পরিবারপিছু এককালীন ৪০,০০০ টাকা এবং জমির একর প্রতি ২.৫ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসেছে কোম্পানির তরফ থেকে। আন্দোলনকারীরা সাফ জানিয়েছেন তাঁরা ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন কিছুই চান না। নিজেদের ভিটেমাটি, জমি ও জীবিকা ছেড়ে তাঁরা যেতে চান না।

জিন্দাল প্রতিরোধ সংগ্রাম সমিতি নামের একটি সংগঠন তৈরি করেছেন গ্রামবাসীরা। গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন গ্রামে সভা, পঞ্চায়েত বৈঠক, মিটিং মিছিল, সরকারি দপ্তরে চিঠি দেওয়ার কর্মসূচি চালিয়েছে এই সংগঠন। ধিনকিয়ার বাসিন্দা দেবেন্দ্র সোয়ানের নাম উঠে এসেছে এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে।

অন্যান্য প্রকল্পের মত এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে নবীন সরকারের পক্ষ থেকে ঢালাও প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের বিজ্ঞাপন। প্রায় ১২,০০০ চাকরির গালগল্পও শোনানো হচ্ছে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে। আন্দোলনকারীদের উন্নয়নবিরোধী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। জোর করে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলনও জোরদার হচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ছে গ্রামে গ্রামে পুলিশি পাহারা, পিকেটিং চলছে সর্বক্ষণ। যখন খুশি যে কারুর বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিস, মারধর করছে, থানায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে, মিথ্যে কেসে ফাঁসাচ্ছে। বেশিরভাগ গ্রামেই এখনো গ্রামসভা ডেকে সাধারণ মানুষের অনুমতি অবধি নেওয়া হয়নি।

এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তৈরি করা হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। নিজেদের গ্রামেই নজরবন্দি হয়েছেন ধিনকিয়ার মানুষ। নিজের জমিতে চাষ করতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না, প্রতিটা গ্রামে বসানো হয়েছে বাঁশের ব্যারিকেড। সেই ব্যারিকেডের সামনে বসেই মহিলারা, শিশুরা স্লোগান দিচ্ছেন, গান গাইছেন।

এক মাস আগে পুলিস ব্যাপক সন্ত্রাস চালায় গ্রামবাসীদের উপর। পান চাষী, মৎস্য চাষীদের জীবিকার একমাত্র সম্বল তাদের জমি, পুকুর ইত্যাদি নষ্ট করা হয়। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। এই ঘটনার পর আবার গত ১৪ জানুয়ারি সকালবেলা পুলিস নিজেই বাঁশের ব্যারিকেড ভেঙে রাস্তা করে দেয় গ্রামবাসীদের, যাতে দেখানো যায় যে গ্রামবাসীদের কাজে যেতে তারা বাধ্য দিচ্ছে না।

গ্রামবাসীরা কাজে গেলেও প্রতিবাদ করতে ছাড়েননি। নিজেদের কাজের জায়গায় নিজেদের মত জমায়েত করে প্রতিবাদ করেন। আর ঠিক সেইদিনই শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলের আয়োজন করেন গ্রামবাসীরা। অন্যান্য গ্রাম থেকে যাতে সাধারণ মানুষ ওই মিছিলে আসতে না পারেন তার জন্য আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেওয়া হয়। এরপর ওড়িশা পুলিস ব্যাপক লাঠিচার্জ করে জখম করে মিছিলে আসা নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের। মহিলা, শিশু সকলকেই মাটিতে ফেলে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়। খবরে প্রকাশ, নেতৃত্বকে মিথ্যা মামলায় জেলে বন্দী করেছে পুলিস। বিনা অনুমতিতে গ্রামবাসীদের ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র ফেলে দিয়ে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করেছে পুলিস।

ওড়িশা সরকারের এই অগণতান্ত্রিক, বর্বর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে যেমন আওয়াজ উঠেছে ধিনকিয়ায়, তেমনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও নিন্দা করেছে। জল-জঙ্গল-জমি-জীবিকা রক্ষার এই আন্দোলনের উপর আগামী দিনে আরও বড় রকমের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নেমে আসার সম্ভবনাই প্রবল। জিন্দাল গোষ্ঠীও তাদের মুনাফার স্বার্থে এই বিরাট প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে বদ্ধপরিকর। আর ওড়িশা সরকার, প্রশাসন সকলেই একযোগে জিন্দাল গোষ্ঠীর হয়ে পরিবেশ ধ্বংসকারী, জীবিকা হরণকারী এই মেকি উন্নয়ন প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করতে সাধারণ মানুষের মতামতের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও হরণ করেই চলেছে।

এই কর্পোরেট লুঠ এভাবে চলতে থাকলে আমরা ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে তো যাবই, সাথে সাথে সাধারণ মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার, জীবিকা, সংস্কৃতি এই সমস্ত কিছু থেকে উচ্ছেদ হতে হতে হয় শস্তার শ্রমিকে পরিণত হয়ে আরও কম টাকায় নিজেদের ও পরিবারের পেট চালাতে বাধ্য হবে, অথবা কৃষক আত্মহত্যার রিপোর্টে আরও খাতা ভরবে। উন্নয়নের মেকি ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ধিনকিয়ার আন্দোকারী সাধারণ গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে নবীন পট্টনায়কের সরকার, প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দেওয়ার সাহস কি আমাদের নেই? জিন্দাল গোষ্ঠীকে রুখে দেওয়ার যে স্পর্ধা দেখাচ্ছেন ধিনকিয়ার মানুষ, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে জিন্দালের কোনো অফিস ঘেরাও করতে কি আমরা পারি না? বাংলার দেউচা পাঁচামি কিংবা গোয়ার মোল্লেমে যে প্রতিবাদগুলো হচ্ছে এই কর্পোরেট লুঠের বিরুদ্ধে, সেই প্রতিবাদগুলোর সূত্রে গেঁথে ফেলতে পারি না জগৎসিংপুর জেলাকে? ভারতের নাগরিক সমাজের সামনে আজ বড় চ্যালেঞ্জ। কর্পোরেটকে এক যোগে “না” বলতে পারার চ্যালেঞ্জ।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply