লালগড় খ্যাত (মতান্তরে কুখ্যাত) মনোজ বর্মা, যিনি এখন কলকাতার পুলিস কমিশনার, গত ২৫ সেপ্টেম্বর আদেশ করেছেন – সেদিন থেকে আগামী দুমাস, অর্থাৎ ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত, ধর্মতলা সহ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে জারি থাকবে ১৬৩ ধারা। ১৬৩ ধারা শুনে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, এটা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা আমাদের পরিচিত ১৪৪ ধারা। একই জিনিস নরেন্দ্র মোদী সরকারের আনা ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় সংখ্যা বদলে হাজির। যাকে আরএসএস-বিজেপি বলে ঔপনিবেশিক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা। উকিল আর পুলিসবাহিনীকে নতুন করে ধারা মুখস্থ করতে বসিয়ে যে কী আনন্দ পাওয়াযায়, তা শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আর তাঁর নাগপুরের গুরুদেবরাই বলতে পারেন।

বাম জমানা পর্যন্ত ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। বলা যেতে পারে আমাদের তাহরীর স্কোয়্যার বা শাহবাগ। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ে মেট্রো চ্যানেলে লাগাতার অবস্থান চলেছে। মমতা ব্যানার্জি নিজে ওখানেই অবস্থান মঞ্চ গড়ে অনশন করেছেন। কিন্তু ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই তিনি মেট্রো চ্যানেলে ধরনা নিষিদ্ধ করলেন। প্রথম কোপ পড়েছিল মানবাধিকার সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির সভার উপর। সেইসময় মহাশ্বেতা দেবী এপিডিআরের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে মমতা ফ্যাসিবাদী কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যদি আপনি ভেবে থাকেন এই রাজ্যে আইন সবার জন্যে সমান, তাহলে মনে করিয়ে দিই – ২০১৯ সালে সারদা চিটফান্ড দুর্নীতি কাণ্ডের তদন্তে কলকাতার তৎকালীন পুলিস কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই হানা দেওয়ার চেষ্টা করলে নজিরবিহীনভাবে আইপিএস আধিকারিকদের নিয়ে ধরনায় বসে যান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিসমন্ত্রী মমতা। ওই মেট্রো চ্যানেলেই বসেছিলেন। সুতরাং ধরনা নিষিদ্ধ অন্য দলের জন্য, নিজের জন্য নয়।

এর ঠিক দুবছর আগে ২০১৭ সালে কলেজ স্ট্রিটে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। মিটিং, মিছিল ছাড়া কলেজ স্ট্রিট ভাবা যায়? প্রসঙ্গত, কলকাতায় বেশিরভাগ মিছিলের রুটই কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত কলেজ স্কোয়্যার থেকে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল বা রানি রাসমণি রোড পর্যন্ত হত।

বামফ্রন্ট আমলে প্রধান প্রশাসনিক ভবন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আশপাশে ১৪৪ ধারা থাকত। গণতন্ত্র ফেরাবার কথা বলে প্রথমে মেট্রো চ্যানেল, তারপর কলেজ স্ট্রিটে প্রতিবাদী জমায়েতের অধিকার কেড়ে নেয় মমতা সরকার। এখন ২০২৪ সালে এসে দুমাসের জন্য ১৬৩ ধারা জারি করা হচ্ছে, প্রতিবাদের জন্য নিষিদ্ধ অঞ্চলের আয়তন ক্রমাগত বাড়ছে।

১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে যে নির্বাচনী হিংসা, বুথ দখল বাম আমলে প্রবাহিত হয়েছিল, বামেদের দায়িত্ব ছিল সেই হিংসার শৃঙ্খল থেকে গ্রামীণ সমাজকে বার করে এনে একেবারে নিচু তলা থেকে গণতান্ত্রিক চেতনা ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। বলা বাহুল্য, বামেরা নির্বাচনী হিংসার সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়ার বদলে কংগ্রেসিদের থেকে বদলা নিতে সেই সংস্কৃতিই চালিয়ে গেছে। ফলে বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম অবদান – ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা – চোর বাটপাড়ের রাজত্বে পরিণত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসে মমতা সেই নির্বাচনী হিংসা বন্ধ করার পরিবর্তে তাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বিরোধী গরিব ভোটারদের বাড়ি জেসিবি মেশিন দিয়ে ভেঙে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের যোগসাজশে সিভিক পুলিস আমতার গ্রামে ছাত্রনেতা আনিস খানকে ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছে। এরপর তার পরিবারের উপর ঘটে গেছে একের পর এক হিংসাত্বক হামলা। কলকাতা বা শহরতলিতে তবু কিছু বিরোধী রাজনীতি বা প্রতিবাদ আন্দোলনের সুযোগ আছে, গ্রামাঞ্চলে একেবারেই নেই।

আরো পড়ুন প্রতিবাদীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: যোগীর পথে দিদি

শুধু গ্রামাঞ্চলে নয়, তিলোত্তমাকে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভের মাঝেই এবার দুমাসের জন্য ধর্মতলা সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ বন্ধ করার ফরমান এল। আশ্চর্যের বিষয়, বিজেপির ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে যে সব বাম দল মমতাকে সমালোচনামূলক সমর্থনের কথা বলে, তাদের এই সিদ্ধান্তের কোনো সমালোচনা করতে দেখা যাচ্ছে না। সমালোচনার প্রতিশ্রুতিও যদি তারা পালন করতে না পারে, তবে তাদের কোন প্রতিশ্রুতিতে মানুষ কান দেবে?

এই সমালোচনাবিহীন আনুগত্য হয়ত, আগামীদিনে দুমাসের জায়গায় আরও বেশি সময় বা স্থায়ীভাবে ১৬৩ ধারা জারি করতে সরকারকে সাহস দেবে। এই ভাবে সাহস কখন দুঃসাহস হয়ে উঠবে, কখন সীমা ছাড়িয়ে যাবে – মমতা টের পাবেন না। মানুষের গলায় বসতে থাকা ফাঁসটা কখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে এবং মানুষকে পালটা প্রতিরোধে বাধ্য করবে, তা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী শাসকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। একটা সময় এমনও আসতে পারে, যখন মানুষ প্রতিবাদ, বিক্ষোভের কথা পুলিসকে জানানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করবে না। তখন কিন্তু মমতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমর্থক বাম বুদ্ধিজীবী বা দলগুলোও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। বাংলাদেশ থেকে আমরা এইটুকু শিখতেই পারি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.