২০১৫ সালের কথা। সম্ভবত অগাস্ট মাসের শেষদিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসির ক্লাস শুরু হল। আগামী দুবছরের জন্য এটাই হয়ে উঠবে নিয়মিত যাতায়াতের ঠিকানা।

দ্বিতীয় দিনেই ছিল নবীনবরণ, চলতি কথায় যাকে ‘ফ্রেশার্স’ (‘ফ্রেশার্স ওয়েলকাম’-এর অপভ্রংশ) বলে। আমাদের বিভাগে তখন আমরা দুজন কেবল এসেছি বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অতএব, স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি আমাদের দুজনেরও ‘ফ্রেশার্স’ হবে সেদিন। বয়সে ছোটদের সামনে কী ধরনের ‘অ্যাক্টিভিটি’ করতে বলা হবে, তা নিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই আমার খানিক সংশয় ছিল। কেন, সে কথায় পরে আসছি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যাই হোক, একখানা কবিতা বলা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করতে হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে সমবয়সী বন্ধু এবং বড়রা যখন জিজ্ঞাসা করে “ফ্রেশার্স কেমন লাগল?” আমার সোজা উত্তর ছিল “এখানে ফ্রেশার্স তো খুবই ভদ্রভাবে হয় দেখলাম!”

প্রত্যুত্তরে শুনি “আসলে এখানে অ্যান্টি-র‍্যাগিং কমিটি খুব স্ট্রিক্ট।”

আমার সেদিনের অনুষ্ঠান-পূর্ববর্তী অস্বস্তি এবং অনুষ্ঠান শেষের প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে ছিল বিএসসির সময়ের ‘ফ্রেশার্স’-এর স্মৃতি।

আশুতোষ কলেজে প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর ‘ফ্রেশার্স’ হত। প্রথমে কিছু পারফরম্যান্স, তারপর অধ্যাপকদের বক্তব্য এবং একদম শেষে, তাঁরা বেরিয়ে গেলে এক রুদ্ধদ্বার বিনোদনের আয়োজন। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে প্রত্যেককে ডেকে যেসব কাজ করতে বলা হত, সেগুলোর বেশিরভাগই হত চূড়ান্ত ন্যক্কারজনক। নবীনবরণের বদলে আসলে তা হয়ে উঠত বিকৃত যৌনতার উদযাপন। নারী ধর্ষণ বা কুকুরের সঙ্গম ভঙ্গিমা করে দেখাতে হচ্ছে দক্ষিণ কলকাতার এক নামকরা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের, কোনো ছাত্রীকে নিজের পরিচয় দেওয়ার মাঝে মাঝে উচ্চারণ করতে হচ্ছে শীৎকার-বাক্য (একঘর ভর্তি জনা পঞ্চাশেক ছেলেমেয়ের সামনে সেটা করতে গিয়ে তার চোখে জল এসে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক) এবং চারপাশের সুপ্রতিষ্ঠিত সিনিয়ররা তাতে আমোদ পাচ্ছেন – কোনো আধুনিক সভ্য সমাজের বিনোদন যে এমন হতে পারে, তা চর্মচক্ষে না দেখলে অনুভব করা শক্ত।

ব্যাপার হল, এসব যে ঘটবে সেকথা আমরা জানতাম। সেকেন্ড ইয়ারের সিনিয়ররাই এই ব্যাপারে আমাদের ওয়াকিবহাল করেছিল, সঙ্গে দিয়েছিল আশ্বাসবাণী “একদিনের ব্যাপার। এটার পরে দেখবি, সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে বন্ডিং আরও স্ট্রং হবে।” অর্থাৎ এই ধরনের বিকৃত যৌনগন্ধী কার্যকলাপ করতে বলা আদপে তেমন গুরুতর ব্যাপারই নয়, বরং তা আখেরে আমাদের উপকারই করবে – এমন এক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলত বছরের পর বছর।

এই ঘৃণ্য অনুশীলনের বিরুদ্ধে যে মুখ খোলা উচিত, সেকথা তখন অবধি মনে হয়নি কারোর। বরং এসব কথা বাইরে বেরনো অপরাধ – এমন এক ভাবনার কাছেই নতজানু ছিল সকলে। যেমন বাড়ি, পরিবারের বদনাম হবে ভেবে গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা চেপে দেওয়ার চেষ্টা চলে, অনেকটা সেইরকম। আমরাও তেমনটাই ভেবে নিয়ে, আপাত সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সেই অলিখিত নিয়মকে শিরোধার্য করে নিয়েছিলাম।

ব্যতিক্রম ছিল একজন। উপর মহলের কাছে চিঠিতে জানিয়েছিল বিস্তারিত তথ্য। মাত্র একমাস পরের ঘটনা। একদিন কলেজে ক্লাসের শেষে, আবারও এক ‘রুদ্ধদ্বার’ পরিস্থিতি। স্যারেরা এলেন, জানতে চাওয়া হল এরকম সত্যিই কিছু ঘটেছিল কিনা। তখনো মুখ চাওয়া চাওয়ি চলছে। তারপর অবশ্য এক এক করে বলা শুরু হল, কী কী ঘটেছে। চেপে রাখা কথার তোড় তখন আর আটকায় কে! ঘটনার জেরে জড়িত সিনিয়রদের কেরিয়ার নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পরের বছর থেকে কলেজে ফ্রেশার্সের অনুষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যায়।

কে যে এমন প্রভূত সাহসের পরিচয় দিয়েছিল, কোনোদিনই জানা যায়নি। বলাই বাহুল্য সিনিয়রদের কাছে সে তৎক্ষণাৎ খলনায়কে পরিণত হয়েছিল। যাঁরা এখনো ঘটনাটি মনে রেখেছেন, তাঁরা হয়ত সেই ধারণাই আঁকড়ে আছেন। অবিশ্বাস্য এটাই যে, পরবর্তী সময়ে আমরাও সেই অচেনা সাহসিকের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছি, কারণ সে আমাদের সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কে ‘ফাটল’ ধরানোর চেষ্টা করেছিল। আজ, ১১ বছর পরে, যখন আমাদের চোখের সামনে কাঠুয়ার ঘটনা ঘটে গিয়েছে, উন্নাও ঘটে গিয়েছে, ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে পদকজয়ী মহিলা কুস্তিগীরদের শ্লীলতাহানি হয়েছে, মণিপুরের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেদিনের সেই সাহসীর কথা ভাবছি। সত্যিই সে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

বিএসসি পড়াকালীন এমন অভিজ্ঞতা যার, তার কাছে যাদবপুরের ডিপার্টমেন্টাল ফ্রেশার্সকে ভদ্র বা শালীন মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল। সেই যাদবপুরেরই হোস্টেলে সম্প্রতি যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে গেল, তা বিশ্বাস করতে তাই খানিক অসুবিধাই হচ্ছিল। আমি যে যাদবপুরকে চিনেছিলাম তার সঙ্গে কোথাও এর মিল নেই। তবে সোশাল মিডিয়ায় ছেয়ে যাওয়া বক্তব্যের ভিড়ে খানিক ঘোরাফেরা করে বুঝতে পারছি, হয় আমার সেই দেখা বা চেনায় অশেষ খামতি থেকে গিয়েছিল, কিংবা আজকের পরিস্থিতি অনেক পরিবর্তিত।

বুলিইং বা র‍্যাগিং নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই যথেষ্ট সরব – সেটা ইতিবাচক দিক। সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে তাঁরা এই ধরনের অভ্যাস চিরতরে বন্ধ হওয়ার বিষয়ে মুখ খুলেছেন। অনেক প্রাক্তন ছাত্র সরাসরি দায়ী করেছেন ছাত্র ইউনিয়নকে। কয়েকজন বর্তমান ছাত্রের পোস্ট থেকে জানতে পারছি, জুনিয়রদের যাতে সহজে চিহ্নিত করা যায়, সেজন্য চুলে মিলিটারি ছাঁট, নির্দিষ্ট ড্রেস কোড, সন্ধে ছটার মধ্যে হোস্টেলে ঢোকার মতো ‘ফ্যাসিবাদী’ নিয়ম সেখানে জারি রাখা হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বুঝতে পারছি, অন্যান্য জায়গার মত এখানেও এই চর্চা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

র‍্যাগিং শব্দটির সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়ে যা জেনেছিলাম, তা হল র‍্যাগিং মূলত ঘটে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। এর মাধ্যমে সদ্য ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের নাকি খানিক ‘গড়ে পিটে’ নেওয়া হয়, যাতে পরবর্তী কর্মজীবনে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার মত মানসিক কাঠিন্য তৈরি হয়। সেই গড়ে পিটে নেওয়ার পদ্ধতি কেমন হয়, তার কিছু কিছু গল্প শুনে ‘কখনো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব না’ শপথ নিয়ে ফেলেছিলাম অত্যন্ত কাঁচা বয়সে।

বাবার বন্ধু ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ার, শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির কৃতী ছাত্র। থাকতেন হোস্টেলে, তাঁর মুখে শুনেছিলাম সেরকম এক গল্প। একদিন রাতে সব জুনিয়রদের ছাদে নিয়ে যাওয়া হল, তারপর পাঁচিলে উঠতে বলে নির্দেশ দেওয়া হল, “ঝাঁপ মার”। বুদ্ধি খাটিয়ে সেসব জুনিয়ররা ছাদেই ঝাঁপ মারল। তখন সিনিয়রদের সে কী বাহবা, পিঠ চাপড়ানি!

আরেক আত্মীয়, আমার চেয়ে বছর সাতেকের বড়, ভর্তি হয়েছিল জয়পুরের মালব্য ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে। সেখানে হোস্টেলে অচেনা সিনিয়ররা এসে জুনিয়রদের বলত “বল দেখি, আমরা কোন ইয়ারের?” উত্তর ভুল হলে চড়। উত্তর ঠিক হলে পরবর্তী জিজ্ঞাসা “কী করে জানলি?” আন্দাজে বলেছে শুনলে তার ভাগ্যেও সেই চড়। এভাবে শিখিয়ে দেওয়া হত, সিনিয়রের সামনে আন্দাজ করার চেষ্টা অপরাধ। রাতের অন্ধকারে জুনিয়র ছাত্রদের ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছাদের পাঁচিলে দাঁড় করানো বা অকারণ চড় মারা কোন ধরনের মানসিক কাঠিন্য গঠনের শিক্ষা, তা সেইসব সিনিয়ররাই বলতে পারবেন।

জয়পুরের এমএনআইটিতে পাঠরত আমার সেই দাদা এবং তার আরও কয়েকজন বন্ধু র‍্যাগিংয়ের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল সমস্ত ব্যাপার। তার ফলে সাসপেন্ড করা হয়েছিল কয়েকজনকে। আরও ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে – এই আশঙ্কায় দাদারা জয়পুরের এক হোটেলে চলে যায় কয়েক রাতের জন্য। সেটা ২০০৬ সালের শুরুর দিক, কদিন আগেই কলকাতার বুকে ঘটে গিয়েছে এক হাড় হিম করা খুনের ঘটনা। কুড়ি বছরের কলেজ ছাত্র অঙ্কিত দেশাইকে গাড়ির মধ্যে খুন করেছিল তারই কয়েকজন বন্ধু। মাথায় ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করে, বুকে ছুরি বসিয়ে, শেষে গলার নলি কেটে দেওয়া হয়।

যদিও অঙ্কিতের খুনের কারণ ছিল অন্য, কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা ওই দূর পশ্চিম প্রদেশে পড়তে যাওয়া আমার দাদার বাবা, মা, আত্মীয়স্বজনের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এসব ঘটনা ২০০৯ সালে ইউজিসি অ্যান্টি-র‍্যাগিং হেল্পলাইন লঞ্চ করার আগে।

দৃশ্যটা একটু একটু করে বদলেছে পরে। কলেজে কলেজে তৈরি হয়েছে অ্যান্টি-র‍্যাগিং সেল। কিন্তু বিক্ষিপ্ত ঘটনা যে আদৌ তাতে বন্ধ হয়নি, সেকথা হলফ করে বলাই যায়। বিশেষত হোস্টেলে, যেখানে ক্লাসের সময়ের পরেও সিনিয়রদের নজরদারিতে থাকতে হয়, সেখানে যা ঘটছে তার বেশিরভাগটাই যে কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে, আজ আঠারোর তরতাজা তরুণ স্বপ্নদীপের মর্মান্তিক মৃত্যু সেকথাই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। অ্যান্টি-র‍্যাগিং সেলে রিপোর্ট করতে বলার নির্দেশ কলেজের সর্বত্র টাঙানো থাকে, ভর্তির সময়ে ছাত্রছাত্রীদের একটি ফর্মেও সই করতে হয়। তারপরেও যা ঘটছে, তা সামনে না আসার কারণ কী হতে পারে, সেটা বুঝতে খুব বেশি ভাবতে হবে না।

ঘটনার পরদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গিয়েছিলাম অন্য একটি কাজের সূত্রে। স্বপ্নদীপ যে ঘরে এসে উঠেছিল, সেই ঘরেই এক সময়ে থেকেছে আমার এক বন্ধু। তার থেকে যা জানলাম তাতে গোটা ব্যাপারটা নিয়েই ধোঁয়াশা রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক, সম্পূর্ণ তদন্ত না হলে সঠিক কারণ জানার উপায় নেই। নানা মত উঠে আসছে। হোস্টেল ক্যাম্পাস এবং ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস – এই দুই জায়গাতেই তার উপর কোনো চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, একথা প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। হোস্টেলের কিছু বাসিন্দার বয়ান অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধেবেলা ছেলেটি অন্য একটি বন্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে দেয়। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের কয়েকজনের মত, ছেলেটিকে সকলে মিলে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই কেউ বা কারা তাকে ‘গে’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার ফলে স্বপ্নদীপ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল।

মাত্র দুদিনের মধ্যে এত ঘটনা ঘটে গেল যে একটি তরতাজা ছেলের প্রাণ চলে গেল – এই বিষয়টিই সকলকে ভাবিয়ে তুলছে। আমার বন্ধুটি আমায় বলছিল, হোস্টেল এবং ক্যাম্পাস – দুই তরফের বয়ানই যথেষ্ট অসঙ্গতিপূর্ণ। দেহে অজস্র আঘাতের চিহ্ন কোথা থেকে এল – তাও এক বিরাট প্রশ্ন। আমার বন্ধু এবং আরও অনেকেরই দাবি – সঠিক পথে তদন্ত হোক এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক দোষীকে কড়া শাস্তি দেওয়া হোক।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বড় হতে চাওয়ার এক অভ্রভেদী আকাঙ্ক্ষা থাকে। দুর্ভাগ্য এই যে সেই বড়-কে আমরা সংজ্ঞায়িত করেছি ক্ষমতাবান বলে। তারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটে চলেছে প্রতিদিনের জীবনে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সিনিয়রিটির সুযোগ নিয়ে জুনিয়রদের হেনস্থা, অসম্মান করার মত ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে এখন। কিছুদিন আগে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের যে ম্যানেজারের অভব্য আচরণ নিয়ে শোরগোল উঠল, সে তো এই জঘন্য-অথচ-স্বাভাবিক পরিকাঠামোরই বাই-প্রোডাক্ট। তার ইতিহাস ঘাঁটলে হয়ত দেখা যাবে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সে-ও চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার হয়েছে – বাড়িতে, স্কুলে কিংবা কলেজে।

অন্য একজনের তুলনায় বয়সে বড়, শারীরিকভাবে বেশি শক্তিধর, কিংবা মেধার দিক থেকে শক্তিশালী – মূলত এই তিন ধরনের ব্যক্তির নাম উঠে আসে স্কুলে সংঘটিত র‍্যাগিংয়ের ক্ষেত্রে। সুসংবদ্ধভাবে একজনকে ক্রমাগত বুলি করে যাওয়া, শারীরিক নিগ্রহ সেখানে আকছার ঘটে। এছাড়া শারীরিকভাবে দুর্বল, ছোটখাটো-গোলগাল চেহারা, চিকন কণ্ঠস্বর, অনেক বয়স অবধি দাড়িগোঁফের চিহ্ন না থাকা কোনো বয়ঃসন্ধির ছেলের কাছে কী পরিমাণ দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে – সে অভিজ্ঞতা আমার নিজের হয়েছে। বিশেষত যে স্কুলে কেবল ছেলেরাই পড়ে, সেখানে এমন এক চেহারার ছেলে বা স্বভাবগতভাবে ‘মেয়েলি’ ছেলে অনায়াসে হয়ে ওঠে সুঠাম চেহারার, ‘পুরুষালি’ বন্ধুদের যৌন চাহিদা মেটানোর মাধ্যম। যখন-তখন তার বুকে হাত দেওয়া বা জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া চলতে থাকে অবাধে।

স্কুলে এই ধরনের অত্যাচারের ইতিহাস খুব সাম্প্রতিক নয়। নানা সূত্র বলছে, ব্রিটেনের শতাব্দীপ্রাচীন পাবলিক স্কুল ও বোর্ডিং স্কুলে এই অনুশীলন চলেছে দীর্ঘ কয়েক শতক। বয়সে বড় বোর্ডারদের জুতো পরিষ্কার করা, জামাকাপড় কাচা, জলখাবার তৈরি করার মত কাজ করতে হত কমবয়সীদের। এর পোশাকি নাম ছিল ফ্যাগিং। যাদের খাটানো হত, তাদের বলা হত ‘ফ্যাগ’। মূলত বোর্ডিংয়ে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমদানি করা হয়েছিল ‘ফ্যাগিং’। কাজ করতে অস্বীকৃত হলে জুটত শারীরিক নিগ্রহ বা যৌন হেনস্থার মতো কড়া ‘শাস্তি’। ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডের সেন্ট পলস স্কুল, এটন কলেজ, উইনচেস্টার কলেজের বেশ নামডাক ছিল ফ্যাগিং প্রতিষ্ঠান হিসাবে। বিশিষ্ট রোমান্টিক কবি পার্সি বিশ শেলী এটন কলেজে তাঁর প্রিফেক্টের ফ্যাগ হতে অস্বীকার করায় হেনস্থার শিকার হন।

১৯৩২ সালে বাংলার যে গভর্নরের দিকে গুলি ছুঁড়েছিলেন বীণা দাস, সেই স্ট্যানলি জ্যাকসন পড়তেন গ্রেটার লন্ডনের হ্যারো স্কুলে, তাঁর ফ্যাগ ছিলেন চার বছরের ছোট উইনস্টন চার্চিল। এই হ্যারো স্কুলেই পড়েছিলেন অভিনেতা সাইমন উইলিয়ামস। ফ্যাগিংয়ের যন্ত্রণা নিয়ে পরে মুখ খুলেছিলেন তিনি। ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার টায়ারম্যান তাঁর বই A History of Harrow School (1324 – 1991)-এ উল্লেখ করেছেন যৌন নিগ্রহের কথা। ১৯৩০ সালে পশ্চিম লন্ডনের সেডবার্গ স্কুলের এক ১৪ বছরের ছাত্র ফ্যাগিং সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে, টনক নড়ে প্রশাসনের। সেডবার্গে ফ্যাগিং বন্ধের নির্দেশ দেয় আদালত। গত শতাব্দীর নয়ের দশকে এসে ধীরে ধীরে বন্ধ হয় এই সংস্কৃতি।

আরো পড়ুন কেন লাশকাটা ঘর বেছে নেয় পিএইচডি স্কলার?

ব্রিটেনের এই বোর্ডিং স্কুল কালচার ছড়িয়ে পড়েছিল উপনিবেশগুলোতেও। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত কিছু বিখ্যাত বোর্ডিং স্কুল, যেমন দার্জিলিঙের সেন্ট পলস স্কুল, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া স্কুল, দেরাদুনের দুন স্কুল, আজমীরের মেয়ো কলেজের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ধরে চলেছে এই অনুশীলন। কয়েক বছর আগে সিন্ধিয়া স্কুলের ক্লাস এইটের এক ছাত্র আত্মহত্যার চেষ্টা করলে এই তথ্য সামনে আসে। চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব অনুরাগ কাশ্যপ, যিনি নিজে সিন্ধিয়ার প্রাক্তনী, তিনি নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন সেইসময়।

সিমলার বিশপ’স কটন স্কুলের প্রাক্তন অধ্যক্ষ কবীর মুস্তাফি (যিনি সেন্ট পলস স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক) তখন বলেছিলেন “It took a major incident at Scindia to bring the issue into focus, and outrageous instances of barbarism like these only prove that several smaller episodes like these keep happening.”

তিরানব্বই বছর আগের সেডবার্গ স্কুলের সেই নাম-না-জানা ছাত্রটি, ন বছর আগের সিন্ধিয়া স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রটি, কিংবা আজকের স্বপ্নদীপ কুণ্ডু – প্রতিবারই এমন কিছু ‘মেজর ইনসিডেন্ট’-এর প্রয়োজন পড়ে যাচ্ছে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়তে এসেছিল স্বপ্নদীপ। সে স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে গিয়েছে, পড়ে আছে শুধু কিছু কথা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। স্বচ্ছ তদন্তে সঠিক কারণ উঠে আসুক, কোনো এক পক্ষকে আড়াল করার অপচেষ্টা যেন না হয়, এই মুহূর্তে এর চেয়ে জোরালো দাবি আর কিছু নেই। কিন্তু এরই সঙ্গে মনে পড়ছে আরেকটি ঘটনা, ঠিক এই মুহূর্তেই।

কদিন আগে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির লিফটে ওখানকার জনৈক কর্মীর কাছে শুনলাম, তাঁর মেয়ে যাদবপুরে বিএসসি ইকনমিক্সের অ্যাডমিশন টেস্টে পাস করেছে। শুনে বললাম “খুব ভালো। আর কিছু ভাববেন না, চোখকান বুজে দিয়ে দিন।” কথাটা বলার সময়ে আমার গলায় ছিল স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস। এমন উচ্ছ্বাস নিয়ে এই একই কথা কোনও বাবাকে কি বলতে পারব, আবার?

-মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.