স্নিগ্ধা মুখোপাধ্যায়

বর্তমান ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার বিষয়ে কিছু বলতে চাই। নিজের সাত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, কারোর মুখ থেকে শোনা কথা বা সোশাল মিডিয়াতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নয়। এ দেশে পিএইচডি বা গবেষণার ক্ষেত্রটা অনেকটা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মত। লোকে বাইরে থেকে ভাবে, না জানি এই মানুষগুলো কত বিরাট আবিষ্কার করে সমাজকে কৃতার্থ করছে। আসলে ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়। এখানেও কিছু নীচ মানসিকতার লোকজন আছে, যাদের কাছে হয়ত খাতায় কলমে কিছু ডিগ্রি আছে, কিন্তু তাদের মনুষ্যত্ব বা নৈতিকতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে (আবারও বলছি এটা সবার জন্য নয়, কিন্তু বেশ বড় সংখ্যক গবেষকদের জন্য প্রযোজ্য, যাদের অধিকাংশই পিএইচডি গাইড)। আমি একজন রিসার্চ স্কলারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিস্থিতিটা বোঝানোর চেষ্টা করছি।

আমাদের দেশে পিএইচডি ফেলোশিপের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও সময়ে শেষ না করানোই দস্তুর। অথচ পাঁচ বছরের পর ফেলোশিপ আর থাকে না। এই সময়ে আমাদের বয়স দাঁড়ায় মোটামুটি আঠাশ থেকে তিরিশ। বেশিরভাগ স্কলারের উপরেই তখন বিয়ে করে সংসার করার চাপ এসে পড়ে। এছাড়াও বহু স্কলার থাকে যারা প্রান্তিক পরিবার থেকে আসে। পড়াশোনায় অসাধারণ ভাল বলেই তারা গবেষণাকে কেরিয়ার হিসাবে বেছে নেয়। গবেষণার জন্য পাওয়া টাকাতেই তাদের সংসার চলে। পাঁচ বছর পর সেই টাকা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে আতান্তরে পড়তে হয়। খুব কম গাইডই বর্ধিত আর্থিক সাহায্য (extended financial aid) দেন। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোর বয়ঃসীমাও ততদিনে আমরা পেরিয়ে যাই। অর্থাৎ অন্য সব রাস্তা বন্ধ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরও একটা অসুবিধা হল, এদেশের গাইডদের বৈজ্ঞানিক সত্তার চেয়ে সরকারি চাকুরিজীবী সত্তা বেশি জোরদার। একবার চাকরিতে ঢুকে গেলে কোনো গর্হিত অপরাধ না করলে চাকরি খোয়ানোর সম্ভাবনা নেই। তাই কোনো রিসার্চ স্কলার পাঁচ বছরে কাজ শেষ করতে না পারলে তার ফেলোশিপ যে বন্ধ হয়ে যাবে তা নিয়ে এঁদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সম্ভবত সেই কারণেই স্কলারদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গাইডরা নিজেদের ভগবান বলে ভাবতে শুরু করেন। ভাবখানা এরকম, যে এর কেরিয়ার তো এখন আমার হাতে। তাই আমি যা খুশি করতে পারি। এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয় শোষণ।

এদেশে মানসিক নির্যাতনকে কোনো অপরাধ হিসাবেই গণ্য করা হয় না। তাই লিঙ্গ নির্বিশেষে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের উপর নানারকম মানসিক অত্যাচার চলে, ফলে এক-দেড় বছরের মধ্যে অনেকেই পিএইচডি কোর্স ছেড়ে বেরিয়ে যায়। গাইডরা বহাল তবিয়তে থাকেন। ছেলেদের দিয়ে চাকর-বাকরের মত বাড়ির কাজ করানো চালু আছে। মহিলাদের অবস্থা আরও করুণ। যৌন সুখ চাওয়া বা শারীরিক সম্পর্কে যেতে বাধ্য করার ঘটনা প্রায়শই ঘটে। উদাহরণ হিসাবে নাম না করে কয়েকটা ঘটনার কথা বলব, যেগুলো কলকাতার এক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে।

 

ঘটনা ১

আমার এক পরিচিতা আট বছর কাজ করার পরে ল্যাব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কারণ সে তার গাইডের সাথে শারীরিক সম্পর্কে যেতে রাজি হয়নি। তাই আট বছর কেটে যাওয়ার পরে তার গাইড তাকে বলে, “তুমি দুবছর আগে যে এক্সপেরিমেন্টটা করেছিলে, সেটা সম্পূর্ণ ভুল। তোমাকে আবার শুরু থেকে করতে হবে।” এই ধরনের মানসিক অত্যাচার এখানকার রোজকার ঘটনা।

 

ঘটনা ২

এই মেয়েটির পিএইচডির শেষ বছরে এসে বিয়ে ঠিক হয়। ছুটি চাইলে গাইড বলে “না, তুমি ছুটি পাবে না। তা সত্ত্বেও যদি বিয়ে করতে যাও, তাহলে তোমাকে চিঠি লিখে দিতে হবে, যে আমি বিয়ে করার জন্যে দশ-বারো দিন ছুটি নিচ্ছি। যে কদিন আমি থাকতে পারব না তার জন্য যদি আমার কাজের কোনো ক্ষতি হয়, তার সম্পূর্ণ দায় আমার।” অনেককেই চাপ দিয়ে এই ধরনের বয়ান বা চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হয়। আমরাও সেগুলো করতে বাধ্য হই, কারণ ইতিমধ্যেই এ কাজে অনেকগুলো বছর ব্যয় করেছি, এতদিন পরে কাজটা ছেড়ে দিতে পারি না। তাই ক্রমাগত আপোস করার চেষ্টা করি।

 

ঘটনা ৩

কলকাতারই আরেকটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ঘটনা। একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মহিলাদের সঙ্গে খুবই দুর্ব্যবহার করতেন। ওঁর তিন বছরের একটা প্রোজেক্ট ছিল। প্রথম ২-৩ বছরের মধ্যেই ৫৮ জন সেই প্রোজেক্ট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কেউই কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। শেষে ৫৯তম রিসার্চ স্কলার বাধ্য হয়ে ওই বিভাগের অন্য শিক্ষার্থীদের জানায়। তখন শিক্ষার্থীরা তার পাশে দাঁড়ায় এবং ঐ গাইডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখন কথা হল, একটা প্রোজেক্টের জন্য ৫৯ জনকে নেওয়া হয়েছে মানে ৫৯ বার ইন্টারভিউ হয়েছিল। একই প্রোজেক্টের জন্য কেন এতবার ইন্টারভিউ ডাকতে হচ্ছে, ইন্টারভিউ প্যানেল বসাতে হচ্ছে – এই প্রশ্নগুলো কারোর মনে জাগেনি কেন? আসলে এই গাইড ভদ্রলোকের (?) দেশবিদেশে বিস্তর চেনাজানা, বেশ মোটা অঙ্কের অনুদান পেতেন। তার একটা অংশ যেত প্রতিষ্ঠানের খাতায়। এ ধরনের প্রফেসরদের প্রতিষ্ঠান ঘাঁটাতে চায় না।

একদিন সেই মেয়েটাকে নিজের কেবিনে ডেকে সেই অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর কুপ্রস্তাব দেন, জোর খাটানোর চেষ্টা করেন। সে প্রস্তাব নাকচ করে দেয় এবং চিৎকার করে ওঠে। তারপর থেকে তার প্রতি অসহনীয় ব্যবহার করা শুরু হয়। তাকে ল্যাবে ঢুকতে বারণ করা হয়, নানারকম হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে মেয়েটি তার ল্যাবের অন্য সদস্যদের সমর্থন পায়। তারা ল্যাব বয়কট করে। অন্য ল্যাবের বন্ধুরা ঘটনাটা জানতে পেরে কথা বলতে যায়। জানতে পারে ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি বা কমিটি এগেইন্সট সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট-এ তারা গিয়েছিল, কিন্তু সেই কমিটির কনভেনার নিজে একজন মহিলা প্রফেসর হওয়ার সত্ত্বেও মেয়েটাকে বলেন “এই লাইনে এগুলো তো আকছার হয়েই থাকে। তুমি বরং কম্প্রোমাইজ করে নাও। আর নিজের পিএইচডি শেষ করে ফেলো।”

এর আগেও নাকি ওই প্রফেসরের বিরুদ্ধে প্রচুর যৌন নির্যাতনের খবর ছিল এবং প্রতিবারই সে পার পেয়ে গেছিল। কিন্তু সেবার শিক্ষার্থীরা মিলে ঠিক করে, এর বিরুদ্ধে কথা রুখে দাঁড়াতেই হবে। একদিনের নোটিসে দেড়শো জন রিসার্চ স্কলার মিলে ডিরেক্টরের অফিসের সামনে নীরব প্রতিবাদ করে। আন্দোলনের চাপে সেই প্রফেসরকে শোকজ করা হয় এবং তিন মাসের মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত হন।

আরেকটা নির্মম ঘটনা উল্লেখ করি। একজন মহিলা রিসার্চ স্কলার, যিনি ৭-৮ মাসের সন্তানসম্ভবা, তাঁকে ওই অবস্থায় ল্যাবে এসে কাজ করতে হয়। ফলে পেটের বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায়।

দুঃখের বিষয়, এগুলো একটা-দুটো প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেই খোঁজ নিলে এরকম ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায়। শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও নানারকম শোষণের শিকার। এইসব কেলেঙ্কারি কমবেশি সবাই জানে। তাদের সহকর্মীরাও জানে এবং মানিয়ে চলে। কেউ প্রতিবাদ করে না বলেই এগুলো দিনের পর দিন চলতে থাকে।

এগুলো সেইসব মানসিক অত্যাচারের উদাহরণ, যেখানে স্কলাররা অন্তত প্রাণে মারা যায়নি। এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে তারা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। ক্রমাগত মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। শিক্ষাব্যবস্থা এবং গবেষণার প্রক্রিয়া ঢেলে না সাজালে অকালে এমন আরও বহু কুঁড়ি ঝরে যাবে।

নিবন্ধকার কলকাতার এক গবেষণা সংস্থার রিসার্চ স্কলার। মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

কেন লাশকাটা ঘর বেছে নেয় পিএইচডি স্কলার?

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.