দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপান্তে একটি নতুন শব্দবন্ধ উচ্চারিত হতে থাকে – নয়া উপনিবেশবাদ। এই নয়া উপনিবেশবাদেরই সন্তান নয়া দাসত্ববাদ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে শ্রমিক সুরক্ষার জন্য অনেক আইন আছে। কিন্তু কার্যত সবই মায়া। আইন আছে, প্রয়োগ নেই। বিচারব্যবস্থা আছে কিন্তু বিচার নেই। নয়া দাসত্ববাদের বেআব্রু চেহারা বেরিয়ে পড়েছে করোনা-উত্তর পৃথিবীর সর্বত্র। ভারতবর্ষের মাটিতেও শ্রমজীবী মানুষের লাঞ্ছনার ছবি সর্বত্র বিরাজমান। নয়া দাসত্ববাদে শৃঙ্খলিত শ্রমজীবী মানুষ।

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কেউ কথা রাখেনি – সর্বহারা প্রবাসী শ্রমিক

মধ্যগগনে নিঃসঙ্গ সূর্যের কিরণ বর্ষার ফলার মত নেমে আসছে রাস্তার উপর, তারই মধ্যে সন্তানকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলেছে সর্বহারা প্রবাসী শ্রমিক। ২৪ মার্চ ২০২০ কেন্দ্রীয় সরকার দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করল, যার ফলে সমস্ত উৎপাদন প্রক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ভারতবর্ষের ক্ষেতে খামারে কলকারখানায় নির্মাণকার্যে বা খনিতে নিযুক্ত সমস্ত শ্রমিক কর্মহীন হলেন। আর এঁরা যাদের কাছে কাজ করতেন তারা সমস্তরকম দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে প্রবাসী শ্রমিকদের খোলা আকাশের নীচে দাঁড় করিয়ে দিল। তার পরের ইতিহাস মর্মান্তিক। লক্ষ লক্ষ মানুষ খিদের জ্বালায় কাতর, থাকার জায়গা নেই, নিজেদের সামান্য সম্বল নিয়ে নিজেদের বাসস্থানে ফেরার জন্য ব্যাকুল। কিন্তু রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের হিমশীতল নীরবতা প্রবাসী শ্রমিকদের বঞ্চনাকে কেবলমাত্র প্রলম্বিতই করল।

এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে শ্রমিক নিয়ে যাওয়া ভারতের ইতিহাসে কোনো নতুন ঘটনা নয়। এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসেও দাসব্যবস্থা বা ক্রীতদাস প্রথা হল আজকের প্রবাসী শ্রমিকদেরই আদিম অবস্থা। পৃথিবী জুড়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে জোর করে শ্রমিক নিয়ে যাওয়াও নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা গঠন করে এবং এই সেই সংস্থা পৃথিবীজুড়ে শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য একটি সনদ তৈরি করে। সমস্ত দেশকে এই সনদ অনুযায়ী শ্রমিক কল্যাণের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে বলা হয়। স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষেও কমপক্ষে ৪৪টি আইন তৈরি হয়েছিল। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্যও আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমজীবী আইন, ১৯৭৯ সালে তৈরি হয়েছিল। সেই আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, এক রাজ্যের কোনো শিল্প বা কলকারখানায় অন্য রাজ্যের শ্রমিককে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করলে শ্রম দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। আইন তৈরি হবার পর ৪১ বছর অতিক্রান্ত, কিন্তু আজও কোনো রাজ্য বা কেন্দ্রের কাছে প্রবাসী শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমজীবী আইনে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার বন্দোবস্তসহ নানারকম সুরক্ষার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে ওসব বন্দোবস্ত নেই । ২০১৩ সাল থেকে চন্দননগরের আইনি সহায়তা কেন্দ্র এই ধরনের শ্রমিকদের নিয়ে একটি সমীক্ষা করে। তাতে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে কারখানা, ইটখোলা বা খনি শিল্পে নিযুক্ত প্রবাসী শ্রমিকদের কোনো হিসাব নেই। অবশ্য এই অবস্থা প্রায় সমস্ত রাজ্যেই। কেবলমাত্র কেরালায় প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কমবেশি প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমান।

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে দফায় দফায় আইনি নোটিস দেওয়া হলে সরকার সমস্ত রাজ্যে ১৯৭৯ সালের আইন লাগু করার কথা বলে, কিন্তু তা কার্যকর করা হয়নি। অতিমারীর সময়ে প্রবাসী শ্রমিকদের চরম দুরবস্থা প্রমাণ করল আইন থাকলেও তা প্রয়োগ করার কোনো উদ্যোগ রাষ্ট্রের নেই। সম্প্রতি অনেক রাজনৈতিক দলই এ নিয়ে বিবৃতি দিচ্ছে, কিন্তু এরা সকলেই কোনো না কোনো সময়ে কেন্দ্রে বা রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। তখন এদের মনে হয়নি যে আইনটি কার্যকর করতে হবে।

ফলত, ভারতবর্ষ জুড়ে প্রবাসী শ্রমিকরা বেঁচে থাকার তাগিদে কয়েকশো মাইল অতিক্রম করে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেছেন। রাজপথে নিরন্ন, হতাশাগ্রস্ত মানুষের মিছিল এর আগেও ভারতবর্ষের মানুষ দেখেছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়। ছিন্নমূল মানুষের সেই দৃশ্যের আরও একবার জন্ম হল। ভারত রাষ্ট্র তথা উৎপাদন প্রক্রিয়ার মালিকরা ভাল করেই জানেন প্রবাসী শ্রমিকরা না থাকলে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা থমকে যাবে, আর শ্রমিকরাও জানেন গ্রামে তাঁদের কাজ নেই, কাজের প্রয়োজনে আবার যেতে হবে অন্য কোনো রাজ্যে। একবিংশ শতাব্দীর নয়া দাসত্ববাদের শৃঙ্খলে ওঁরা আবদ্ধ।

 

সংগঠিত শিল্পের শ্রমিক – এক বঞ্চনার অধ্যায়

ভারতবর্ষের শ্রমজীবী মানুষের কেবলমাত্র ৫-৬ শতাংশ সংগঠিত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সংগঠিত শিল্প বলতে আমরা বুঝি শ্রমিক আইন অনুযায়ী যেসব উৎপাদন প্রক্রিয়া কলকারখানা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে, অর্থাৎ যেসব শিল্পে একই ছাদের তলায় বা সংস্থায় কমপক্ষে ১০ জন শ্রমিক কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের বুকে সর্ববৃহৎ সংগঠিত শিল্প হল পাটশিল্প ও চা শিল্প। তারপরেই চর্মশিল্প, লৌহ-ইস্পাত শিল্প, কয়লাশিল্পসহ বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। করোনা বিপর্যয়ের পরেই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার ঘোষণা করে যে প্রত্যেক শিল্প সংস্থাকে তার শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। কিন্তু কেন্দ্র, রাজ্যের এই নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মালিকরা দিব্যি আছেন, কারণ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের শিল্পপতিরা জেনে গেছেন, এ দেশে যত আইনই থাকুক না কেন, সেসব না মানলে কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই।

অতিমারীর সময়ে উৎপাদন বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে মালিকরা সবরকম সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বেতন দেওয়া বন্ধ রেখেছিলেন। পাটশিল্প, হোসিয়ারী শিল্প এবং বেসরকারি কারখানার মালিকরা বেতন দেননি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও আইন সহায়তা কেন্দ্র শ্রম দপ্তরের কাছে মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একটি কারখানার মালিকের বিরুদ্ধেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শুধু পাটশিল্পেই অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের প্রায় সাড়ে চারশো কোটি টাকা গ্র্যাচুইটি বকেয়া রয়েছে। অথচ গত দশ বছরে একজন মালিকের বিরুদ্ধেও শ্রম দপ্তর আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। শ্রমিক ছাঁটাই, অবসরকালীন সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করা তো রোজকার ঘটনা। কিন্তু গত দশ বছরে একজন মালিকও শ্রমিকের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য জেলে যাননি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকরাই বাধ্য হয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং আদালতের নির্দেশে কয়েকজন শ্রমিক টাকা আদায় করতে পেরেছেন। কিন্তু সংখ্যাটা নগণ্য।

অতিমারীর ফলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তা থেকে উত্তরণের দোহাই দিয়ে বেশ কয়েকটি পরিবেশ এবং শ্রম আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে তার ফলে অন্তত আইনগতভাবে শ্রমিকদের অবস্থান আগের চেয়েও বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কতখানি প্রয়োগ হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এর আগে অন্তত শ্রমিক স্বার্থে কিছু আইন ছিল। এখন পরিস্থিতি শ্রমিকদের জন্য আরও অনেক বেশি সংকটজনক।

বিশ্বব্যাপী মন্দার চাপে সংগঠিত শিল্পের কী অবস্থা হবে কোনো অর্থনীতিবিদই সঠিকভাবে অনুমান করতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদরা নানারকম পথ খুঁজছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল সরকার কি তাঁদের কথা শুনবে, নাকি ধর্মীয় ভাবাবেগ দিয়েই দেশ চালিয়ে যাবে এবং প্রচারসর্বস্বতাই তার নীতি হয়ে থাকবে? পৃথিবীজুড়ে যে হাহাকার শোনা যাচ্ছে তার প্রতিকার না করলে প্রলয় অবশ্যম্ভাবী, কারণ খিদে কোনো আইন মানে না।

 

অসংগঠিত শ্রমিক – অনিশ্চয়তার যাত্রী

ভারতবর্ষের শ্রমজীবী মানুষের প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ অসংগঠিত শ্রমিক, যাঁদের প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু আমরা দেখেও দেখি না, যাদের কথা আমরা ভুলেও ভাবি না। আমাদের বাড়ির পরিচারিকা, সাফাইকর্মী, কুড়ানি, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটিয়ামজদুর, ড্রাইভার, খালাসী, ধোপা, নাপিতের মত অসংখ্য পেশায় নিযুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ। আমাদের সুখদুঃখে এঁরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। না আছে নিয়োগপত্র, না আছে ভবিষ্যতের দিশা। যতদিন গতর খাটাতে পারবেন ততদিন খাওয়া পরার নিশ্চয়তা আছে, তারপর মৃত্যুর অপেক্ষা। চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। বড়জোর সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের বেডে শুয়ে মরার সুযোগ আছে। অতিমারী এঁদেরই সবচেয়ে ক্ষতি করেছে। এঁদের বেতন দেবে কে? কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই, কোনো সংস্থাও এঁদের নিয়োগকর্তা নয় যে সেখানে গিয়ে বেতন চাইবেন। সরকারের বহুবিধ নির্মাণকাজে অথবা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রের নির্মাণের সঙ্গে ওঁরা অনেকে যুক্ত। সকলের অবস্থাই একইরকম সংকটজনক।

অতিমারির সময়ে এঁদের কয়েকটি আবেদনপত্র সরকারি দপ্তরে জমা পড়েছিল আর্থিক অনুদানের জন্য, কিন্তু সরকারের দিক থেকে বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অসংগঠিত শ্রমিকরা তাকিয়ে থাকেন বড় বড় হোর্ডিংয়ের দিকে, যেখানে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় – সরকার সর্বদা শ্রমিকের পাশে আছে। চরম লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা নিয়ে চলতে চলতে এখন এঁদের ভরসা কেবল ত্রাণ।

পরিশেষে আবার সেই কথাই বলতে হয়। নয়া দাসত্ববাদের যুগে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় শ্রমিক স্বাধীন, কিন্তু আসলে একটি শ্রেণির কাছে শৃঙ্খলিত। এই শৃঙ্খল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.