যদি আপনি চোখ-কান বুজে জীবনযাপন না করেন, তাহলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে এ বাজারে প্রায় সব কর্পোরেট কোম্পানিই তাদের কোম্পানির লোগো সাত রঙে রাঙিয়েছে?

একটু ভুল খেয়াল করেছেন। তার কারণ ওই লোগোগুলোতে রঙের সংখ্যা সাত নয়, ছয়। এই ছটি রঙ যথাক্রমে বেগুনি (প্রাণের প্রতীক), নীল (শান্তির প্রতীক), সবুজ (প্রকৃতির প্রতীক), হলুদ (সূর্যালোকের প্রতীক), কমলা (নিরাময়ের প্রতীক), লাল (জীবনের প্রতীক)। এই ছয়ে মিলেই ভুবনখ্যাত ‘প্রাইড পতাকা’। এর পরের প্রশ্ন কী এই প্রাইড? খায় না মাথায় দেয়? কারাই বা খায় বা মাথায় দেয়? কেনই বা খায় অথবা মাথায় দেয়?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একটা একটা করে বলছি।

প্রাইডের আভিধানিক অর্থ গৌরব হলেও, এক্ষেত্রে প্রাইড শব্দটার ব্যবহার মূলত আত্মবিশ্বাস এবং আত্মসম্মান অর্থে। কিন্তু কাদের জন্য? পৃথিবীব্যাপী সমকামী, উভকামী এবং রূপান্তরকামী মানুষদের সসম্মানে বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস, নিজেদের মত করে বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস, জীবনকে গড়ে তোলার আত্মবিশ্বাস, সমাজের অংশ হয়ে ওঠার আত্মবিশ্বাস।

আজকের পৃথিবীটা বেশ অদ্ভুত। আজকের পৃথিবীতে এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হবার কথা ভাবতে পারেন সমপ্রেমের বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ পিট বুটেজেজ, সমপ্রেমের বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ লিও ভারাদকর আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি হিসাবে দাপটে দেশ চালাতে পারেন। আবার সেই একই পৃথিবীতে ১০০ কোটির দেশে সমপ্রেমের বৈবাহিক স্বীকৃতিটুকুও না থাকতে পারে। আজ্ঞে হ্যাঁ, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমির কথাই বলছি আর কি।

pride parade
প্রাইড প্যারেড

সে যাক গে। এত ঘ্যানঘ্যান না করে থেকে বরং জুন মাসে ‘প্রাইড মান্থ’ উদযাপনের ইতিহাস একটু ঘেঁটেঘুঁটে দেখি। ইতিহাস বলে, ষাটের দশকে নিউ ইয়র্ক শহরের সমপ্রেমী মানুষেরা কিছু কিছু ছোট পানশালায় জমায়েত হতেন। এমনই এক ছোট্ট পানশালায় ১৯৬৯ সালের ২৮শে জুন পুলিশ রেড করে, এবং রেডের নামে সেই পানশালার প্রচুর নিরীহ মানুষের ওপর অবাধ শারীরিক নির্যাতন চালায়। তারই প্রতিবাদে মহানগরীর পথে প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে। আর বলব না, টুক করে উইকিপিডিয়াতে ঢুঁ মারুন। অতীতকে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বাহান্ন বছর আগে নিউ ইয়র্কের একটা ছোট্ট পানশালায় যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলনের তরণী বেয়ে ২০১৫ সালে পুরো আমেরিকার সমপ্রেমী মানুষে নিজেদের পছন্দের মানুষকে আইনত বিয়ে করার অধিকার ছিনিয়ে নিল, ২০২০ সালের জুন মাসে ইকুয়ালিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে আদায় করে নিল কর্মক্ষেত্রে সমানাধিকার। তাই আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনও সংস্থা, তাদের কোন সমপ্রেমী কর্মীর প্রতি কোনরকম বৈষম্যমূলক আচরণ করলে তাদের বিরূদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

পৃথিবী বদলেছে, বদলাচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে।

ভারতের মাটিতেই একাধিক জাতীয় এবং বহুজাতিক সংস্থা আজ সমপ্রেমী যুগলদের মধুচন্দ্রিমা প্যাকেজ থেকে শুরু করে জীবন বিমা — নানা সুবিধা দিতে শুরু করেছে। আপনার পাড়ার অতি-কৌতূহলী কাকিমাও তাঁর ভুঁড়িওয়ালা বরকে বলছেন

“হ্যাঁ গা, ওই মিত্তিরদের বাড়ির বড় মেয়েটাকে চেনো তো? ওর সাথে সারাক্ষণ যে মেয়েটা থাকে… তার সাথে আজ বিকেলে আলাপ করিয়ে দিল। বড় ভালো গো মেয়েটা। আমার পায়ের ব্যথা শুনে নিজেই দেখে শুনে কয়েকটা ব্যায়াম দেখিয়ে দিল। ও মেয়ে নাকি ন্যাশনাল মেডিকেলে হাউসস্টাফশিপ করছে এখন। দুটিতে বেশ মানায় যাই বলো…’

আপনি এই পাল্টে যাওয়া পৃথিবীর সাথে সাথে পালটাবেন, নাকি আড়ালে চাট্টি ছোট-বড় কথা বলবেন সে আপনার ব্যাপার। কে ছোট-বড় কথা বলতো মনে আছে তো? যশোদাপিসি! পাশের পাড়ার কুণাল যখন এক চাকরি করা মেয়েকে প্রেম করে বিয়ে করল যশোদাদেবীর কত্ত কথা, বাব্বাঃ! যশোদা দেবী আমাদের সাথে নেই বছর দশেক হল। পাড়ার পাঁচজন কিন্তু ওঁকে শুধু ওঁর ওই ব্যাঁকা ট্যারা কথাগুলোর জন্যই মনে করে রেখেছে। আপনিও কি নিজের জন্য তাই চান? ভেবে দেখবেন।

মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে — সেটাই সমাজ। সব ভালবাসা একরকম হবে না — সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। সেই বিভিন্নরকম ভালবাসাকে সমান সম্মান দিতে পারাই সভ্যতা। আর সেটা না করতে পারা শুধু আপনার সীমাবদ্ধতাই নয়, সভ্যতার পরিপন্থী।

আর নয়। অনেক বকলাম । শুভ প্রাইড।

ভালো থাকুন। ভালো রাখুন … ভালোবাসুন, যাকে ভালোবাসতে হৃদয় চায়, তাকেই।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.