প্রবাসে লকডাউনে লাল ঝান্ডা

সুমিত তালুকদার

দীর্ঘদিন বেঙ্গালুরুতে থাকলেও সেখানে যে প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকের বাস, যাঁরা রোজের হিসাবে কাজ করেন, সে ব্যাপারে ধারণাই ছিল না। করোনার জন্য ২৪শে মার্চ ২০২০ থেকে লকডাউন শুরু হল দেশব্যাপী। বেঙ্গালুরুর সিপিএম সদস্য ধীমান সাউয়ের নেতৃত্বে মনসিজ, নবনীতা ও দীপাঞ্জন সহ আরো অনেকে শুরু করল বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকদের রেশন পৌঁছে দেওয়ার কাজ।

শুরুতে স্বল্প পুঁজি নিয়ে নিজেরা যতটা পারছিল করে যাচ্ছিল। এপ্রিলের শুরুতে ঝঙ্কার, শীর্ষেন্দু, ইন্দ্রজিৎ, সৌভিক, আমি এবং আরো কিছু মানুষ যুক্ত হই এই কর্মকাণ্ডে। ইতিমধ্যে প্রবাসী শ্রমিকের থেকে প্রতিদিন পাওয়া ফোনের সংখ্যা দিনে ১০ থেকে বেড়ে ৫০-৬০ এ পৌঁছেছে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে CITU, DYFI, SFI ও AIKS সহ অনেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন জেলার প্রবাসী শ্রমিকদের যোগাযোগ নম্বর পাঠান রেশন পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কর্ণাটকে ভারতের জ্ঞান বিজ্ঞান সমিতির সঙ্গে আমরা কজন মিলে টানা ৩ মাস ধরে প্রায় ২৫,০০০ প্রবাসী শ্রমিকের কাছে রেশন পৌঁছে দিতে পেরেছি। যখন এই মহামারীর সময় বেঙ্গালুরুতে র হোয়াইট কলার আই টি কর্মীরা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে করতে এবং ডালগোনা কফি খেতে খেতে নেটফ্লিক্স, আম্যাজনের ওয়েব সিরিজ উপভোগ করছিল, তখন আমাদের কমরেডরা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের মাঝেই প্রায় রোজ ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ছুটে গেছে ৬০-৭০ কেজি চাল আর ২০ কেজি আলু নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে। একটাই অঙ্গীকার নিয়ে — বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“হেরে যাওয়ার জায়গা ছিল না। চার বছরের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা করাতে এসে আটকে গেছি। টাকাপয়সা শেষ, চিকিৎসাও হল না। কিন্তু আপনারা ছিলেন বলে পেট চলল। আমার বাচ্চার জন্য দুধ কিনে দেওয়ায়া যা উপকার হল, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না,” বলছিলেন দেগঙ্গা থেকে আসা সরফরাজ।

শুধু প্রবাসী শ্রমিক নয়, চিকিৎসা করতে এসে আটকে পড়া বহু মানুষের কাছে আমরা পৌঁছে গেছি। পূর্ব বেঙ্গালুরুর থবুরাহাল্লির বস্তিতে ৪৮০টা পরিবারের কাছে পৌঁছতে হবে, অথচ আমাদের কাছে টাকা নেই। ফেসবুকে আমরা খোলাখুলি সাহায্য চাইলাম। দুদিনে উঠে এল টাকা। সেখানে পৌঁছে দেখি প্রায় ১২ থেকে ১৫ জন অন্তঃসত্ত্বা। তাঁদের জন্য নবনীতাদি ব্যবস্থা করলেন ফলমূলসহ বিভিন্ন খাবারের। পরের দিন তা পৌঁছে দেওয়া হল। এত ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনা জানাই, যা আমাকে নাড়া দিয়ে বলেছে “আমি শুধু না, আমরা সবাই বাঁচব” নীতির জয় হবেই।

সেন্ট জনস হসপিটাল থেকে একজন ফোন করলেন “আমার ছেলেকে ডাক্তার নুন ছাড়া মুড়ি খাওয়াতে বলেছে।“ শিশুটির বয়স দেড় বছরের মতো। সম্বুদ্ধদা আর কৃত্তিকা মিলে হাসপাতালের সামনে গিয়ে নুন ছাড়া মুড়ি পৌঁছে দিয়ে এল এবং শুনল ওখানে অনেক বাচ্চা আছে যাদের বেবি ফুড আর ওষুধ লাগবে। নবনীতাদি সেই ভদ্রলোককে ফোন করলে তিনি বলেন “আমি আমার একার সন্তানের জন্য কিচ্ছু নেব না। যদি সবার কোন ব্যবস্থা হয় জানাবেন। সেই মত ওনার অ্যাকাউন্টে আমরা টাকা পৌঁছে দিই। উনি সবাইকে সেই টাকা ভাগ করে দিয়ে আমাদের ছবি পাঠান। আরো অনেক শিক্ষা পেয়েছি এই সময়। এইসব মানুষের মুখে একটাই কথা। “দাদা অন্য রাজ্যেও লাল ঝান্ডা আমাদের পাশে দাঁড়াল। আমরা আপনাদের অনেক বার ভোট দিইনি। কিন্তু আপনারা একবারের জন্য জিজ্ঞেসও করলেন না।“

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে বেঙ্গালুরুর বুকে CITU-র সাথে যুক্ত ভারতবর্ষের প্রথম প্রবাসী শ্রমিক সংগঠন তৈরি  হয়েছে। এর উদ্দেশ্য লড়াই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে দাবি আদায় এবং শ্রমিকশ্রেণির পাশে থেকে শোষণহীন সমাজের রূপকথা লেখা।

কিছুদিন আগে হয়ে গেল লাল ঝান্ডার ব্রিগেড। সেই ব্রিগেডে উপস্থিত সুরাট, পুনে, মুম্বাইয়ের প্রবাসী শ্রমিকরা। প্রাণের টানে, অধিকার রক্ষার টানে, আর প্রবাসী হয়ে না থাকার টানে।

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বেঙ্গালুরু, পুনে, সুরাট, মুম্বাই, গুরগাঁও থেকে প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন  গ্রামে ফিরে ভোট দেবেন, যাতে পরিযায়ী হয়ে পরিবারের থেকে দূরে থাকতে না হয়।

এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা শ্রেণির লড়াইয়ে নেমেছে। তারা জিতবে না হারবে সময় বলবে। কিন্তু এবারের ভোট জুড়ে প্রবাসীদের ঘরে ফেরা এবং অধিকারের লড়াই অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রবাসে লকডাউনে লাল ঝান্ডা(ছবি ঋণ: Wikimedia)

Leave a Reply