আমরা এখন এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই দেখা যায়, প্রচুর মানুষ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করছেন। লক্ষ করা যাচ্ছে যে এমনকি তথাকথিত পুলিস এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের মেরে ফেলার ঘটনাকেও শিক্ষিত মানুষ সমর্থন জানাচ্ছেন এবং ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। একদিকে ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে অভিযুক্তের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার রাস্তায় হাঁটছে কিছু কিছু রাজ্যের সরকার, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের মত নেতার বিরুদ্ধে পকসো আইনে মারাত্মক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনোরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা যদি কামদুনি মামলা এবং নিঠারি কেসের অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস পাওয়ার রায় বোঝার চেষ্টা করি, এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুদূর ভবিষ্যৎ নয়, অদূর ভবিষ্যৎ।

একথা ঠিক যে মানবাধিকার কর্মীরা সর্বদাই ফাঁসির বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন। নারীবাদী আন্দোলনও মনে করেছে ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসি হওয়া ঠিক নয়। আন্তর্জাতিক স্তরে যে কটা গবেষণা হয়েছে, সবকটাই জানাচ্ছে যে শাস্তি কঠিনতম হলে বা মৃত্যুদণ্ড হলে অপরাধের ঘটনা কমে যাবে এ কথা ভুল। আর ধর্ষণ হলেই নারীর জীবন শেষ হয়ে গেল, ফলে ধর্ষককে সবসময়েই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে – এই ধারণাও পুরোদস্তুর পুরুষতান্ত্রিক। সরকার বাহাদুর অবশ্য এসব কথা মানতে রাজি নন। ধর্ষণ বা ওই জাতীয় অপরাধ কমানোর উপায় হিসাবে সরকার আরও কঠোর শাস্তি দেওয়ার আইন প্রণয়ন করেছে। নারী আন্দোলনের কর্মীরা বারবার বলেছেন, শাস্তি কঠোরতম হলে কিন্তু প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তের ছাড় পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফাঁসির মত চরমতম শাস্তি দিতে গেলে বিচারপতিকেও দশবার ভাবতে হয়, বিচারে কোনো গলদ কোন থেকে গেল কিনা। কামদুনি এবং নিঠারি – দুটি মামলাতেই দেখা গেল সঠিক প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই নিম্ন আদালতের রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে বদলে গেছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ইদানীং শাস্তিমূলক ন্যায়বিচার (punitive justice) বাদ দিয়ে পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার (restorative justice) চালু করা নিয়ে চর্চা হচ্ছে। ভারতবর্ষের মত দেশে অবশ্য এই চিন্তাধারা এখনো সামান্য কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার কামদুনি বা নিঠারির মত ঘটনার মামলায় কীভাবে প্রযোজ্য হবে তাও ভাবার বিষয়। আমরা জানি যে আমাদের দেশে পুলিস আদালত বাদ দিলে অন্য ধারার কিছু বিচারব্যবস্থাও প্রচলিত আছে। তার মধ্যে পঞ্চায়েতের সালিশি, নারী আদালত ইত্যাদি পড়ে। এই ধরনের বিচারব্যবস্থায় বিচার সঠিক হবে, এমন ভরসা সাধারণ মানুষের নেই। পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার হল দুই পক্ষকে একসাথে বসিয়ে সিদ্ধান্তে আসার ব্যবস্থা। যেখানে নিগৃহীত মানুষটি মৃত, সেখানে কীভাবে তেমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে, তা ভাববার মত কথা।

কামদুনি মামলার ক্ষেত্রে ধর্ষিতা মেয়েটি মৃত। তার পরিবার এবং তার বন্ধুরা যে বিচারের দাবি জানাচ্ছেন, তার সঙ্গে আদালতের রায় একেবারেই মেলেনি। সবথেকে বড় কথা, এই মেয়েটি ছিল ওই গ্রামের প্রথম কলেজে পড়তে যাওয়া তরুণী। তার উপর হওয়া অত্যাচার সঠিক বিচার না পেলে সেই গ্রামের আরও অনেক মেয়ের পরিবার যে তাদের কলেজে পাঠানো থেকে বিরত থাকতে পারে – এটুকু বুঝে নেওয়া শক্ত নয়। যেহেতু অভিযুক্তরাও একই গ্রামে থাকে, তাই ভয় তৈরি হওয়া আশ্চর্যের নয়।

নিঠারি মামলা আরও জটিল। বলতে কোন দ্বিধা নেই, এই অতি বিরল ঘটনার মামলায় আমরা পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচারের ধারণা কীভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব তা পরিষ্কার নয়। এই কেসের দুই অভিযুক্ত একসময় স্বীকার করেছিল যে তারা অনেকগুলি শিশু এবং তরুণীকে হত্যা ও ধর্ষণ করেছে। এমনকি নরমাংস ভক্ষণ করার কথাও তারা জানিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, এরা মানুষের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রিতেও জড়িত। তবু সম্প্রতি এলাহাবাদ হাইকোর্ট এদের ফাঁসির হুকুম রদ করেছে এবং মুক্তি দিয়েছে।

ফাঁসির হুকুম রদ এবং বেকসুর খালাস হওয়ার ঘটনা আমরা কামদুনি এবং নিঠারি – দুটি মামলাতেই দেখলাম। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, দুটি মামলাই জনসাধারণের মধ্যে ভীষণভাবে চর্চিত। সংবাদমাধ্যম এই দুটি ঘটনারই নানা দিক বারবার আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। কামদুনি গ্রামের কলেজ ছাত্রীটির ধর্ষণ ও খুনের নৃশংসতা সারা পশ্চিমবঙ্গকে এক সময় নাড়িয়ে দিয়েছিল। কামদুনি আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন সেই গ্রামেরই দুই তরুণী – টুম্পা কয়াল ও মৌসুমী কয়াল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে এঁদের মুখোমুখি তর্কের দৃশ্য আমরা অনেকেই টিভির পর্দায় দেখেছি এবং তাঁদের সাহসকে সম্মান করেছি।

নিঠারির ঘটনা কামদুনির চেয়েও ভয়াবহ। সারা দেশের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। একসঙ্গে অতগুলি মেয়ের হারিয়ে যাওয়া, যৌন নিগ্রহ – সবকিছু এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার দুনিয়ার চেহারা দেখায়। আজ এত বছর বাদে এই আসামিরা বেকসুর খালাস পেল, মাননীয় আদালত জানাল তদন্তের পদ্ধতি ঠিক না হওয়ায় কিছু প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। কামদুনি ধর্ষণ মামলাতেও তদন্তে গলদের কথা সংবাদমাধ্যম মারফত আমরা পেয়েছি। প্রশ্ন হল, বহুচর্চিত এই মামলাগুলোতেও যদি তদন্ত ঠিকমত না হয়, তাহলে আমরা কী করে আশা করতে পারি যে আরও অসংখ্য কম আলোচিত বা অনালোচিত মামলায় তদন্ত সঠিকভাবে হবে? সাধারণ মানুষের মনে আইন আদালতের উপর যে আস্থা থাকে, এই ধরনের রায়ে তা প্রবল আঘাত পায়।

আরো পড়ুন বিলকিস বানো: ছাত্রীর সঙ্গে অসমাপ্ত আলোচনা

দুর্গাপুজোর মধ্যেই খবর এল, নদিয়া জেলায় একটি যুবক এক কিশোরীকে যৌন নিগ্রহ করেছে। গ্রামবাসীরা যুবকটিকে গাছে বেঁধে মারধোর করছে শুনে তার বাবা ছেলেকে বাঁচাতে ছুটে আসেন। সেই সময় নিগ্রহকারীরা তাঁকে এত মারধর করে যে সেই বৃদ্ধ মারা যান। এই যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ইচ্ছা – এগুলি কিন্তু আরও বৃদ্ধি পাবে, যদি সাধারণ মানুষ বিচারব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস হারান। এমনিতেও সাধারণ মানুষের মনে হিংসা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি শাসক দলগুলি দায়িত্ব সহকারে করে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে কামদুনি ও নিঠারি মামলার রায় আমাদের আরও চিন্তায় ফেলে দিল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.