১৯৬৭ সালে ইউনিসেফের প্রতিনিধি হিসাবে একটি প্রকল্পের কাজে প্রখ্যাত অভিনেতা মার্লন ব্রান্ডো ভারতে আসেন। দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর স্টুডিওতে অমিতা মালিকের সঞ্চালনায় ব্রান্ডো ও সত্যজিৎ রায়ের মধ্যে এক দীর্ঘ কথোপকথন হয়, যা দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হয়েছিল। সেই কথোপকথনের ট্রান্সক্রিপ্ট গত ৯ ডিসেম্বর ২০২১ চলচ্চিত্র নির্মাতা অলোক শর্মা টুইট করেন। নাগরিক ডট নেটের এক শুভানুধ্যায়ী সেই টুইট আমাদের নজরে আনেন এবং এই ট্রান্সক্রিপ্টের বাংলা ভাষান্তর প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন। প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়ার জন্য আমরা অলোকবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ। গবেষক দেবাশিস গুপ্ত জানিয়েছেন, ইংরেজিতে এই কথোপকথনের ট্রান্সক্রিপ্ট ইতিপূর্বে চিত্রভাষ পত্রিকার অগ্রন্থিত সত্যজিৎ, দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রথম বাংলায়, নাগরিক ডট নেটের পাঠকদের জন্য। আজ প্রথম পর্ব।

অমিতা মালিক: আমার মনে হয় এসব ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি নেহাতই বাহুল্য। দিল্লিতে বা পৃথিবীর অন্য কোথাও টিভি, রেডিও বা অন্য কোনোকিছুর দর্শক-শ্রোতাকেই সত্যজিৎ রায় আর মার্লন ব্রান্ডোর পরিচয় দেওয়ার দরকার হয় না। সেইজন্যে আজকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর স্টুডিওতে আপনাদের পেয়ে আমরা আনন্দিত, গর্বিত এবং সম্মানিত। আর আপনাদের দুজনকে একসাথে পাওয়ার অনুভূতি তো তুলনাহীন। আপনাদের দুজনের হাতে ফ্লোরটা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার আগে আমার একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে। আমার মনে হয় এটা বলা যেতেই পারে, যে আপনারা দুজনেই সিনেমার একই প্রজন্মের লোক, এবং আমার মনে হয় দুটো গুণ আপনাদের দুজনেরই আছে। সেগুলো হল নিজের কাজের প্রতি শৈল্পিক নিষ্ঠা আর বৌদ্ধিক সততা। আমি এ-ও জানতে পেরেছি, যে আপনারা একে অপরের ফিল্মগুলোর সঙ্গে রীতিমত পরিচিত। তাই আমার মনে হয় এই আলোচনার মধ্যে কোনো এক সময়ে যদি আপনারা দুজন দুজনের ফিল্ম সম্পর্কে যা মনে করেন তা নিয়ে একটু বলেন, তাহলে ভাল হয়। তাই না, মিঃ রায়?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সত্যজিৎ রায়: প্রথমে মিঃ ব্রান্ডো বলুন…

মার্লন ব্রান্ডো: আপনি আমাকে স্রেফ মার্লন বলেই ডাকুন না?

সত্যজিৎ: আচ্ছা, মার্লন। আপনাকে দিল্লিতে দেখতে পেয়ে দারুণ আনন্দ পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছি। দিল্লিতে কী জন্যে আসতে হল একটু বলবেন?

মার্লন: আসলে, আমি কিন্তু ঠিক বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে তৈরি নই। সংক্ষেপে বললে, আমি এসেছি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ইউনিসেফ প্রোগ্রামের হয়ে একটা সমীক্ষা করতে। মানে জাতিপুঞ্জের জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে আমরা শিগগির একটা অনুষ্ঠান করতে পারব আশা করছি। অনুষ্ঠানটা এমন বাচ্চাদের নিয়ে, যারা ইউনিসেফের প্রকল্পগুলোতে অংশগ্রহণ করেছে এবং তার সুযোগসুবিধা পেয়েছে। তা সমীক্ষা বলতে খুঁজে দেখা, কোন কোন শিল্পী ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন।

সত্যজিৎ: বাঃ! শুনে বেশ কৌতূহল হচ্ছে। তার মানে আপনি নিজে কোনো ফিল্ম-টিল্ম বানাচ্ছেন না।

মার্লন: না। আমার কাজের দ্বিতীয় অংশটা হল পরখ করে দেখা, বিভিন্ন দেশে — মানে আমি ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ঘুরেছি — সরকারগুলো যুব প্রকল্পে অংশগ্রহণ করলে কতটা আগ্রহ তৈরি হবে।

সত্যজিৎ: আপনাকে কিন্তু এক্ষেত্রে অডিয়েন্স ব্যাপারটা একেবারে ব্যাপকতম অর্থে ধরতে হবে। বিশেষ করে ভারতে লোকে একইসঙ্গে বিনোদন আর তথ্য পেতে চায়। যা-ই হোক, আপনি তাহলে বেশ কিছুদিন হল আমেরিকার বাইরে রয়েছেন। লম্বা টুর।

মার্লন: বেশ লম্বা। আমি এবার লস এঞ্জেলসে গিয়ে শুয়ে পড়ে একটু দম নেব।

সত্যজিৎ: কেবল দম নেবেন? একটা ছবি করবেন না?

মার্লন: আমি রোজগারের জন্যে ছবি করি। আর সেটা করি যখন দরকার হয় তখন।

সত্যজিৎ: আপনি শেষ কোন ছবিটা করলেন? ওই চ্যাপলিনেরটা, না?

মার্লন: এলিজাবেথ টেলরের সাথে একটা ছবি। নাম ছিল রিফ্লেকশনস ইন আ গোল্ডেন আই। ছবিটা তৈরি করেছিলেন…

সত্যজিৎ: জন হিউস্টন কি?

মার্লন: হ্যাঁ। আপনি জানলেন কী করে?

সত্যজিৎ: ওই, জানি আর কি। এ তো গোপন কিছু নয়, তাই না?

মার্লন: তা ঠিক নয়, তবে কোনো কোনো দিক থেকে গোপন বইকি। আপনি [অমিতা] যখন কথাটা বললেন তখন আমি তর্ক করতে চাইনি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে সারা পৃথিবীতেই আমাদের পরিচয় দেওয়ার দরকার হয়। এখন আমরা শহর এলাকায় বসে আছি। লস এঞ্জেলস, শিকাগো আর নিউইয়র্কে সত্যজিৎ রায়কে সবাই চেনে। আর দিল্লি, কলকাতায় হয়ত কিছু লোক আমাকে চেনে। কিন্তু ডে মোয়েন, আইওয়াতে কেউ মিস্টার রায়কে চিনবে কিনা আমি জানি না। যদি না আমেরিকান প্রেস ওঁকে নিয়ে যে লেখাগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ছেপেছে সেগুলো সে পড়ে থাকে। আমাকেও কি গ্রামে কেউ চেনে? কিন্তু যে পরিমাণ লোক চেনে, তা দেখেও…

সত্যজিৎ: …অবাক হয়েছেন তো? আসলে বোঝেনই তো, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে। ফিল্ম পত্রিকাগুলো আছে তো। আমি আপনার কাজের ভক্ত, কিন্তু আপনার প্রথম ছবিটা আমার দেখা হয়নি। দ্য মেন নাম ছিল কি? জিনেমানের ছবি বোধহয়? তারপর আপনি করলেন আ স্ট্রিটকার নেমড ডিজায়ার। ওটাই আপনার দ্বিতীয় ছবি তো?

মার্লন: তখন আমার একেবারে অল্প বয়স, বহু বছর আগের কথা। সৌভাগ্যক্রমে আমেরিকাতে এখন আমরা সিনেমা হলে আর টিভিতে আরও বেশি বিদেশি ছবি দেখতে পাচ্ছি। বাজারটা বদলাচ্ছে, মানুষের আগ্রহের জিনিসগুলোও বদলাচ্ছে। দশ বছর আগে আপনার ছবির মত ভারতীয় ছবি দেখার কথা আমরা ভাবতেই পারতাম না। এক-আধটা বিশেষ ছবি এদিকে ওদিকে দেখা যেত। কিন্তু পথের পাঁচালি, অপুর সংসার আর অপরাজিত দিয়ে পুরো ভারতীয় ছবির জগতটা যেন আমাদের সামনে খুলে গেল। তারপর খোলাই রয়ে গেল। ছবিগুলো ওখানে দারুণ সফল। আপনার ছবিগুলো নিয়ে ওখানে সবাই প্রচণ্ড উৎসাহিত। ওগুলো সত্যিই ভারী সুন্দর।

সত্যজিৎ: ধন্যবাদ।

মার্লন: খুবই মন ছুঁয়ে যাওয়া। কথাটা ভদ্রতা করে বলা হয়ে থাকে, কিন্তু এটা আমি সত্যি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি বলেই বললাম। আমি আপনার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম এবং মানুষটাকে তার ছবির সাথে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। অনেকসময় দেখা যায় লোকটা আর তার ছবি একেবারেই একরকম নয়।

সত্যজিৎ: আমি না জিজ্ঞেস করে পারছি না, মিলিয়ে দেখে কী মনে হচ্ছে?

মার্লন: এক্ষেত্রে দেখছি একে অপরের পরিপূরক। তবে আমি আপনার খুব বেশি ছবি দেখিনি। যখন সিডনি থেকে ফিরে আসব, তখন কলকাতায় গিয়ে আপনার কিছু ছবি দেখতে চেষ্টা করব।

সত্যজিৎ: মনে হয় আপনার জন্যে কয়েকটা ছবির স্ক্রিনিং করতে পারব। ইদানীংকালের কয়েকটা ছবি।

মার্লন: আপনার যে ছবিগুলো সবচেয়ে ভাল লাগে তার মধ্যে কোনো একটা দেখাবেন।

সত্যজিৎ: আচ্ছা। চারুলতা নামে একটা ছবি আছে, রবীন্দ্রনাথের একটা ছোটগল্প অবলম্বনে।

মার্লন: চারুলতা?

সত্যজিৎ: ওটা কেন্দ্রীয় চরিত্র যে মহিলা, তার নাম।

মার্লন: শার্লট?

সত্যজিৎ: একজন ফরাসি ভদ্রলোকও শার্লট বলেছিলেন বটে। ওটা বেশ তৃপ্তিদায়ক একটা ছবি। ছবিটা উনবিংশ শতাব্দীর পটভূমিকায়, যে সময়টাকে আমরা বাংলার রেনেসাঁ বলি। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক চেতনা রয়েছে, প্রথম রাজনৈতিক খবরের কাগজ বেরোচ্ছে। প্রেমের গল্প। অনেকটাই আন্তন শেকভের গল্পের মত। আরও কয়েকটার কথা বলব। যেমন মহানগর। ওটা হল আজকের কলকাতা, মধ্যবিত্তদের চাকরি, অসুবিধা —- এইসব নিয়ে। আর আছে এই কিছুদিন আগের একটা ছবি, যেটা আমি শেষ তৈরি করলাম — নায়ক। এটা একজন চিত্রতারকা, একজন শীর্ষস্থানীয় ম্যাটিনি আইডলকে নিয়ে।

মার্লন: আপনি কি ওতে শোধ তুলেছেন?

সত্যজিৎ: না না, খুবই সহানুভূতিপূর্ণ ট্রিটমেন্ট।

মার্লন: সেটাই তো প্রতিশোধ।

সত্যজিৎ: ওটার গল্পটা আমারই। একজন শীর্ষস্থানীয় বাঙালি অভিনেতা ওতে অভিনয় করেছেন। আমার ইচ্ছে আপনি ওই ছবিটা দেখুন।

মার্লন: হ্যাঁ, ওটা দেখতে চাই। আপনি চাকরি, সামাজিক অবস্থা নিয়ে যে ছবিটা বানিয়েছেন বললেন ওটা নিয়ে আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে। আজকাল পরিবর্তন বা অনুসন্ধানকে ফিল্মগুলো কতটা প্রভাবিত করে দেখে অবাক লাগে। লোকে সিনেমা সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন হয়ে উঠছে। আর আমার মনে হয় আমরা আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি না, যেভাবে আপনি করেন।

সত্যজিৎ: আসলে পাশ্চাত্যে সোশাল প্রোপাগান্ডা বানানো তো দস্তুর নয়। আপনি তো বিশেষভাবে জানেন, ওটা কেবল কয়েকটা প্রোপাগান্ডাপ্রবণ দেশেরই কাজ বলে মনে করা হয়। ফ্রান্সে তো সামাজিক সমস্যা নিয়ে তৈরি ছবি প্রায় দেখাই যায় না।

মার্লন: আর ভারতে?

সত্যজিৎ: এখানে ওটা কিছুটা দরকার। একটা পর্যায় অব্দি দরকার।

পরবর্তী অংশ >> 

ভাষান্তর: প্রতীক

পড়ুন গোটা সিরিজ : সত্যজিৎ – ব্রান্ডো মুখোমুখি

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.