এই নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে বিশ্ব অর্থব্যবস্থা এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে। প্রায় কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়, কিন্তু কোনো কোনো দেশে এর প্রভাব পড়েছে খুব বেশি। বিশেষ করে সেইসব দেশে, যেখানে আগে থেকেই কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল বা এমন কিছু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের উপর অত্যধিক নির্ভরতা ছিল যেগুলি মহামারীজনিত কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হল আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা, যেখানে অর্থনৈতিক সঙ্কট এখন হাতের বাইরে চলে গেছে। আমাদের আরও দুই প্রতিবেশী দেশ, পাকিস্তান ও নেপাল, ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। আর এক প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশও স্বস্তিতে নেই। বেশ কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হল পেট্রল ও ডিজেলের উপর ভর্তুকি কমানোর ফলে অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি।

আমাদের দেশ ভারতেও অর্থনৈতিক সমস্যা খুব কম নয়। দেশে বেকারত্বের সমস্যা অভূতপূর্ব। যদিও তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। হয়ত এই কারণে, যে এই সমস্যা দেশের সবাইকে স্পর্শ করেনি। তবে দেশে লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সংকোচনের ফলে কর সংগ্রহে ঘাটতি, অন্যদিকে মহামারী পরিস্থিতি সামলাতে স্বাস্থ্য খাতে অভূতপূর্ব খরচ বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর প্রায় সব দেশই রাজকোষ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আমাদের দেশও শ্রীলঙ্কার মত পরিস্থিতিতে যাতে না পড়তে হয় তার জন্য বিভিন্ন রাজ্য সরকারকে জনকল্যাণমূলক বা জনমোহিনী প্রকল্পে ব্যয় সংকোচনের নিদান দিয়েছে। অবশ্য বলে রাখা ভাল, আমাদের দেশের বেশ কিছু রাজ্যে রাজকোষ ঘাটতি বেশ বেশি হলেও, ঠিক সেই কারণে শ্রীলঙ্কার মত পরিস্থিতি বা সংকট সৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য নয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কোনো সন্দেহ নেই, দেশে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যার বেশির ভাগটাই আসে দেশের বাইরে থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। তবে একথাও মনে রাখা দরকার, বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের মূল্য যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অর্থাৎ এর পুরো দায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর চাপানো ঠিক হবে না। বরং এর আরও একটা বড় কারণ দেশে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের জোগানে ঘাটতি।

ভারতে ব্যবহৃত ভোজ্য তেলের বড় অংশ আসে বাইরে থেকে, তাই তার দাম বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দায়ী। তার অনেকখানিই হয়েছে যুদ্ধজনিত অস্থিরতার কারণে। তাই আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে হয়ত দায়ী করা যাবে না। ইউক্রেন যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সারের বড় যোগানদার এবং ভারত সারের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল, তাই সারের দাম বৃদ্ধিতে অবশ্যই যুদ্ধের ভূমিকা আছে। কিন্তু সারের দাম বৃদ্ধি কৃষিদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে এত তাড়াতাড়ি প্রভাব ফেলার কথা নয়। বরং এর প্রভাব বোঝা যাবে আরও কিছু পরে। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে কৃষিদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা আছে। যা-ই হোক, কৃষিদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি যেহেতু অতিমারীর পর থেকেই বজায় আছে, তাই এর জন্য লকডাউন এবং তার ফলে উদ্ভূত পরিবহন ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের সংহতি সাধনে ব্যাঘাত সৃষ্টির ভূমিকা থাকা সম্ভব। শুধুমাত্র কৃষিকে লকডাউনের আওতার বাইরে রেখে তা আটকানো সম্ভব ছিল না। আরও আগে যে বিমুদ্রাকরণ ও পণ্য পরিষেবা কর চালু করা হয়েছিল, তার ফলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ব্যাঘাত ঘটেছে। সে কারণেও এই সংকট এসে থাকতে পারে, কারণ এগুলির সাথে কৃষিক্ষেত্রের গভীর সম্পর্ক আছে।

এছাড়া সাধারণভাবে কৃষির সাথে শিল্পদ্রব্যের সম্পর্ক আছে। শিল্প এখন অনেকখানি আমদানি নির্ভর। তাই টাকার মূল্য কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন তথা বিভিন্ন দ্রব্যের উৎপাদন শৃঙ্খলে ভাঙনের ফলে সাধারণভাবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবেও ভারতের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঊর্ধ্বগামী হওয়া খুব স্বাভাবিক। আজকের দিনে বেশিরভাগ দ্রব্যের উৎপাদনে যেসব উপাদান ব্যবহৃত হয় তা আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। তার জন্য দরকার সুসংহত আন্তর্জাতিক পরিবহন তথা যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা অতিমারী পরিস্থিতে বিঘ্নিত হয়েছিল। তার প্রভাব এখনো খানিক বর্তমান।

এখন প্রশ্ন হল, হঠাৎ টাকার দাম এভাবে কমে যাচ্ছে কেন? সাধারণভাবে বলা হয়, আমদানি রপ্তানির ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটলে, বিশেষত রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হলে, সেই দেশের মুদ্রার মান কমতে থাকে। এমনও বলা হয় যে এরকম মুদ্রার মানের অবনয়ন শেষ পর্যন্ত আমদানি রপ্তানিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে এবং একসময় অবনয়নও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। স্মরণ করা যেতে পারে, ভারতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই তেলের দাম মাত্রাছাড়া হয়ে গেছে তখনই টাকার দামের পতন হয়েছে এবং অনেক সময় বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বে মুদ্রার বিনিময় মূল্যে পতনের মাধ্যমে আমদানি রপ্তানিতে ভারসাম্য নিয়ে আসা সম্পর্কে যা-ই বলা হোক, বাস্তবে সেই পথে এগোনো অসম্ভব। সে পথে এগোতে গেলে তেলের দাম এত বেড়ে যেতে পারে, যাতে করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিয়ে যাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। কারণ জ্বালানি প্রায় সমস্ত কর্মকাণ্ডে অপরিহার্য উপাদান। বস্তুত শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণ এটিই।

আরো পড়ুন চীনা ঋণের ফাঁদ কি সত্য, নাকি মায়া?

অর্থাৎ মুদ্রার বিনিময় মূল্য পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। পাশাপাশি এ-ও মনে রাখা দরকার, মুদ্রার বিনিময় বাজারের ব্যাপারটিই গোলমেলে, কারণ তা যথাযথ হতে গেলে সমস্ত মুদ্রারই নিজ নিজ শক্তি নিয়ে বাজারে অংশগ্রহণ দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবের বাজারে তো ডলারের একাধিপত্য, যার জোগান নির্ভর করে একটি দেশের সরকারি নীতির উপর।

তবে ভারতের মত দেশে মুদ্রার বিনিময় মূল্য শুধুমাত্র আমদানি রপ্তানি (যা পণ্য এবং পরিষেবা দুয়েরই হতে পারে) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় না। বিদেশে কর্মরত ভারতীয়দের প্রেরিত অর্থ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় তা হয়ত আমরা সকলেই জানি। বিদেশি পুঁজির আসা যাওয়াও এক বড় নিয়ন্ত্রক। অবশ্য ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ সেখানে বিদেশি পুঁজির আসা তেমন নয়। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি আসা যাওয়া অনেক কম। সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে এবং সুদের হার বাড়িয়ে এর মোকাবিলা করা যাবে – এই আশায় সেখানে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। ফলে বিদেশি পুঁজি, যারা খুব সামান্য প্ররোচনায় দেশ বিদেশে পাড়ি দেয়, তাদের দেশ ছেড়ে মার্কিন দেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার প্রভাবও টাকার বিনিময় মূল্যে পড়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে, অর্থব্যবস্থায় অনেককিছুই নির্ধারিত হয় কী হয়েছে তা দিয়ে নয়, বরং বাজারে যারা আছে তারা কী হতে পারে বলে মনে করে, তা দিয়ে। তাই অনেকসময় দেশ থেকে সামান্য পুঁজি বেরিয়ে গেলেও তার প্রভাব অনেকখানি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার মত হতে পারে। এমন করেই জ্বালানি বা অন্যান্য মৌলিক দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণে চাহিদা-যোগান ছাড়িয়ে বড় ভূমিকা পালন করে ফাটকাবাজদের বা অগ্রিম বাজারের উপস্থিতি। ফলে এইসব দ্রব্যের মূল্য কখনোই ‘সঠিক’ জায়গায় থাকে না এবং অত্যন্ত অস্থির থাকে। এরকম বাজারের নিয়মই হল, ফাটকাবাজদের প্রত্যাশা বড় ভূমিকা পালন করবে। তাদের প্রত্যাশা অযৌক্তিক হওয়াও অসম্ভব নয়। তাই অবিরত বিদেশি পুঁজি ঢুকিয়ে টাকার দরে স্থিতাবস্তা নিয়ে আসার চেষ্টা সবসময় ফলপ্রসূ হয় না।

একদিকে রাজকোষের ঘাটতি (কেন্দ্র ও রাজ্য – উভয় স্তরে) ও অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির সাথে যুঝতে যেমন একদিকে বেশকিছু দ্রব্যের উপর পণ্য ও পরিষেবা কর বাড়ানো হয়েছে, তেমনি আবার মূল্যবৃদ্ধি রুখতে সুদের হার বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কর বাড়লে মূল্যবৃদ্ধি ঘটাই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া পণ্য ও পরিষেবা করের মত পরোক্ষ করের উপর বেশি নির্ভরশীল হলে অপেক্ষাকৃত গরীব লোকেদের উপর বোঝা বাড়ে। এ-ও কারোর অজানা নয় যে এ দেশের গরীব মানুষ বেশ কষ্টে আছে। তাহলে অন্য কোনো বিকল্পের কথা কি ভাবা যেত না?

ব্যবসায়িক সংস্থার উপর কর আমাদের দেশে বেশ কম এবং তা করা হয়েছে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু সে চেষ্টা যে খুব সফল হয়েছে একথা বলা যায় না, বিশেষ করে প্রকৃত বিনিয়োগের ব্যাপারে। তাই ও দিকটা পুনর্বিবেচনা করা যেত। আর মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার মূল কারণ যখন মৌলিক তথা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জোগানে ঘাটতি, তখন সুদের হার বৃদ্ধি খুব একটা কার্যকরী পদক্ষেপ হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশে। বরং তাতে বিনিয়োগ ব্যাহত হতে পারে এবং কার্যকরী পুঁজির খরচ বাড়তে পারে, ফলে মন্দাস্ফীতির মত পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ শুধু বাস্তবের উপর ভিত্তি করে হয় না, বিশ্বাসেরও একটা বড় ভূমিকা থাকে! অবশ্য দীর্ঘ সময় ধরে চড়া মূল্যস্ফীতি হলে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সুদের হার নির্ধারণের প্রশ্নও উঠতে পারে, তবে তা অন্য বিষয়।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.