জনসংখ্যায় ভারত চীনকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বে প্রথম স্থান দখল করার খবর আসতেই এই নিয়ে পুরনো বিতর্ক আবার সামনে চলে এসেছে। এক দল যদি মনে করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানেই সমস্যা বৃদ্ধি তো অন্য দল মনে করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি আসলে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের (demographic dividend) সুযোগ সৃষ্টি করে। ভারতে উচ্চ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেকদিন ধরে হতে থাকলেও ১৯৭০-এর দশকে এটাকে একটা সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর সাথে সারা বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদের নিরিখে জনসংখ্যা অনেকটাই বেশি হওয়া নিয়ে চিন্তা বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক আছে। তবে ১৯৯১ সালে ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও এক নতুন প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিকোণ সামনে আসে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করবে – এই ধারণা প্রচারিত হতে থাকে।

এরকম ধারণার পক্ষে অবশ্যই কিছু যুক্তি আছে। নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতিতে কোন দেশে মজুরি কম হলে সেই দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানেই বাজারের আয়তন বৃদ্ধি, কারণ মানুষ ন্যূনতম ভোগব্যয় করবেই। এটাও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মানুষ তথা জনগণকে সমস্যা হিসাবে না দেখে সম্পদ হিসাবে দেখার নৈতিক যুক্তিও দেওয়া হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অন্যদিকে যুক্তি দেওয়া হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলে মজুরি কমার প্রবণতা দেখা দেবে এবং তাতে পুঁজিপতি শ্রেণি খুশি হবে। তবে ভারতের মত দেশে পৃথিবীর প্রায় ১৮% মানুষ বাস করে অথচ তার দখলে পৃথিবীর মাত্র ২.৪% পৃষ্ঠভূমি। একইভাবে জল ও অন্যান্য সম্পদও ভারতে জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। তাই এরকম জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভীষণ চাপ তৈরি করে তা অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া ভারতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা তথা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই অপ্রতুল। সেখানে এরকম জনসংখ্যা বৃদ্ধি এই এইসব সুবিধাকে আরও বেশি অপ্রতুল করে তোলে। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বেশি হয় গরীব মানুষের মধ্যে, যাদের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করার আগ্রহ এবং সামর্থ – দুয়েরই অভাব থাকার কারণে এবং এদের হাতে সম্পদ অপ্রতুল হওয়ার কারণে এদের পক্ষে অর্থব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিমাণে যোগদান করাও মুশকিল হয়ে পড়ে।

তবে এটা অবশ্য আজ দিনের আলোর মত পরিষ্কার যে গত তিন দশকে ভারত জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ পেয়েছে – এরকম বলার কোনো অবকাশ নেই। বরং দেশ শিল্পক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ভারত বিদেশের বাজার দখল করার পরিবর্তে ভারতের বাজারেই বিদেশি দ্রব্যের রমরমা বেড়েছে। এর হয়ত অনেকগুলো কারণ আছে, তবে একটা কারণ অবশ্যই রাষ্ট্রের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগে অনীহা। গ্রামীণ অর্থব্যবস্থা, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের একটা ভূমিকা থাকে, সেখানে সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা অনেকটাই বেশি হয়ে যাওয়ায় আরও অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ প্রচ্ছন্ন বেকার হয়ে পড়েছে। ভারতে সামাজিক সুরক্ষা নেই বললেই চলে, কিন্তু এখানে প্রাচীনকাল থেকে সন্তানরাই পিতামাতার সামাজিক সুরক্ষা হিসাবে কাজ করে আসছেন। কিন্তু আজ সেই সন্তানদের অনেকের নিজেদেরই টিকিয়ে রাখা মুশকিল হওয়ায় এই চিরাচরিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। দেশে বেকার ও প্রচ্ছন্ন বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নানারকম সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টেনে বলা যায়, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, সিন্ডিকেটরাজ তথা তোলাবাজি এরই ফলশ্রুতি এবং এসবের ফলে যে অর্থব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই।

জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের ধারণা শুধুমাত্র আর্থিক বৃদ্ধিকেই পাখির চোখ করে এবং পরিবেশ বা বাস্তুতন্ত্রের বিষয়গুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ তথা বাস্তুতন্ত্রের অবনমন আজ অনেকটাই প্রকট। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে ভারত এখন প্রাকৃতিক প্রতিস্থাপন হারের (যতটা জল উত্তোলন বৃষ্টির জল দিয়ে পূরণ করা যাবে) অনেক বেশি ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করছে। দেশের অনেক এলাকাই এখন জলসঙ্কটে ভুগছে এবং প্রতি বছরই এরকম এলাকার সংখ্যা বেড়ে চলেছে। খাদ্য সুরক্ষার চিন্তা ভারতকে খাদ্য ছাড়া অন্য কৃষি দ্রব্য উৎপাদনে বাধা দিচ্ছে, যার ফলে আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক কৃষি পণ্য উৎপাদন তথা রপ্তানি করা যাচ্ছে না। প্রকৃতি ভারতের প্রতি বেশ কার্পণ্য করেছে, যার ফলে ভারতকে খনিজ তেল সহ আরও অনেক খনিজ দ্রব্য বিপুল পরিমাণে আমদানি করতে হয়। খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে এত বেশি চিন্তা না থাকলে বাণিজ্যিক কৃষি পণ্য রপ্তানি করে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি – যা মাঝেসাঝেই দেশের অর্থব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দেয়, এমনকি অস্থির করে তোলে – কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যেত।

ভারত চীনের মত এক সন্তান নীতি গ্রহণ করেনি ঠিকই, তবু ভারতের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে এক সন্তান একটা নিয়ম বা মান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের অনেকের কাছেই সন্তান উৎপাদন বা প্রতিপালন এখন বেশ খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। সন্তানের জন্ম থেকে শিক্ষা – কোনো ব্যাপারেই মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর ভরসা রাখতে পারছে না। উচ্চশিক্ষায় অবশ্য এখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা অনেকটাই অটুট। কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা এতই কম, যে তাদের আশঙ্কা সন্তানকে অনেক খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়তে হতে পারে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় সুযোগ এতটাই কম, যে সন্তানরা বড় হয়ে কী করবে সেই চিন্তাও অনেককে বাধ্য করে একাধিক সন্তানের জন্ম না দিতে। আবার ঠিক চীনের মতই পুত্রসন্তানের প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ আসক্তি এবং স্ব-আরোপিত এক সন্তান নিয়ম ভয়ঙ্কর লিঙ্গ বৈষম্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এগুলোও অত্যধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল।

আরো পড়ুন ভর্তুকি উন্নয়নের পরিপন্থী: বাজার মৌলবাদীদের কুসংস্কার

এতকিছুর পরেও যে অনেকেই জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন, তা সত্যিই অবাক করার মত। এটা এখন বেশ পরিষ্কার যে ভারতে আরও বেশি জনসংখ্যা ধারণ করার মত পরিবেশগত স্থান যেমন নেই, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত জনসংখ্যা থেকে তথাকথিত জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের ফায়দা তোলার মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং উদ্যমের মূলধন নেই। দেশে যারা সদ্য সাবালক হয়েছে বা হতে চলেছে, তাদের একটা বড় অংশ ঠিকমত শিক্ষা পায়নি বা পাচ্ছে না। বিশেষত যে সমস্ত রাজ্যে জন্মহার বেশি, সেখানে শিক্ষা পরিকাঠামো এতই খারাপ যে অদূর ভবিষ্যতে তা উন্নত করে আগামী শিশুদের জন্য সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা করাও বেশ কঠিন কাজ হবে। যার অর্থ, আগামী বেশ কিছুকাল যাবৎ শিশুদের একটা বড় অংশ যথাযথ শিক্ষা ছাড়াই বড় হবে। এরকম পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষে তথাকথিত জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের ফায়দা তোলার কথা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। বড়জোর ভারত যত শীঘ্র সম্ভব শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে যাকে অনেকে জনসংখ্যাগত বিপর্যয় (demographic disaster) বলে, তা সীমিত করতে পারে মাত্র।

অত্যধিক জনসংখ্যা ভারতের অন্যতম মাথাব্যথার কারণ হলেও, একথাও ঠিক যে এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করে বিশেষ লাভ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সামগ্রিকভাবে ভারতের জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের নিচে নেমে গেছে। অর্থাৎ ভারত কিছুকালের মধ্যেই জনসংখ্যার নিরিখে স্থিরতা অর্জন করবে। কয়েকটা রাজ্যে অবশ্য এই জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের কিছুটা উপরেই আছে। বিশেষত বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং ঝাড়খণ্ডের মত রাজ্যে, যেখানে জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের অনেকটাই উপরে, সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে অনেকটাই খারাপ। তাই এইরকম রাজ্যগুলোতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারে। ভারতের জনসংখ্যা ২০৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ১৭০ কোটির কাছাকাছি গিয়ে স্থিরতা অর্জন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সময়টাকে যদি কিছুটা এগিয়ে আনতে পারা যায়, ২০৫০ সালের কাছাকাছি কোনো একটা সময়ে এবং ১৬০ কোটি জনসংখ্যার কাছাকাছি – তাহলে কিছুটা হলেও সমস্যাটা কমানো যায়। তবে একথা মাথায় রাখতে হবে, যে এটা করতে হবে শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি ও জন্মনিয়ন্ত্রণে সহায়তা দিয়ে। জোরজবরদস্তিমূলক জন্ম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ১৯৭০-এর দশকে উল্টো ফল দিয়েছিল, এখনো তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়।

আবার পশ্চিমবঙ্গ ও পাঞ্জাবের মত রাজ্যে জন্মহার এত কমে গেছে যে অদূর ভবিষ্যতেই সেসব জায়গায় বয়স্ক লোকের তুলনায় যুবসম্প্রদায়ের সংখ্যা কমতে শুরু করবে। এতেও এক ধরণের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এমনিতেই যারা উপার্জন করে তাদের একটা বড় অংশের উপার্জন খুব বেশি নয়। তাই এদের ঘাড়ে যদি আরও বেশি সংখ্যক বয়স্ক লোকের দায়িত্ব চাপে, তাহলে এদের অনেকের পক্ষেই তা বহন করা মুশকিল হবে। তাই এই সমস্ত রাজ্যে বয়স্কদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে জোর দিতে হবে। এ ব্যাপারে বিহার, উত্তরপ্রদেশে অধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পশ্চিমবঙ্গের খুব একটা কাজে আসবে না। ২০৬০ সালের পর ভারতে হয়ত জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে। এরকম পরিস্থিতিতে কিছু দেশ জন্মহার বৃদ্ধিতে প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে ভারতের মত দেশে, যেখানে পরিবেশের উপর চাপ এমনিতেই অনেক বেশি, সেখানে এরকম না করে জনসংখ্যা হ্রাস মেনে নেওয়াই ভাল। তাতে যদি অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কিছুটা কম হয় তাতেও ক্ষতি নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।