নদী বয়ে নিয়ে চলেছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই। কোথাও আবার স্পঞ্জ আয়রন কারখানার বর্জ্যে দূষিত জলের রং হয়ে গেছে সিঁদুরে লাল। নদী থেকে অবাধে বালি, পাথর লুঠ, খাল, ছোটবড় নদীর প্রবাহপথ দখল হয়ে যাওয়ার চিত্র ছড়িয়ে রয়েছে পথ জুড়ে। সরকারি নানা প্রকল্পের নির্মাণকাজও হচ্ছে নদীর পথ, নিকাশি খালের ক্ষতি করে। ‘জল ধরো জল ভরো’ নীতি ঠিকমত বাস্তবায়নের বদলে সরকারি নানা প্রকল্পেই মাটির তলার জল নির্দ্বিধায় তুলে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ। নদী, ভূগর্ভস্থ জলে টান পড়ছে। জঙ্গল, পাহাড়ও আর সমাজের অধিকারে থাকছে না; ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাচ্ছে। বন্যা মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন দফতর, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমম্বয়ের অভাব অতি প্রকট। অথচ পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে গড়ে উঠেছে অঘোষিত ঐকমত্য। পুঁজির স্বার্থে চালু করা উন্নয়ন নামের যজ্ঞ সেই মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের নখানা জেলার ৭৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এমনই অভিজ্ঞতা হল সাইকেল যাত্রীদের। ‘ছোট নদীর দিকে নজর দিন, প্রজন্মের যত্ন নিন’ – এই বার্তা নিয়ে গত মাসে হল ১২ দিনব্যাপী সাইকেল মিছিল। গত ১৮ জানুয়ারি বীরভূম জেলার ময়ূরাক্ষীর তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে শুরু হয়েছিল এই সাইকেল যাত্রা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে বর্ণিত ময়ূরাক্ষী নদী এখন শীর্ণকায়া। নদীর বালি, পাথর লুঠ করায় বীরভূম জেলা এখন সংবাদের শিরোনামে। অনেকেই হয়ত জানেন না, জেলা সদর সিউড়ি অতি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিন সিউড়ির নদী সভায় যাত্রীরা সেই সংকটের উল্লেখ করেন। পথের প্রচারসভাগুলোকে উদ্যোক্তারা নাম দিয়েছিলেন নদী সভা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বীরভূম জেলা থেকে পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, হাওড়া জেলা অতিক্রম করে ২৯ জানুয়ারি কলকাতায় এই সাইকেল অভিযান শেষ হয়। পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের ভয়ঙ্কর চিত্র প্রত্যক্ষ করা, নদী সভা করার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা পেরিয়ে আসা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে মত বিনিময়ও করেন। তাঁরা বুঝতে চান প্রাকৃতিক সম্ভার রক্ষায় মূলবাসীদের বহু পুরুষলালিত ধারণা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের জীবিকা, সংস্কৃতি, জীবনচর্যা। তারই সঙ্গে বিলি করা হয় ১৪ দফা দাবি সম্বলিত প্রচারপত্র।

যাত্রীরা দেখেছেন, বীরভূম জেলার বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাইয়ের পুকুর। সেই ছাই বয়ে নিয়ে চলা চন্দ্রভাগা নদী। দুবরাজপুরে মিছিল পড়ে তীব্র যানজটে। পাথর নিয়ে সারি সারি ডাম্পার দাঁড়িয়ে। ঝাড়খণ্ড রাজ্য, বীরভূম জেলা থেকে পাহাড়, নদীর পাথর কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন (থুড়ি পাথরে ভরা দৈত্যাকার ডাম্পার) রাস্তায় এভাবে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে মসৃণ গতিতে এগোয় কার সাধ্যি? বীরভূম জেলায় যাত্রাপথে পড়ে বক্রেশ্বর, শাল, হিংলো, অজয়ের মত ছোট বড় নদনদী।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার পাণ্ডবেশ্বরে নদী সভা চলাকালীন চোখে পড়ে নদী থেকে বালি নিয়ে চলা ট্রাক। স্থানীয় মানুষ শোনান অবাধে বালি লুঠের কাহিনি। মাটির তলার খনি, নদীর বালি সহ প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠের সাক্ষী হয়ে রয়েছে দূষণে বিপর্যস্ত প্রকৃতি। পশ্চিম বর্ধমান জেলার কয়লাখনি অঞ্চল জুড়ে টের পাওয়া গেল বাতাস, জলদূষণের ভয়াবহ পরিণতি। গাছের পাতাও এখানে কালচে। আসানসোলের উপকণ্ঠে কল্যাণপুরে গারুই নদী নাগরিক বর্জ্যে রূপান্তরিত হয়েছে দূষিত নালায়। জামুরিয়ার সিঙ্গারন নদীর একপ্রকার দখল নিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। কারখানার বর্জ্যে নদীর জল লাল। আশপাশের বেশ কয়েকটা আদিবাসীদের গ্রামের মানুষের জলের একমাত্র উৎস সেই দূষিত জল। যাত্রীদের চোখে পড়ে – সেই জলে বাসন মাজছেন, কাপড় কাচছেন, স্নান করছেন গ্রামবাসী। স্থানীয় অধিবাসীরা পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে উগরে দেন ক্ষোভ। অভিযোগ – প্রশাসন কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিবাদীদেরই বারবার হেনস্থা করছে।

সাইকেল মিছিলের একটি দৃশ্য। ছবি সংগঠকদের সৌজন্যে

দামোদর ও বরাকরের সংযোগস্থল দেখে সাইকেল মিছিল ঢোকে পুরুলিয়া জেলায়। জঙ্গলমহলে প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠ করার দৃশ্য আরও ভয়াবহ। সানতালডিহি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই বয়ে নিয়ে চলেছে গোয়াই নদী। ছাইয়ে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের চাষবাসও বিপর্যস্ত। সেতুর উপর থেকে দেখা যায় গোয়াই ও ইজরি নদীর সঙ্গমস্থল, সেতুর শেষে থেকেই শুরু হচ্ছে ঝাড়খণ্ড। এখানকার নদী সভায় উপস্থিত ছিলেন নদী দূষণের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া প্রতিবাদীরা। এখানেও প্রতিবাদীদের উপর প্রশাসনিক হেনস্থার অভিযোগ আছে। সিঙ্গারন, গোয়াই নদীর দূষিত জল গিয়ে পড়েছে দামোদরে আর দামোদর মিশেছে গঙ্গায়। কোটি কোটি টাকা খরচ করলেই কি আর গঙ্গা দূষণমুক্ত করা যায়? পুরুলিয়া জেলায় সাইকেল যাত্রীরা পরিদর্শন করেন শিলাই নদীর উৎসস্থল।

এক পুকুর থেকে এই নদীর উৎপত্তি। শিলাই নদীর উৎসে তখনো চলছিল মকর মেলা। সেদিন ছিল ৮ই মাঘ। পয়লা মাঘ এখানকার বিভিন্ন জনজাতির বছরের শুরু। সেদিন গরাম থানে পুজো দেওয়াই রীতি। আগের দিন সংক্রান্তিতে হয় মকর পরব। প্রকৃতি, কৃষিকেন্দ্রিক উৎসবে মেতে থাকে জঙ্গলমহল। প্রাকৃতিক সম্ভার লুঠের সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকায়ত সংস্কৃতি হারাচ্ছে নিজস্বতা। কাঁসাই নদীর দুই পারে টুসু ভাসান হয়। কিন্তু কেমন আছে কাঁসাই? অবাধ বালি লুঠে সেও আজ বিপন্ন। কাঁসাই সংলগ্ন গ্রামগুলোর বাসিন্দারা শোনাচ্ছিলেন সেই কথা। গরমে নদীর বালি সরিয়ে জল সংগ্রহের অভ্যাস বহু প্রজন্ম ধরে প্রবাহিত। বালি লুঠের ফলে গরমে সেই জলও পাওয়া যাচ্ছে না। পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দারা নদী সভায় শোনালেন নদী দখলের কথা। শোনা গেল, প্রশাসনের কড়াকড়িতে লুঠ করা বালি নিয়ে যাওয়ার বাহন বদলেছে মাত্র। আগে যেত ট্রাকে, এখন যায় ট্র্যাক্টরে। পুঞ্চায় গতবারের গরমে তীব্র জলসংকট দেখা দিয়েছিল। পাড়ায় পাড়ায় জল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

পথেই সাইকেল যাত্রীদের সঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের কথা হচ্ছিল। এই মরশুমে বৃষ্টি ভাল হওয়ায় আমন ধানের ফলন ভাল হয়েছে। তার আগের বেশ কয়েকবছর তীব্র জলাভাবে জেলায় ধান ভাল হয়নি। জঙ্গলমহল জুড়ে চলছে অবাধে জঙ্গল নিধন, পাহাড়ের পাথর লুঠ। সানতালডিহির কাছে পাহাড়িগোড়ায় যাত্রীরা পাহাড় লুঠের পরিণতি প্রত্যক্ষ করেন। লুঠ শুরু হয়েছিল ছয় দশক আগে, ক্রমশ বেড়েছে। শেষে থান যখন আক্রান্ত হল, তখন আদিবাসীরা লুটেরাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। যাত্রীদের মনে পড়ে যায়, ওড়িশার নিয়মগিরি পাহাড় বাঁচাতে আদিবাসী মানুষের লড়াইয়ের কথা। পুরুলিয়া জেলার উদয়পুর উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে হয় নদী সভা।

মানবাজার থেকে কংসাবতী নদী নৌকোয় পেরিয়ে সাইকেল যাত্রীরা পৌঁছন বাঁকুড়া জেলার মুকুটমণিপুরে। দিনটা ছিল ২৩ জানুয়ারি, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন। ছুটির দিনে পিকনিকের ভিড়। প্রকৃতি উপভোগ করতে ভিড় জমানো মানুষের মধ্যে কতজন প্রকৃতি বাঁচাতে সচেতন? কতজন খবর রাখেন এই বাঁধ তৈরির সময়ে আদিবাসী-মূলবাসীদের উচ্ছেদের? সাইকেল যাত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করা একজন মানুষের। গত শতকের পাঁচের দশকে কংসাবতী বাঁধ নির্মাণে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর ক্ষতিপূরণের দাবিতে গড়ে উঠেছিল লড়াই। ভদ্রলোক তখন শৈশবে। তাঁর বাবা-মা দুজনেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। মা জেল খেটেছিলেন। নদীবাঁধের বিরুদ্ধে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে এই বাংলাতেও বহু আগেই প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। তিনিই সাইকেল যাত্রীদের দেখালেন বাঁধ কীভাবে কুমারী নদীর ক্ষতি করেছে।

বাঁকুড়া শহরে দ্বারকেশ্বর আর গন্ধেশ্বরী নদীর সঙ্গমস্থলেও দেখা যায় দখলদারির ভয়াবহ চিত্র। নদী এখানে প্রায় পুরোপুরি মাঠ হয়ে গেছে। গন্ধেশ্বরী বাঁচানোর জন্য স্থানীয় মানুষ বহুবছর ধরে লড়ে যাচ্ছেন। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের মূর্তিতে মাল্যদান করে সাইকেল যাত্রীরা পৌঁছন ওন্দায়। চোখে পড়ে বিরাই নদীর দুর্দশা। শিলাবতী পেরিয়ে সাইকেল মিছিল প্রবেশ করে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতায়। গনগনিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংগঠকদের সঙ্গে নদী সভায় উঠে আসে শিলাবতীর দুরবস্থার কথা। শিলাইয়ের নাম এখানে শিলাবতী। যেমন কাঁসাই পরবর্তীতে হয়েছে কংসাবতী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পর্যটকদের চাপে গনগনির ভূমিরূপ বদলে যাচ্ছে। কাজু বাদাম গাছের মধ্যে অনেকগুলোই মুমূর্ষু। পিংবনী খাল, কংসাবতী নদীর সেতু পেরিয়ে লালগড়, দহিজুড়ি হয়ে সাইকেল মিছিল পৌঁছয় ঝাড়গ্রাম শহরে। সেখান থেকে আবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ধরে জেলা সদর মেদিনীপুর। পথে বৈতাতে অভিযাত্রীরা শোনেন কংসাবতীর নদীর ভাঙনের কথা। দেখেন দিনের আলোয় বুলডোজার দিয়ে নদী থেকে বালি তোলা, ধেড়ুয়ায় গোড়ালি ডোবা জলে গ্রামবাসীদের কংসাবতী নদী পার হওয়ার দৃশ্য। পুরুলিয়া থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর – জঙ্গলমহলের পথে পথে মিলেছে অসংখ্য পুকুর, দীঘি। এগুলো রুক্ষ এই মালভূমি অঞ্চলের জীবনদাতা।

মেদিনীপুর শহর থেকে গন্তব্য ছিল নিম্ন দামোদর অববাহিকা। কেশপুর, দাসপুর হয়ে সাইকেল যাত্রীরা পৌঁছন ঘাটালে। ঘাটাল, খানাকুল, আমতা, উদয়নারায়ণপুর প্রতিবছর বন্যার জন্য খবরের শিরোনামে আসে। তিনটে জেলায় অবস্থিত এই জনপদগুলোর সংকটে কোনো পার্থক্য নেই। ঘাটালে নদী পেরিয়ে সাইকেল মিছিল পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে প্রবেশ করে হুগলী জেলার খানাকুলে। শিলাবতী ও দ্বারকেশ্বর মিলে হয়েছে রূপনারায়ণ। দামোদর, শিলাই বা শিলাবতী, কাঁসাই বা কংসাবতী, দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে ৭৫০ কিলোমিটার যাত্রাপথে দেখা হয়েছে বারবার। পুরুলিয়া জেলায় পুকুরের থেকে যে শিলাই নদীর উৎপত্তি, সেই নদীই পথে অসংখ্য খাল, ছোট নদীর জলে স্ফীত হয়ে পড়েছে রূপনারায়ণে। প্রকৃতির এটাই নিয়ম। খাল, ছোট নদী, বড় নদী তার সঙ্গে পাহাড়, জঙ্গল – সব একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রাজ্যে এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু। কিন্তু পারস্পরিক সমম্বয়হীন, এই ধরনের খণ্ডিত মাস্টার প্ল্যানে কাজ হয় না। তাই সাইকেল মিছিল থেকে সমগ্র নদী অববাহিকার ভূমিরূপ ব্যবস্থাপনার জন্য পরিকল্পনার দাবি উঠেছে। দাবির যাথার্থ্য প্রমাণিত হয়েছে গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসের ভয়াবহ বন্যায়। আরামবাগ মাস্টার প্ল্যানে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরেও দেখা গেছে মুণ্ডেশ্বরী, দ্বারকেশ্বরের ভয়ঙ্কর রূপ। দামোদরের জলে স্ফীত মুণ্ডেশ্বরীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে হুগলি ও হাওড়া জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। খানাকুলের নদী সভাগুলোতে উঠে এসেছে সেসব কথা। পাশাপাশি হুগলি জেলারই ভাবাদীঘি গ্রামের বাসিন্দাদের দীঘি বাঁচানোর লড়াইয়ের কথাও তুলে ধরেন সাইকেল যাত্রী ও স্থানীয় সংগঠকরা।

আরো পড়ুন বড় বাঁধ ক্ষতি করছে: কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে?

খানাকুলের রামনগর অতুল বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষক পুষ্পস্তবক ও মূল্যবান বই উপহার দিয়ে সাইকেল যাত্রীদের শুভেচ্ছা জানান। রামমোহন রায়ের জন্মস্থান খানাকুল। তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করে সাইকেল মিছিল বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে ছোট নদী পেরিয়ে ঢুকেছে গ্রামের ভিতরে। কানা নদীর পাড় বাঁধের ধার ঘেঁষে জলের পাইপলাইন বন্যায় নদীর হানা বাড়িয়েছিল। বন্যায় খেতে জমা বালির কিছু এখনো রয়ে গেছে। বন্যার পর বেড়েছে পঞ্চায়েতের মাতব্বর আর বালি মাফিয়াদের আনাগোনা। ভাগ, চুক্তি, ইজারা চাষি, বেশিরভাগ মৎস্যজীবী, খেতমজুর সরকারি নিয়মের বেড়াজালে ক্ষতিপূরণ পাননি। সাইকেল মিছিলের প্রচারপত্রেও তাই ক্ষতিপূরণের সরকারি নিয়ম বদলের দাবি তোলা হয়েছে। অভিযাত্রীদের কাছে কেউ বা শোনান বন্যায় কাঁচা বাড়ি ভাঙার পর শীতে তাঁদের দুরবস্থার কথা। আবাস যোজনার তালিকায় তাঁদের অনেকের ঠাঁই মেলেনি।

বন্যাপ্রবণ এই অঞ্চলে অবাধে খাল, নদী দখল, এমনকি বেমালুম গায়েব করে দেওয়ার চিত্রও সাইকেল যাত্রীরা প্রত্যক্ষ করেন। নালায় পরিণত হওয়া নদীর বুকেই হয়েছে সরকারি নির্মাণ। খালের উপর বাড়ি, দোকানঘর। একই চিত্র নদীর অপর পারের হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর, আমতার। বাঁশের সেতু দিয়ে মুণ্ডেশ্বরী নদী পেরিয়ে সাইকেল মিছিল খানাকুল থেকে প্রবেশ করে হাওড়া জেলায়। অভিযাত্রীরা পাঁচারুল হয়ে উদয়নারায়ণপুরে যান। নদী সভার পর দ্বারকেশ্বর ও দামোদরের সংযোগকারী খাল লালবেনাগরী, কানা দ্বারকেশ্বর, রত্নাকর নদী দেখতে দেখতে নারীট-গাজিপুর যাওয়া। যাত্রাপথে সবচেয়ে বেশি দখল হতে দেখা গেছে রত্নাকর নদীকে। খানাকুলের চিত্রই হাওড়া জেলায়। গাজিপুর থেকে দামোদর পেরিয়ে গাববেড়িয়ায় রাজাপুর খালে হয় নদী সভা। হাওড়া জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে দামোদর, কানা দামোদর, সরস্বতী নদী, রাজাপুর খাল, মৌরিয়া খাল – কোনোটাই ভাল নেই। বিভিন্ন সংগঠন, নদী কর্মীরা মিলে শুরু করেছেন খাল, নদী বাঁচানোর লড়াই। নদী সভাগুলোতে তাঁরা শোনান সেই লড়াইয়ের কথা। আন্দুলের গ্রাম্য হিতকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে হয় নদী সভা।

দীর্ঘ সাইকেল মিছিলের তাল কাটে রাজ্যের রাজধানী কলকাতার প্রবেশপথে। সৌজন্যে রাজ্য পুলিস প্রশাসনের কাণ্ডজ্ঞান। ভাবনা ছিল হাওড়া থেকে রবীন্দ্র সেতু (হাওড়া ব্রিজ) পেরিয়ে সাইকেল মিছিল কলকাতায় ঢুকবে। কিন্তু কলকাতায় সাইকেল চালানো নিষিদ্ধ থাকার অজুহাতে পুলিস অনুমোদন দেয়নি। পরিবেশবান্ধব সাইকেল সরকারের দৃষ্টিতে উন্নয়নের শত্রু। তাই বাধ্য হয়ে রামকৃষ্ণপুর ঘাট থেকে ফেরি পার হয়ে বাবুঘাটে আসতে হয়। সেখান থেকে সাইকেল হাঁটিয়ে মিছিল এসে পৌঁছয় রাণুছায়া মঞ্চে। হেঁটে আসার পথেও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের শেষ ছিল না। যদিও অনেক আগে থেকেই প্রশাসনকে গোটা কর্মসূচি জানানো ছিল। বালি, পাথর লুঠ, খাল, নদী দখলে প্রশাসনের উদ্বেগ নেই। এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই যত চিন্তা। রাণুছায়া মঞ্চে সাইকেল যাত্রী, আয়োজক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গোটা পথেই আবৃত্তি, লোকসঙ্গীত, ঝুমুর গান, নদীর গানে মুখরিত ছিল এই সাইকেল যাত্রা।

নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও আন্দোলন, যৌথ জীবনযাপন, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, পরিবেশবান্ধব মঞ্চ ব্যারাকপুর, কুশকর্ণী নদী সমাজ, প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ, জল জমি জঙ্গল, বিজ্ঞান দরবার কাঁচরাপাড়া, জলঙ্গি নদী সমাজ, গাড়ুই নদী সমাজ কল্যাণপুর, গ্রিন নাগরিক কলকাতা, সিঙ্গারন নদী বাঁচাও কমিটি, নদীয়া নেচার ফার্স্ট, নদীয়ার যুগবার্তা, যুব ভারত, থার্ড প্ল্যানেট, হাওড়া যৌথ পরিবেশ মঞ্চ, বেহালা পরিবেশ গোষ্ঠী সহ সমমনোভাবাপন্ন সাথী সংগঠনগুলো এই সাইকেল মিছিলের আয়োজক ছিল। পথে জুড়েছে আরও অনেক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান। সংগঠনগুলো সব বিষয়ে সহমত নয়। কিন্তু নদী, পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র বাঁচানোর লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ। তারা নৈতিক সহমতের ভিত্তিতে আরও সংগঠনকে এই আন্দোলনকে জুড়তে চাইছে। কারণ লড়াইটা যেমন কঠিন, তেমন দীর্ঘমেয়াদি। তাই তো রাণুছায়া মঞ্চে সমাপ্তি অনুষ্ঠানে স্লোগান ওঠে ‘আমার নদী, আমার গাঁ/কর্পোরেটের হবে না।’ বারো দিন ধরে বাংলার নটা জেলার গ্রাম, শহর বারবার মুখরিত হয়েছে এই স্লোগানে।

তথ্য ও মতামত লেখকের

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.