খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ারে কিসসা খোয়ানি বাজার যুগ যুগ ধরে সওদাগরদের গল্পের আখড়া। ভারতবর্ষ থেকে চীন থেকে সব সওদাগররা নিজের নিজের সওদা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয় এই বাজারে বসে। এরপরই খাইবার গিরিপথ ধরে তারা তাদের সওদা নিয়ে চলে যাবে আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তানের পথে। মধ্যপ্রাচ্যের ওইসব অঞ্চল থেকে আসা সওদাগররাও নিজের সওদা নিয়ে হিন্দুস্তান বা চীন দেশে যাওয়ার আগে এখানে এসে জিরিয়ে নেয়। জিরোতে জিরোতে তারা নিজেদের মধ্যে শুরু করে গল্প বলা। সেইসব দূর দূর দেশের গল্প, যা যুগে যুগে লোকেদের মুখে মুখে ফেরে। সেইসব গল্পের জন্যই এই বাজারের নাম কিসসা খোয়ানি বাজার। যে বাজারে কিসসা তৈরি হয়।

শীতকালে খাইবার গিরিপথের দিক থেকে আসা শীতল বাতাস হাড়সুদ্ধ কাঁপিয়ে দেয় এখানকার লোকেদের। এই বাজার অঞ্চলেই মহাবত খান মসজিদের কাছের একটা বাড়িতে এক বৃদ্ধা কিসসা শোনাচ্ছিল এক শিশুকে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

“সে রাতে আয়েশা মরেই যাচ্ছিল ঠান্ডাতে। ঠকঠক করে কাঁপছিল ঠান্ডায়। বাড়ির দরজাটা একবার খুলছিল, আরেকবার বন্ধ হচ্ছিল। বাইরে থেকে আসা লোকজন খবর নিচ্ছিল আয়েশার। সেই খোলা দরজা দিয়ে যে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আসছিল তাতে আয়েশা আরো কেঁপে উঠছিল। ব্যথায় ককিয়ে উঠছিল।”

তারপর কী হল দাদি? শিশুর প্রশ্নে দাদি হেসে উঠে বলল “তারপর আমার সোনা বাবা ইউসুফ পয়দা হল।”

“উসকে বাদ আয়েশা কা সোনা বেটা ইউসুফ তশরীফ লায়া।”

ছোট্ট ইউসুফ দাদির মুখে এই গল্প শুনে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না ওর আম্মি আয়েশার কেন ব্যথা হচ্ছিল। ছোট্ট ইউসুফের পক্ষে বোঝা সম্ভবও ছিল না কেন তার আম্মির ব্যথা হবে।

১১ই ডিসেম্বর ১৯২২, যে রাতের গল্প ইউসুফের দাদি ইউসুফকে শুনিয়েছিল, সেই রাতে যখন মহম্মদ সারওয়ার খান আর আয়েশা বিবির ছেলে ইউসুফের জন্ম হয় তখনই ইতিহাস লেখা হয়ে গিয়েছিল।

কদিন বাদে এক ফকির সারওয়ার খানের বাড়িতে আসে। দাদির সামনে ইউসুফকে দেখে বলে, বাচ্চাকে সাবধানে রেখো। বড় হয়ে এই বাচ্চা বহতই খুবসুরত দেখতে হবে। তাই এখন থেকেই লোকের চোখ থেকে আড়াল করে রেখো। ফকিরের কথা শুনে দাদি বাচ্চা ইউসুফকে ন্যাড়া করে মাথায় কালো কালি লাগিয়ে দিত স্কুলে যাওয়ার আগে, যাতে বুরি নজরওয়ালেদের হাত থেকে বাঁচানো যায়। স্কুলে যথারীতি বন্ধুদের কাছে হাসির খোরাক হওয়ার পর সেই রীতির পরিবর্তন হয়।

বাবার হাত ধরে ছোট্ট ইউসুফ যখন কিসসা খোয়ানি বাজারে গিয়ে সওদাগর আর মৌলানাদের মুখ থেকে নানারকমের গল্প শুনত, বাড়িতে এসে সেই গল্পের চরিত্রগুলোর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাত। ওই গল্পের ওই চরিত্র কীভাবে কথা বলতে পারে, কীভাবে হাঁটতে চলতে পারে সেটা ছোট্ট ইউসুফ নিজের কল্পনায় গড়ে নিত। পাঠানদের বিশেষত্ব হচ্ছে মেহমান নওয়াজি। অর্থাৎ অতিথিদের খাতিরদারী। সেইজন্য ইউসুফদের বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকত। মাঝেমাঝে ওদের বাড়িতে আসতেন দেওয়ান বশেশ্বরনাথ কাপুর, যাঁর ছেলে পৃথ্বীরাজ খ্যাতিমান হবে আরো বেশ কিছুকাল পরে। দেওয়ান বশেশ্বরনাথের মতই বাড়িতে অন্য আত্মীয়স্বজনদের আসা যাওয়াও লেগে থাকত। আড়াল থেকে ইউসুফ সেই আত্মীয়স্বজনদের আচার আচরণ লক্ষ্য করে তাদের নকল করত। দাদি একদিন অল্প করে বকে দিয়েছিল ইউসুফের এই স্বভাবের জন্য। বড়দের সাথে এরকম করতে নেই। কিন্তু ইউসুফের ওটাই ছিল খেলা। পেশোয়ারে থাকাকালীন এরকমই নানা হাসিঠাট্টা খেলাধুলার মধ্যে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। তবে এই মজার দিনগুলো খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না ইউসুফের জীবনে।

তিনের দশকের মাঝামাঝি ইউরোপের আকাশে যুদ্ধের মেঘ যখন ঘনিয়ে আসছে, তখন আব্বুর হাত ধরে ইউসুফ তার ভাইবোনেদের সাথে চেপে বসল ফ্রন্টিয়ার মেলে। হাজির হল বোম্বের মাটিতে। এখান থেকে ব্যবসার কাজে সুবিধা হবে আব্বুর। ক্রফোর্ড মার্কেটের কাছে একটা ভাড়া বাড়িতে উঠল সবাই, আর আব্বু ফলের দোকান দিল ক্রফোর্ড মার্কেটে। বোম্বেতে তখন বশেশ্বরনাথের পরিবারও চলে এসেছে। পেশোয়ারের দুই পড়শি আবার এসে মিলিত হল বোম্বেতে। খালসা কলেজে ইউসুফের বন্ধু তখন বশেশ্বরনাথের নাতি রাজ। ছেলে পৃথ্বী পারিবারিক উপাধি ‘নাথ’ ত্যাগ করে ‘রাজ’ উপাধি গ্রহণ করে পৃথ্বীরাজ কাপুর হয়েছে।

বন্ধু রাজ যেহেতু পৃথ্বীরাজ কাপুরের ছেলে, কাজেই তার একটা আলাদা গুরুত্ব ছিল। বন্ধুবান্ধবদের সাথে হুল্লোড় হোক বা মহিলাদের সঙ্গ, কোনোকিছুতেই রাজকে দমিয়ে রাখা যেত না। অন্যদিকে বন্ধু ইউসুফ ছিল খুবই অন্তর্মুখী লাজুক।

অনেকে ভেবেছিল ফল ব্যবসায়ীর ছেলে যে ফল ব্যবসায়ীই হবে। বাবার ব্যবসা তো ছেলের কাঁধেই চাপবে। কিন্তু তকদীর হয়ত ইউসুফকে দিয়ে অন্যরকম কিছু করাবে ভেবেছিল। শুধু তকদীরের কথাই বা কেন বলি? ইউসুফ নিজেও অন্যরকম কিছুই ভেবেছিল।

যুদ্ধের বাজারে তখন ফলের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। এদিকে সারওয়ার খানের কাঁধে বিয়ের যুগ্যি বড় মেয়ে সাকিনার দায় রয়েছে। কিছু একটা করতে হবে ভেবে ইউসুফ পকেটে চল্লিশ টাকা নিয়ে বোরি বন্দর স্টেশন থেকে পুনের ট্রেনে চেপে বসল। পুনে পৌঁছে এক পারিবারিক বন্ধুর সূত্রে ক্লাব ক্যান্টিনের ক্যান্টিন ম্যানেজারের অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ জুটে গেল। ফল সবজি সম্পর্কে আব্বুর দোকানের সূত্রে যেহেতু আগের অভিজ্ঞতা ছিল, তাই পচা মালের বদলে তাজা শাকসবজি কাঁচামাল হিসাবে কিনে ক্যান্টিনের মান অনেকটাই উঁচুতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

হাতে কিছু টাকাপয়সা আসার পর হঠাৎ করেই ক্যান্টিনের ঠিকাদার পরিবর্তন হয়ে গেল। ফিরে আসতে হল বোম্বেতে। বোম্বে এসে এদিক ওদিক যখন কাজের ধান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন একদিন উইলসন কলেজের পুরনো এক পরিচিতের সাথে দেখা হয়ে গেল। ডক্টর মাসানি ছিলেন মনস্তত্ত্ববিদ। কথায় কথায় ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করলেন “এখন কী করছ?” ইউসুফ বলে, “এই তো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি কাজের ধান্দায়। এক আর্মি কন্ট্রাকটারের কাছে যাচ্ছি, হয়ত কিছু কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” ডক্টর মাসানি তখন বলেন “এক কাজ করো, আমার সাথে বোম্বে টকিজে চলো। আমার কিছু কাজ আছে ওখানে। দেখি, হয়ত তোমারও কিছু গতি করে দিতে পারব।”

বন্ধু রাজের থেকে বোম্বে টকিজের নাম অনেক শুনেছিল ইউসুফ। রাজ বলত “ওখানে আমার বাবা শুটিং করে।” কিন্তু কোনোদিন সেখানে যাওয়া হয়নি। ডক্টর মাসানির সাথে গুটিগুটি পায়ে গিয়ে হাজির হল বোম্বে টকিজে। বিশাল বড় সেই স্টুডিওতে সুদৃশ্য বাগান আর ঝর্ণা আর বাংলোর মত দেবিকা রানির অফিস মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল ইউসুফের।

ডক্টর মাসানির সাথে দেবিকা রানির পূর্বপরিচয় ছিল। মাসানি ইউসুফকে পরিচয় করিয়ে দিতে দেবিকা রানি হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে ইউসুফকে চেয়ার টেনে বসতে বলেন। ইউসুফের সামনে তখন গ্ল্যামার কুইন দেবিকা রানি। চোখে যেন ধাঁধা লেগে গিয়েছিল ইউসুফের। পাকা জহুরির মত দেবিকা রানির চোখ চিনে নিয়েছিল ইউসুফকে। বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর পরিচালক অমিয় চক্রবর্তীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ইউসুফকে, জিজ্ঞাসা করলেন উর্দু জানে কিনা। ডক্টর মাসানি বলেন “আরে ওর তো জন্ম পেশোয়ারে আর ওখানকার ফল ব্যবসায়ীর ছেলে। উর্দু জানবে না!” ইউসুফ শুধু ভাবছিল এই রূপসী ভদ্রমহিলা তার উর্দু জ্ঞান পরখ করতে চাইছে কেন? কী কাজ তাকে দেবে?

এর পরের যে প্রশ্নটা করেছিলেন দেবিকা রানি। সেই প্রশ্নটা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ইউসুফের। ওই যে আগেই বলেছিলাম তকদীর! তা না হলে পেশোয়ারের ফল ব্যবসায়ীর ছেলে বোম্বেতে এসে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যাবে ডক্টর মাসানির সাথে, আর তাঁর সূত্রেই সে চলে যাবে বোম্বে টকিজে একদম দেবিকা রানির সামনে! সেদিন যদি ইউসুফ চার্চগেট স্টেশন থেকে দাদরে সেই আর্মি কন্ট্রাকটারের কাছে চলে যেত, ডক্টর মাসানির সাথে সেই সময় দেখা না হত, তাহলে তকদীর অন্যরকম কিছু লিখত। দাদরের বদলে মালাড স্টেশনে নামতেই তকদীর বদলে গেল একদম।

দেবিকা রানি জিজ্ঞাসা করলেন “মাসে ১২৫০ টাকা দেব। আমাদের সাথে কাজ করবে?” সাময়িকভাবে কিছু বলতে পারেনি ইউসুফ। ১৯৪২ সালে মাসে ১২৫০ টাকা অবাক হয়ে যাওয়ার মত টাকা। ডক্টর মাসানিও চুপ হয়ে গিয়েছিলেন শুনে। কিছুক্ষণ পর ইউসুফ বলে উঠল “কিন্তু আমি তো অভিনয় কিছু জানিই না।” দেবিকা রানি জিজ্ঞাসা করলেন “তোমাদের ফলের ব্যবসা সম্পর্কে একদম প্রথমে তুমি কতটা জানতে?” জবাবে ইউসুফ বলে “আস্তে আস্তে শিখেছি।” দেবিকা রানি শুনে বললেন “অভিনয়ও শিখে যাবে। সব কিছুই পরিশ্রমের ফসল। ফল ব্যবসা সম্পর্কে শিখতে যতটা পরিশ্রম করেছ, অভিনয়েও ততটা পরিশ্রম করলে শিখে যাবে।”

ইউসুফ কোনোমতে মাথা নেড়ে বেরিয়ে এসেছিল ডক্টর মাসানির সাথে। বাড়ি ফিরে ইউসুফের দাদা আয়ুব শুনে বলেছিল “মাসে ১২৫০ হতেই পারে না। ভুল শুনেছিস। ওটা বছরে ১২৫০ হবে। আমি শুনেছি রাজ কাপুরই পায় মাসে ১৭০ টাকা করে। ধুর, তুই কী শুনতে কী শুনেছিস। বছরে ওই টাকায় কী হবে!”

ঠিকই তো, রাজ যদি মাসে ১৭০ টাকা করে পায়, তাহলে ও কী করে এত টাকা পাবে? রাজ তখন পৃথ্বীরাজ কাপুরের বন্ধু কিদার শর্মার কাছে কাজ শিখছে আর ক্ল্যাপ বয়ের কাজ করছে। ইউসুফ তখনই দৌড়ে গেল ডক্টর মাসানির কাছে। বলল “বছরে ১২৫০ টাকায় আমার কী করে চলবে? চার্চগেট থেকে মালাড যেতে আমার ট্রেনের ভাড়াতেই তো চলে যাবে অর্ধেক টাকা।” মাসানি তখন দেবিকা রানিকে ফোন করে আশ্বস্ত হলেন, না, ওটা বছরে নয়, ওটা মাসিক ১২৫০ টাকাই।

পরদিন সকালে ইউসুফ পরিষ্কার জামাকাপড় পরে সকাল নটার মধ্যে হাজির হয়ে গেল বোম্বে টকিজে দেবিকা রানির অফিসে। দেবিকা ওকে নিয়ে গেলেন শুটিং ফ্লোরে, যেখানে শুটিং শুরু হওয়ার তোড়জোড় চলছে। শুটিং চলছিল ‘কিসমত’ ছবির, যা মুক্তি পায় ১৯৪৩ সালে।

সেখানেই দেবিকা একজন লোকের সাথে পরিচয় করালেন ইউসুফকে। “এই যে এ আমাদের নতুন অভিনেতা ইউসুফ। আজই জয়েন করল।” ভদ্রলোককে এর আগে ক্রফোর্ড মার্কেটের পোস্টারে দেখেছিল ইউসুফ। ব্যাকব্রাশ করা কালো চুলের সেই ভদ্রলোক সুন্দর একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন “হ্যালো, আমার নাম অশোককুমার”। ইউসুফের কাছে আজীবন সেই অশোককুমার অশোক ভাইয়া হয়ে রয়ে গেলেন।

প্রথম কদিন স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে সবার সাথে আলাপ পরিচয় করতে করতেই কেটে গেল। পরিচয় হল শশধর মুখার্জি, জ্ঞান মুখার্জি প্রমুখের সাথে। আর অমিয় চক্রবর্তীর সাথে তো প্রথম দিনেই পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। কদিন বাদে দেবিকা ডেকে পাঠালেন তাঁর অফিসে। বললেন “তোমাকে আমরা খুব তাড়াতাড়ি লঞ্চ করতে চাইছি।”

ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সেদিনই জন্ম হল এক নতুন তারকার। বোম্বে টকিজের ব্যানারে অমিয় চক্রবর্তীর পরিচালনায় তৈরি ‘জোয়ার ভাটা’ সিনেমা থেকে জন্ম নিল ভবিষ্যতের এক কিংবদন্তি অভিনেতা।

১৯৪৪ সালে ‘জোয়ার ভাটা’ রিলিজ করার পর অতি সহজেই জিতে নিল দর্শকদের মন। নতুন হিরো দিলীপ কুমারে সবাই আমোদিত। পরিচালক কে আসিফ এরকম সময়েই ঠিক করলেন সেলিম-আনারকলির প্রেম কাহিনী নিয়ে একটা ছবি তৈরি করবেন। ঠিক করেছিলেন ডি কে সাপ্রু, যিনি পরে প্রচুর চরিত্রাভিনয় করেছিলেন, তাঁকে নায়কের ভূমিকায় নিয়ে ছবিটা তৈরি করবেন। নবাগত দিলীপ কুমারের কথা কানে আসায় ভাবলেন, একবার দেখা যাক ডেকে কথা বলে, সেলিমের রোলে মানায় কিনা। সেই মত দিলীপ কুমারকে ডেকে পাঠালেন আসিফ। কথাবার্তা বলে ভাবলেন, ঠিক আছে, কিন্তু সেলিমের রোলে আরেকটু পরিণত অভিনেতা দরকার। চেহারাটা যদি আরেকটু ভারিক্কি হত, তাহলে হয়ত মানাত। যদি আরো বছর দশেক বাদে উনি ছবিটা করতেন তাহলে হয়ত দিলীপ কুমারকে সেলিমের ভূমিকায় মানিয়ে যেত ভালোই। কাজেই দিলীপ কুমারকে বাদ দিয়ে ডি কে সাপ্রুকেই সেলিমের ভূমিকায় কাস্ট করে সিনেমার শুটিং শুরু করে দিলেন। কয়েকটা দৃশ্য শুট করার পর দেখা গেল আসিফ যেরকম পরিকল্পনা করেছিলেন সেই অনুযায়ী চলতে গেলে বাজেট প্রচুর বেড়ে যাচ্ছে। আবার যুদ্ধের মন্দার মধ্যে বাজারও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। কাজেই সেই কাজ আর সম্পূর্ণ হল না। তবে আসিফের সেলিম-আনারকলি মাথা থেকে বেরিয়ে যায়নি।

বহু বছর পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যখন ১৯৬০ সালে ‘মুঘল-এ-আজম’ মুক্তি পেল, তখন আসিফের সেই আগের ভাবনাকেই ঠিক প্রমাণ করে দশ নয়, পনেরো বছর পর সেলিমের চরিত্রে দিলীপ কুমার অভিনয় করলেন। ততদিনে অবশ্য তিনি অনেক পরিণতও হয়েছেন। মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই ব্লক বাস্টার হিট ‘মুঘল-এ-আজম’। এখানেও দেখুন তকদীর, যে ঠিক করেছিল ইউসুফকে দিয়েই সেলিমের অভিনয় করাবে। পনেরো বছর পরে সেই সেলিমের চরিত্রেই ইউসুফ অভিনয় করল। আজও দিলীপ কুমার অভিনীত অসংখ্য চরিত্রের মধ্যে অন্যতম প্রধান হল সেলিমের চরিত্র।

পাঁচ দশকের কেরিয়ার শেষ করার পর দিলীপ কুমারের ঝুলিতে অসংখ্য ফিল্মের সাথে সাথেই ছড়িয়ে ছিল এরকম টুকরো টুকরো অসংখ্য গল্প। মধুবালার সাথে সম্পর্কেরও আগে জড়িয়ে পড়েছিলেন কামিনী কৌশলের সাথে। দুটো সম্পর্কই বিচ্ছেদে শেষ হয়। মুঘল-এ-আজমে যখন মধুবালার সাথে শুটিং করছেন, তার ঠিক আগেই দুজনের সম্পর্ক শেষ হয়েছে তিক্ততা দিয়ে। এমন তিক্ততা যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তবে জীবনের শেষদিন অব্দি জীবনসঙ্গিনী সায়রা বানুর হাত ছাড়েননি। আটের দশকে যদিও হায়দ্রাবাদের আসমা রহমানের সাথে দু বছরের বিয়েটা জীবনের একটা দুর্ঘটনা বলে স্বীকার করেন।

আসলে দিলীপ কুমার তো শুধুমাত্র একটা নাম নয়, ৭ই জুলাই ২০২১ অব্দি ছিলেন একজন জীবিত কিংবদন্তি। দিলীপ কুমারের প্রস্থানের সাথে সাথে চলে গেলেন বোম্বে টকিজের সাথে জড়িয়ে থাকা শেষ মানুষটা। বোম্বে টকিজের শেষ নায়ক ছিলেন দিলীপ কুমার। আজ থেকে হয়তো আর জীবিত কারো সাথে কেউ বোম্বে টকিজ নিয়ে কথা বলতে পারবে না।

দিলীপ কুমার ও তাঁর সিনেমার পোস্টার ও দৃশ্য – ছবি উইকিপিডিয়া থেকে।

Leave a Reply