সৌরব চক্রবর্ত্তী

একানব্বই বছর বয়সী ওড়িশি নৃত্যগুরু মায়াধর রাউতকে তাঁর দিল্লির সরকারি আবাসন থেকে উৎখাত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পদ্মশ্রী, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ইত্যাদি সম্মাননা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে, ঘরের যাবতীয় জিনিস রাস্তাতেই ফেলে রেখে দিয়ে গেছে। ওড়িশি নৃত্যের দিকপাল ব্যক্তিত্ব মায়াধরকে বিনা নোটিসে ঘর ছাড়তে হয়েছে, এমনটাই অভিযোগ তাঁর কন্যার।

স্বাধীনতার অনেক আগে থেকে নৃত্যচর্চা করেছেন মায়াধর রাউত। ওড়িশি নৃত্যের জন্য তিনি গোটা জীবন ব্যয় করেছেন। ওড়িশি নৃত্য চর্চাকারী এবং আগ্রহীদের কাছে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। নৃত্যশিল্পে অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পান। ২০১০ সালে ভারত সরকার দেয় পদ্মশ্রী সম্মান। আশির দশকে কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ কোটায় মাসিক রোজগার কুড়ি হাজার টাকার কম এমন চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, চিত্রগ্রাহক, নৃত্যশিল্পীদের জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। দেশের নানা প্রান্তের ৪০ জন শিল্পী তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালে নিয়ম বদলানো হয় এবং ২০১৪ সালে এই আবাসনে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে বলে জানানো হয়। মায়াধরের কন্যা মধুমিতা রাউতের অভিযোগ, বাড়ি ছাড়ার জন্য তাঁদের কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি। হঠাৎ করে কিছু সরকারি লোকজন এসে বাড়ি খালি করতে হবে বলে জিনিসপত্র বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে থাকে। বারবার বারণ করা সত্ত্বেও তারা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দেয়। তার মধ্যে শিল্পীর পদ্মশ্রী পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারও আছে। তিনি আরও বলেছেন, অন্তত ২৪ ঘন্টা সময় দিলে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে দিতেন, কিন্তু সেই সময়টুকুও দেওয়া হয়নি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সরকারি নির্দেশে বাড়ি খালি না করায় এই কাজ করতে হয়েছে, এমন এক আপাত নিরীহ বয়ান তৈরি করা হচ্ছে ঘটনাটাকে চাপা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তলিয়ে ভাবলে দেখব, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পাননি সমবয়সী অশীতিপর ভারভারা রাও এবং স্ট্যান স্বামী; ছেলেবেলায় পোলিও রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে আজীবন হুইলচেয়ারে বসা জি এন সাইবাবার মত মানুষ। কারাগারে তাঁর ওষুধ পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। ভীমা কোরেগাঁও কেসের আরেক অভিযুক্ত গৌতম নওলাখার চশমা ভেঙে যাওয়ার কোনো সুরাহা করা হয়নি। পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত স্ট্যান স্বামীকে জল খাওয়ার জন্য একটা স্ট্র পেতেও আদালতে আবেদন করতে হয়েছিল। করোনা অতিমারীর সময়ে সর্বত্র বলা হত, লেখা হত বয়স্কদের যেন বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে আশির বেশি বয়সী গণআন্দোলনের কর্মীরা কারাগারেই রয়ে গেলেন। অথচ এদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তিলার্ধও এখনো প্রমাণ করে উঠতে পারেনি সরকারপক্ষ।

এঁদের মত শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান মায়াধরের নেই, তবু তাঁর এই দুর্দশা হল। আসলে দেশজুড়ে ফ্যাসিবাদী কেন্দ্রীয় সরকার যে দমননীতি নিয়েছে তাতে প্রত্যক্ষ রাজনীতি করা আর রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকার মধ্যে ফারাক মুছে গেছে। মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা এখন রোজকার ব্যাপার। কয়েকদিন আগেই দিল্লির জাহাঙ্গিরপুরীতে রামনবমীর মিছিলকে আক্রমণ করার অভিযোগে বিনা নোটিসে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের দোকানপাট, বাড়িঘর ভাঙতে গিয়েছিল দিল্লি পৌরসভা। কিন্তু বয়ান গুলিয়ে দেওয়ার স্বার্থে পরে বলা হয় বেআইনি দখলদার উচ্ছেদ করতে যাওয়া হয়েছিল। ঘটনা হল এই উচ্ছেদে সমস্ত বৈধ কাগজপত্র থাকা হিন্দুদের দোকানও কিন্তু বাদ পড়েনি।

আশ্চর্যের কথা, মায়াধর আক্রান্ত, কিন্তু কোনো নৃত্যশিল্পী একটি বাক্য খরচ করেননি। দিনের পর দিন কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের অর্থে মঞ্চে অনুষ্ঠান করতে করতে চোখ, কান বন্ধ হয়ে গেলে যে কিছুই দেখা যায় না, এ তারই প্রমাণ। ভারতের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন হলে বছরে কয়েক হাজার নাচগানের অনুষ্ঠান হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। তাই এখন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলার গলার জোর শিল্পীদের নেই। মায়াধরের আর কোনো বাসস্থান নেই, সরকারি আবাসনে আছেন প্রায় চল্লিশ বছর। হঠাৎ তাঁকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়ে সরকার যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা গোটা দেশে প্রতিদিন বহু মানুষের জীবনে তৈরি করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে কেউই নিরাপদ নয়। নির্বাচনী রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের ঐক্য তৈরি না হলে এ ধরণের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক অরাজনৈতিক সাজার ভান করে সরকারের কাছ থেকে নানারকম সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে, তাঁরাও একদিন পদদলিত হবেন।

মতামত ব্যক্তিগত

লেখক বিকল্প সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত।

আরো পড়ুন

কবীর সুমনের কুবাক্যে ঢাকা পড়ে গেল যেসব কথা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.