বর্তমানে ঐতিহাসিক মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। দিনে আট ঘন্টা কাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আজ অপ্রাসঙ্গিক। আবার অনেকের মতে শ্রমিক শ্রেণি নাকি বিলুপ্তির পথে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের গুরুত্ব কমে যন্ত্রের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ করা শ্রমিকদের অনেকেই শ্রমিক বলে মানতে রাজি নন। শিল্প শ্রমিকের বদলে, পরিষেবা ক্ষেত্রের শ্রমিকের সংখ্যা আজ বাড়ছে। ওটা এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই।

ভারতের ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। তাঁদের কাজের নিরাপত্তা নেই, সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, আয় ও কাজের সময়ের নিশ্চয়তা নেই। কাজের সন্ধানে ঘর ছেড়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানোই যেন তাঁদের ভবিতব্য। লকডাউনের সময়ে এই শ্রমিকদের দুরবস্থার কথা সারা দেশ জানতে পেরেছিল। তাঁদের জন্য আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে আইনি অধিকার নেই। এঁদের সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য কেন্দ্র বা কোনো রাজ্য সরকারের কাছে থাকে না। নির্মাণ, পর্যটন, হোটেল থেকে শুরু করে পরিষেবার নানা ক্ষেত্রে কাজ করা কোটি কোটি শ্রমিক সরকারের পরিকল্পনার বাইরে থেকে যান।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বহু ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রমিকের মর্যাদাই দেওয়া হয় না। যেমন, গৃহ সহায়িকাদের আর্থিক বা সামাজিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা বাস্তবে নেই। উন্নয়নের নামে দ্রুত বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রা। শপিং মল, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যুক্ত কর্মীদের না আছে কাজের নির্দিষ্ট সময়, না আছে আর্থসামাজিক নিরাপত্তা। যে কোনো অজুহাতে তাঁদের ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। অ্যাপের ডেলিভারির কাজে নিযুক্ত অসংখ্য কর্মীরও একই অবস্থা – কাজ অনুযায়ী আয়। যে কোনো অজুহাতে টাকা কাটা যাওয়া বা ছাঁটাই হওয়ার আতঙ্ক তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।

বেসরকারি ক্ষেত্রেই শুধু নয়, সরকারি ক্ষেত্রেও আজ অস্থায়ী কর্মীদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। তাঁরা সরকারি কর্মচারীর স্বীকৃতি পান না, নানা এজেন্সির মাধ্যমে নিযুক্ত হন। এমনকি পুলিশ থেকে শিক্ষক, চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত হচ্ছেন। আশা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিলসহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কর্মীদেরও সরকারি কর্মচারীর স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। সুপ্রিম কোর্টের সম কাজে সম বেতনের নির্দেশ সরকারও মানছে না।

কারখানাতেও স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমে চলেছে, নানা নামের অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই, মজুরি ও কাজের নিরাপত্তা নেই। মালিক শ্রম আইন লঙ্ঘন করলেও, সরকার ব্যবস্থা নেয় না। শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারগুলোও আজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ভারতে শ্রম আইনগুলো তুলে দিয়ে শ্রম কোড নিয়ে আসা তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শ্রম কোডের মাধ্যমে শ্রমিক শোষণ, ইচ্ছেমত ছাঁটাই, মজুরি না দেওয়া, বাড়তি মজুরি না দিয়ে যত খুশি সময় কাজ করানোর আইনি অধিকার পেল মালিকপক্ষ। শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার, প্রতিবাদ করার অধিকারও কার্যত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। লকডাউনের সুযোগে বিভিন্ন রাজ্যে শ্রম আইন বদলে কাজের সময় বাড়ানো হয়েছে। শ্রমিকদের আইনি অধিকার বিভিন্ন রাজ্য সরকার কেড়ে নিয়েছে। বিভিন্ন কারখানার মালিক যথেচ্ছ লক আউট, শ্রমিক ছাঁটাই করে চলেছে। শ্রমের ওপর পুঁজির আধিপত্য নিরঙ্কুশ করতে রাষ্ট্রশক্তি আজ মরিয়া। গণতন্ত্রের মুখোশ খসে গিয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কদর্য রূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

আজ মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে শ্রম ও পুঁজির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করা পরগাছা মালিক শ্রেণির চরিত্র। প্রযুক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বলে যা গেলানো হয়, তা আসলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা। প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রমিকই আরও মূল্য সৃষ্টি করে। শ্রমের মূল্য সৃষ্টিকে আড়াল করে পুঁজির মহিমা প্রচার করা হয়। শ্রমের বাজার যত শস্তা হয়, পুঁজি তত কেন্দ্রীভূত হয়। তাই শ্রমের বাজার শস্তা করতে শ্রমিকদের বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে হয়। রাষ্ট্রশক্তি সেই কাজটাই করে। রাষ্ট্র শ্রমিককে যেটুকু অধিকার দিয়েছে, তা শখ করে নয়, বাধ্য হয়ে। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিক আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস, রক্তাক্ত ইতিহাস।

কেইনসিয় অর্থনীতির যুগে শ্রমিক শ্রেণিকে বাধ্য হয়ে কিছু রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাগিদেই পুঁজিবাদ সেই অধিকারগুলো দিতে বাধ্য হয়েছিল। আর্থিক মন্দা থেকে উদ্ধার পেতে চাহিদা বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে পুঁজির চলছিল না। শ্রমের বাজারে শৃঙ্খলা আনতে কাজের নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নয়া উদারনীতিতে পুঁজিবাদের ভূমিকা বদলেছে। নয়া উদারনীতির লক্ষ্যই হল শ্রমের বাজার শস্তা করতে শ্রমিকদের অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া।

দেশে দেশে রাষ্ট্রশক্তি শ্রমিক শ্রেণির ওপর আক্রমণ সংগঠিত করছে। নয়া উদারনীতি চরিত্রগতভাবেই অগণতান্ত্রিক। পরিষেবা ক্ষেত্রের গুরুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি এই ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের অধিকার দিতে পুঁজিবাদ নারাজ। পরিষেবা ক্ষেত্রে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব আড়াল করতে এদের শ্রমিক পরিচয় আড়াল করা হয়। কারখানায় দৈহিক শ্রমশক্তি বেচা শ্রমিকের সঙ্গে পরিষেবা ক্ষেত্রে বৌদ্ধিক শ্রমশক্তি বেচা শ্রমিকের কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। পরিষেবা ক্ষেত্রের শ্রমিককেও শ্রমশক্তি বেচেই মূল্য সৃষ্টি করতে হয়। তাঁর কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকে না, কাজের ভিত্তিতে বেতন বা বাড়তি অর্থ দেওয়ার নামে কাজের সময় ও নিরাপত্তা বলে কিছুই দেওয়া হয় না। ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নামে কৌশলে কাজের সময় বাড়ানো হচ্ছে।

শস্তা শ্রমের বাজার তৈরিতে বেকার সমস্যা পুঁজিবাদের বিরাট সহায়ক শক্তি। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। কর্মপ্রার্থী বাড়লে, শ্রমের বাজারও শস্তা হয়। শ্রমিকের কাজের নিরাপত্তাও কমে। আজ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে সংগঠিত হওয়ার সুযোগও কম। নয়া উদারনীতি এভাবেই শ্রমিকের অর্জিত অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলোও সঠিক ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক, প্রচলিত ব্যবস্থার সমর্থক করে তোলার জন্য নানা ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি নানা কমিটি, নানা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর প্রতিবাদী ভূমিকাকে গ্রাস করা হচ্ছে। অধিকাংশ সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন এসব প্রাতিষ্ঠানিক কাজেই বেশি আগ্রহী। মালিক বা সরকারপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তাই অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের সংগঠিত করার কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায় না। কাজের ক্ষেত্রে কে কতজন অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের ক্ষমতা পাবেন, তা নিয়ে চলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যার পরিণাম মালিক বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপস।

শ্রেণি আপসের ফলে শ্রমিকদের মধ্যেও সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলো সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব দেখা দিচ্ছে। শ্রেণিসংগ্রাম দুর্বল হলে শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ হতে বাধ্য। মে দিবসের অর্জিত অধিকার তাই আজ সহজেই কেড়ে নেওয়া যাচ্ছে। শ্রেণিসমঝোতা নয়, লড়াইকে রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করাই শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির পথ।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

অ্যামাজন লেবার ইউনিয়ন তৈরি যুগপৎ ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.