ভোট চুরি নিয়ে যখন সারা দেশে তোলপাড় হওয়ার কথা, ঠিক তখনই দেখা গেল সোশাল মিডিয়ায় ভারতের নাগরিকরা উদ্বেলিত হচ্ছেন পথকুকুরদের নিয়ে। রীতিমত দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে তাঁরা মতামত দিচ্ছেন, তর্ক করছেন সুপ্রিম কোর্টের দিল্লির পথকুকুরদের সম্পর্কে দেওয়া রায় নিয়ে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারক এ নিয়ে যে রায় দিয়েছেন তা এই লেখকের অমানবিক বলে মনে হয়, তবে সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই রায় কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। সর্বোপরি এই রায় যেভাবে দেশের আইনকে পাশ কাটিয়ে গেছে তা যাঁরা পশুপ্রেমী নন, তাঁদের জন্যও উদ্বেগজনক।
শেষ গণনা অনুসারে দিল্লিতে এই মুহূর্তে পথকুকুর তিন লক্ষের কাছাকাছি। দীর্ঘদিন পশু অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী এই রায় বেরোবার পর বলেছেন, দিল্লি সরকারের কাছে কুকুরদের রাখার নিজস্ব আশ্রয় নেই। প্রায় তিন লক্ষ কুকুরের জন্য রাতারাতি আশ্রয় তৈরি করা, তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা, সেই কাজের জন্য কর্মী নিয়োগ করা ইত্যাদি যে অসম্ভব ব্যাপার তা বলাই বাহুল্য। অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এই কাজ আট সপ্তাহের মধ্যে করতে হবে। এই কাজগুলো করতে যে বিপুল পরিমাণে টাকা লাগবে সেই বাজেট বরাদ্দ কোথা থেকে আসবে তাও বোঝা যাচ্ছে না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
স্থায়ী আশ্রয় নেই, ফলে জোর করে অপসারণ করলে কুকুরদের খাদ্য, জল সরবরাহ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে পথকুকুরদের ভবিষ্যৎ যে ভয়াবহ হবে তা বোঝা সহজ। ছোট জায়গায় চিকিৎসা, ওষুধপত্রের বন্দোবস্ত না করে এদের রেখে দিলে সংক্রমণ ছড়াতে বাধ্য। এত কুকুর একসঙ্গে মারা গেলে তাদের ঠিকমত সৎকার হবে না, ফলে তা থেকে মানুষের মধ্যেও নানা রোগ ছড়াবে।
ভারতের অ্যানিমাল বার্থ কন্ট্রোল রুলস, ২০২৩ অনুসারে নির্বীজকরণ ও টিকাকরণের পর কুকুরদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটাই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। দুই বিচারপতি অবশ্য বলেছেন, তাঁরা এই আইনের তোয়াক্কা করেন না। ভয় হয়, আজ কুকুরদের সম্পর্কে তৈরি আইন মানব না বলছেন, পরে কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বললে কী হবে।
একথাও সত্যি যে এত বিরাট সংখ্যক কুকুরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলে ‘ভ্যাকুয়াম এফেক্ট’ হবে। অর্থাৎ নতুন, টিকা না দেওয়া কুকুর এসে এলাকায় ভিড় করবে, মানুষকে কামড়ে দেওয়ার এবং জলাতঙ্ক হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। রাজধানী দিল্লির সীমান্ত বলে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত কিছু নেই। কাজেই নয়ডা বা গুরুগ্রাম থেকে দিল্লির ফাঁকা জায়গায় চলে আসতে কুকুরদের খুব বেশি সময় লাগবে না, সুতরাং ‘ভ্যাকুয়াম এফেক্ট’ অবশ্যম্ভাবী। উপরন্তু কুকুর না থাকলে শহরে বাঁদর এবং ইঁদুরের উৎপাত বাড়বে। তাতে যে মানুষের রোগভোগ বাড়বে – তা বুঝতেও পশুপ্রেমী হওয়ার দরকার নেই। অনেকে বলছেন, কুকুরশূন্য শহরে প্লেগ ছড়াতে পারে। এই আশঙ্কাও বিজ্ঞানসম্মত।
স্বভাবতই আদালতের এই রায় নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য রেখেছেন। তার মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত রাহুল গান্ধীর নাম। তিনি এখন ভোট চুরিকেন্দ্রিক আলোচনা ও প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে এই রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। জনসাধারণের নিরাপত্তা এবং পশুকল্যাণের মধ্যে যে কোনো বিরোধ নেই – তা তিনি তাঁর পোস্টের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।
ঠিক এই কথা আমরা শুনেছিলাম এক বছর আগে দিল্লির অন্য এক আদালতে। শহরের দুজন দৃষ্টিহীন আইনজীবী দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন এই বলে যে কুকুর আর বাঁদরের উৎপাতে প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে রাস্তায় চলাফেরা করা খুবই অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনজীবী রাহুল বাজাজ এবং অমর জৈন এই মামলা চলাকালীন নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আদালতকে জানিয়েছিলেন। এই জনস্বার্থ মামলা চলাকালীন তাঁরা বলেন যে ফুটপাথে দৃষ্টিহীনদের সাদা লাঠি নিয়ে চলাফেরা করলে কুকুররা ভাবে ওই লাঠি তাদের মারার জন্য, ফলে তাড়া করে। ফুটপাথে প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীনভাবে হাঁটাচলা করার অধিকার আছে – একথা মেনে নিয়ে দেশের আইন অনুসারে পশু অধিকার সংগঠনের কথাও শুনবেন বলে সেই মামলার বিচারপতি জানিয়েছিলেন। সেই মামলার রায়ে দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এমন ব্যবস্থা করার, যাতে দুই পক্ষ, অর্থাৎ প্রতিবন্ধীরা এবং পশু অধিকার কর্মী, মিলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এমনকি গতবছর অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টেরই বিচারপতি সঞ্জয় কারোল আর জে কে মাহেশ্বরী আরেকটা মামলার রায়ে পথকুকুরদের নিয়ে নানা সমস্যা হয় মেনে নিয়েও বলেছিলেন, সমস্ত জীবজন্তুর প্রতি সহমর্মিতা দেখানো সংবিধানে লিপিবদ্ধ মূল্যবোধেরই প্রকাশ। সুতরাং এ জিনিস বজায় রাখা কর্তৃপক্ষের দায়। একবছর পরে হঠাৎ এমন কী ঘটল যে সুপ্রিম কোর্টেরই অন্য দুই বিচারপতির মনে হল তাঁরা কোনো পক্ষের কথা শুনবেন না? এমনকি পশু অধিকার নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের ‘সেন্টিমেন্টাল’ বলেও অভিহিত করলেন বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও আর মহাদেবন! কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হয়ে কারোর মৃত্যু যে কাম্য নয় তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দিল্লি পৌরসভা কেন এ ব্যাপারে তার দায়িত্ব পালন করছে না তা নিয়ে বিচারপতিদ্বয় একটা বাক্যও ব্যয় করেননি।
বিচারপতি পারদিওয়ালা ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দি আগলি ছবির বিখ্যার সংলাপ উদ্ধৃত করেছেন ‘হোয়েন ইউ ওয়ান্ট টু শুট, শুট। ডোন্ট টক।’ গোদা বাংলায় – অত কথাবার্তার কী আছে? সোজা গুলি করে দেওয়া উচিত। আপাতত একথা বলা হয়েছে পথকুকুরদের সম্পর্কে। পরে মানুষ সম্পর্কেও যে সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারপতি এরকম বলবেন না – তার নিশ্চয়তা কী? বিচারপতি পারদিওয়ালা কিন্তু বরাবরই কড়া লোক হিসাবে পরিচিত। গুজরাট হাইকোর্টের বিচারপতি থাকার সময়ে এক রায়ে লিখেছিলেন ‘যদি আমাকে কেউ বলে দুটো জিনিসের নাম করতে যেগুলো এই দেশটাকে ধ্বংস করেছে বা সঠিক দিকে এগিয়ে যেতে দেয়নি, তাহলে সেই দুটো জিনিস হল সংরক্ষণ আর দুর্নীতি। স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও এদেশের কোনো নাগরিক সংরক্ষণ চাইলে সেটা লজ্জার ব্যাপার।’ সেই রায়ের জন্যে রাজ্যসভার ৫৮ জন সাংসদ তাঁর অপসারণ দাবি করেছিলেন। গুজরাট সরকার অবশ্য তাড়াতাড়ি তাঁকে রায় থেকে ওই কথাগুলো মুছে দিতে বলেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়ান।
আরো পড়ুন পিটুনি, গণপিটুনির উৎস সন্ধানে
আশার কথা, এবারের রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বহু নেতা নেত্রী এবং অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সোচ্চার হয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাওয়াইয়ের কাছে আবেদন করেছেন। তিনি সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চে এই রায় পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করেছেন।
বোঝা দরকার যে এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পশুপ্রেমীদের লড়াই নয়। আজ যদি সুপ্রিম কোর্ট মনে করে যে অবলা প্রাণির কথা শোনার দরকার নেই, তাহলে আগামীকাল প্রান্তিক মানুষের কথা শুনতেও রাজি না হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







