আরিয়ান খান কি মাদকাসক্ত? নাকি মাদক পাচারকারী? এই সব প্রশ্ন নিয়ে যখন নিখুঁত কাটাছেঁড়া চলছে, তখন একটি খবর আমাদের চোখ এড়িয়ে পালালো। আমরা টের পেয়েও পেলাম না। এককালের অভিনেতা, বর্তমানে বিজেপির খড়্গপুরের বিধায়ক হিরণ বেশ কয়েকটি আর্জি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে একটি দু পাতার চিঠি লিখেছেন। যার মধ্যে দুটি আর্জি, বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। [১] এক, তিনি সমস্ত শহীদ জওয়ানদের পরিবারকে ‘তেরঙ্গা পরিবার’ উপাধিতে ভূষিত করে তাদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা দেওয়ার আর্জি রেখেছেন। দুই, তিনি বলেছেন, মূলত পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরলে, সেখানকার তরুণ তরুণীদের জন্য, বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক।

এখানে এই দুটো আর্জির লক্ষ্য এক বলেই আমার ধারণা। এক এক করে আসা যাক। যে কোনো জওয়ান যদি যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারান তবে ভারত সরকারের নিয়মানুসারে তাঁর পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে দুই লক্ষ টাকা পায় [২] এবং সাথে পেনশনের মতো একাধিক সুযোগসুবিধাও। বিধায়ক হিরণের দাবি অনুযায়ী, এই পাওয়ার তালিকাটিকে আরেকটু প্রসারিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজ্য, জেলা, ব্লক, পুরসভা, পঞ্চায়েত স্তরে ২৬শে জানুয়ারি বা ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে যে অনুষ্ঠানগুলি হয় তাতে শহীদ পরিবারের লোকজনদের বিশেষ অতিথি করতে হবে। শহীদদের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেলস্টেশন, সড়ক গড়তে হবে। কথা হল, বীরদের স্মরণ করা তো আর অন্যায় নয়। তবে যখন এই স্মরণকে খানিক হিড়িকে বদলে দেওয়া হয়, তখন বোঝা প্রয়োজন এই স্মরণ করবার পিছনে নিপাট ভালমানুষী নয়, লুকিয়ে আছে কুটিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। কথাটা এমন ঝপ করে বলে দিলাম বলে ঝটকা লাগতে পারে। তবে এমন চেষ্টা নতুন নয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবির পর স্বভাবতই তাদের শেষ খুঁটি ‘যুদ্ধ’, ‘ধর্ম’, ‘সেনা’।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্মরণে রাখা প্রয়োজন পুলওয়ামার ঘটনা। [৩] চল্লিশ জনের বেশি সৈনিক প্রাণ হারিয়েছিলেন সেখানে। ঠিক ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে। এখানে নির্বাচন প্রসঙ্গটা উল্লেখ করা প্রয়োজন। নির্বাচন ছিল এপ্রিলে, আর পুলওয়ামা ঘটে ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ। আর ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ পুলওয়ামার বদলা নিতে পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা করে ভারতীয় সেনা। উল্লেখ্য, ২০১৯ নির্বাচনে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের একাধিক অভিযোগ ছিল। ডিমনেটাইজেশন, জিএসটি, আসামে এনআরসির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজ্যগুলোতে ব্যাপক প্রচারও চলে এসবের বিরুদ্ধে, তবু কোথাও যেন বিরোধীরা বারবার পিছিয়ে যায়। নির্বাচনের ফলাফল মোদীর মুখেই শেষ হাসি নিয়ে আসে। একপ্রকার গেরুয়া ঝড় তুলে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। শুধু ২০১৯ নয়, একাধিক নির্বাচনের আগে, ‘হাওয়া’ সরকারের পক্ষে যাচ্ছে না আঁচ করলে যুদ্ধের ধুয়ো তোলা বহু সরকারেরই পুরনো এবং সফল ছক। হিরণের আর্জি এককথায় বিজেপির সেই রাজনীতিরই নিদর্শন। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন তাদের কাছে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, ছিল অস্তিত্বের লড়াই। যার জন্য স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে প্রচার করতে দেখা গেছিল। তবে দিনের শেষে হিসাব মিলল না। মরণকামড় দিয়েও বাংলার মাটিতে টিকে থাকতে পারল না বিজেপি। এমতাবস্থায় তাদের ফের আরেকবার মঞ্চে ফেরার উপায় পেতে হলে, সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে রাজনীতি করা ছাড়া গতি নেই।

যখন সেনাবাহিনীকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে, চিঠির আদানপ্রদান হচ্ছে, তখন উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সেনাবাহিনীর অবস্থা ঠিক কেমন। ২০১৯ সালে ৯৫ জন সৈনিক আত্মহত্যা করেন। ২০১৮ সালে সংখ্যাটা ছিল ১০৭ আর ২০১৭ সালে ছিল ১০৩। এখানে দেওয়া একটি তথ্যও আমার মনগড়া নয়। ২০২০ সালের মার্চে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী শ্রীপদ নায়েক এই তথ্য লোকসভায় পেশ করেন।

প্রত্যেক বছর এত সৈনিকের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে বিজেপি সরকার বরাবরই তাঁদের পারিবারিক সমস্যাকে দোষারোপ করে এসেছে। তবে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২০ তারিখের একটি প্রতিবেদন থেকে অন্য চিত্র পাওয়া যায়। [৪] ডিআইপিআর অর্থাৎ ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অফ সাইকোলজিক্যাল রিসার্চের পক্ষ থেকে সৈনিকদের আত্মহত্যা নিয়ে একটি গবেষণামূলক কাজ করা হয়। সেখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। জানা যায়, সৈনিকরা দীর্ঘদিন ধরে কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছে, যেগুলোকে বারবার পারিবারিক সমস্যার নাম করে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প বেতন, দিনের পর দিন ছুটি নামঞ্জুর হওয়া, আর্মি মেসের খাবারের দুরবস্থা, পাহাড়ি এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাদের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা না থাকা, ইত্যাদি। এককথায় বলা চলে সবরকম মৌলিক সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা।

ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের মতে, [৫] খাবারের চরম দুরবস্থার ফলে, প্রায় ৮২ শতাংশের কাছাকাছি সৈনিক পর্যাপ্ত ক্যালোরি পাচ্ছেন না। এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যখন সিয়াচেনে জওয়ানরা লড়াই করছে বলে বিজেপির নেতা নেত্রীরা প্রায় প্রতিদিন কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখন ২০১৭ সালে বিএসএফের ২৯ বিএন ব্যাটেলিয়ানের একজন জওয়ান মোদীর উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও আবেদন পোস্ট করেন, [৬] যেন আর্মি মেসের খাবারকে অন্তত গলাধঃকরণের যোগ্য করে তোলা হয়।

কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটার জেনারেল আরও জানাচ্ছেন, সিয়াচেনের মতো ১৭,০০০ থেকে ২২,০০০ ফুট উচ্চতায় কর্মরত জওয়ানদের যে বিপুল পরিমাণ শীতবস্ত্রের প্রয়োজন তার ৪১ শতাংশও তাদের কাছে পৌঁছায় না। দি ইকোনমিক টাইমসের ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সৈনিকদের মাথাপিছু একটি করে কিট বরাদ্দ আছে। তার মধ্যে রয়েছে

১# জ্যাকেট বাদেও একাধিক গরম জামা। বাজেট ২৮,০০০/-।

২# চরম ঠান্ডা ঠেকাতে বিশেষ ধরণের স্লিপিং ব্যাগ। বাজেট ১৩,০০০/-।

৩# ডাউন জ্যাকেট এবং গ্লাভস। বাজেট ১৪,০০০/-।

৪# শীতের জুতো। বাজেট ১২,৫০০/-।

৫# অক্সিজেন সিলিন্ডার। ৫০,০০০/- প্রতি পিস।

খাতায় কলমে এতকিছু থাকলেও দিনের শেষে ২২,০০০ ফুট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের কাছে এর সিকিভাগও পৌঁছায় না।

ফলত বিজেপির সেনাপ্রেমের আড়ালে যে আসলে ভোটের অঙ্ক লুকিয়ে আছে তা আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না।

ফিরে আসা যাক বিধায়কের চিঠিতে। তাঁর দ্বিতীয় দাবিটি হল, বিশেষত বাংলা এবং কেরলে, অর্থাৎ যে দুটি রাজ্যে বিজেপি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তরুণ তরুণীদের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। কারণ তাঁর মতে এই দুটি রাজ্যে হিন্দুরা বিপদে। তাদের নিরাপত্তা নেই, জেহাদি আক্রমণ হলে তারা ঠেকাতে পারবে না। তাই এই পদক্ষেপ জরুরি।

এখন বোঝা প্রয়োজন, সামরিক প্রশিক্ষণ কেবল অস্ত্র হাতে দৌড়ানো বা অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নয়। সামরিকীকরণ একটি মতাদর্শ, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে সংকুচিত করে আনে এবং তাকে সুচতুরভাবে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের গন্ডিতে আবদ্ধ করে। চিন্তার অবাধ বিচরণ বা চিন্তাশক্তি‌র বিকাশ থেমে যায়। এই ছাতাটির তলায় মানুষকে প্রশ্নবিহীন জীবে পরিণত করা সম্ভব। হিরণের মতানুযায়ী আজ যদি প্রতিটি তরুণ তরুণীর জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তাদের আর অন্য কোনো মতাদর্শ নিয়ে ভাবার ফুরসৎ থাকবে না। তাদের খুব সহজেই, ঘরে বাইরে, একটি মতাদর্শগত ঘেরাটোপে বেঁধে‌ ফেলা যাবে — তা হল হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যেখানে ভিন্নমতের ঠাঁই নেই। ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব মিলবে না। ফ্যাসিস্ট ইতালিতে ১৮ ছুঁইছুঁই পুরুষদের সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সেখানেও বাধ্যতামূলক করার পিছনে ছিল একই ভাবনা। ধর্মের নামে, রক্তের নামে, জাতির নামে একপ্রকার আরোপিত ঐক্য গড়ে তোলা।

তবে এ ভাবনা কেবল হিরণ বা বিজেপির — এমন ভাবলে ভুল হবে। বহু আগে থেকেই আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের মতো সংগঠনগুলো ছলে বলে কৌশলে এই দাবি করে আসছে। সামরিকীকরণের আড়ালে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকড় শক্ত করছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোটবড় ক্যাম্পের মাধ্যমে এই কাজ চালিয়েও যাচ্ছে। [৭] ২০১৭ সালের একটি খবর থেকে জানা যায়, উত্তরপ্রদেশের শিকারপুর অঞ্চলে আরএসএস একটি স্কুলও তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা একগুচ্ছ ছেলেকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে ভারতীয় সেনায় যোগ দেওয়ার জন্য। আরএসএসের এক প্রচারক এই বিষয়ে স্পষ্ট বলেন, কেবল উত্তরপ্রদেশ নয়, তারা এইরকম ব্যবস্থা অনান্য রাজ্যগুলোতেও নেওয়ার কথা ভাবছে। হিরণের আজকের বক্তব্যকে এই বক্তব্যের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে ভুল হবে।

তথ্যসূত্র:

১) আনন্দবাজার পত্রিকা 
২) বিসনেস স্ট্যান্ডার্ড
৩) ও আর এফ অনলাইন
৪) টাইমস অফ ইন্ডিয়া
৫) ইকোনমিক টাইমস
৬) ইউটিউব
৭) ইকোনমিক টাইমস

Leave a Reply