এই সেদিন ভরদুপুরে বছর চল্লিশের ব্যবসায়ী তৌকির আলমকে রায়গঞ্জ শহরে কাঠফাটা রোদে একটা টোটো এসে ধাক্কা দিয়েছিল। তারপর রায়গঞ্জ সুপার স্পেশালিটি হসপিটাল হয়ে ইসলামপুর, ইসলামপুর থেকে শিলিগুড়ি নেওটিয়া হসপিটালে পৌঁছনোর আগেই তৌকির মারা গেলেন। রায়গঞ্জ হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার নেই, দুর্ঘটনার জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ নেই। কী কী আছে, হাসপাতালের সুপার পর্যন্ত বলতে পারবেন না। ইসলামপুর সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আদৌ কি কেউ চিকিৎসার জন্য যায়? উত্তরবঙ্গে এইমস রায়গঞ্জে হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। রায়গঞ্জের বদলে এইমস উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, মালদা – যে কোনো শহরে হতে পারত। কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সদিচ্ছায় এইমস হচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের কল্যাণীতে। উত্তরবঙ্গ সেই বাদ পড়ে গেল। কেন এমন হল?

হতে পারে উত্তরবঙ্গের নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। আবার এমনও হতে পারে যে সরকার মনে করে উত্তরবঙ্গের নাগরিকরা উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি এখনো। এমন নয় যে আগের সরকারের আমলে উত্তরবঙ্গের চিকিৎসাব্যবস্থা সোনায় মোড়া ছিল, হঠাৎ এই সেদিন খারাপ হয়েছে। কিন্তু এগারো বছর ধরে চলা একটা পরিবর্তনকামী সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবার নামে উঁচু উঁচু ইমারতের দেউলিয়া চাকচিক্য উপহার দেবে? নীল, সাদা রঙের হাসপাতাল বিল্ডিং শাসকের দম্ভ ছাড়া উত্তরবঙ্গকে কিছুই দেয়নি। উত্তরবঙ্গ মেডিকাল কলেজের পরে রায়গঞ্জ ও মালদা মেডিকাল কলেজ হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা? ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন, মালদা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে স্নায়ুর রোগের চিকিৎসা কতটা হয়। পাঠক একবার কল্পনা করুন, কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গের কোনো মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে স্নায়ুর রোগের চিকিৎসক নেই!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কবে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, কোচবিহার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জলপাইগুড়ি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জলপাইগুড়ি সরকারি আইন কলেজ, শিলিগুড়ি সরকারি আইন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ আর অনেকেই মনে করতে পারেন না। তারপর কয়েক দশক কাটিয়ে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন সরকার এসে উত্তরবঙ্গের শিক্ষার উন্নয়নে দয়াপরবশ হয়ে রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছে এবং বালুরঘাটে বিশ্ববিদ্যালয়, কোচবিহারে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিপুরদুয়ারে আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে। কিন্তু এগারো বছরে কতগুলো নতুন কলেজ তৈরি করেছে? সরকার নতুন করে উত্তরবঙ্গে কতগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তৈরি করেছে? এই এগারো বছরে একটাও গার্লস কলেজ তৈরি করেছে? কেন উত্তরবঙ্গে আইআইটি তৈরি হল না? কেন কলকাতার সেক্টর ফাইভ অথবা রাজারহাটের মত উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি শহরে আই টি হাব গড়ে তোলা হল না? এসএসসি কমিশনে জোন তুলে দিয়ে এককেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা চালু করা হল। ফলে উত্তরবঙ্গের গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করতে আসছেন সুন্দরবনের কেউ। উত্তরবঙ্গের ছেলে মেয়েরা উত্তরবঙ্গেই নিজের জেলার স্কুলে চাকরি করার আগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল। গত একবছর ধরে উৎসশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে যাঁরা এসেছিলেন দক্ষিণবঙ্গ থেকে, তাঁরা বদলি নিয়ে চলে গেছেন নিজের জেলায়। উৎসশ্রী উত্তরবঙ্গের শিক্ষা কাঠামোকে শ্রীহীন করে, স্কুলগুলোকে শিক্ষকহীন পান্থশালায় পরিণত করেছে। শাসক কি এসব দেখে না বা জানে না? এগুলো বঞ্চনা নয়?

উত্তরবঙ্গ শিক্ষা ক্ষেত্রে কেন পিছিয়ে, এই প্রশ্ন তোলার মত কোনো রাজনৈতিক নেতা নেই? নেই বললে ভুল হবে। কিন্তু যে দু-একজন তুলছেন, তাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্যই বলছেন। উত্তরবঙ্গের শাসক দলের নেতারা কোনো আমলেই গুরুত্ব আদায় করতে পারেননি। একসময় প্রাক্তন নগরোন্নয়ন মন্ত্রী নিজের দলের রাজ্য কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীতে জায়গা পেয়েছিলেন আমন্ত্রিত সদস্য হিসাবে। আর বর্তমান শাসক দল উত্তরবঙ্গে নিজের দলের নেতাদের অভিভাবকত্ব করার জন্য দক্ষিণবঙ্গ থেকে এক নেতাকে শিলিগুড়ি শহরে নিয়োগ করেছেন। উত্তরবঙ্গ থেকে যদিও বা দু-একজন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন, তাঁরা আদৌ কোনো ছাপ রাখতে পেরেছেন কি? পারেননি। উত্তরবঙ্গের জন্য কোনো প্রকল্প আনতে পারেননি। ইসলামপুর বিধানসভার বিধায়ক গত মন্ত্রিসভায় গ্রন্থাগার মন্ত্রী ছিলেন, অথচ উত্তরবঙ্গে একটাও নতুন গ্রন্থাগার হয়নি। সুতরাং উত্তরবঙ্গকে বাম আমলে এবং তৃণমূল আমলে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজ্য মন্ত্রিসভায় দক্ষিণ কলকাতার প্রাধান্য চোখে পড়ার মত।

উত্তরবঙ্গের বঞ্চনার ইতিহাস তো আজকের নয়, বহুদিনের। আশা করা গিয়েছিল নতুন সরকারের আমলে ছবি বদলাবে। এগারো বছরে মুখ্যমন্ত্রী নিয়ম করে গরমে দার্জিলিং ভ্রমণে এসেছেন, এর বাইরে উত্তরবঙ্গে পরিবর্তনের প্রলেপ পড়েনি। উত্তরকন্যা, গাজলডোবা, তৈরি হয়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান হয়নি। এখানকার একমাত্র শিল্প চা আগের চেয়েও বেশি ধুঁকছে, সরকারের হেলদোল নেই। নতুন কোনো শিল্প আসেনি। শাসক সম্ভবত ভাবেই না উত্তরবঙ্গে শিল্প হতে পারে। পর্যটন শিল্পে অনেক কিছু করার ছিল, কিছুই করা হয়নি। হোম স্টে চলছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, ব্যক্তি মালিকানায়। সরকারের অবদান শূন্য।

আরো পড়ুন পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্য: ইতিহাস ও সম্ভাবনা

আগের সরকারের আমলে যেমন, এই সরকারের আমলেও তেমনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই অবহেলা, বঞ্চনা। সরকার চাইলেই কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের মত শিলিগুড়ি, বালুরঘাট অথবা কোচবিহার শহরে বই বাজার গড়ে তুলতে পারত, কিন্তু তা করেনি। করার তাগিদ নেই। উত্তরবঙ্গ যেন কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গের উপনিবেশ। নিজেদের উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করার জায়গা। তাই সরকার চায় না উত্তরবঙ্গে উৎপাদন হোক, উত্তরবঙ্গের নাটক কলকাতায় হোক, উত্তরেই কোনো এক শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠুক শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র, কলকাতার মত। উত্তরের যে কোনো শহরে থেকেই লিখুন সমরেশ মজুমদার, তিলোত্তমা মজুমদাররা। তাঁদের মত কাউকে যেন কলকাতায় যেতে না হয়। উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ব্যবহার করে টালিগঞ্জের মত চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলা যেত। অনীহা, শাসকের উপেক্ষার কারণে হয়নি। এমন অনেককিছুই হয়নি। দ্বিতীয় করোনেশন ব্রিজ হয়নি, দ্বিতীয় ফরাক্কা সেতু হয়নি।

কী কী হয়নি তার খতিয়ান দিতে গেলে ধারাবাহিক কলাম লিখতে হবে। পাঠকেরও নিশ্চয়ই উত্তরবঙ্গের ধারাবাহিক, দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস পড়তে ভাল লাগবে না। তাই এখানেই ইতি টানতে হচ্ছে। শেষে বলা, উত্তরের না পাওয়ার তালিকা খুব লম্বা। এক সময় দার্জিলিং শহরে কলকাতার বাবুরা অফিস করতেন। দার্জিলিং শহরের যুবকরা বাবুদের কোয়ার্টার পাহারা দিত। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি, রকমফের হয়েছে মাত্র। এখন উত্তরবঙ্গের কর্মহীন যুবকরা নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিযায়ী হয়ে চলে যায় দূর প্রদেশে। শাসকের ভাবা উচিত, কলকাতার বাইরেও পশ্চিমবঙ্গ আছে। কলকাতায় গরম মানে উত্তরবঙ্গে গরম নয়। কলকাতার পরে উত্তরবঙ্গে গরম পড়ে। উত্তরেও দিনহাটা কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী চুমকি রায় অসহ্য গরমে মারা গেছে।

~মতামত ব্যক্তিগত