২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রাক্তন সিবিআই কর্তা আর কে রাঘবনের নেতৃত্বে র‍্যাগিং প্রতিকারে একটি কমিটি গঠিত হয়। রাঘবন কমিটির রিপোর্ট র‌্যাগিংকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে এবং দেখায় যে বিশ্ব জাগৃতি মিশন দ্বারা দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলায় দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের ২০০১ সালের মে মাসের নির্দেশিকা কলেজগুলি বাস্তবায়িত করেনি। রিপোর্টে এও বলা হয় যে র‌্যাগিং সম্পর্কে সচেতনতার প্রয়োজন শুধুমাত্র নবাগত নয়, সমস্ত অংশীদারদের মধ্যেই থাকা দরকার। অর্থাৎ সিনিয়র, শিক্ষক এবং বৃহত্তর নাগরিক সমাজের মধ্যেও। উপরন্তু একটি শক্তিশালী ও অভিন্ন র‍্যাগিংবিরোধী আইন দরকার। এর জন্য আচমকা পরিদর্শন এবং পরিচয় গোপন রেখে সমীক্ষা, ভুক্তভোগীদের র‌্যাগিংয়ের ঘটনা রিপোর্ট করার ভয়কে প্রশমিত করার ব্যবস্থা; কেন্দ্রীয়, রাজ্য এবং কলেজ স্তরে অ্যান্টি-র‌্যাগিং সেল স্থাপন, র‍্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য টোল ফ্রি হেল্পলাইন তৈরি, এনসিইআরটি, এসসিইআরটি সমেত সমস্ত বোর্দের স্কুলপাঠ্য বইয়ে র‌্যাগিং সম্পর্কে অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা, সিনিয়র সেকেন্ডারি স্তরে অ্যান্টি-র‌্যাগিং এবং মানবাধিকার বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, কলেজের কর্মীদের উপস্থিতিতে জুনিয়র এবং সিনিয়রদের মধ্যে কথাবার্তার আয়োজন ইত্যাদি নানাবিধ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়।

পাশাপাশি রাঘবন কমিটি সঠিকভাবেই উল্লেখ করে, বহু র‍্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে ক্যাম্পাসের বাইরে যেসব জায়গায় ছাত্রছাত্রীরা থাকে সেইখানে। সেইসব জায়গায় সিনিয়রদের পক্ষে জুনিয়রদের র‍্যাগ করা খুবই সহজ হয়ে যায় এবং শাস্তি এড়িয়ে যেতেও অসুবিধা হয় না, কারণ কলেজের এলাকার বাইরে হওয়া র‍্যাগিং নিয়ে কলেজ প্রশাসন মাথা ঘামায় না। এই জাতীয় হোস্টেলগুলিকে অবশ্যই স্থানীয় পুলিসের কাছে নথিভুক্ত হতে হবে এবং এগুলির প্রশাসক ও কলেজের প্রশাসকদের নবাগতদের নিরাপত্তার জন্য দায়ী করতে হবে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাঘবন কমিটির এই পর্যবেক্ষণ যাদবপুরের ঘটনাতেও প্রযোজ্য। ক্যাম্পাসের ভিতর র‌্যাগিং হলে তা প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু এক্ষেত্রে যে হোস্টেলে র‌্যাগিং হয়েছে সেই হোস্টেলের অবস্থান ক্যাম্পাসের বাইরে হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরেই সেখানে র‌্যাগিংয়ের রমরমা। সেসব ঘটনা হোস্টেলের চার দেওয়ালেই আটকে রাখার প্রচেষ্টাও সফল। এমনকি নবাগত ছাত্ররা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার সাহস করলে সিনিয়ররা তাদের হুমকি দিয়ে থাকে বলে জানা যাচ্ছে। অপমান বা নির্যাতন অব্যাহত রাখা সহজ হয় এবং এক্ষেত্রে সেই নির্যাতন ভুক্তভোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে চলা এহেন নির্যাতন একবারের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গোচরে এল না! এমনকি অ্যান্টি-র‌্যাগিং কমিটিতেও কোনো অভিযোগ এসে পৌঁছয়নি? বেনামেও কেউ কোনো অভিযোগ করেনি? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বারবার যে নবাগত ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা হোস্টেলের দাবি উঠছে, সে ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আইআইটিগুলোতে দ্বিতীয় বর্ষ থেকে র‌্যাগিং শুরু হয়, একথা অনেকেই বলে।

র‍্যাগিংয়ের ব্যাপারে এই রাজ্যের অবস্থা কী?

ইউজিসির সাম্প্রতিক হিসাব বলছে গত নয় বছরের মধ্যে ২০২২ সালেই র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উঠেছে – ৯৬টি। উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা যথাক্রমে ১৪১ ও ১০০। অর্থাৎ র‌্যাগিংয়ের অভিযোগের নিরিখে গোবলয়ের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বাংলা। গতবছর দেশজুড়ে করা ইউজিসির সমীক্ষা বলছে, যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪০% পড়ুয়াই কোনো না কোনোভাবে র‌্যাগিংয়ের শিকার হন। মুখ খোলেন বা অভিযোগ করেন কতজন? মাত্র ৯%। বেশ কিছু রাজ্য নিজেরা র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে আলাদা আইন তৈরি করেছে। যেমন তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা, মহারাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গেও ২০০০ সালে একটি আইন পাস করা হয়।

সেই আইনে রাজ্যের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রতি অ্যান্টি-র‌্যাগিং কমিটি গঠন করা এবং র‍্যাগিংয়ে লিপ্ত শিক্ষার্থীদের আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ আছে। ফলে যেভাবেই র‍্যাগিং করা হয়ে থাক, তা ২০০০ সালে পাস হওয়া (এবং কয়েক বছর আগে সংশোধিত হওয়া) পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আইন পাস হওয়ার দুই দশক পরেও রাজ্যের একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রথম বর্ষের ছাত্রকে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হল। এর আগেও বিক্ষিপ্তভাবে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় (উত্তরবঙ্গের কথা আগেই বলেছি), ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা অন্যান্য কলেজে র‍্যাগিংয়ের ঘটনা সামনে এসেছে।

ইউনেস্কোর এক সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী বুলিইং-র‌্যাগিংয়ের শিকার। এর ফলে তারা গভীর আতঙ্কের শিকার হয়, কেউ কেউ সারাজীবন ট্রমায় ভুগতে থাকে। কিছু ঘটনা জনসমক্ষে আসে, তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়, কিছুদিন পরে সবাই সব ভুলে যায় এবং র‌্যাগিং চলতেই থাকে।

আজ থেকে নয়, সেই খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতক থেকেই গ্রীক সংস্কৃতির অংশ হিসাবে কোনো ক্রীড়া সম্প্রদায়ে নতুন খেলোয়াড় বা শিক্ষার্থীর আগমন ঘটলে তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করে নিতে এবং তার মধ্যে দলীয় আনুগত্যের বীজ বপন করতে নাকি অগ্রজরা দল বেঁধে তাকে উপহাস করত, তার নানা পরীক্ষা নিত। আধুনিককালে সৈন্যদলগুলি এই পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করে, যেখান থেকে র‌্যাগিং শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করে ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডে এবং পরে আমেরিকায়। ইংল্যান্ডের সেন্ট পলস স্কুল, এটন কলেজ, উইনচেস্টার কলেজের বেশ নামডাক ছিল ফ্যাগিং প্রতিষ্ঠান হিসাবে। ১৮৭৩ সালে র‍্যাগিংয়ের কারণে মারা যাওয়া যে প্রথম শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া যায়, তিনি মর্টিমার লেগেট। নিউ ইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার টায়ারম্যানের A History of Harrow School (1324-1991) বই থেকে জানা যায় ছাত্রছাত্রীদের যৌন নিগ্রহের কথা। ১৯৩০ সালে পশ্চিম লন্ডনের সেডবার্গ স্কুলের এক ১৪ বছরের ছাত্র ফ্যাগিং সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপ ও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে র‍্যাগিংয়ের ঘটনা কমে যেতে থাকে, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের বোঝা কাঁধে নিয়ে র‍্যাগিং উল্টে আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে। ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায়, সাধারণ বর্গের ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে র‍্যাগিংয়ের ঘটনা বেশি করে ঘটতে থাকে।

আইন, আদালতের নির্দেশ – সবকিছু থাকা সত্ত্বেও র‍্যাগিং হয়। কেন হয়? আক্রান্ত যদি নিজেই মনে করে সে আক্রান্ত নয়, তবে আক্রমণ প্রতিহত করা বড় কঠিন। আসলে র‍্যাগিং বিষয়টা প্রয়োগে শারীরিক হলেও কারণ ও ফলাফল দুটোতেই মনস্তাত্ত্বিক। র‍্যাগিংয়ে শ্রেণির প্রশ্নও জড়িত। প্রবল আধিপত্যের ভাবনা, সিনিয়র-জুনিয়র শব্দবন্ধের মধ্যে সুপ্ত থাকা হীনমন্যতা, অবদমিত যৌনতা, পরিবেশগত ও সামাজিক বৈষম্যের ফলাফল কিংবা যূথবদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি – সবই আছে।

এর মধ্যে সর্বাগ্রে যে তত্ত্বটির কথা বলা হয় সেটি হল স্টকহোম সিনড্রোম। ১৯৭৩ সালের অগাস্টে স্টকহোমে দুই ব্যাঙ্ক ডাকাত তিন মহিলা এবং একজন পুরুষকে ছদিন বন্দি করে রাখে। সেই ছদিনে বন্দিরা ওই অপরাধীদের সঙ্গে মানসিক বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। যে বন্দিরা অপরাধীদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছিল তারা বেঁচে গিয়েছিল, যারা তা পারেনি তাদের হত্যা করা হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, র‌্যাগিং সোশাল স্টকহোম সিনড্রোমের উদাহরণ। র‌্যাগিংয়ে প্রায়শই প্রথমে নির্যাতন করা হয়, তারপর নির্যাতিতদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের কৌশল ব্যক্তিকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে ফেলে। সিনিয়ররা প্রথমে নবাগতদের ঘন্টার পর ঘন্টা মারধর করে, তারপর নানা উপহার দেয়, নোট দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। বেশিরভাগ ভুক্তভোগী এই শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের কাছে নতিস্বীকার করে। এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে নির্যাতিত নিজেই অপরাধীকে ত্রাতা বলে মনে করতে থাকে। এইভাবে নবাগতরা সিনিয়রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে এবং এক সময় তাদের সমর্থক হয়ে ওঠে। পরের বছর নিজেরাই সেই কাজে লিপ্ত হয়।

র‌্যাগিং বোঝার জন্য অবশ্যই বৃহত্তর সামাজিক, সাংস্কৃতিক কারণগুলিকেও বুঝে নিতে হবে। সমাজে শ্রেণিবিন্যাসের স্বীকৃতির পাশাপাশি কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য হিংস্রতা এবং জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার ব্যবহার এবং শৃঙ্খলা, শিক্ষা এবং শাস্তির স্বীকৃতি রয়েছে। আমাদের সমাজ একটি বৈষম্যমূলক সমাজ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও বৈষম্যমূলক। এর ফলে আধিপত্যবাদের জন্ম হয়। বৈষম্য আছে মানে সমাজের এক শ্রেণি আরেক শ্রেণির উপর কর্তৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করে। এই চেষ্টা শারীরিক, মানসিক দুরকমই হয়ে থাকে। আবার সমাজে একই শ্রেণির মধ্যেও শক্তির তারতম্যের ভিত্তিতে আধিপত্য তৈরির চেষ্টা চলে। আমাদের দেশ ও সমাজ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত। পুঁজিবাদ যেহেতু একটি শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, জোর-জবরদস্তির শাসন, বেশিরভাগ মানুষের অধিকার মুষ্টিমেয় মানুষের কেড়ে নেওয়ার বিধান এখানে প্রতি মুহূর্তে দমনপীড়নের পরিবেশ তৈরি করে। সমাজের এই অবস্থা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উপরেও প্রভাব ফেলে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজেরই অণু সংস্করণ, সেহেতু লিঙ্গ, জাতপাত এবং শ্রেণিগত শোষণ সম্পর্কিত সামাজিক উদ্বেগগুলি অনিবার্যভাবে সেখানে প্রতিফলিত হয় এবং র‌্যাগিংকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে।

(চলবে)

– মতামত ব্যক্তিগত

প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.