সবার জানা কী উপায়ে ১৯৩৪ বিশ্বকাপ ফুটবল জিতেছিল মুসোলিনির ইতালি

একেই বলে “আমি যাই বঙ্গে, তো কপাল যায় সঙ্গে”।

কথা ছিল খেলা হবে পাঁচদিন ধরে, মনোরম আলোয় আলোকিত মাঠে, গোলাপী বলের বিরুদ্ধে। আর প্রতিদিন, সেই দুপুর থেকে রাত অবধি, ৩৬০ মিনিট ধরে ভাষ্যকাররা প্রতিনিয়ত সুমধুর কণ্ঠে ঘোষণা করবেন, এবার রিলায়েন্স প্রান্ত থেকে বল করতে আসছেন ব্যাটসম্যানদের যম অশ্বীন, এবার আদানি প্রান্ত থেকে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ঝুঁটি ধরে নেড়ে দিতে আসছেন অক্ষর প্যাটেল, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বিধি বাম, যাবতীয় আয়োজন ব্যর্থ হল, কারণ গোড়ায় গলদ। এমনই কিম্ভুত কিমাকার পিচ বানানো হল যে পাঁচদিনের ম্যাচের দুদিনেই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটল। একটি বিশেষ টেলিভিশনের রিপোর্ট যদি মানতে হয়, তাহলে স্রেফ জলে গেল নগদ আড়াইশো কোটি টাকা দিয়ে কিনে নেওয়া রিলায়েন্স প্রান্ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় প্রমথনাথ বিশীর একটি লেখা। তাঁরই লেখা একটি গল্পের মৌখিক সমালোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ নাকি বলেছিলেন, “গল্পটা এমনভাবে আরম্ভ হইয়াছে, যেন অনেক আড়ম্বর করিয়া রেলে চড়িয়া বোম্বাই যাত্রার মত; কিন্তু অকালে অকস্মাৎ শ্রীরামপুরে আসিয়া রেল কলিসন ঘটিয়া সব শেষ হইয়া গেল।” সম্প্রতি আহমেদাবাদে অকালমৃত তৃতীয় টেস্ট সম্বন্ধেও বোধহয় একই উক্তি করা যায়।

এ তো গেল সদ্যসমাপ্ত টেস্ট ম্যাচ নিয়ে নেহাত হালকা একটি রসিকতা। কিন্তু এরই পাশাপাশি এমন কিছু ঘটনা সামনে উঠে আসছে, যা নিয়ে ভাঁজ পড়েছে অনেকের কপালেই। অনেকেরই মনে হচ্ছে আরও গভীর, গভীরতর অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট, এবং বৃহত্তর অর্থে দেশের ক্রীড়া কাঠামো, যা কিনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামে রাতারাতি স্টেডিয়াম নামাঙ্কিত করে ফেলবার চাইতেও ভয়ঙ্কর ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে।

আসলে দেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে সর্বময় কর্তা হয়ে বসে যেন তেন প্রকারেণ আন্তর্জাতিক আসরে সাফল্য অর্জন করে মানুষের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তোলবার প্রচেষ্টা একনায়কতন্ত্রের এক পুরাতন ব্যাধি হিসাবে সারা বিশ্বে পরিচিত। আজ নয়, গত প্রায় একশো বছর ধরে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সেই রোগেই আক্রান্ত হয়েছেন দেশের বর্তমান প্রশাসকরা। এবং সেই মারণ জ্বরেই বুঝি দুদিনেই অপমৃত্যু ঘটল পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচের।

অনেকেই বলবেন এমন আশঙ্কা অমূলক, এটা আসলে রজ্জুতে সর্পভ্রম মাত্র। হয়ত তাঁরাই ঠিক। কিন্তু তবু, তবু, কিছু হিসাব যে কিছুতেই মিলছে না। ধরা যাক, এই মুহূর্তে ঠিক কিভাবে চলছে দেশের ক্রিকেট বোর্ড, বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রীড়া সংস্থা? বোর্ডের সভাপতির পদ অলংকৃত করে আছেন যে ভদ্রলোক, তাঁর নামে বাজারে জোর গুজব, তিনি নাকি আগামী পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে হতে পারেন দেশের শাসক দলের অন্যতম মুখ। হয়ত নেহাত গুজব, এই রটনার মধ্যে কোন সারবত্তা নেই। কিন্তু বোর্ডের যিনি সচিব, তিনি তো খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র। যিনি কোষাধ্যক্ষ, তিনি তো দেশের কনিষ্ঠ অর্থমন্ত্রীর ভ্রাতা, তাঁর পিতা কদিন আগেও ছিলেন একটি রাজ্যে শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রী। এই ক্রিকেট বোর্ড যে আদতে কাদের করতলগত, বুঝতে কারুর তেমন অসুবিধা হবার কথা নয়। সুপ্রীম কোর্টের অনুমোদিত আইন অনুযায়ী একটানা ছয় বছরের বেশি ক্রিকেট প্রশাসকের ভূমিকা পালন করতে পারেন না দেশের কোনো নাগরিক। সেই আইনের ভিত্তিতে বলা যায়, প্রায় এক বছর আগেই পদে থাকবার অধিকার হারিয়েছেন বোর্ড সভাপতি এবং সচিব দুজনেই। কিন্তু কোনো রহস্যময় কারণে সরে দাঁড়াবার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা দেখাননি এঁদের কেউই।

কিন্তু এ তো গেল মাত্র একটি দিক। বৃহত্তর দিকটা দেখলে বোঝা যায়, যেরকম দৃষ্টিকটুভাবে এবং তড়িঘড়ি আহমেদাবাদকে বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে তুলে ধরবার চেষ্টা চলছে, তা শুধু বিস্ময় উদ্রেক করে না, বেশ কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিতে পারে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের।

প্রথমে বলা হল, যাবতীয় আধুনিক সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা নিয়ে এই স্টেডিয়াম হতে চলেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা। ভালো কথা। তারপর জানা গেল, বিশ্বের সর্বাধিক দর্শক আসন থাকবে এই স্টেডিয়ামে। আরো ভাল কথা। কিন্তু কাকপক্ষীও টের পায়নি বদলে দেওয়া হচ্ছে স্টেডিয়ামের নাম অবধি। জানা গেল একেবারে টেস্ট ম্যাচ শুরুর দিন। প্রধানমন্ত্রী নিজে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলেও, উড়ে গেলেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আরও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে গিয়েছিলেন যে সমস্ত সাংবাদিকরা, তাঁরাও জানতেন না রুমালকে কখন বেড়াল করে দেওয়া হবে। নামকরণ নিয়ে এই গোপনীয়তার আদৌ প্রয়োজন ছিল কতটুকু, তা বোঝা দায়।

আসলে তলে তলে কোথায় যেন সন্দেহ দানা বাঁধছে, বিরাট কোহলির দলকে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে তুলতে যেন বড্ড বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কর্তৃপক্ষ। লর্ডসের মাঠে সেই ফাইনাল খেলতে গেলে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চলতি সিরিজ জেতা আবশ্যিক। স্পিনারদের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তি সর্বজনবিদিত। সেই কথা মাথায় রেখেই কি মোটেরার বুকে এমন এক পিচ তৈরি হল যাতে সপাটে মুখ থুবড়ে পড়লেন বিশ্বের সেরা ব্যাটধারীরা? খেলাধূলার প্রচলিত রীতিনীতির কোনরকম তোয়াক্কা না করে যেমন তেমন করে জিততেই হবে, আর জেতার পরেই তুলে দিতে হবে জাতীয় পতাকা, এবং জুড়ে দিতে হবে উচ্চকণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত; কারণ এতেই প্রমাণিত হবে জাতীয়তাবাদ — এই হল একনায়কতন্ত্রের প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ। অনেকের ভয়, সেই দোষে দুষ্ট হল না তো ভারতীয় ক্রিকেট?

আসলে এই ধরনের ঘটনার তো অভাব নেই বিশ্বের খেলাধূলার ইতিহাসে। এখন মোটামুটি সবার জানা আছে ঠিক কী উপায়ে ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল জিতেছিল মুসোলিনির ইতালি। শোনা যায় যোগ্যতা অর্জন পর্বের খেলায় ইতালির বিরুদ্ধে গ্রীসের অনুপস্থিত থাকবার কারণ হল গ্রীসের ফেডারেশনের কর্তাদের হাতে ভালরকম টাকাপয়সা ধরিয়ে দিয়ে ইতালিয় সরকার বলেছিলেন তোমাদের আর খেলবার প্রয়োজন নেই। স্পেনের বিরুদ্ধে ইতালির ম্যাচের পর এক সাংবাদিক নাকি মন্তব্য করেছিলেন, এই ম্যাচের জয়মাল্য কাদের গলায় দোলা উচিৎ, তাই নিয়ে মনে হচ্ছে অস্ট্রিয়ার রেফারির আগে থেকেই স্বচ্ছ ধারণা ছিল। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে পরবর্তী রাউন্ডে যেতে আয়োজক দেশ আর্জেন্টিনার পেরুর বিরুদ্ধে চার গোলে জয়ের প্রয়োজন ছিল। অভিযোগ, আর্জেন্টিনার তৎকালীন কুখ্যাত ডিক্টেটর জর্গে ভিদেলা নাকি পেরুর রাষ্ট্রপতি ফ্রান্সিসকো বর্মুদেজের সঙ্গে রীতিমত ষড় করে আর্জেন্টিনাকে ছয় গোলে জিতিয়ে আনেন। পেরুর এক ফুটবলার পরবর্তীকালে জানিয়েছেন, ম্যাচের আগে নাকি পেরুর ড্রেসিং রুমে হাজির হন ভিদেলা স্বয়ং। রক্তচক্ষু করে জানিয়ে দেন, তিনি আশা করেন পেরু তাদের সেরা ফুটবল খেলবে, কিন্তু পাশাপাশি তারা যেন আন্তর্জাতিক আসরে দক্ষিণ আমেরিকার সম্মানের কথাটাও মাথায় রাখে। মাঠে নামার আগেই স্রেফ আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় পেরুর ফুটবলারদের।

না, এই কুখ্যাত ঘটনাগুলির সঙ্গে তৃতীয় টেস্টের কোন তুলনা টানা হচ্ছে না। আহমেদাবাদে যা ঘটেছে, তা হয়ত অতিরিক্ত লোভের কুফল মাত্র। স্পিনারদের উপযোগী পিচ তৈরি করে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের কুপোকাত করা যাবে, এই তত্ত্ব অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে খেয়াল থাকেনি দুদিনে ম্যাচ শেষ হয়ে গেলে বিশ্বের দরবারে মুখ ছোট হতে বাধ্য। ফলত, যা হবার তাই হয়েছে।

কিন্তু, এত কিছুর পরেও, মনের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে দিন কাটাবেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রশ্ন উঠবে, কেন পিচ নিয়ে একটাও কথা বললেন না ম্যাচ রেফারি জাভাগাল শ্রীনাথ? কেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে মাত্র একটি অ্যাঙ্গেল থেকে দেখেই নির্দ্বিধায় নট আউট ঘোষণা করে দিচ্ছিলেন তৃতীয় আম্পায়ার? কেনই বা ভাষ্যকাররা বারবার সাফাই গাইছিলেন, পিচ নয়, যাবতীয় দোষ আসলে দুই দলের ব্যাটসম্যানদের?

আর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে আসনচ্যুত করে মোদীর নামাঙ্কিত স্টেডিয়াম? পাল্টা যুক্তি তো তৈরি আছে; ইতিপূর্বে কে কবে কোথায় একই কাজ করেছেন। ভালো কি খারাপ করেছেন, সেটা কথা নয়। করেছেন তো! তাহলে আমরাই বা সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করব না কেন? মহাজ্ঞানী, মহাজন, যে পথে করে গমন, হয়েছেন চিরস্মরণীয়….

হক কথা। মূল লক্ষ্য তো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকা। তারই হেতু যাবতীয় আয়োজন। শেলীর অজিমানদিয়াস আমাদের পড়ে দেখবার প্রয়োজন নেই।সুতরাং, এই আলোচনায় অধিক অগ্রসর হবার কি দরকার! তবু, হয়ত খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই মনে পড়ে যায় সেই ১৯৬৬ সালে লেখা অশোক মিত্রর একটি প্রবন্ধের কথা। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর একশোটি গল্পের একটি সংকলনের সমালোচনা লিখেছিলেন অশোকবাবু। লেখকের যথেষ্ট প্রশংসা করে শেষকালে লিখেছিলেন, “শুরুতে অচিন্ত্যবাবুর নিজের লেখা মস্ত ভূমিকা, যেটা না থাকলেই ভালো ছিল; পড়ে মনে হয় অন্য লোকের অভাবে নিজেই নিজের তারিফ করতে নেমে পড়েছেন।”

থাক, বাদ দেওয়া যাক এসব পুরনো, অবান্তর কথা। তার চাইতে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় থাকা যাক ৪ঠা মার্চ থেকে নতুন কী ভেল্কি দেখাতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পিচ, তারই জন্য। বাদুড় বলে ওরে ও ভাই সজারু, মোটেরার মাঠে দেখবি একটা মজারু….

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম-মোটেরা ও অন্যান্য ছবি (Wikimedia এবং Twitter থেকে)

Leave a Reply