রামায়ণের পালা শেষে দুটো বাচ্চা ছেলে মঞ্চের পিছনে গিয়ে দেখে সীতা আর রাবণ একসাথে সিগারেট খাচ্ছে। দৃশ্যতই অবাক দুজনের প্রশ্ন শুনে অভিনেতারা তাদের বোঝায়, তারা আসলে সবাই বন্ধু। শুধু রুটিরুজির তাগিদে একে অপরের শত্রু সেজে সকলের সামনে মারামারি করে।

স্রেফ এই একটা দৃশ্যই দোস্তজী ছবিটার হৃদয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রসূন চ্যাটার্জি তাঁর প্রথম ছবিতেই পৌঁছে গেছেন ১৯৯৩ সালের মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে। বাংলাদেশের চেয়ে যেখান থেকে কলকাতার দূরত্ব বেশি। বাবরি ধ্বংস পরবর্তী সময়ে সেই গ্রামে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘ছোট বাবরি মসজিদ’ তৈরির দাবি আর রামায়ণের পালার প্রতিক্রিয়া এবং তার মধ্যে দিয়ে ছোট্ট দুই বন্ধু পলাশ আর সফিকুলের এগিয়ে চলার গল্প দোস্তজী

এই ছবির প্রাণভোমরা আগাগোড়া পলাশ (আশিক শেখ) আর সফিকুলের (আরিফ শেখ) জিম্মায়। তারা সেটাকে একদম শেষ শট পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে। বন্ধুত্বের অভিব্যক্তি, খেলা, ঝগড়া, দ্বিধা আর প্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্যের মধ্যেও দারিদ্র‍্যের আয়রনি দারুণ ফুটিয়ে তুলেছে। ওদের একসাথে স্কুলে যাওয়া এবং এক বেঞ্চে বসা, এক গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া, বচ্চন সাইকেল রিপেয়ারিং শপে অমিতাভ বচ্চনের দিওয়ার ছবির পোজ নকল করার চেষ্টা এবং আড়ি পর্ব দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিশ্বাসই হয় না, এরা পেশাদার অভিনেতা নয়। দুজন শিশুশিল্পীর মধ্যে থেকে এই ধরনের অভিনয় বার করে আনার কৃতিত্ব দোস্তজী পরিচালককে দিতেই হয়। পরিচালক তাঁর মুন্সিয়ানা চিত্রনাট্যেও দেখিয়েছেন। চরিত্রগুলোর স্তরে বন্ধুত্ব, ঝগড়া, আবার গোটা সমাজের প্রেক্ষিতে দুই ধর্মের মানুষের সহাবস্থান আর একটা চাপা সন্দেহের গুমোট বাতাবরণ দেখাতে গিয়েও খেই হারিয়ে ফেলেননি প্রসূন। প্রত্যেকটা দৃশ্য লিরিকাল। তাই প্রায় দুঘন্টার ছবিতে তাল কাটে না কখনোই।

বিশেষ করে বলতে হয় সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন বিশ্বাসের কথা। ওঁর একেকটা শট দেখলে কে বলবে উনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক? রাজপুত্রের সাজে দুই বন্ধুর লড়াই, জোনাকি ধরা, চাঁদের আলো মাখা বিরাট গাছ আর সুবিস্তীর্ণ আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো – এইসব শট মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মত। সত্যিকারের বাংলার গ্রাম দেখাতে পেরেছেন তুহিন। যার পরতে পরতে লেগে রয়েছেন বিভূতিভূষণ আর জসীমউদ্দিন। ছবিটা দেখতে দেখতে মনে পড়বে ছোটবেলায় কল্পনার ক্যামেরায় দেখা ‘তালনবমী’ কিংবা নক্সী কাঁথার মাঠ। কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছা করবে তুহিন বিশ্বাসের ক্যামেরাকে। পরপর বেশ কয়েকটা বাংলা ছবিতে ক্যামেরার কাজে বেশ উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গভীরতায় না হোক, অন্তত টেকনিকাল নৈপুণ্যে বাঙালি টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগায়।

তবে নৈপুণ্য দেখে জেগে ওঠা আশাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় ছবির সামাজিক সংবেদনশীলতার অভাব। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক কারণে ঠোকাঠুকি লাগার প্রবণতা এ দেশে সুপ্রাচীন। পরিচালক সেই ধরনের এক সংঘাতকেই দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাবরি মসজিদ ধ্বংস যেভাবে ভারতের ধর্ম ও রাজনীতিকে গুণগতভাবে আমূল বদলে দিয়েছে তার কোনো উল্লেখ এই ছবিতে নেই। থাকার মধ্যে আছে অপ্রাসঙ্গিক নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা, যা দু পক্ষকেই সমান দোষী ঠাউরায়।

আরো পড়ুন ৮৩: এই দ্বেষের মাঝে বসে ওই দেশের গল্প

তাছাড়া যে কোনো সচেতন দর্শকের চোখে পড়বে হিন্দু এবং মুসলমান চরিত্রগুলোর মধ্যে স্টিরিওটাইপের যথেচ্ছ প্রকাশ। সফিকুল চঞ্চল, ডানপিটেই বলা চলে। এদিকে পলাশ একদম শান্ত। সফিকুল তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলেও পয়সা জমিয়ে মুসলমান বন্ধুর জন্য ঘুড়ি কিনে আনে পলাশই। পলাশের মায়ের সাম্প্রদায়িকতার প্রচ্ছন্ন প্রকাশের পাশে প্রকট হয়ে দাঁড়ায় সফিকুলের বাবার ধর্মীয় উস্কানিমূলক চিৎকার। এই ছবি শান্ত হিন্দু এবং আগ্রাসী মুসলমানের স্টিরিওটাইপকে অজান্তেই দর্শকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এর দায় পুরোপুরি পরিচালকের। এই ত্রুটি এড়াতে পারলে দোস্তজী স্রেফ একটা ভাল ছবি হয়ে না থেকে সময়ের এক অসামান্য দলিলে পরিণত হতে পারত।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.