অনন্য চক্রবর্তী

সমকালীন পরিবেশ সংকট মানুষের সামগ্রিক বিকাশের পথে এক অভূতপূর্ব অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করছে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে বিশ্বের সমস্ত মানুষ সমষ্টিগতভাবে পরিবেশ সংকটে জর্জরিত। পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার ফলে প্রবল উষ্ণায়ন, অকাল বর্ষণ, খরা, দূষিত আবহাওয়া, জমির উর্বরতা হ্রাস পাওয়া, সামুদ্রিক স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি সহ করোনার মত জন্তু থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া জুনোটিক রোগ মানুষের জনজীবনকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। তবে আজকের বিশ্বায়নের যুগে পরিবেশ সংকট সর্বত্র সমান প্রভাব ফেলেনি। কারণ দেখা যাচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশের জনগণ প্রথম বিশ্বের মানুষের তুলনায় বেশি সমস্যার সম্মুখীন। অন্য সব অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের মতই পরিবেশ সংকটের ক্ষেত্রেও প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে শোষণ এবং শোষণ বিরোধিতার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বর্তমান। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ – এই দুই ব্যবস্থার একত্রে কাজ থেকে এ হেন বিশ্ব ব্যবস্থার উৎপত্তি। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, পরিবেশ সংকটের ইতিহাস পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস। খুব সীমিতভাবে এই ইতিহাসের কিছু দিক আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে।

কার্ল মার্কস পুঁজির শোষণমূলক প্রবৃত্তির কথা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, পুঁজিবাদী উৎপাদন ও পুঁজির আহরণ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক বিপাকীয় ফাটল (metabolic rift) সৃষ্টি করে। তাঁর দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী বীক্ষণ থেকে তিনি মনে করতেন, পুঁজিপতিরা মেহনতি মানুষের শোষণ ও প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতিসাধনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত মুনাফা লাভের লক্ষ্যে অবিচল। সেই কারণেই প্রাকৃতিক পুঁজির (natural capital) দখল নেওয়া এবং পণ্যায়ন ঘটানো তাদের আশু কর্তব্য। প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জন বেলামি ফস্টার ও নীল স্মিথের মতে, প্রকৃতিও পুঁজিপতিদের পুঁজি আহরণের ক্ষেত্র (means of accumulation বা accumulation strategy) হয়ে দাঁড়ায়, যা মুনাফার জন্য আবশ্যক। সহজ ভাষায়, অ্যামাজনের অরণ্য অথবা টিলাবনি পাহাড় কর্পোরেটদের কুক্ষিগত হয়ে যাওয়া শুধুমাত্র সরকারের নৈতিক অধঃপতনের নিদর্শন নয়, বরং নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার্থে অতিপ্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড। হাজার হাজার বছর ধরে যে জঙ্গল, জমির ভরসায় মানুষ জীবনযাপন করেছে, সেগুলি নির্মূল করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিপুল ক্ষতি করে। পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রান্তিক মানুষের জীবিকা নষ্ট করা ছাড়া পুঁজিবাদী উৎপাদন কোনোভাবেই সম্ভব নয় – যে কারণে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভি পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বলেন “accumulation by dispossession”। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের বহু ম্যানগ্রোভ কেটে নেওয়ার ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে যাওয়া বা রাজস্থানে পরিবেশ ধ্বংস করা শিল্পায়নের জন্য উষ্ণায়নের কারণে খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত থেকে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনের সমস্যা। এতে শ্রমজীবী মানুষের যে সামান্য আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বা উৎপাদন ক্ষেত্রে যতটুকু স্বয়ংক্রিয়তা অবশিষ্ট থাকে, তা-ও শেষ হয়ে যায়। স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে ‘বিকাশ’-এর নামে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে জঙ্গল, পাহাড় ধ্বংস করে নানা ভারি শিল্প গড়ে উঠেছে। তা শুধুই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করেনি, প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা ও বাসস্থান থেকে তাঁদের উৎখাতও করেছে। গবেষক এম এম সার্নিয়ার ১৯৯৬ সালের তথ্য অনুযায়ী এক একটি বড় নদীবাঁধ প্রকল্প আনুমানিক ১৩,০০০ মানুষকে উৎখাত করে। কিন্তু অনেক গবেষকের মতে, এই সংখ্যা প্রকারান্তরে লক্ষাধিক ছাড়িয়ে যায়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি বা বিশ্বব্যাঙ্কের শুমারিগুলি পরিসংখ্যান ও পদ্ধতিগতভাবে রক্ষণশীল। মার্কসের বিপাকীয় ফাটলের তত্ত্বের আলোয় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়, যে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সীমাহীন শোষণের কারণে শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের প্রকৃতি থেকে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। অমিতাভ ঘোষ বলেন, আধুনিক যুগের আগে মানুষ প্রকৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকার দরুন প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে ভয় পেত, কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদের আগমনে সেই ভয় হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তিনি উদাহরণ দেন ষোড়শ শতাব্দীর জাপানের, যখন সেখানকার মানুষ সুনামির ভয়ে সমুদ্রসৈকতের কাছে বসতি তৈরি করতেন না। কিন্তু সেই জাপানেরই ফুকুশিমাতে ২০১১ সালে সুনামির কারণে ঘটে যায় ভয়াবহ তৈল বিস্ফোরণ এবং সমুদ্রতটের কাছে থাকা অসংখ্য মানুষের মৃত্যু। পুঁজিবাদী আধুনিকতা মানুষকে প্রকৃতির থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে করে তুলেছে অহঙ্কারী।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পুঁজিবাদী উৎপাদনের আলোচনা সাম্রাজ্যবাদের কাঠামোগত আলোচনা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পশ্চিম ইউরোপ থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের হাত ধরে। পর্তুগিজ, স্পেনীয়, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য পথ দখল করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক জেএ হবসন সর্বপ্রথম সাম্রাজ্যবাদ বিশ্লেষণ করে তার অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী দেশগুলিতে অতি-উৎপাদনের কারণে তাদের দেশীয় পণ্য বাজার অর্থনৈতিকভাবে অতি-সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, আর তাই পুঁজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করতে তাদের বিদেশি বাজার খুঁজতে হয়। পুঁজিবাদের অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদনকে সক্রিয় রাখতে এবং মুনাফা বৃদ্ধি করতে তাদের কম মজুরিতে বিপুল শ্রমিক ও পণ্য তৈরির জন্য রসদের প্রয়োজন বাড়তে থাকে। সেই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে বিভিন্ন ইউরোপীয় বাণিজ্য সংস্থা বিশ্বের নানা দেশে উপনিবেশ গঠন করতে থাকে এবং সেইসব দেশের উচ্চশ্রেণির মানুষের সহযোগিতায় মানবিক, অর্থনৈতিক ও পণ্যায়িত প্রাকৃতিক সম্পদ হিংস্রভাবে নিষ্কাশন করতে থাকে। এইসব দেশগুলির নিজস্ব শিল্প ধ্বংস করা হয় আর ইউরোপীয় পণ্য দিয়ে তাদের বাজার ভরিয়ে দেওয়া হয়। রোজা লুক্সেমবার্গ এহেন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করলেন ‘unequal exchange’ এর তত্ত্ব দিয়ে – সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও তার উপনিবেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে তিনি প্রলেতারিয়েতের ওপর বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণের মত দেখলেন। ভ্লাদিমির লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের উচ্চতম পর্যায় বলে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে উপনিবেশ দখলের লড়াই নগ্নভাবে বিশ্বযুদ্ধে উপনীত হয়েছিল। বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ইম্যানুয়েল ওয়ালারস্টাইন তাঁর world systems theory-র মধ্য দিয়ে গোটা পৃথিবীকে ভাগ করলেন দুই ভাগে – মেট্রোপলিস (পশ্চিম ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি) ও পেরিফারি (উপনিবেশগুলি)। মেট্রোপলিস পুঁজিবাদী শোষণের কেন্দ্র, পেরিফারি সেই শোষণের ক্ষেত্র। ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী নিষ্কাশন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন দাদাভাই নওরোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, রজনী পাম দত্ত ও মহাদেব গোবিন্দ রানাডেরা। তাঁদের ‘de-industrialization’ ও ‘drain of wealth’ তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সংসদ তোলপাড় হয়। পরবর্তীকালে মরিস ডি মরিস, অমিয় বাগচী, বিপান চন্দ্র, তীর্থঙ্কর রায়, আদিত্য মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বিষয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে, যা এই রচনায় আলোচ্য নয়। অর্থনীতিবিদ উৎসা পট্টনায়কের গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ব্রিটিশ রাজ ভারতবর্ষ থেকে আনুমানিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত নিষ্কাশন করে। বলা যেতে পারে, এই বিপুল অর্থের সিংহভাগই প্রাকৃতিক সম্পদের স্বত্ব নিরসনের মধ্য দিয়ে অধিকৃত।

মহাত্মা গান্ধী তাঁর হিন্দ স্বরাজ বইটিতে আধুনিক সভ্যতার তীব্র সমালোচনা করেন। ভারতবর্ষের সমস্যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নয়, আধুনিক সভ্যতা – এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গান্ধী সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে আধুনিক পুঁজিবাদী সভ্যতার সঙ্গে জুড়ে দিতে চাইলেন। অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদকে তিনি ভারতের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করলেন। যান্ত্রিক সভ্যতা যে মানবতাবিরোধী এবং মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পরিপন্থী, সেই ধারণা গান্ধীর লেখার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে। একই বক্তব্য পরিস্ফুট হয় রবীন্দ্রনাথের বহু লেখায়। হিন্দ স্বরাজ প্রকাশের একশো বছর পর ঐতিহাসিক প্রসন্নন পার্থসারথী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন উপমা সামনে আনলেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ভারতে শিল্প বিপ্লব না ঘটার কারণ ব্রিটিশ রাজ কৃত ‘deindustrialization’। পার্থসারথী যোগ করলেন, ভারতের জনগণকে হিংস্রভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি সাম্রাজ্য (fossil fuel empire)-এর অধীন হতে বাধ্য করা হয়। ব্রিটিশ শোষণ ও সামগ্রিক দারিদ্র্যের কারণেই ভারতবর্ষকে প্রকৃতি ধ্বংসকারী কয়লার ওপর জ্বালানির জন্য নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। ১৯১০-এর দশকে ব্রিটেনে কয়লা খনির শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলনের জেরে ১৯২০-র দশক থেকে পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল আমদানি শুরু করে ব্রিটেন। শুরু হয় বিশ্ব পরিসরে জ্বালানি হিসাবে তেলের আধিপত্য। কিন্তু, ভারতবর্ষ বহু বছর বঞ্চিত থেকে যায়। ব্রিটিশ সরকার মূলত বন্য অধিকার আইনের মাধ্যমে স্থানীয় বন্য জমি সরকারিভাবে দখল করে। চা, কফি, তুলো, রাবার, পাট, আফিম প্রভৃতি অর্থকরী ফসলের উৎপাদন, বসতি ও রেল স্থাপন ইত্যাদির জন্য ব্যবহার করা হয় এই সকল জমি—বন্য গাছ কেটে বাঁশ, শাল, সেগুনকাঠের ব্যবহারও চলে নানা শিল্পে। প্রকৃতি ধ্বংস ও জীবন, জীবিকা কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে ভারতের প্রায় প্রত্যেক কোণে আদিবাসীরা ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহে গর্জে ওঠেন। হুল বিদ্রোহ, গুডেম-রামপা বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, ভিল বিদ্রোহ, খাসী, গারো, জয়ন্তিয়া বিদ্রোহের মত অসংখ্য লড়াইকে প্রকৃতি বাঁচানোর লড়াই হিসাবেও দেখা যায়।

আরো পড়ুন রবীন্দ্রনাথ পরিবেশ সংরক্ষণের ধ্রুবতারা হতে পারেন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সারা বিশ্বে ভারী শিল্প উৎপাদন, শহরাঞ্চলের লোকসংখ্যা, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের ব্যবহারের মত আর্থসামাজিক সূচকের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি হয়। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায় বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেনের মতো গ্যাস; সামুদ্রিক তাপমাত্রা, জমি দূষণ সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সূচক, যাকে বিজ্ঞানী উইল স্টিফেন আখ্যা দেন Great Acceleration। উপনিবেশগুলি স্বাধীনতা লাভ করে তৃতীয় বিশ্বের ঐক্যসাধনে বদ্ধপরিকর হয় এবং নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ছত্রছায়ায় থাকা ব্রেটন উডস সংস্থাগুলির (বিশ্বব্যাঙ্ক বা ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড) মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালায়। স্বাধীনোত্তর ভারতেও ঔপনিবেশিক পরিবেশ শোষণের ব্যাতিক্রম ঘটেনি। ভারতবর্ষের বিপুল খাদ্য সমস্যা মেটাতে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন সরকার ও আইএমএফ নিদান দিল ল্যাবে তৈরি ‘high yielding’ বীজ রোপণ ও প্রকৃতি ধ্বংস করা রাসায়নিক সার ব্যবহারের। এহেন সবুজ বিপ্লবের জন্য সাময়িকভাবে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কৃষিজমির বিপুল ক্ষতি হয়। বৈজ্ঞানিক বন্দনা শিবার মতে, সবুজ বিপ্লবের দরুন প্রাকৃতিক অবক্ষয়ের কারণে পাঞ্জাবে পরবর্তীকালে জঘন্যতম রাজনৈতিক হিংসা ঘটে এবং অসংখ্য মানুষ ক্যানসারের মত নানা মারণ রোগে আক্রান্ত হন।

নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি রূপায়ণ হওয়ার পরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তীব্রতর হয়েছে, যা বিভিন্ন তথ্য থেকে স্পষ্ট। রাজস্থানে পেপসিকোর ভূমি-গর্ভ জলের বেআইনি নিষ্কাশন, মহারাষ্ট্রে আরে জঙ্গলের কর্পোরেট হস্তান্তর, ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডে বেআইনি বক্সাইট খনন, প্রায় প্রত্যেক রাজ্যে ভারি শিল্পের জন্য জঙ্গল নির্মূল সহ হাজার হাজার প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের ঘটনা মানুষ এবং পশুপাখির সহাবস্থানকে বিঘ্নিত করে। সাম্প্রতিককালে মোদী সরকার সংসদে আলোচনা ছাড়াই ২০২০ সালে Environment Impact Assessment Act পাশ করে, যা কর্পোরেটদের প্রাকৃতিক সম্পদ হরণ করার পথ আরও প্রশস্ত করে। তবে প্রাকৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে সাতের দশক থেকে প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য ভারতবর্ষের বুকে নানা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, অনেক আন্দোলন ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে আজকের দিনেও। প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীবিকা ও বাসস্থান রক্ষা করতে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের সংগঠিত লড়াইয়ের ইতিহাসও সমকালীন পরিবেশ সংকটের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ – এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বর্তমান পরিবেশ সংকট মানুষের ইতিহাস রচনা করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করে। এই সংকটের আলোয় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাস লেখার চেষ্টা করছেন বহু ইতিহাসবিদ। একুশ শতকে প্রথম বিশ্বের বিজ্ঞানী মহলে Anthropocene-এর তত্ত্ব যথেষ্ট আলোড়ন ফেলেছে। অনেকের মতে, মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য পৃথিবীর জলবায়ুর অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা গেছে এবং সমষ্টিগতভাবে মানুষ ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির মত biogeological agent বা জৈব-ভূতাত্ত্বিক শক্তি হয়ে উঠেছে। ফলত, হোলোসিন ভূতাত্ত্বিক যুগ শেষ হয়ে Anthropocene যুগের সূচনা হয়েছে। ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তী জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস রচনা করার ক্ষেত্রে সমস্ত মানুষকে planetary being আখ্যা দিয়ে তাদের সেই পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম হিসাবে তুলে ধরছেন। কিন্তু এই তত্ত্ব আমাদের কিছু মৌলিক রাজনৈতিক সমস্যার সামনে এনে ফেলে।

প্রথমত, Anthropocene-এর প্রতার্কিক কাঠামো প্রথম বিশ্বে কেন্দ্রীভূত, যার জেরে এই তত্ত্ব মানুষের resource consumption-কে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসাবে দেখে, যা আদৌ সত্যি নয়। গত কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডার মত প্রথম বিশ্বের দেশগুলি চীন বা ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশকে সম্পূর্ণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা বন্ধ করতে বলে আসছে। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি, এই সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী নিষ্কাশনের জন্যই আমাদের কয়লার মত শস্তা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়েছে। তাছাড়া প্রাক-ফোর্ডিস্ট শিল্প ব্যবস্থা তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ প্রকৃতি ধ্বংস করা উৎপাদনকারী শিল্পে প্রথম বিশ্বের বিনিয়োগ দেখা যায়। সেই কারণেই তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব দেশ net zero carbon-এর অন্যায্য লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সুবিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশ সংকট আগের আর্থসামাজিক বৈষম্যগুলিকে তীব্রতর করছে। নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের যুগে প্রথম ও তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে বৈপরীত্য দূর হয়নি, বরং বহুগুণ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ সামির আমিনের মতে, পুঁজিবাদী শোষণের আন্তর্জাতিকীকরণের ফলে তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিক-কৃষকরা আরও বেশি দারিদ্র্যের শিকার হয়েছেন। সুতরাং সব মানুষ একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। শ্রমজীবী মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। যেহেতু পরিবেশ সংকটের মূলে রয়েছে পুঁজিবাদী উৎপাদন, তাই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি ও তাদের সহযোগী রাষ্ট্রগুলিকেই এই দুর্যোগের জন্য দায়ী করা সমীচীন। সেইজন্য জেসন মুর, আন্দ্রিয়া মামের মতো মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা বর্তমান ভূতাত্ত্বিক যুগকে Anthropocene এর বদলে Capitalocene আখ্যা দিয়েছেন। Capitalocene ইতিহাসে পুঁজি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শক্তি – পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ও তার বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের শ্রেণি সংগ্রাম এই আখ্যানের উপযাজক।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পংক্তি ধার করে বলতে হয় “ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা”। পরিবেশ সংকট বিভিন্নভাবে প্রান্তিক মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বছর বছর আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন করেও অবক্ষয়ের feedback loop (উত্তর মেরুর বরফ গলে যাওয়া, কোরাল রিফ ধ্বংস হওয়া ইত্যাদি) আমাদের গ্রাস করছে। তাই পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে প্রাকৃতিক অধঃপতনের হিংস্র ইতিহাস চর্চা করা আজকের যুগের ঐতিহাসিকদের আশু কর্তব্য। এই ইতিহাস অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক চলমান সংলাপ। বিশ্বের অগুনতি মুক্তিকামী মানুষই এই সংলাপের ধারক ও বাহক।

নিবন্ধকার সেন্ট স্টিফেন্স কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক। মতামত ব্যক্তিগত

4 মন্তব্য

  1. চমৎকার লাগলো ৷ একটি বাক্যের সঙ্গে কেবল একমত হতে পারলাম না “…যার জেরে এই তত্ত্ব মানুষের resource consumption কে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখে, যা আদৌ সত্যি নয় ৷” – এটা সরাসরি মুর-এর আর্গুমেন্ট থেকে, এবং মুর-এর পাঠ হিসেবে এতে কোন সমস্যা নেই ৷ কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটা সঠিক বক্তব্য নয় ৷ মুর তাঁর সমালোচনায় Capitalocene কে Anthropocene-এর further qualification হিসেবে না দেখিয়ে দুটোর proposition কে বিরোধাত্মক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন ৷ কিন্তু সব মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সমানভাবে দায়ী – এটা মনে হয় anthropocene-এর ভুল ব্যাখ্যা ৷ মুর-ও তাঁর আলোচনায় এটা সোজা assume করে নিয়েছেন, যথাযথ প্রমাণভিত্তি ছাড়াই ৷ ‘শ্রমজীবি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী’ – এ নিয়ে কোন সন্দেহই নেই, Capitalocene নিঃসন্দেহে তাত্ত্বিক, এবং সর্বোপরি ব্যবহারিকভাবে, Anthropocene-এর থেকে বেশি refined, কিন্তু inter-species exploitation এর ভুয়ো গল্প দিয়ে intra-species exploitation কে চাপা দেবার উদ্দেশ্য Anthropocene-এর আছে কি না – এটা তর্কসাপেক্ষ ৷ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দুটো বিরোধাত্মক বটেই, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিরোধাত্মক নয়, ক্রমিক তাত্ত্বিক (বি)নির্মাণ ৷ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে কেন বিরোধাত্মক – সেটা সংক্ষেপে চমৎকার ফুটে উঠলো এই প্রবন্ধে ৷ পুরো লেখাটাই খুব জরুরী এবং খুব ভালো লাগলো ৷

  2. আমার লেখার সঙ্গে engage করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আপনি আলোকপাত করেছেন। আমার একটা ছোট caveat আছে এখানে। আমি দীপেশ চক্রবর্তীর planetary being এর আর্গুমেন্ট থেকে Anthropocene এর এই চরিত্রকে তুলে ধরেছি। কে কতটা planetary, deep history চর্চা করা কিভাবে পরিবেশ সঙ্কটের ইতিহাসের contemporary nature এর ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে, এই নিয়ে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা প্রয়োজন, এবং হচ্ছেও। তবে Anthropocene এর তাত্ত্বিক ধাঁচ Capitalocene এর সম্পূর্ণ বিরোধাত্মক নয়, এটা আমিও মনে করি। Capitalocene এক উন্নত তাত্ত্বিক কাঠামো।

  3. আমার লেখা পড়ে engage করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার একটা ছোট caveat আছে এখানে। আমি দীপেশ চক্রবর্তীর planetary being এর আর্গুমেন্ট থেকে Anthropocene এর এই চরিত্রকে তুলে ধরেছি। কে কতটা planetary, deep history চর্চা করা কিভাবে পরিবেশ সঙ্কটের ইতিহাসের contemporary nature এর ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে, এই নিয়ে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা প্রয়োজন, এবং হচ্ছেও। তবে Anthropocene এর তাত্ত্বিক ধাঁচ Capitalocene এর সম্পূর্ণ বিরোধাত্মক নয়, এটা আমিও মনে করি। Capitalocene সমকালীন পরিবেশ সঙ্কট বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এক উন্নত তাত্ত্বিক কাঠামো।

  4. আমার লেখা পড়ে engage করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার একটা ছোট caveat আছে এখানে। আমি দীপেশ চক্রবর্তীর planetary being এর আর্গুমেন্ট থেকে Anthropocene এর এই চরিত্রকে তুলে ধরেছি। কে কতটা planetary, deep history চর্চা করা কিভাবে পরিবেশ সঙ্কটের ইতিহাসের contemporary nature এর ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে, এই নিয়ে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা প্রয়োজন, এবং হচ্ছেও। তবে Anthropocene এর তাত্ত্বিক ধাঁচ Capitalocene এর সম্পূর্ণ বিরোধাত্মক নয়, এটা আমিও মনে করি। Capitalocene এক উন্নত তাত্ত্বিক কাঠামো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.