১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষ লগ্ন। কয়েক বছর আগের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। গোটা ইউরোপ জুড়ে জার্মানির অপ্রতিহত জয়যাত্রা ধাক্কা খেয়েছে রাশিয়ার মাটিতে। বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া লাল ফৌজ। মস্কো এবং স্ট্যালিনগ্রাডে ঢোকার বেশ কিছুটা আগেই থমকে গিয়েছে নাৎসিরা। জায়গায় জায়গায় সোভিয়েতের ঘেরাও-এর মধ্যেও পড়ছে তারা।

এশিয়ায় অক্ষশক্তির অবস্থা অবশ্য এতটা খারাপ নয়। জাপানের দুর্ধর্ষ আক্রমণের মুখে নাভিশ্বাস উঠছে ব্রিটিশের। একটার পর একটা দ্বীপ দখল করে নিচ্ছে জাপানিরা। তাদের পাখির চোখ ভারত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় এই অংশে ঢুকে পড়তে চাইছে তারা। কিন্তু ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা করতে মরিয়া ব্রিটিশ। একচুল জমিও ছাড়তে রাজি নয় তারা। এটা যে কেবল ব্রিটিশ সিংহের মর্যাদার প্রশ্ন তা তো নয়, সামরিক-রাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের গুরুত্ব অপরিসীম। সব নজর তখন ভারতের পূর্ব সীমান্তের দিকে। বার্মা, পূর্ববঙ্গ, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে টানটান উত্তেজনা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঠিক এইরকম একটা সময়েই রেঙ্গুনে বসবাসকারী ভারতীয়রা লিখে ফেললেন এক মহাকাব্যিক আত্মত্যাগের কাহিনী। তার নেপথ্যে তাঁদের জ্বলন্ত দেশপ্রেম আর সুভাষচন্দ্র বসুর আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব। দেশের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা হয়তো ওই মানুষগুলিকে না দেখলে বোঝা যেত না। স্বাধীনতা দিবসের পবিত্র লগ্নে রেঙ্গুনের এমনই এক ভারতীয় পরিবারের অবদানকে ফিরে দেখব এক নজরে। স্বয়ং সুভাষচন্দ্রও বিস্ময়াভিভূত হয়েছিলেন তাঁদের দেখে। আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্য তাঁদের দানের পরিমাণ চমকে দিয়েছিল খোদ নেতাজিকেও।

চট্টগ্রামের চৌধুরি পরিবার কেবল চট্টগ্রাম নয়, গোটা পূর্ববঙ্গেরই এক সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসাবে পরিচিত। একদিকে বিরাট জমিদারি, অন্যদিকে বিদ্যাচর্চার প্রতি আগ্রহ তাঁদের সুপরিচিত করে তুলেছিল। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া বিপুল সম্পদ আরো বাড়িয়ে তুলেছিলেন তাঁরা। বিনিয়োগ করেছিলেন একাধিক ব্যবসায়। অনঙ্গনাথ চৌধুরি, গগন চৌধুরি, নবীন চৌধুরিদের প্রাচুর্য বাংলার সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বার্মাতেও। গগন চৌধুরির ছেলে নরেন চৌধুরি, বীরেন্দ্রলাল চৌধুরি এবং পরিবারের আর এক শরিক ভূপেন্দ্রলাল চৌধুরির দক্ষতায় রেঙ্গুন এবং সংলগ্ন অঞ্চলে তাঁরা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন। ইরাবতী নদীর বুক চিরে চলত তাঁদের নিজস্ব জাহাজ। ওয়াখিমা ছিল চিকিৎসা সংক্রান্ত বড় ব্যবসা। চৌধুরিদের জাহাজ ব্যবসার রমরমার কথা পাচ্ছি কলকাতা পুরসভার নথিতেও। খিদিরপুর ডকের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল। সব মিলিয়ে যাকে বলে অর্থে, বিত্তে অতি সচ্ছল এক বাঙালি পরিবার।

সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে তেমন যোগ ছিল না চৌধুরিদের। চট্টগ্রাম শহরে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে যে ঐতিহাসিক যুব বিদ্রোহ হয়েছিল, তা-ও তাঁদের খুব স্পর্শ করেনি। যদিও কলকাতা পুলিশের পুরনো দস্তাবেজ অনুযায়ী, সূর্য সেনের প্রতি সহানুভূতিশীল যে ১১০টি বাঙালি সচ্ছল পরিবারের নাম রয়েছে, তার একটি চৌধুরি পরিবার। মজার বিষয় হল, এই পরিবারগুলির মধ্যে একাধিক রায়বাহাদুরের পরিবারও রয়েছে। তবে মোটের উপর বলা যায়, চৌধুরিরা রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বেশ কিছুটা দূরেই অবস্থান করতেন।

অবস্থাটা একেবারে বদলে গেল ১৯৪৩ সাল নাগাদ। সুভাষচন্দ্র বসু পা রাখলেন রেঙ্গুনে। তাঁর উদাত্ত ভাষণ শুনতে ভেঙে পড়লেন রেঙ্গুনবাসী ভারতীয়রা। নেতাজি আহ্বান জানালেন, যার যা কিছু সম্বল, সব তাঁর হাতে তুলে দিন ভারতীয়রা। সঙ্গে রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া সেই রণধ্বনি “চলো দিল্লি, দিল্লি চলো”। সত্যিই রক্তে আগুনের বান ডেকেছিল রেঙ্গুনে বসবাসরত ভারতীয়দের। সুভাষচন্দ্রের আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং অসামান্য বাগ্মিতা তাঁদের নতুন করে খুঁজতে শিখিয়েছিল জীবনের অর্থ। বিত্তবান, বিত্তহীন, মধ্যবিত্ত, এমনকি পথের ভিক্ষুকও এগিয়ে এসেছিলেন আইএনএ তহবিলে সাহায্য করতে চেয়ে। যে যা পারছেন, যতটুকু পারছেন ঢেলে দিচ্ছেন দেশমাতৃকার পায়ে। সুভাষচন্দ্রের গলায় পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুষ্পমাল্য। সেই মালা নিলাম হচ্ছে বিপুল অঙ্কে, ফুলে উঠছে আইএনএ তহবিল। এমনকি পথের বৃদ্ধা ভিক্ষুণীও তাঁর সম্বল পাঁচ টাকা নিয়ে হাজির হলেন। দেশমাতৃকার চরণে সে-ই তাঁর দান। সুভাষচন্দ্র নিজ হাতে গ্রহণ করলেন সেই পাঁচ টাকা। হিন্দু, মুসলিম, ক্রিশ্চান নির্বিশেষে দলে দলে ভারতবাসীরা এগিয়ে এসেছিলেন সেদিন। অনেক স্বামী নিজে যোগ দিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজে, স্ত্রী নাম লিখিয়েছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের ঝাঁসির রানি বাহিনীতে, সন্তানদের তুলে দিয়েছেন শিশু-কিশোর বাহিনীর হাতে। এই আশ্চর্য গণজাগরণের আঁচ এসে লাগল চৌধুরি পরিবারেও।

রেঙ্গুনে সেদিন এক সভায় বক্তৃতা করছেন সুভাষচন্দ্র, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রী দেবনাথ দাস। অন্য দিনের মতো সেদিনও সুভাষচন্দ্র আহ্বান জানাচ্ছেন আইএনএ তহবিলে যথাসাধ্য সাহায্য করার জন্য। ধীর পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলেন নরেন চৌধুরি, বীরেন্দ্রলাল চৌধুরি, ভূপেন্দ্রলাল চৌধুরি, জ্যোৎস্না চৌধুরিরা। তাঁরা আইএনএ তহবিলে তুলে দিলেন তিল তিল করে জমানো, তাঁদের কষ্টার্জিত বিপুল সম্পদ। দেবনাথ দাস স্বাধীনতার পরে বলেছেন, ধনসম্পদ, সোনা দানা মিলিয়ে সেই বিপুল সম্পত্তির মূল্য ছিল ৪৮ লক্ষ টাকারও বেশি! ১৯৪৩ সালের ৪৮ লক্ষ টাকা! থমকে দাঁড়ালেন সুভাষচন্দ্র। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন চৌধুরিদের দিকে৷ তারপর দেবনাথ দাসকে বললেন, “ওঁদের বলো সন্তানসন্ততিদের জন্য কিছু অর্থ রাখতে..”। মাথা নাড়লেন চৌধুরি পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা যা করেছেন, ভেবেচিন্তেই করেছেন। দেশমাতৃকার পায়ে নিজেদের সাধ্য উজাড় করে দিতেই এসেছেন। তাঁদের দৃঢ়তা দেখে আর না করলেন না সুভাষচন্দ্র।

চৌধুরি পরিবারের এখনকার প্রজন্ম গর্ব করেন এই স্মৃতি নিয়ে। তাঁরা নিজের চোখে হয়তো দেখেননি সেই দ্রোহকাল, কিন্তু ছোট থেকে বৃদ্ধ হয়েছেন স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করা প্রজন্মের গল্প শুনে। চৌধুরি পরিবারের সদস্যা কাজলী ঘোষকে প্রশ্ন করা গেল, এই বিপুল সম্পদ যে স্বপ্নের জন্য আইএনএ-র হাতে তুলে দেওয়া হল, তা তো শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। আজাদ হিন্দ ফৌজ দিল্লি পৌঁছতে পারেনি। সামরিক দিক থেকে দেখলে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন সুভাষচন্দ্র। এই নিয়ে পরিবারের অন্দরে কোনো আক্ষেপের সুর শোনেননি কখনো? কারো মনে হয়নি আসলে অপচয় হল এই কষ্টার্জিত বিপুল সম্পদ? কাজলী বলেন, “প্রশ্নই ওঠে না। এমন করে আমাদের পূর্বজরা বিষয়টিকে দেখেননি। তাঁরা সুভাষচন্দ্রের স্বপ্নের শরিক হতে চেয়েছিলেন। রেঙ্গুনের আরো অনেকের মত তাঁরাই ভারতের মুক্তির জন্য সাধ্যমত কিছু অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। জেতা বা হারার চেয়ে অনেক বড় ছিল সেই স্বপ্নটা।”

প্রায় একইরকম কথা বললেন পরিবারের আর এক প্রবীণ সদস্যা কৃষ্ণা দেববর্মন। তাঁর কথায়, “সে ছিল একটা অন্যরকমের সময়। ভারত স্বাধীন হবে, মাতৃভূমির ২০০ বছরের শৃঙ্খল ঘুচবে, এই আবেগের সামনে সবকিছু তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। সর্বোপরি সুভাষচন্দ্র বসুর আহ্বান! তার তীব্রতা উপেক্ষা করা ছিল অসম্ভব। ওঁরা যুদ্ধে জেতেননি, কিন্তু নতুন ইতিহাস তৈরি করেছিলেন।”

হাজার হাজার ভারতীয় তিল তিল করে জমানো সম্পদ দিয়ে সাজিয়ে তুলেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজকে। মরণজয়ী সংগ্রাম করেছিল সেই বাহিনী। যুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজ জিততে পারেনি ঠিকই, কিন্তু এমন অসংখ্য গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগের গাথা রচনা করেছিলেন রেঙ্গুনের ভারতীয়রা। আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং বার্মার বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন সুকান্ত পাত্র। তিনি বলেন, “রেঙ্গুনের ভারতীয়রা দেশের জন্য ওই ছোট কালপর্বে যা করেছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। ১৯৪৩ সালের ৪৮ লক্ষ টাকার মূল্য একটি পরিবারের কাছে আজকের দিনে কী হতে পারে তা ভাবাই দুঃসাধ্য। তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, স্বাধীনতা ও দেশভাগ পরবর্তী কালে বার্মা থেকে ক্রমশ বাঙালিরা সরতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ ওই দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিলেন বাঙালিরা। বার্মার কমিউনিস্ট আন্দোলনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন হরিনারায়ণ ঘোষাল, অমর নাগ, সুবোধ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষরা। সেই ইতিহাস গণপরিসরে তেমন চর্চায় আসে না।”

চৌধুরি পরিবারও বার্মায় বেশিদিন থাকেননি। ১৯৫৫ সালে যখন ভারত সফরে আসেন সোভিয়েত নেতা ক্রুশ্চেভ এবং বুলগানিন, তখনই তাঁরাও চলে আসেন ভারতে। তারপরেও কয়েকজন ছিলেন। কিন্তু আগের মতো করে নয়। তাঁদের ফার্মেসির ব্যবসা, বসতবাটি ছিল যে অঞ্চলে, এখনও তার হদিশ দেয় গুগল ম্যাপ। সবকিছুই আছে, কিন্তু আগের মতো করে নয়। চৌধুরি পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও ইরাবতী নদীতে স্টিমার চড়ার স্মৃতি। এক অন্যরকম জনপদ, যেখানে তাঁদের মতোই অসংখ্য ভারতীয় সংসার পেতেছিলেন। এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বময় দেশনায়ক নিজের আবেগ আর দেশপ্রেম দিয়ে উদ্বেল করে তুলেছিলেন সেই জনপদের মানুষগুলোকে। যাঁর ডাকে এক কথায় প্রায় অর্ধ কোটি টাকার পারিবারিক সম্পদ তুলে দিতে দুবার ভাবেননি তাঁরা।

নেতাজি ভবনে সংরক্ষিত চৌধুরী পরিবারের আত্মত্যাগের ইতিহাস

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণ উপলক্ষে নাগরিক ডট নেটের বিশেষ সংখ্যার লেখাগুলো (স্বাধীনতা ৭৫):

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.