~দীপক পাত্র~

দেখতে দেখতে স্বাধীনতার ৭৫ বছর হতে চলেছে, যা আগামী এক বছর ধরে সাড়ম্বরে পালিত হবে। দেশের নেতা মন্ত্রীগণ বর্ণোজ্জ্বল ১৫ই আগস্ট পালন করবেন। তোপধ্বনি করবেন, উন্নয়নের ফিরিস্তি দেবেন, উড়বে জাতীয় পতাকা। আর সেই মুহূর্তে দেশে অনাহারে মৃত্যু মিছিল চলবে। কৃষক-বেকার যুবক আত্মঘাতী হবেন। ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি! শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি — সবকিছুর উপর জনসাধারণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিল? না, ছিল না।

পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে কে আগে প্রাণ দেবে বাংলায় তা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। মেদিনীপুরেও ব্যতিক্রম হয়নি। শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুর জেলা স্কুল (বর্তমানে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল)-এর প্রধান শিক্ষকতার দায়িত্ব নিলেন ১৮৫১ সালে। তখন নবজাগরণের আলো জ্বালাচ্ছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নতুন মানুষ তৈরির সর্বাত্মক উদ্যোগ চলছে, একটার পর একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। সেই কর্মযজ্ঞে রাজনারায়ণ নিজের ভূমিকা পালন করতে শুরু করলেন। ব্রাহ্ম সমাজের কর্মকাণ্ডও শুরু করলেন। এই পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠছিলেন রাজনারায়ণের ভাই তথা শিক্ষক অভয়চরণ বসুর পুত্র জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং জামাই প্যারীলাল ঘোষ। ১৯০২ সালে নিবেদিতার আহ্বানে বরোদা থেকে বাংলায় আসেন অরবিন্দ ঘোষ। কলকাতায় অরবিন্দ তাঁর ভাই বারীন ঘোষ, যতীন্দ্রনাথ প্রমুখকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন গুপ্ত সমিতি। মেদিনীপুরে এলেন। তিনি রাজনারায়ণ বসুর দৌহিত্র। দুই মামা জ্ঞানেন্দ্র ও সত্যেন্দ্রকে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা হল। ইতিমধ্যেই কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক জ্ঞানেন্দ্রনাথ ও অন্য শিক্ষক তথা প্রখ্যাত চিত্রকর হেমচন্দ্র দাস কানুনগো তাঁদের দেশপ্রেমিক কার্যকলাপ শুরু করেছিলেন। অরবিন্দ এসে জ্ঞানেন্দ্র-হেমচন্দ্র এবং বয়ঃকনিষ্ঠ সত্যেনকে নিয়ে মেদিনীপুরেও গুপ্ত সমিতি গড়ে তুললেন। পরের বছর ১৯০৩ সালে মেদিনীপুরে এলেন স্বয়ং নিবেদিতা, হল সভা। বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ায় মেদিনীপুরে এভাবেই গড়ে উঠল বিপ্লবী ধারা। উনবিংশ শতাব্দীর বিদ্যাসাগর-রাজনারায়ণের তৈরি জমিতে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য কৈশোর, যৌবন উদ্বেল হয়ে উঠল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ছাত্র ও যুবকদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন সত্যেন। শরীরচর্চা ও খেলাধুলোর মাধ্যমে এই কাজ করতে গড়ে তুললেন:

১) ডায়মন্ড স্পোটিং ক্লাব

২) চিড়িমারসাই পল্লী সমিতি

৩) বড়বাজার সন্তান সমিতি

৪) মীর বাজার বসন্ত মালতী আখড়া প্রভৃতি সংগঠন। পেলেন ক্ষুদিরাম সহ একদল তরুণকে, বিপ্লবী আন্দোলনে গতি সঞ্চার হল। ১৯০৫ সালে মেদিনীপুর, কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন জায়গার বিপ্লবীদের কার্যকলাপে আতঙ্কিত হল ব্রিটিশ শাসক। কার্জন বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করতেই আগুনে ঘি পড়ল। সাতই আগস্ট কলকাতার টাউন হলে সভা হল, মেদিনীপুরেও বিশাল সভা হল। তার আগে ৫ই আগস্ট সাতকড়ি রায়ের সভাপতিত্বে গঠিত হয়েছে ছাত্র সভা। মেদিনীপুর শহর সহ দিকে দিকে ‘ছাত্র সভা’ গঠিত হতে থাকল, কলকাতায় বিদেশী পণ্য বয়কটের কথা ঘোষণা হল। দশই অক্টোবর কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার জারি হল। কিন্তু ছাত্ররা তাতে দমে না গিয়ে গড়ে তুলল অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি। ষোলই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ সরকারী আদেশে পরিণত হলে প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ক্ষুদিরাম-সত্যেনের নেতৃত্বে মেদিনীপুরে বয়কট আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। সোনার বাংলা বিলি করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। জেল থেকে মুক্ত হলে হাজার হাজার শহরবাসী ক্ষুদিরামকে ফিটন গাড়িতে তুলে বন্দেমাতরম বলতে বলতে শহর পরিক্রমা করে। কাঁথি, তমলুক সহ সর্বত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উত্তাল হতে থাকে মেদিনীপুর।

দামাল জেলাটাকে স্তব্ধ করতে কার্জনের পরামর্শদাতা ফ্রেজার মেদিনীপুরকেও বিভক্তি করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করেন। উচিৎ শিক্ষা দিতে বিপ্লবীরা ফ্রেজারকে চরম শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফ্রেজারের ট্রেনের পথে, ৬ই ডিসেম্বর ১৯০৭, নারায়ণগড়ের কাছে রেললাইনের নিচে রাখা হয় কলকাতার উল্লাসকর দত্তের তৈরি বোমা। বিস্ফোরণ হলেও অল্পের জন্য ফ্রেজার রক্ষা পান। পরদিন মেদিনীপুরের বেইলি হলে (বর্তমানে রাজনারায়ণ স্মৃতি পাঠাগার) রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে আপোষকামী নেতারা এই দুর্বার আন্দোলনের রাশ টানতে চাইলেন। সম্মেলন ভেস্তে গেলে ৮ই ডিসেম্বর মেদিনীপুর টাউন স্কুলের সামনে সত্যেন্দ্রনাথ বিপ্লবী ধারার কর্তব্য ঠিক করার জন্য সভা করেন।

ঠিক হয় বিপ্লবী আদর্শ প্রচার করা হবে। সংগঠকের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ক্ষুদিরাম বেরিয়ে পড়েন। জেলা জুড়ে চলতে থাকে গুপ্ত সমিতি গঠন। তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের লাঠি খেলা শেখাতে থাকেন। এভাবেই ক্ষুদিরাম ওড়িশার কটক পর্যন্ত যান। এদিকে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল বাংলার সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে কিংসফোর্ডের ভূমিকার সমুচিত জবাব দিতে চান বারীন-সত্যেন-জ্ঞানেন্দ্র-হেমচন্দ্ররা। একদিন যে কিশোর হেমচন্দে্রর সাইকেল আটকে পুলিস মারার জন্য বন্দুক চেয়েছিল, প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে সেই ক্ষুদিরামকেই কিংসফোর্ড নিধনের দায়িত্ব দেওয়া হল। ৩০শে এপ্রিল ১৯০৮ মজফফরপুরের বোমার শব্দ শুধু এদেশের ব্রিটিশ শাসকদের নয়, খোদ লন্ডনকেও কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই বোমা তৈরির কলাকৌশল শেখার জন্য শিল্পকলা শেখার অছিলায় হেমচন্দ্র পাড়ি দিয়েছিলেন প্যারিসে। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিরে এসে কলকাতায় উল্লাসকরদের নিয়ে তিনি তৈরি করলেন সেই বোমা।

পয়লা মে কলকাতায় শুরু হল ব্যাপক তল্লাসি, মেদিনীপুরে হল ৩রা মে। ঐতিহাসিক বোমা মামলায় অরবিন্দ, বারিন, উল্লাসকর থেকে হেমচন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্র, সত্যেন — একে একে সকলকে কারারুদ্ধ করল পুলিস। মেদিনীপুর শহরে বাড়িতে বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ চলল। বিশেষত সত্যেন্দ্র, জ্ঞানেন্দ্রের গোলকুয়া চকের বাড়িতে।

প্রায়শই এই বাড়িতে রেডের নামে বীভৎস হাঙ্গামা করত পুলিস। একবার বাড়ির সবাইকে বেঁধে চলছে চিরুনি তল্লাসি। তোষক, বালিশ থেকে চালের বস্তা পুলিস ফালাফালা করে দিচ্ছে কিছু নথি পাওয়ার আশায়। কিন্তু মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে ‘বন্দেমাতরম’, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ ধ্বনি। কার এত স্পর্ধা? চলল নির্মম অত্যাচার, তবু ধ্বনি বন্ধ হয় না। একজন দারোগার নজরে এল বাড়ির পোষা টিয়াপাখি স্লোগান দিচ্ছে। সত্যেন্দ্রনাথের এক ভাই পক্ষীপ্রেমী ছিলেন। ক্ষিপ্ত ব্রিটিশ দারোগা পাখি মারতে উদ্যত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত জেলাশাসকের নির্দেশে পাখিটিকে কোর্টে চালান দেওয়া হয়। এমনই ছিল সেদিনের মেদিনীপুর।

ক্ষুদিরামের কেসের রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইকে জেলের ভিতরে হত্যা করে ছিলেন সত্যেন ও হুগলী জেলার কানাইলাল দত্ত। ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয় ১১ই আগস্ট ১৯০৮, আর ২১শে নভেম্বর ফাঁসি হয় তাঁর গুরু সত্যেন্দ্রনাথের। পরিতাপের বিষয় ক্ষুদিরামের আত্মোৎসর্গের শতবর্ষে এই বাংলার এক প্রথম শ্রেণির দৈনিকে লেখা হয়েছিল, নেতারা নাকি ‘বোকা’ ক্ষুদিরামকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বোমা হাতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা বহাল তবিয়তে ছিলেন। অথচ শিষ্যের চরিত্রের প্রতি কি অসীম শ্রদ্ধাবোধ থাকলে “জেলের ভিতরে রিভলভার কোথায় পেলেন?”জিজ্ঞাসা করা হলে গুরু সত্যেন বলতে পারেন “ক্ষুদিরামের আত্মা আমাকে দিয়েছে”!

ক্ষুদিরামের নেতারা হয় শহীদের মৃত্যু বরণ করেছেন, অথবা কারাবাস করেছেন। বোমার মামলায় ১৫৪ জনের বিরুদ্ধে পুলিস অভিযোগ দায়ের করেছিল। এদের মধ্যে রাজা নরেন্দ্রলাল খান সহ ২৫ জনের বিচার হল। পুলিশের ধারাবাহিক বেপরোয়া আগ্রাসনে বিপ্লবী সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হল। বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে মেদিনীপুরে যে আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তা সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও পরে আবার জ্বলে ওঠে।

১৯২৭ সালে দীনেশ গুপ্তকে মেদিনীপুরে পাঠালেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। তিনি ভর্তি হলেন মেদিনীপুর কলেজে। তরুণ আইনজীবী দাদার বাসায় উঠলেন বিভির শাখা গঠনের উদ্দেশ্যে। একজন যোগ্য সংগঠকের অভাবে যে ছাত্র, যুবকেরা সংগঠিত হতে পারছিল না, তা বিমল দাশগুপ্তের কথায় জানা যায়।

“ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ, চরিত্র, বলিষ্ঠতা আমাদের শিশুমনে গভীর দাগ কেটেছিল। ইংরেজের প্রতি প্রবল ঘৃণা হত। … শৈশবে আমরা শুনেছি সত্যেন বোসের বহু কাহিনী, অরবিন্দের আগমন বিপ্লবী দল গঠন… এমন সময় পেলাম দীনেশদাকে… দীনেশদার যাদুস্পর্শে আমি, অমর চট্টোপাধ্যায়, ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, অনাথবন্ধু পাঁজা, রামকৃষ্ণ রায়, যতিজীবন ঘোষ, প্রভাংশু পাল, নরেশ দাস, ক্ষিতিপ্রসাদ সেন, ফণী দাস, বিনোদবিহারী সেন দীনেশদার দলের সঙ্গে যুক্ত হলাম।” গড়ে উঠল বিভির মেদিনীপুর শাখা। ১৯২৯ সালে সুভাষচন্দ্র মেদিনীপুরে আসেন। দীনেশের হাতে তৈরি বিভির সদস্যরা মিলিত সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মিলিত হন। এইসব ছেলেদের তিনি প্রশ্ন করেন “দেশের জন্য তোমরা তোমাদের রক্ত দিতে প্রস্তুত?” এই প্রশ্ন বিমল দাশগুপ্তদের রক্তে তুফান তোলে।

লবণ আইন অমান্য ও ছাত্র ধর্মঘটে অত্যাচারী পেডিকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৩১ এর ১০ই ফেব্রুয়ারি কাঁসাইয়ের তীরে দীনেশের স্থলাভিষিক্ত শশাঙ্ক দাসগুপ্ত, বিমল দাশগুপ্ত, ফণী কুণ্ডু, যতিজীবন ঘোষ মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেন। ২৩শে মার্চ ভগৎ সিংয়ের আত্মবলিদানে দেশ উত্তাল হয় আর তার ১৫ দিনের মধ্যেই, ৭ই এপ্রিল জেলাশাসক পেডিকে হত্যা করা হয়। রাজনারায়ণ, জগেন্দ্র, হেমচন্দ্র, সত্যেন, ক্ষুদিরামের স্মৃতি বিজড়িত মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের একটি ঘরে গর্জে ওঠে বিমল, যতিজীবনের রিভলভার। মুখে পটাশিয়াম সায়ানাইডের অ্যাম্পল নিয়ে ধরা না দিয়ে জীবন সাঙ্গ করার পরিকল্পনা থাকলেও, পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় লাফ দিয়ে এক সাইকেল আরোহীর সাইকেল ছোঁ মেরে নিয়ে দুজনে জঙ্গলের পথে শালবনী স্টেশনে পৌঁছান। সেখান থেকে ট্রেনে দুজন দুই গন্তব্যে। বিমল কলকাতার বিপ্লবী নেতা রাজেন গুহর বাড়িতে থেকে কয়েকদিন পর মেদিনীপুরে বাড়ি ফেরেন। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে পুলিস হানা দেয়। কবিরাজ বাবা অক্ষয় দাশগুপ্তের উপস্থিত বুদ্ধিতে তারা বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে যায়। সেই রাতেই সত্যেন বসুর ভাই কেতন বসুর উদ্যোগে রঘু গোয়ালার সঙ্গে তার ছেলে সেজে কলকাতায় চলে যান। কয়েক মাসের মধ্যেই আর একটি অ্যাকশনে ভিলিয়ার্সকে হত্যা করতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং নৃশংস অত্যাচার সহ্য করতে হয়।

পুলিস জানত বিমল নিহত, কারণ এর মধ্যে বিমলদের নেতা তথা অলিন্দ যুদ্ধের নায়ক দীনেশকে ফাঁসি দেওয়া গার্লিককে হত্যা করে ঘটনাস্থলেই আত্মবলিদান করেছেন এক কিশোর। তার পকেট থেকে পাওয়া গিয়েছিল একটা চিরকুট: “ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তকে অবিচারের ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও – বিমল গুপ্ত”। আসলে ওই কিশোর ছিলেন জয়নগরের কানাইলাল ভট্টাচার্য। পুলিসকে বিভ্রান্ত করতেই কানাইয়ের এই পরিকল্পনা।

লালবাজারে নৃশংস অত্যাচার চালিয়েও ধৃত বিমলের মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি পুলিস। ক্ষিপ্ত পুলিস বিমলকে নিয়ে কার্যত ফুটবল খেলেছে লনে, মারা গেছে ভেবে ফেলে রেখেছে। বাবা ছেলের থেঁতলানো মুখ ও রক্তমাখা শরীর দেখে চিনতে পারেননি। পরবর্তীকালে বিমল বলতেন “এ শক্তি পেয়েছিলাম রাজেন গুহ ও বাবার কাছ থেকে।”

পুলিসকে বিভ্রান্ত করে ফেরত পাঠানোর পর এই আপাত নিরীহ গান্ধীবাদী মানুষটি ছেলেকে বলেছিলেন “তুমি যা করেছে তা বিচারের ঊর্ধ্বে। ফলাফল কী হতে পারে তোমার অজ্ঞাত নয়…. এইটুকু তোমাকে অনুরোধ করব যে, তুমি যদি জীবিত ধরা পড়ো, তাহলে এমন কিছু কোরো না যাতে বন্ধুদের ক্ষতি হয়।” স্বাধীন ভারতে বিমল বেঁচে ছিলেন জীবন্ত শহীদ হিসাবে, অনাদরে, অবহেলায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে। ২০০০ সালের ৩রা মার্চ প্রয়াত হন।

শোষণমুক্ত স্বাধীন ভারতের অপূর্ণ স্বপ্ন বহন করেছেন বলিষ্ঠভাবে। মেদিনীপুর কলেজের গেটে চা, জলখাবারের দোকান খুলে সেখানে ছাত্র-যুবদের সমাজ বিপ্লবের পাঠ দিতেন। সমস্ত প্রলোভন ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। নতুন উদ্যমে সভা, সমিতি করতে বৃদ্ধ বয়সেও সারা বাংলা ছুটে বেড়িয়েছেন। সর্বত্রই গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করতেন “আমি বিশ্বাস করি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবেই, সেদিন আমি হয়ত থাকব না।”

পেডি হত্যার পর পুলিস হত্যাকারীকে না ধরতে পেরে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে পড়ে। গোটা মেদিনীপুর শহরে ব্যাপক অত্যাচার চলে বিশেষ করে ছাত্র-যুবদের উপর। হিন্দু স্কুলের ছাত্র প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য মাধ্যমিক পাশ করে মেদিনীপুর কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সেইসময় তিনি সরাসরি গুপ্ত সমিতিতে যুক্ত হন। ইতিপূর্বে তিনি ক্ষুদিরামের দিদি অপরূপা দেবীর কাছে যেতেন এবং ক্ষুদিরাম, সত্যেনের বীরগাথা শুনে নিজেকে তৈরি করছিলেন। পেডির উত্তরসূরী জেলাশাসক ডগলাস পুলিসি দিয়ে অত্যাচারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। যদিও ভয়ে পেডির মতো প্রকাশ্যে চাবুক হাতে ছাত্র পেটাতে বেরোতেন না। ডগলাসের অত্যাচারের চরমে উঠল ১৬ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩১, হিজলি জেলে। রাজবন্দিরা তখন সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের জন্ম দিন পালনের আয়োজন করছিলেন। রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বন্দীদের হত্যা করল পুলিস। সন্তোষ মিত্র ও তারকেশ্বর সেন শহীদের মৃত্যু বরণ করলেন, অসংখ্য রাজবন্দি আহত হলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের হাত পা কেটে বাদ দিতে হল।

উদ্বেল হল সারা দেশ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি। কবির সভাপতিত্বে বিশাল প্রতিবাদ সভা মথিত হলে প্রশ্নে “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো / তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?”

বিপ্লবীরা ডগলাসকে চরম শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দায়িত্ব নিলেন প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য ও প্রভাংশু পাল। বেশ কয়েকবার প্রয়াস সফল না হওয়ার পর এক সভায় কড়া প্রহরার মধ্যে সাহেবি পোশাকে দুই কিশোর ঘরে ঢুকলেন, পুলিস বুঝতেই পারল না। দিনটা ছিল ৩০শে এপ্রিল ১৯৩২। ডগলাসকে খতম করে পাঁচিল টপকে ছুটলেন দুজনে। শেষ মুহূর্তে রিভলভার কাজ না করায় প্রদ্যোৎ ধরা পড়েন। তাঁর পকেট থেকে বেরোয় দুটো চিরকুট। একটায় লাল কালিতে লেখা “হিজলী অত্যাচারের ক্ষীণ প্রতিবাদ। ইহাদের মরণেতে ব্রিটেন জানুক, আমাদের আহুতিতে ভারত জাগুক।” অন্যটায় ‘আমাদের প্রাথমিক পাটিগণিত’ শীর্ষক ছাপা ইশতেহার।

কোতোয়ালী থানায় চলে বীভৎস অত্যাচার। প্রদ্যোতের ভাইদেরও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিপ্লবী সহযোগী ফণীন্দ্রচন্দ্র দাস কে ক্ষত বিক্ষত করা হয়। তিনি ছিলেন ক্ষুদিরামের সহকর্মী যতীন্দ্রনাথ দাসের সন্তান। যতীন্দ্রনাথ, নরেন্দ্রনাথ দাস সহ ৩২ জন ছাত্র যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিস। মেদিনীপুরে সেন্ট্রাল জেলে ১২ই জানুয়ারি ১৯৩৩ প্রদ্যোতের ফাঁসি হয়।

পর পর দু বছর এপ্রিলে জেলাশাসক নিধনের ফলে ব্রিটিশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের ঘটনাও ঘটেছিল এই এপ্রিলে। কথিত আছে ব্রিটেনেও নাকি মায়েরা তাদের শিশু সন্তানদের বিভির ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াত।

এর পর জেলাশাসক হয়ে আসেন বার্জ। তিনি শহরে চালু করেন কার্ড নীতি। তিন রঙের কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ, বাড়ি ও এলাকায় প্রত্যেক ছাত্রের খোঁজখবর নিয়ে গতিবিধির উপর নজরদারি চালিয়ে প্রত্যেকের বায়োডাটা তৈরি করে বার্জের পুলিস। সেই মত দেওয়া হয় সাদা, নীল ও লাল রঙের কার্ড। সর্বদা ছাত্রদের তা পকেটে নিয়ে ঘুরতে হত। সাদা অর্থাৎ সন্দেহমুক্ত, নীল অর্থাৎ সন্দেহভাজন এবং লাল অর্থাৎ সাংঘাতিক। এদের প্রতি মূহূর্তে পুলিশি জেরার সম্মুখীন হতে হত। ছাত্র-যুবদের সাইকেল চড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়। মেদিনীপুরকে শায়েস্তা করতে বার্জ উঠে পড়ে লাগেন। চতুর্দিকে রক্তগঙ্গা। আতঙ্কের এপ্রিল মাস অতিক্রান্ত হলে বার্জ সহ ব্রিটিশ রাজ আশ্বস্ত হয় বিপ্লবীরা ছত্রভঙ্গ হয়েছে ভেবে।

২রা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ মেদিনীপুর পুলিস লাইনের মাঠে সতর্ক প্রহরার মধ্যে ফুটবল খেলা শুরু করলেন বার্জ। গোলপোস্টের দুদিক থেকে ১৬-১৭ বছরের দুই কিশোর অনাথ বন্ধু পাঁজা ও মৃগেন দত্ত বার্জকে লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে ছুটলেন। আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে সান্ত্রীরাও তাদের গুলি করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়া বার্জের বুকে অনাথ তখনও গুলি চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপর তিনিও লুটিয়ে পড়েন। পরদিন হাসপাতালে শহীদের মৃত্যুবরণ করলেন মৃগেন দত্ত।

শুরু হল ধরপাকড়। ওই রাতেই ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ রায়, নির্মলজীবন ঘোষ সহ ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। পরে সনাতন রায়, কামাক্ষা ঘোষ সহ আরো ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারে ব্রজকিশোর, রামকৃষ্ণ ও নির্মলজীবনের ফাঁসির আদেশ হয়। ১৯৩৪ সালের ২১শে অক্টোবর ব্রজকিশোর ও রামকৃষ্ণ এবং ২২শে অক্টোবর নির্মলজীবনের ফাঁসি হয়। সনাতন, কামাক্ষা, নন্দদুলাল সিংহ এবং সুকুমার সেনের হয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর।

কলকাতার নরেন গোঁসাইয়ের মত বিশ্বাসঘাতকের তালিকায় মেদিনীপুরে নাম লেখালেন শৈলেন ঘোষ। রাজসাক্ষী হয়ে তিনি মেদিনীপুরের গুপ্ত সমিতির ইতিবৃত্ত পুলিশের কাছে ফাঁস করেন। শান্তিগোপাল সেন বহু দিন নিরুদ্দেশ থাকার পর পুলিশের জালে ধরা পড়েন। তাঁরও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়।

দীনেশ গুপ্তের হাত ধরে মেদিনীপুরে বিভির যে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠেছিল, তাঁর পরে সেই দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে শশাঙ্ক দাসগুপ্ত (কমেটদা), ফণীন্দ্রনাথ কুণ্ডু, পরিমল রায়, ব্রজকিশোর চক্রবর্তী এবং শান্তিগোপাল সেন। এরপর সংগঠন ভেঙে যায়। এমনকি বিপ্লবীরা বেশিরভাগ হিন্দু স্কুলের ছাত্র হওয়ায় ইংরেজরা স্কুলটাই ধ্বংস করে দেয়।

এই বিপ্লবী ধারার প্রভাব ১৯৪২-এর আগস্ট আন্দোলনেও পড়েছিল। তমলুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় সরকার। অজয় মুখোপাধ্যায়, সতীশ সামন্ত,  সুশীল ধাড়ার নেতৃত্বে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গড়ে তুলেছিল সমান্তরাল শাসন। পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা৷ সেই সঙ্গে অসংখ্য কম আলোচিত চরিত্ররাও নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিলেন। তেমনই একজনের নাম সাবিত্রীবালা দে। তমলুকে যখন পুলিশের লাঠি, গুলিতে মিছিল ছত্রভঙ্গ, অসংখ্য আহত, রক্তাক্ত, তখন এগিয়ে এলেন সাবিত্রীবালা। আহতদের মুখে তুলে দিলেন তৃষ্ণার জল, মুছিয়ে দিলেন রক্ত। ছুটে এল ইংরেজের পুলিশ। বন্দুক উঁচিয়ে সরে যেতে বলল তারা। রুখে দাঁড়ালেন সাবিত্রীবালা। তার সঙ্গে দা, বঁটি নিয়ে জড়ো হলেন আরো অসংখ্য নারী৷ পুলিশকে তাড়া করে এলাকাছাড়া করলেন তারা। রণংদেহী এই মহিলাদের উপর গুলি চালানোর সাহস দেখায়নি পুলিশ।

ইতিহাস বলে, সাবিত্রীবালা ছিলেন এক প্রান্তিক নারী, একজন বারাঙ্গনা। অনেক বাধার প্রাচীর পেরিয়েই সেদিন রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি। বহু বছর পর ১৯৯২ সালে হতদরিদ্র অবস্থায় মারা যান তিনি। বিপ্লবীদের পাশাপাশি এমন অসংখ্য তথাকথিত সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেশপ্রেমের আগুন জ্বেলে দিয়েছিল মেদিনীপুর। হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের তীর্থভূমি। 

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণ উপলক্ষে নাগরিক ডট নেটের বিশেষ সংখ্যার লেখাগুলো (স্বাধীনতা ৭৫):

Leave a Reply