পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে পার্টির যুব সংগঠনের সভাপতি হয়েছেন, পার্টির রাজ্য শাখারও সভাপতি হয়েছেন। দুবার লোকসভার সাংসদ হয়েছেন, বহুবার রাজ্যসভার সাংসদ। এছাড়া বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, তিন দশকের বেশি সময় পার্টির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক কমিটিতে ছিলেন। কেন্দ্রে ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন, আবার নিজের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন। এমন বায়োডাটা থাকলে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদই গর্বিত বোধ করবেন। কিন্তু গুলাম নবী আজাদ অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি তো কোনো সাধারণ রাজনীতিবিদ নন, তিনি হলেন সেই বিরল প্রজাতির রাজনীতিবিদদের একজন, যাঁরা ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলের সার্বিক অবক্ষয়ের যুগপৎ কারণ ও ফলাফল।

এত বড় কথাটা কেন বলছি সে ব্যাখ্যায় আসব, তবে তার আগে একটু প্রেক্ষাপটটা বলে নেওয়া যাক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের ঘটনাবলী দিল্লিতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। আম আদমি পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লির আবগারী নীতি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো অভিযুক্ত মন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়ার বাড়িতে, অফিসে হানা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই খবর ছাপিয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ২৬ অগাস্ট (শুক্রবার) মিডিয়ার কাছে ফাঁস করে দেওয়া একটা চিঠি – আজাদের পদত্যাগপত্র

এই প্রবীণ নেতার সঙ্গে অনেকদিন ধরেই কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তথা গান্ধী পরিবারের মতানৈক্য চলছিল। আজাদ ‘জি-২৩’ নামে পরিচিত একটা গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা, যে গোষ্ঠী পার্টি নেতৃত্বের সংস্কার ও পরিবর্তন দাবি করেছিল। ফলে আজাদের পদত্যাগ তেমন অবাক করা ঘটনা নয়। বরং এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি পার্টি ছাড়তে পারেন বলে মনে করা হচ্ছিল। কোনো নেতার কংগ্রেস ছেড়ে দেওয়াও কোনো নতুন ব্যাপার নয়। বহু বিশিষ্ট এবং বিশেষত্বহীন নেতাই পার্টি ছেড়ে গেছেন। কিন্তু যা অপ্রত্যাশিত তা হল আজাদের পদত্যাগপত্রের বয়ান, ভঙ্গিমা এবং চড়া সুর।

আজাদ সোনিয়া গান্ধীকে বলেছেন নাম কা ওয়াস্তে নেত্রী, এবং দাবি করেছেন সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাহুল গান্ধী এবং তাঁর “নিরাপত্তারক্ষী ও পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টরা” নেয়। তারপর তিনি রাহুলকে “অপরিণত” বলে বর্ণনা করেছেন, প্রমাণ হিসাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে ইউপিএ সরকারের অর্ডিন্যান্স ছিঁড়ে ফেলার কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন ওই “শিশুসুলভ” ব্যবহার প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব খর্ব করেছিল।

পার্টি নেতৃত্বকে আক্রমণ করে আজাদ তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছেন “২০১৪ সাল থেকে প্রথমে আপনার এবং পরে রাহুল গান্ধীর তত্ত্বাবধানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দুটি লোকসভা নির্বাচনে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছে। ২০১৪-২০২২ সালের মধ্যে ৪৯টি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে ৩৯টিতে পরাজিত হয়েছে… পার্টি মাত্র চারটি রাজ্যের নির্বাচনে জিতেছে এবং ছটি ক্ষেত্রে জোট সদস্য হতে পেরেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে আজ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস মাত্র দুটি রাজ্যে ক্ষমতাসীন এবং অন্য দুটি রাজ্যের ক্ষমতাসীন জোটের একেবারেই প্রান্তিক সদস্য।”

তিনি আরও বলেছেন, ২০১৯ সালের পর থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। যে বর্ষীয়ান নেতারা নিজেদের গোটা জীবন পার্টিকে দিয়েছেন, রাহুল পার্টির সভাপতি পদ ছেড়ে দেওয়ার সময়ে তাঁদের অপমান করেন এবং সেই কারণেই সোনিয়াকে অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতির দায়িত্ব নিতে হয়। পাঁচ পাতা লম্বা এই চিঠির ছত্রে ছত্রে এত বিষ যে কেবল কংগ্রেস নয়, বহু বিরোধী দলের নেতাও হতবাক। অনেকে তো বলতে চেয়েছেন এই চিঠির বয়ান সম্ভবত গৈরিক দলের কারোর তৈরি করে দেওয়া।

কংগ্রেস প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে প্রতিক্রিয়ায় বলেছে “পার্টি যখন মুদ্রাস্ফীতি ও মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়ছে” তখন আজাদের পদত্যাগ “দুঃখজনক”। সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ আরও বলেছেন যে এই চিঠিতে যা লেখা হয়েছে তা “সত্যনিষ্ঠ নয়” এবং পদত্যাগের সময়টা ভয়াবহ।

“সত্যনিষ্ঠ নয়” আর “সময়টা ভয়াবহ”। দুটো কথাই সমান গুরুত্বপূর্ণ কেন? আসুন দেখি।

আজাদের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে বুঝতে পারা শক্ত হয় না যে তিনি খুবই বড় নেতা হলেও তাঁর উচ্চতা যতটা সাংগঠনিক ও নির্বাচনী সাফল্যের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি তিনি যে পদগুলো অলংকৃত করেছেন সেগুলোর জন্য। সেই কারণেই তিনি অক্লান্তভাবে কংগ্রেস নেতৃত্বের দরবারি সংস্কৃতি সম্পর্কে বিষোদ্গার করে গেছেন। তাতে কোনো অন্যায় নেই, কিন্তু তিনি কি অস্বীকার করতে পারেন যে তিনি নিজে বছরের পর বছর ওই সংস্কৃতিতে লাভবান হয়েছেন? উপরন্তু জম্মুতে তিনি নিজেও নিজের দরবার তৈরি করেছেন। নতুন মুখ তুলে আনার ব্যাপারে প্রায় কিছুই করেননি, বরং বহু প্রতিশ্রুতিমান নেতার রাজনৈতিক জীবন নষ্ট করে দিয়েছেন। ফলে তাঁর প্রভাব জম্মুর কিছু ডিভিশনে আর কিছুটা কারগিলে সীমাবদ্ধ। উপত্যকায় তিনি কল্কে পান না। জাতীয় রাজনীতিতে আজাদের ভূমিকার পর্যালোচনা করতে গেলে বলতে হয় তামিলনাড়ু এবং অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশে পার্টির সংগঠন ধ্বংস হওয়ার জন্য তিনি সরাসরি দায়ী। অন্ধ্র ছিল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। আজ সেখানে কংগ্রেস আদৌ পাত্তা পায় না।

পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সময়টাও খুবই সন্দেহজনক। কংগ্রেস এই মুহূর্তে এমন এক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেরকম বিরাট মাপের কর্মসূচি বহু বছর গ্রহণ করা হয়নি – ভারত জোড়ো যাত্রা। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ভোটারদের কাছে পৌঁছনো এবং ৩৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পরিক্রমায় করার এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য শক্তি এবং ঐক্য প্রদর্শন। দেশ আজ যে নানারকম সমস্যায় জর্জরিত সেগুলো তুলে ধরা হবে এই যাত্রায়। বিজেপি এই কর্মসূচি নিয়ে খুবই অস্বস্তিতে। কন্যাকুমারী থেকে ৭ সেপ্টেম্বর শুরু হবে ভারত জোড়ো যাত্রা। আজাদের পত্রবোমা তা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার কাজটা বেশ ভালভাবেই করেছে।

আরো পড়ুন কংগ্রেস কর্মী, সমর্থকদের নতুন উৎসাহ জোগাল চিন্তন শিবির

ওই চিঠির ফল কী হবে?

অনস্বীকার্য যে ব্যাপারটা কংগ্রেসের পক্ষে খুবই অস্বস্তিকর। কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ এবং সংবাদমাধ্যম এতে গান্ধী পরিবারকে আক্রমণ করার আরও একটা সুযোগ পেয়ে গেল। কিন্তু তাছাড়া জম্মু বাদ দিলে আর কোথাও আজাদের চিঠির বা সিদ্ধান্তের কোনো নির্বাচনী প্রভাব পড়বে না। আজাদ ঘোষণা করেছেন যে তিনি নতুন দল গড়বেন। বিজেপি ঠিক সেটাই চায়। কারণ ওই নতুন দল জম্মু ডিভিশনের কংগ্রেসের ভোট কাটা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।

কংগ্রেস নেতৃত্ব কি আগেই আজাদকে বহিষ্কার করতে পারত?

তা পারত, কিন্তু সেক্ষেত্রে এই নিয়ে নাটক চলত সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস। ওঁকে বহিষ্কার না করা দারুণ সিদ্ধান্ত। এর ফলে আজাদের আর ‘শহিদ’ হওয়ার সুযোগ রইল না। সংবাদমাধ্যম আর কিছু কায়েমি স্বার্থের পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে তিনি বাসি খবরই হয়ে গিয়েছিলেন। কংগ্রেস ভুল না করলে আজাদ শিগগির জাতীয় রাজনীতিতে এমন এক অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তি হয়ে পড়বেন যিনি সব পেয়েও আরও পেতে চেয়েছিলেন। বড়জোর তিনি আরেকবার রাজ্যসভার সাংসদ হবেন। আর কিছু নয়। কংগ্রেস নতুন কোনো সভাপতির পথে এগিয়ে চলবে। তিনি রাহুলই হোন আর শশী থারুরই হোন।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.