র্যাগিংয়েরও বিভিন্ন মাত্রা আছে। পোশাক খুলে নেওয়া, সমকামী বলা, অশ্লীল অভিনয় করে দেখাতে বলা – এসবের পিছনে কি কোনো অবদমন কাজ করে? যারা এসব করে তাদের বড় হয়ে ওঠার মধ্যে কি কোনো গলদ থেকে গেছে? বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ, সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, সাবালকত্বের উত্তেজনা, উদ্বেগ এবং রোমাঞ্চ, যৌনতা – সব মিলিয়েই র্যাগিংয়ের মানসিকতা তৈরি হয়। শৈশব থেকে যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত উৎপীড়নের অভিজ্ঞতা, বড়দের ঠিক করে দেওয়া কেরিয়ারসর্বস্ব জীবনযাপন যা একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে সামাজিকীকরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখে – এসব এক জটিল মানসিক বিকৃতি তৈরি করে। র্যাগিংয়ের মধ্যে দিয়ে সেই বিকৃতি পরিতৃপ্তি লাভ করে।
প্রকৃতপক্ষে র্যাগিং ধর্ষকাম মানসিকতার চরম উদাহরণ। অবশ্যই সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক অসুস্থতার লক্ষণগুলি স্কুল পর্যায়ে এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের আগেই তৈরি হয়ে যাওয়া নৈতিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে যে কোনো ঘাটতি শিক্ষার্থীর অবচেতনে সমস্যা তৈরি করে। মনে রাখতে হবে র্যাগিংয়ে যূথবদ্ধতার একটা বড় ভূমিকা আছে। র্যাগিংয়ের মত সমষ্টিগত অপরাধের প্রধান কারণই হল প্রথাগত নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অভাবের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিগত এবং সার্বিক সহমতের জন্য দলগত চাপের প্রাধান্য। যূথবদ্ধতার মনস্তত্ত্ব উল্লসিত অপরাধপ্রবণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সেখানে সমষ্টিগত কুকর্মে ব্যক্তির দায় যেমন পরিমাপ করা যায় না, তেমন ব্যক্তিকেও দলের ভিতরে অপরাধের সমস্ত দায়ভার বহন করতে হয় না। এইভাবেই দলের মধ্যে একটা যৌথ মতামতের ভিত্তিতে র্যাগিংয়ের মত কাজকে গোপন রাখা এবং তার যৌক্তিকতা খোঁজার প্রক্রিয়া ব্যক্তির নিজস্ব অপরাধবোধকে লঘু করে দেয়। সে দলের সবাইয়ের মতই র্যাগিং করা সঠিক বলে মনে করে। উন্মত্ত জনতার মধ্যে নিজেকে অনেক নিরাপদ ও শক্তিশালী মনে করে। আশা করি আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সমষ্টির ধারণা থেকেই এই নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। সেই সমষ্টির মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট মত বা রাজনীতির (যেমন যাদবপুরের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট সংগঠনের) প্রভাব বেশি থাকলে তাদের রেজিমেন্টেশনের ধারণা থেকেও এই নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রতিটি মানুষের মধ্যে থাকা চাপা অসামাজিক প্রবণতাও র্যাগিংয়ের মত অপরাধে ভূমিকা পালন করে। র্যাগিংয়ের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আজকাল ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজমের কথাও বলা হয়, অর্থাৎ যেখানে শুধু সমষ্টি নয়, ব্যক্তিগত লাভের জন্যও কাউকে প্ররোচিত করা হয়। এটি ‘ডার্ক ট্রায়াড’-এর তিনটি ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি, যা নার্সিসিজম এবং সাইকোপ্যাথিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির তিনটিই একজন ব্যক্তির মধ্যে থাকতে পারে এবং অন্য ব্যক্তির মানসিক সুস্থতার জন্য বিপজ্জনক। ভুক্তভোগীর কষ্ট নির্যাতনকারীদের উৎসাহিত করে।
এটাও ঠিক যে র্যাগিংয়ের জন্য পরিবেশ ও পরিস্থিতি – দুটোই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। একজন কোন সমষ্টি, কোন পরিস্থিতি ও পরিবেশে আছে, তার উপর অনেকাংশে নির্ভর করছে সে র্যাগিং করবে কি করবে না। হানা আরেন্টের বিখ্যাত ‘ব্যানালিটি অফ ইভিল’ তত্ত্ব পড়ে নিতে পারেন। আসলে শুধু নবাগত ছাত্র বা ছাত্রীটিই নয়, যেসব সিনিয়র র্যাগিংকে সঠিক মনে করতে চায় না, তারাও সহপাঠীদের দ্বারাই র্যাগড হয়। না চাইলেও সহপাঠীদের চাপে তারা কাজটা করতে বাধ্য বা প্ররোচিত হয়। উন্মত্ত জনতা যা বলে তা না মানা কাপুরুষতার কাজ বলে বিবেচিত হয়। তেমন ব্যক্তির উদ্দেশে কটূক্তি করা হয় কারণ র্যাগিংকে সাহসের পরীক্ষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভিড়ের আচরণের তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে এই ধারণা নিয়ে গঠিত যে ভিড়ের সদস্য হওয়া অচেতন মনকে আনলক করতে কাজ করে। এটি ঘটে কারণ ব্যক্তির সুপার-ইগো, বা চেতনার নৈতিকতা ভিড়ের চেতনায় মিশে যায়। এই যৌথতার উদাহরণ দেখিয়েছে কীভাবে দলগত মনস্তত্ত্ব ফ্যাসিবাদী ভিড়কে নির্দয় করে তোলে। ফলে বলাই যায় যে জোটবদ্ধ বন্ধুরা মূলত মূল্যবোধ, আচরণগত মডেল এবং সামাজিক শক্তিবৃদ্ধির মাধ্যমে একে অপরের আচরণ গঠন করে (অ্যাকর্স, ১৯৭৩)। সাদারল্যান্ড এই তত্ত্বকে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন এই বলে যে, শিক্ষার্থীরা সমবয়সী বা সহপাঠী, মেলামেশার বৃত্তে অন্যদের পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণ করে আচরণ শেখে এবং ইতিমধ্যে অপরাধের সাথে জড়িত অন্যদের সাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অপরাধী হয়ে ওঠে।
তাহলে সমস্যাটা কোথায় ? সবাই বুঝছে র্যাগিং খারাপ, বন্ধ করা দরকার অথচ বাস্তবে র্যাগিং চলছে। কেন?
কেবল শিক্ষার্থীরাই এই ধারণায় বিশ্বাসী নয়। বহু শিক্ষক, এমনকি কখনো কলেজে যাননি এমন মানুষও র্যাগিংয়ের মিথগুলি বিশ্বাস করেন। র্যাগিং নিয়ে যে কোনো আলোচনা শেষ পর্যন্ত হালকা বনাম গুরুতর র্যাগিং নিয়ে হাস্যকর বিতর্কে পরিণত হয়।
র্যাগিং হওয়া প্রমাণ করে যে কার্যকর প্রতিরোধী ব্যবস্থার অনুপস্থিতি বা অভাব ছিল। এটি অবশ্যই কর্তৃপক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাবের ফল। এমন হতেই পারে না যে যাদবপুরের মেইন হোস্টেলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা র্যাগিংয়ের খবর হোস্টেল সুপার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ – কারোর কাছে ছিল না। গুরুতর নজরদারির অভাব এবং অ্যান্টি-র্যাগিং ব্যবস্থার বাস্তবায়ন না করা, হোস্টেল ওয়ার্ডেনদের শূন্য পদ বা আদৌ কোনো পদ না থাকা, অনেক ওয়ার্ডেনের হোস্টেলে বসবাস না করা (চোপড়া, ২০০৯: ৫৫-৫৮)। এককথায় প্রতিটা ছাত্রছাত্রীর সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে কর্তৃপক্ষের, তারপর শিক্ষকদের, তারপর ছাত্র সংগঠনগুলোর, এবং তারপর তার ক্যাম্পাসের সহপাঠীদের। এই সমষ্টিগত ব্যর্থতা স্বীকার না করলে একে রোধ করার কাজে এক পাও এগোতে পারা যাবে না।
র্যাগিংয়ের রাজনৈতিক দিকটিকেও আলোচনায় আনা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রাধান্য বজায় রাখার জন্যেও নবাগত ছাত্রছাত্রীদের উপর র্যাগিং চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করার জন্যও র্যাগিংকে ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রথম বর্ষ থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক করে তোলা যায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তনী লিখেছেন “ভোটের আগে খুব জনসংযোগ বা মগজ ধোলাই হইত। মনে পড়ে, ফোরাম ফর আর্টস স্টুডেন্টস-এর দাদা আমাদের অনেক বুঝিয়েছিলেন ইউনিয়ন নির্বাচনের সময়ে। একবারও জিজ্ঞাসা করেন নাই যে আমাদের পড়াশুনা কেমন চলিতেছে ইত্যাদি। তাঁহারা কোনোদিনও সেগুলির খোঁজ নেন নাই। যে ছেলেটি বা মেয়েটি সুদূর বাঁকুড়ার রানীবাঁধ হইতে আসিয়া বিজয়গড়ে মামার বাড়িতে থাকিয়া পড়াশুনা চালাইত আর হাত খরচের জন্য কাপড়ের দোকানে কাজ করিত।”
রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কারণেই দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংস্কৃতি চর্চার চেয়ে বিকৃতি চর্চার পরিমাণই বেশি। এই বিকৃতির চূড়ান্ত নিদর্শন হল বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন। মনে রাখতে হবে, এই রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই, পরিচালন কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধি নেই, এমনকি রাজ্যের সরকারের (অথবা কেন্দ্রেরও) উচ্চশিক্ষা মডেলে লিংডো কমিশনের সুপারিশক্রমে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কোনো সুযোগ নেই।
কোয়ালিশিন টু আপরুট র্যাগিং ফ্রম এডুকেশন বা কিওর নামক একটি অ্যান্টি-র্যাগিং সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, তদন্তের জন্য একটি তৃতীয় পক্ষ থাকলে তা রাজ্য এবং ইউজিসিকে সাহায্য করবে। প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে একটি স্বাধীন কমিটির তদন্ত করা উচিত।
র্যাগিংয়ের সমাধান হিসাবে ইউজিসি আইনগুলিকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জরুরি এলাকাগুলিতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির কথা বলেছে। যদিও দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর নজরদারি করার জন্যেও একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কারণ র্যাগিং সংক্রান্ত নিয়মগুলি অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা দেখার মত কোনো সক্রিয় সংস্থা নেই। উল্লেখ্য, ইউজিসি নিজেই বলেছে যে নজরদারি ব্যবস্থা বলতে মূলত সিসিটিভি ক্যামেরা বোঝানো হয়। কিন্তু সিসিটিভির দিকে লক্ষ রাখা বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর রিপোর্ট নেওয়া, পিয়ার মনিটরিং ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে হয় না। নজরদারি ব্যবস্থা এই ধরনের নৈর্ব্যক্তিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে সিসিটিভি বিতর্কের ঊর্ধ্বেও নয়। এর পক্ষে ও বিপক্ষে বহু যুক্তি আছে, কারণ তা প্রাইভেসির অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে সিসিটিভির ব্যবহার হিংস্রতা এবং সহিংসতা কমায় না। সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো ছাড়াও, ওয়ার্ডেন, পরামর্শদাতা ইত্যাদির মানবিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি যথাযথ নজরদারির ব্যবস্থা তৈরি করার কথা ইউজিসি বলেছে [ডিও নং: F1-15/2009 (ARC) pt. lll, তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০১৭]। অর্থাৎ সিসিটিভি নিয়ে ইউজিসি মোটেই অনড় নয়। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের উচ্চ আদর্শের ভিত্তিতেই বাঁচতে হবে – এই মত প্রকাশ করেছে।
ফিরে আসি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেই যাদবপুরে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে, সোশাল মিডিয়ায় যারা ‘কলরব’ নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করছে, তারা ভুলে যাচ্ছে সেই কলরবই অতিরিক্ত ছাত্রাবাসের দাবি, পরিকাঠামো বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে বারবার। বিশেষ করে যখন গ্রামাঞ্চল তথা মফস্বলের প্রান্তিক শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য হোস্টেল এক অত্যন্ত দরকারী সহায়ক ব্যবস্থা। অথচ শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো পরিকাঠামো নেই কেন – এই প্রশ্ন টিভি চ্যানেলে, সোশাল মিডিয়ায় গলা ফাটিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় না কেন? কেনই বা প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের অন্য আবাসিকদের অতিথি হয়ে থাকতে হয়, নতুন শিক্ষাবর্ষের ছাত্রছাত্রীদের আলাদা হোস্টেল দেওয়া যায় না? যখন এর উত্তর চায় ছাত্র ফেডারেশন, তখন মিডিয়া নীরব থাকে।
জানা গেছে, যাদবপুরে র্যাগিং দমন স্কোয়াড বা ফর্ম পূরণ করার ব্যবস্থা – সবই আছে, নীতিগত দিক থেকে কোনো ত্রুটি নেই। সমস্যা বাস্তবায়নের। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সেদিন পর্যন্ত কোনো উপাচার্য ছিল না (রাজ্য সরকারের উচ্চশিক্ষা নীতির দাপটে রাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই উপাচার্য নেই বা থাকলেও ক্ষমতাহীন), তিনটে বিভাগের পূর্ণ সময়ের ডিন নেই, একজন মাত্র প্রো ভাইস চ্যান্সেলর। আবার এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল, ফ্যাকাল্টি কাউন্সিল, কোর্ট (বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সর্বোচ্চ পরিষদ) – এগুলিতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। বাকি রাজ্যের মত যাদবপুরেও দীর্ঘদিন ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হয় না। এতগুলো ‘নেই’-এর মাঝে র্যাগিংবিরোধী নীতিগুলি যে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষক, নিরাপত্তা কর্মী, কেয়ারটেকার, দারোয়ান ইত্যাদি পদে দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ।
সঠিকভাবেই প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জন্য আলাদা হোস্টেল, সিসিটিভি ইত্যাদি ব্যবস্থার দাবি উঠছে। কিন্তু তার খরচ দেবে কে? রাজ্য সরকার বাজেট ক্রমশ কমাচ্ছে আর বাজেটের টাকাও পুরো দিচ্ছে না। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় বিনা খরচে পড়ার সুযোগ দেবে বলে পণ করেছে, যাতে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার সুযোগ পায়। তাদের জন্য তো কোনো গৌরী সেন নেই।
মনে রাখতে হবে, এই রাজ্যে ২০১১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বারবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলির আইন সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধনগুলি লক্ষ করলেই বোঝা যায়, উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন ধ্বংস করে রাজ্য সরকারের বকলমে শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বাজারি সংবাদমাধ্যম যাকে ‘অনিলায়ন’ বলে, সেই সময়েও সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কমিটিগুলিতে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্য করার পদ্ধতি চালু ছিল। তাকে নাকচ করে এখন সরকারের তাঁবেদার গোষ্ঠীর দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় চালানো হয়। সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কমিটিতে যেটুকু নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখার সুযোগ আছে সেটুকুও আজ ১২ বছর ধরে শূন্য করে রাখা হয়েছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছিল, আদালতের নির্দেশে সেই উপাচার্যদের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। ফলে সারা রাজ্যে ১৪-১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যহীন। এই অবস্থায় ইউজিসির নির্দেশিকা মেনে হোস্টেলের ছাত্রছাত্রীদের ভালমন্দ খতিয়ে দেখার জন্য যে রেসিডেন্ট ও ডিসিপ্লিন কমিটিগুলি থাকার কথা, সেগুলোও তৈরি হয়নি।
এবার বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এইসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে না গিয়ে যা করা হচ্ছে সংবাদমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে তা স্রেফ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। তার উদ্দেশ্য র্যাগিং বন্ধ করা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় দখল করা। আগেও এই চেষ্টা হয়েছে বারবার। কিন্তু যাদবপুরের শিক্ষাদর্শের কেন্দ্র যে কলা বিভাগ, সেখান থেকে বাম প্রগতিশীল মতাদর্শকে সরিয়ে দেওয়া যায়নি, যেমন যায়নি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাই দুটিই দক্ষিণপন্থী উগ্র রাজনীতির চাঁদমারি। যেহেতু যাদবপুর আত্মসমর্পণ করে না, সেহেতু যাদবপুর নামেই ঝড় ওঠে, নিরন্তর আক্রমণ শুরু হয়। সেই আক্রমণের ধরনটাও খুব চেনা – বামেদের ঘাঁটি মানেই দেশবিরোধীদের আড্ডা, নেশাভাং করার জায়গা, হোক কলরবের নামে নৈরাজ্য, ছাত্র রাজনীতির নামে কেরিয়ারের বারোটা বাজানো, মেয়েরা ছোট জামাকাপড় পড়ে আসে, শুধুই রাজনীতি হয় কিন্তু পড়াশোনা হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। হরেকরকম প্রোপাগান্ডা। হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক জুড়ে এইসব লেখা চলবে নিরন্তর। তারপর আপনি, একজন অভিভাবক, ঘাড় নেড়ে বলবেন “নাঃ! আর যাদবপুর না।”
ছকটা পরিষ্কার। যাদবপুরের ছাত্র না হয়েও পরিষ্কার বোঝা যায়। আসলে যাদবপুর থাকলে কম দামে সবার জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা উন্মুক্ত থাকবে। তাতে বাজারের অসুবিধা। যাদবপুর, জেএনইউ থাকলে রিলায়েন্স, টেকনো, অ্যাডামাসদের অসুবিধা। পুঁজির অসুবিধা, শিক্ষাকে বিক্রি করার অসুবিধা। অতএব চালাও বুলডোজার, গুঁড়িয়ে দাও যাদবপুর। র্যাগিং এখন একটা উপলক্ষ্য মাত্র।
তাই লড়াইটা শুধু র্যাগিং রুখে দেওয়ার নয় কিংবা এর সঙ্গে জড়িত সমস্ত ছাত্র ও প্রাক্তন ছাত্রদের চূড়ান্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং মৃত ছাত্রটিকে ন্যায় পাইয়ে দেওয়ার নয়। এই লড়াই একটা বিশ্বাসকে রক্ষা করার, নয়া উদারনৈতিক পুঁজিবাদের বিপ্রতীপে সবার জন্য উচ্চশিক্ষার দরজাটা খুলে রাখারও লড়াই। অরাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে, চরম দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধেও লড়াই।
ঋণ:
১। Recommendation of the Committee on Psychological Study of Ragging in Selected Educational institution in India by UGC (D.O. No. F1-15/2009 (ARC) pt. lll dated, 13th November 2017).
২। Organised crime groups: A systematic review of individual‐ level risk factors related to recruitment. By Francesco Calderoni, Tommaso Comunale, Gian Maria Campedelli, Martina Marchesi, Deborah Manzi, Niccolò Frualdo.
৩। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা; জুন ২০২১।
৪। The Menace of Ragging in Educational Institutions and Measures to Curb It – Report of the Committee constituted by the Hon’ble Supreme Court of India in SLP No. 24295 of 2006.
৫। Psychology Behind Ragging by Harsh Agarwal; 2010
৬। West Bengal Act XIII of 2000; The West Bengal Prohibition of Ragging in Educational Institutions Act, 2000; Published in the Calcutta Gazette, Extraordinary, of the 29th May, 2000.
৭। A Critical Evaluation of Ragging and Anti ragging Laws in India by Jayant Minj and Dr Abdul Alim Khan.
৮। SUPREME COURT Judgement on CIVIL APPEAL NO. 887 OF 2009; University of Kerala Versus Council, Principals’ Colleges, Kerala and Ors.; May 08, 2009.
৯। Psychosocial Study of Ragging in Selected Educational Institutions in India by Prof. Mohan Rao, Dr Shobna Sonpar, Dr Amit Sen, Prof Shekhar P Seshadri, Harsh Agarwal, Divya Padalia; December, 2015.
১০। Ragging in India: A Summary Report on Incidents, Social Perceptions and Psychological Perspectives. CURE REPORT: May 16, 2007
১১। উর্বা চৌধুরী, অর্কাদি গাইদার, সমুদ্র সেনগুপ্ত, রাহুল সেনগুপ্ত, শমীক ঘোষ, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের ফেসবুক পোস্ট
– মতামত ব্যক্তিগত
প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব
তৃতীয় পর্ব
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








