এই লেখা শুরু করার আগে টিভির খবরে দেখলাম করুণাময়ীতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা আরও একবার বিক্ষোভ মিছিলে সামিল হয়েছিল, রাজ্যের পুলিস তাদের টেনে হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলেছে। ছেলেমেয়েগুলোর অপরাধ, তারা একটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে। ধর্মতলায় অনশন মঞ্চের বয়সও কম হল না। মিডিয়া ছেড়ে দিন, আমাদের, তথাকথিত নাগরিক সমাজের, বিন্দুমাত্র হেলদোল আছে? সোশাল মিডিয়ায় সমবেদনা প্রকাশ বা জ্বালাময়ী পোস্টের কথা বলছি না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষণিকের উত্তেজনা সৃষ্টি ছাড়া এগুলোর কোনো বাস্তব প্রয়োগ নেই।

ধান ভানতে শিবের গীতের মত এই প্রসঙ্গ টেনে আনলাম, কারণ লিখতে বলা হয়েছে কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তির করুণ হাল নিয়ে। তথ্য দিয়ে লেখা ভারাক্রান্ত করতে চাইছি না। যাঁরা খবরের কাগজ নিয়মিত পড়ে থাকেন বা টিভি চ্যানেলে চোখ রাখেন, তাঁরা সবাই জানেন যে গত কয়েক বছর ধরেই জেনারেল ডিগ্রি কলেজগুলোতে ভর্তির হাল বেশ খারাপ। যেহেতু কলকাতায় বৃষ্টি না হলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম বর্ষাকাল দেখতে পায় না, তাই কলকাতার কলেজগুলো সার্বিক রক্তশূন্যতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরে কলকাতার কাগজগুলোতে এই বিষয়ে লেখালিখি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অসুখ যতদূর ছড়িয়েছে তাতে নিছক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা একে কতদূর নিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে সংশয় থাকছে পুরোমাত্রায়। স্কুল সার্ভিসে দুর্নীতির ফলে বঞ্চিত প্রার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নাগরিক সমাজে যে শীতলতা দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রেও তার চেয়ে বেশি কিছু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে না। সচেতন নাগরিকরা মার্জনা করবেন, কিন্তু শীতলতা শব্দটা লিখতে বাধ্য হলাম। বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিবাদ ছাড়া আমরা কিন্তু সত্যিই এদের পাশে দাঁড়াইনি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বেশিরভাগ কলেজে অধিকাংশ বিষয়ে ভর্তির হার ৫০ শতাংশের নিচে। বেশকিছু বিষয়ে ছাত্রছাত্রী পাওয়াই যাচ্ছে না। এ নিয়ে মাথাব্যথা যখন শুরুই হয়েছে, তখন কিছু আবশ্যিক প্রশ্ন তোলা যাক।

আচ্ছা, বলুন তো? পড়ে কী হবে?

লোকে পড়তে আসে চাকরির জন্যে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধিকাংশ সাধারণ ছাত্রছাত্রীই চাকরির জন্যে পড়ে, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হবার জন্যে নয়। সেই চাকরির একটা বড় জোগানদার ছিল স্কুল সার্ভিস কমিশন, যা বর্তমানে জেলে ডায়েট চার্টে থাকা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও তাঁর রাজ্য সরকারের দৌলতে আস্ত প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

কী বলছেন? সবাই চাকরি করবে কেন? ঠিক কথা, সরকার তো তৈরিই হয়েছে আদানি, আম্বানি আর গোয়েঙ্কাদের জন্যে। তারা তো আর সব্বাইকে চাকরি দেওয়ার ঠিকা নিয়ে বসে নেই। তা এই গ্র্যাজুয়েট হওয়া ছাত্রছাত্রীরা ঠিক কোন কাজের যোগ্য তৈরি হয় বলুন তো?

যারা কলেজে পড়ে, তাদের একটা বড় অংশই পড়ে জেনারেল কোর্সে। সময় পেলে রাজ্যের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক স্তরের সিলেবাস একটু উলটে পালটে দেখবেন। ওটা পড়ে সহজে পাস করা ছাড়া আর কিস্যু হয় না। কাজের জগতে পা দেওয়ার মত কিছুই শেখানো হয় না। আর পাস করানোটাই যেহেতু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই।

কলকাতার কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমাদের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই কলেজে নাম লিখিয়ে বাইরে কিছু না কিছু কোর্স করে। কেউ কম্পিউটার শেখে, কেউ স্টেনোগ্রাফি বা টাইপিংয়ের কাজ, কেউ অন্য কোনো পেশাদার কোর্সে ভর্তি হয়, যাতে কলেজ পাস করেই কাজ পেতে সুবিধে হয়। এবার সহজ কথাটা বুঝুন। যদি সরকারের চাকরি দেওয়ার দায় না থাকে, বেসরকারি ক্ষেত্রেই কাজ জোগাড় করতে হয় এবং সেই কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ জেনারেল ডিগ্রি কলেজে না পাওয়া যায়, তাহলে ছেলেমেয়েরা কলেজ করতে আসবে কিসের জন্যে?

শেখানোর কথাটা যখন উঠলই, তখন আরেকটা কথা না বললেই নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাল্লা দিয়ে লেখাপড়া বাদ দিয়ে অন্য কাজ বাড়ছে। সব শিক্ষক খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ান এমন দাবি কেউ করছে না। ফাঁকিবাজ সব পেশাতেই আছে। শিক্ষকরা মঙ্গলগ্রহ থেকে আসেননি, ফলে তাঁদের মধ্যেও ফাঁকিবাজ থাকবে। এটা কাঙ্ক্ষিত না হলেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যাঁরা পড়াতে চান, যাঁরা ক্লাসরুমে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা সমস্যায় পড়ছেন। এ প্রসঙ্গে সব চেয়ে ভুক্তভোগী বোধহয় স্কুলশিক্ষকরা। কিন্তু তা নিয়ে সরকার কিংবা সাধারণ মানুষ, কারোরই কোনো হেলদোল নেই।

যারা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছি যে কোনো ভূমিকায়, তারা প্রত্যেকেই জানি যে কোভিড একটা বড়সড় ক্ষতি করে দিয়েছে আমাদের। বাচ্চাদের পড়ার অভ্যাস চলে গেছে। অনেকের পড়ানোর অভ্যাসও চলে গেছে। বাচ্চারা বাড়িতে বসে বই খুলে উত্তর লিখেছে, অভিভাবকরা মদত দিয়েছেন। তিন ঘন্টার পরীক্ষা পাঁচ ঘন্টায় দিয়েছে, ঢালাও নম্বর পেয়েছে এবং কিছুই শেখেনি।

ব্যক্তিগতভাবে এর জন্যে আমরা বাচ্চাদের দায়ী করতে পারি না। কারণ সরকার এবং শিক্ষামন্ত্রক – কারোর পক্ষ থেকেই বিকল্প কিছু করার কোনো উদ্যোগ ছিল না। কোনো অনলাইন পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। প্রান্তিক পরিবারের ছেলেটা বা মেয়েটা কীভাবে অনলাইন ক্লাস করবে সেকথা ভাবা হয়নি। পরীক্ষাব্যবস্থাকে অভিনব করে তোলার চেষ্টা হয়নি। না স্কুল, না কলেজ – কোথাও হয়নি। দুটো বছর ধরে আমরা এদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে গেছি।

দেখুন জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আব্দুল কাফির ভিডিও সাক্ষাৎকার

শুধু পাস কোর্সই নয়, অনার্সের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মাস্টার ডিগ্রি করে গবেষণার দিকে এগনো অসম্ভব হয়ে উঠছে। প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলে মেয়ে নেট, সেট পাশ করছে। অথচ পিএইচডিতে অত আসন নেই, থাকলেও রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বজনপোষণের অভিযোগ রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। রাজ্যে অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলেও তাদের পরিকাঠামো পর্যাপ্ত নয় একেবারেই। রাজ্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রক এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুঘলকি কার্যকলাপ চালু রেখেছিল, তার উপর উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন বর্তমান রাজ্যপাল মহাশয়। শিক্ষাজগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগবিহীন অন্য পেশার লোকেরা উপাচার্য হয়ে যাচ্ছেন। রাজ্যপাল আর রাজ্যের দ্বন্দ্বে এক ধরনের অরাজকতা তৈরি হচ্ছে। এর কোনোটাই শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে শুভ নয়। এই পরিবেশে ছেলেমেয়েরা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় পড়তে আসতে আগ্রহী হবে কোন দুঃখে? অন্যদিকে নিয়মিত নিয়োগের অভাবে নাম কা ওয়াস্তে বেতনে অথবা ক্লাসপিছু যৎসামান্য টাকায় উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা পড়াতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা সবাই পুতুলের মত চুপ করে দেখছি সবকিছু।

ফেলোশিপ পেলেই বা কী হবে? আচ্ছে দিনের খোয়াব দেখানো সরকার গত কয়েক বছরে মৌলিক গবেষণা খাতে যথেচ্ছ হারে বাজেট কমিয়েছে। একের পর এক রিসার্চ গ্রান্ট বন্ধ হয়েছে। অমুক আর তমুক রকমের তকমা আর গ্রেডিংয়ের ফাঁক দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাটা আদতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এটা অবশ্য আচ্ছে দিনের সরকার লুকোবার চেষ্টা করেনি। তাদের নীতি আয়োগের প্রধান অমিতাভ কান্ত অনেক আগেই বলেছিলেন যে স্কুল, কলেজ চালানো সরকারের কাজ নয়।

কোভিড পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হয়েছে এ রাজ্যে। ঢালাও বদলির ফলে গ্রামের দিকের স্কুলগুলো শিক্ষকশূন্য হতে যাচ্ছে। স্কলারশিপের জন্যে স্কুলে নাম লিখিয়ে ১৩-১৪ বছরের ছেলেরা বাইরে খাটতে যাচ্ছে। এরা আর উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী নয়। তাই কলেজের আসন ভর্তি হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই স্কুল কলেজ ক্লাস্টারের কথা শুরু হয়েছে।

আরেকটা কথা বলে শেষ করব। জেনে রাখুন, কেন্দ্রীয় সরকার আজ হোক না কাল, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাটাকে বিক্রি করবেই। আমাদের রাজ্য সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি মেনে নিয়েছে কোনো অজানা বাধ্যবাধকতায়। যদি ছেলেমেয়েরা ভর্তিই না হয়, তাহলে সরকারি কলেজ রেখে কী লাভ – এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই।

সমস্যা হচ্ছে, এটা নিয়ে সরকারের লুকনো এজেন্ডা খুব স্পষ্ট। অভিভাবকদের একটা বড় অংশ সচেতন নন। শিক্ষককুলের অধিকাংশও যে এ নিয়ে খুব চিন্তিত, তা কিন্তু নয়। অনেকেই জাতীয় শিক্ষানীতিটা পড়ে ওঠার সময় পাননি। সব মিলিয়ে খুব ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। বুঝছি না অথবা বুঝতে চাইছি না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.