অনির্বাণ ভট্টাচার্য

নমস্কার, আমার নাম অনির্বাণ ভট্টাচার্য। নাগরিক থেকে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছে, ৭৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্বাধীনতা বিষয়টা আমার কাছে ঠিক কী, সে বিষয়ে সামান্য কিছু বলতে।

প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই এই অনুরোধ আমায় করার জন্য, কিন্তু সত্যিই এইরকম একটা অনুভব খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যক্ত করার জন্যে যে প্রজ্ঞা, যে পাণ্ডিত্য এবং কথা বলার উপর যে দখল দরকার হয় তা আমার নেই। এটা একটা সমস্যা। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, সত্যি এই অনুরোধটা আসার পর আমি নানারকমভাবে ভাবার চেষ্টা করেছি যে আমি কী বলতে পারি স্বাধীনতা বিষয়টা নিয়ে। তখন আমার মনে নানারকমের কথা এসছে। সেই কথাগুলোকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে সব সময় যে একটা চেহারা দেওয়া যাচ্ছে তা নয়। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি, যে নিশ্চয়ই খুব বেশি মানুষের মনে এমন সন্দেহ নেই, যে আমাদের চারপাশে সব ঠিক আছে। সততই আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের চারপাশে সব ঠিক নেই। যাদের বয়স একটু বেশি, আমাদের থেকেও যাদের বয়স বেশি, তাঁদের থেকেও যাঁদের বয়স বেশি, তাঁরা সময়ের এই বদলটা আরও বেশি করে দেখতে পাচ্ছেন। আমরাও এমন একটা জেনারেশনের মধ্যে এসে পড়েছি যাতে আমরাও একটা পরিষ্কার বদল দেখতে পাচ্ছি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখন কথা হচ্ছে, আমার মতে এই বদল খুব একটা ভালো বদল হয়নি। যতই বলা হোক না কেন যে সময় বদলেই যায়, বদলে যাওয়াটাই একমাত্র নিয়ম, বদলে গিয়ে সবসময় ব্যাপারটা যে ভালোই হবে তার তো কোন মানে নেই। ফলত আমি মনে করি যে আমরা একটা খারাপ বদলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এই বদলটার মধ্যে কোনো ভাল কিছু নেই। অবশ্যই এই ধরণের সময়ে অনেকেরই পৌষ মাস হয়, কিন্তু বেশিরভাগ লোকেরই সর্বনাশ বলেই আমার মনে হচ্ছে ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে। শিল্পীদের তো বটেই।

এখন কথা হচ্ছে স্বাধীনতা বলতে আমি মনে করি – ছোট থেকেই দেখে আসছি – ছোটবেলায় হয়ত অনুভব করতাম না, এখন আমি যখন নিজের ছোটবেলার জীবন যখন অনুভব করি তখন বুঝি, যে আমাদের দেশে চিরকালই একটা উপর উপর জিনিস চলে।

সম্প্রতি আমি ঘরে বাইরে নাটকে অভিনয় করছি। সেখানে নিখিলেশের মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রের একটি সংলাপ আছে, দেশ মানে তো মাটিই নয়, মানুষই তো। আমার মনে হয় আমাদের দেশের চর্চাটা সম্পূর্ণ তার উলটো দিকের অবস্থানে আছে। আমরা একটা মাটিকেই একটা ঠাকুর বা দেবতা করে তুলেছি। মানুষকে দিয়ে যে দেশ তৈরি, তাকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আমার মনে হয় না রাজনৈতিক নেতারা কোনোদিনই মানুষকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছেন। যদি দিয়ে থাকতেন তাহলে ৭৫ বছর বয়সে দেশ এই জায়গায় পৌঁছত না। এখন আমার মনে হয় যে এক মানুষও আরেক মানুষকে ততটা গুরুত্ব আর দেন না।

আমি মনে করি যে মানুষের স্বাধীনতা আছে। আমি মনে করি যারা যারা ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করতে পারেন, সোশাল মিডিয়া অ্যাক্সেস করতে পারেন, ডেটা অ্যাফোর্ড করতে পারেন, আমি মনে করি তাঁরা ভালই স্বাধীনতা উপভোগ করছেন। যাকে যা ইচ্ছে বলা, যেমন ইচ্ছে বলা, যখন ইচ্ছে বলার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা তো সততই পৃথিবীতে কোনদিন ছিল না। সকলে মিলে কথা বলা, সকলে মিলে সোচ্চারে সকলকে গালাগাল দেওয়ার যে স্বাধীনতা, তা তো সত্যিই এক ধরণের স্বাধীনতা। মানুষ সেটা খুব চারিয়ে উপভোগ করছেন, সেটা তো কোনোকিছুর দিকে তাকালেই বোঝা যায় এবং সেটা সর্বক্ষেত্রে সবরকমভাবেই করছেন। ভাল যে করছেন না তা নয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই জিনিসগুলো তো অর্গ্যানিক কিছু নয়, এগুলোকে অ্যালগোরিদম চালায়, সে অ্যালগোরিদমের পেছনে ইনভেস্টমেন্ট আছে, তার প্রফিট স্কেল আছে। ফলত বোঝাই যায়, যেগুলোকে আমরা প্রবৃত্তি বলি, যেমন ঘৃণা, রাগ, দ্বেষ, হিংসা – এগুলোর প্রতিই সেখানে ইনভেস্টমেন্ট বেশি। যেহেতু মানুষকে অ্যালগোরিদম দিয়ে সেট করা আছে, ফলত মানুষের প্রকাশের যে স্বাধীনতা সেটা এই লাইনগুলোতেই হয়। সে স্বাধীনতা মানুষ ভালই ভোগ করছে। এবং আমার ধারণা যাঁরা দেশ চালান, রাজ্য চালান, শহর-নগর চালান, তাঁরা বোকা লোক নন। তাঁদের কাছে মানুষের এই স্বাধীনতা ভোগটা বিরাট একটা স্বাধীনতার দরজা খুলে দেয়। সেটা হল যথেচ্ছাচার করার স্বাধীনতা। যার ফলাফল আমরা সম্প্রতি রাজ্যে, এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি। দেখেই চলেছি, ভবিষ্যতে আরও দেখব। আমার মনে হয় এই একটি স্বাধীনতা আরেকটি স্বাধীনতার পরিপূরক, বা এই একটি স্বাধীনতা আরেকটি স্বাধীনতার দরজা খুলে দিচ্ছে। মানুষ যেহেতু নিজেদের প্রকাশ করার, যা ইচ্ছে তাই, যে কোনো সময় প্রকাশ করার স্বাধীনতা ভোগ করছেন, তাই হয়ত আমাদের দেশে যাঁরা রাষ্ট্র চালান, তাঁদের কাছেও নিজেদের যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতার দরজা খুলে যাচ্ছে।

আরেকটি স্বাধীনতার কথা আমি অবশ্যই বলব। সেটা হচ্ছে, এত অন্যায় চারপাশে, এতকিছু দেখে সবকিছু দিনের শেষে মেনে চলার যে স্বাধীনতা। এই মান্যতারও তো একটা স্বাধীনতা আছে। এই যে আমরা মেনে নিতে পারি, এই যে আমরা মুখ বুঝে সইতে পারি, এইভাবে চলতে চলতে হয়ত আমাদের সভ্যতা, দেশ, আমাদের সমগ্র পৃথিবীটাই হয়ত দিকচক্রবালে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তখনো আমাদের এই স্বাধীনতাটা জেগে থাকবে, যে আমরা সব কিছু মেনে নেওয়ার স্বাধীনতাকে বেছে নিয়েছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল, যে মেনে নেওয়ার স্বাধীনতার মধ্যেই আমরা আসল স্বাধীনতা খুঁজে পাব। প্রশ্ন করার স্বাধীনতার আমাদের প্রয়োজন নেই, বিপ্লব-বিদ্রোহ-প্রতিবাদের স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। তার থেকে অনেক সুবিধাজনক স্বাধীনতা হচ্ছে মেনে নেওয়ার স্বাধীনতা।

আমি আমার দেশকে সত্যিই খুব ভালোবাসি। মানে এই কথাটা বলা এখন ম্যান্ডেটরি, এই কথাটা না বললে বাড়িতে ঢিল পাটকেল পড়বে – এই কারণে বলছি না। সত্যিই আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। আমার মতো করে যেটা ভারতবর্ষ – আমার মেদিনীপুর, আমার শিল্পচর্চা, আমার বাড়ি, আমার বন্ধুরা, আমার চারপাশ, আমার বাড়ির পাশের গাছ, আমি যখন ট্রেনে করে যাই পাশের যে শস্য ক্ষেত, যে আকাশ, আমি যখন ভারতবর্ষের অন্য কোথাও যাই – এই সবকিছু নিয়েই তো আমার ভারতবর্ষ। আমি যতটুকু আমার ভারতবর্ষকে দেখেছি, অনুভব করেছি। সেটাকে আমি অসম্ভব ভালবাসি। আমি যা, আমাকে আজকে যে কারণে নাগরিকে এই কথা বলতে অনুরোধ করেছে, সেই সবকিছুর পিছনে আমার তো দেশই আছে। কিন্তু আমি এতটুকু বলতে পারি, যে আজকে আমার দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক স্বাধীনতার কথা আমি একেবারেই বলব না। কারণ সেগুলো বোধহয় আর কহতব্য নয় বা সেই আলোচনা হয়ত খুব ছোট করে ধরানোও যাবে না। তাতে প্রচুর তত্ত্বগত তর্ক হয়ত শুরু হবে, যার সম্পূর্ণত উত্তর দেওয়ার যোগ্যতা হয়ত আমার নেই। কিন্তু এটা সকলেই বোঝেন, যে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবস্থা আমাদের দেশে খুব একটা ভাল নয়। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীরও ভালো না, একজন সাধারণ মানুষেরও ভালো না। ফলত বাদবাকি যে স্বাধীনতাগুলো আছে, মেনে নেওয়ার স্বাধীনতা, চুপ করে থাকার স্বাধীনতা, একে অন্যকে আঘাত করার স্বাধীনতা – এই স্বাধীনতাগুলোতে সত্যিই আমার দেশ, এই ৭৫ বছর পূর্ণ করার স্বাধীনতা দিবসে, অত্যন্ত বলীয়ান। তাই আমি দেশের সকল মানুষকে ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই।

অনুলিখন: রিঙ্কি দাস

 

আরো পড়ুন:

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.